📄 বোহেমন্ডের বিনম্র আচরণ!
এসব বিষয় চিন্তা করে বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায় বোহেমন্ডের অভিনব কৌশলে। আরও বড় দাঁও মারার নিশ্চয়তায় বোহেমন্ড কল্পনাতীত ভিন্ন এক পন্থা অবলম্বন করেন!
বোহেমন্ড বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। তার এও জানা ছিল যে, বাইজান্টাইনদের সহায়তা ব্যতীত ক্রুসেডার বাহিনী কস্মিনকালেও ইসলামি ভূখণ্ড দখল করতে পারবে না।(২২১) সবচেয়ে বড় কথা—অতি সম্প্রতি সম্রাট ও গডফ্রের মধ্যে যে মতবিরোধের ঘটনা ঘটেছে এবং গডফ্রে যে শেষ পর্যন্ত নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি বিসর্জন দিয়ে বাইজান্টাইন সম্রাটের আনুগত্যের শপথ করতে বাধ্য হয়েছেন, বোহেমন্ড তাও জেনেছিলেন।
পরিস্থিতির আগা-গোড়া বিশ্লেষণ করে বোহেমন্ড উপলব্ধি করেন যে, প্রতাপশালী বাইজান্টাইন সম্রাট যদি তাকে সহায়তা করেন, তাহলে তার সামনে পুরো ক্রুসেডার বাহিনীর নেতৃত্বলাভের সুযোগ চলে আসবে। সবকিছু বিবেচনা করে বোহেমন্ড তার বাহিনীকে বাইজান্টাইন ভূখণ্ডে প্রবেশ করার পর শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। (২২২) এরপর তিনি সরাসরি কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে রওনা হন। নগরপ্রাচীরের কাছে পৌঁছে বোহেমন্ড তার ভাগ্নে টেনক্রেডের কাছে বাহিনীর দায়িত্ব দিয়ে নিজে রওনা হন সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য ও মিত্রতার শপথ করতে! (২২৩)
সুচতুর বোহেমন্ড প্রথমেই সরাসরি আনুগত্যের কথা ঘোষণা না করে সুস্পষ্ট দাবি জানান যে, তাকে এন্টিয়ক অঞ্চলে বড় ধরনের জায়গির প্রদান করতে হবে। বাইজান্টাইন সম্রাট এতে সম্মতি প্রকাশ করেন। ক্রুসেড যুদ্ধ চলাকালে এন্টিয়কে যে নরম্যান রাজ্যের অভ্যুদয় হয়েছিল, এ চুক্তি যেন ছিল সেই রাজ্যের প্রথম জন্মদিনের ঘোষণা! (২২৪) বোহেমন্ড তাকে ক্রুসেডার বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণারও দাবি জানান। তবে বাইজান্টাইন সম্রাট তার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। (২২৫) বাইজান্টাইন সম্রাট চাচ্ছিলেন কোনো সেনাপতিকে অসন্তুষ্ট না করে সবার নিয়ন্ত্রণ-চাবি নিজের হাতে রাখতে।
চুক্তি সম্পাদনের পরই বাইজান্টাইন সম্রাট নরম্যান বাহিনীটিকে গডফ্রের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য এশিয়া মাইনর অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন। এটি ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ এপ্রিলের ঘটনা। (২২৬)
টিকাঃ
২17. Chalandon: Alexis Comnene, p. 138.
২18. Setton: op., p. 155; Runciman: op. cit. 1, 155.
২19, Schomberger: Racit de Byzanceet des Croisades. Vol II, p. 82.
২২০. Cam. Med. Hist. vol. 5 p. 282.
২২১, Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 21.
২২২. Chalandon: Premiere Croisade, p.p. 133-136.
২২৩. Chalandon: Premiere Croisade, p. 132.
২২৪, Iorga: Brave Hist. des Croisades, p. 51.
২২৫. Brehier: op. cit., p. 311.
২২৬. Cam. Med. Hist. vol. 5 p. 281.
📄 অবশিষ্ট দুই বাহিনীর কনস্টান্টিনোপলে উপস্থিতি
এরপর কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছায় তুলুজ ও প্রভিন্সের ডিউক ৪র্থ রেমন্ডের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ ফ্রান্স ও প্রভিন্সের বাহিনী। এ বাহিনীটি স্থলপথে অগ্রসর হয়ে ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলের শেষ দিকে কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছায়। পথে রেমন্ডের বাহিনীও এমন কিছু সীমালঙ্ঘন করে, যার কারণে বাধ্য হয়ে বাইজান্টাইন বাহিনী তাদের প্রতিরোধ করে।(২২৭) বাহিনীটি কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছতেই সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস সেনাপতি রেমন্ডকে পূর্বে আগত দুই সেনাপতির অনুসরণ করে তার প্রতি আনুগত্য ও বশ্যতা স্বীকারের শপথ করতে বলেন। কিন্তু এ দাবি ছিল রেমন্ডের স্বপ্নের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। কারণ, রেমন্ড তো ক্যাথলিক পোপের রাজকীয় প্রতিনিধি হিসেবে পুরো বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হতে চান। পোপের প্রেরিত প্রতিনিধি অ্যাডমারও তার বাহিনীর সঙ্গে আছেন। তিনি কীভাবে এখন অর্থোডক্স গির্জার তত্ত্বাবধায়কের বশ্যতা ও আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করবেন? সমস্যা আরও আছে। রেমন্ড জানেন যে, তার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী নরম্যান সেনাপতি বোহেমন্ড ইতিমধ্যে বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রিয় মিত্রতে পরিণত হয়েছে। কাজেই এখন যদি তিনি সম্রাটের প্রতি আনুগত্যের শপথ করেন, সম্রাট হয়তো তাকে বোহেমন্ডের অধীনে কাজ করতে বলবেন। এটা তো রেমন্ড কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না।
এসব দিক বিবেচনা করে রেমন্ড সম্রাটের আনুগত্যের শপথ করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান(২২৮) এবং সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দেন যে, তিনি বাইজান্টাইন সম্রাটের স্বার্থরক্ষায় নয়; বরং 'যিশুখ্রিষ্টে'র মর্যাদা রক্ষায় যুদ্ধ করতে এখানে এসেছেন। এরপরও সম্রাট বারবার পীড়াপীড়ি ও চাপ প্রয়োগ করায় সশস্ত্র সংঘাত পরিস্থিতি অনিবার্য হয়ে ওঠে।(২২৯)
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবার মঞ্চে পুনঃআবির্ভাব ঘটে বোহেমন্ডের। ঘোলা পানিতে শিকার করার লোভে তিনি এবার ঘোষণা করেন, রেমন্ড যদি সম্রাটের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান, তাহলে তিনি তার শক্তিশালী নরম্যান বাহিনী নিয়ে বাইজান্টাইন বাহিনীর পক্ষে যোগ দেবেন। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। গডফ্রেও এই পরিস্থিতিতে বসে থাকবেন কেন! তিনি রেমন্ডকে এই বলে সম্রাটের কাছে নতি স্বীকার করতে রাজি করান যে, মুসলিম শত্রুবাহিনীর অবস্থান অতি নিকটে আর তারা অতিসত্বর ক্রুসেডারদের ওপর আক্রমণ চালাতে পারে। সবার চাপে নতি স্বীকার করে অবশেষে রেমন্ড এমন একটি মধ্যপন্থা অবলম্বনে সম্মত হন, যাতে তার মানসম্মানও রক্ষা পায়, সম্রাটও আপাতত তুষ্ট হন। তিনি আনুগত্যের শপথের পরিবর্তে বাইজান্টাইন সম্রাটের জীবন ও মর্যাদার সম্মান রক্ষার এবং সম্রাটকে ক্রুদ্ধ করবে এমন কোনো কাজ না করার শপথ করেন। (২৩০) সবদিক বিবেচনা করে সম্রাটও এতেই রাজি হন; বরং রেমন্ডের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে মিলিত হয়ে তাকে কৌশলে বুঝিয়ে দেন যে, তিনি বোহেমন্ডকে সম্মিলিত বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদানের বিষয়ে আশ্বস্ত নন। সম্রাটের এই স্পষ্টকথনে যথেষ্ট কাজ হয়; রেমন্ডের মন প্রশান্ত হয় এবং তিনি বাইজান্টাইন সম্রাটের সঙ্গে দৃঢ় মিত্রতাপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। (২৩১)
সর্বশেষ বাহিনীটি অর্থাৎ নরমান্দে (Normandy) অঞ্চলের ডিউক রবার্ট কার্তুজ-এর নেতৃত্বাধীন পশ্চিম ফ্রান্সের বাহিনীটি অন্যান্য বাহিনীর চেয়ে বিলম্ব করে কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছায়। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, রবার্টের সঙ্গে তার ভগ্নিপতি ও ব্লয়েস নগরীর কাউন্ট স্টিভেনও ছিলেন। (২৩২) এ বাহিনীটি প্রথমে ইতালি পৌঁছায়, তারপর সমুদ্রপথে বলকান অঞ্চল অভিমুখে রওনা হয়; এরপর সেখান থেকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ভূখণ্ড পাড়ি দিয়ে কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছায়। পথে এই বাহিনীটি কোনো ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করেনি। (২৩৩) বাহিনীর সেনাপতিদ্বয়ও বাইজান্টাইন সম্রাটের আনুগত্য স্বীকারের শপথ করতে কোনো প্রকার টালবাহানা করেননি। এজন্য তাদের দুজনকে প্রচুর উপঢৌকন প্রদান করা হয়। এরপর সম্রাট অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য তাদেরকে বসফরাস পাড়ি দিয়ে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে পৌঁছতে সহায়তা করেন। (২৩৪)
রবার্টের বাহিনীর এশিয়া মাইনর অঞ্চলে পা রাখার মধ্য দিয়ে প্রথম ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী সবগুলো পেশাদার বাহিনীর মুসলিম ভূখণ্ডে পৌঁছা সমাপ্ত হয়। পথিমধ্যে তাদের বলতে গেলে তেমন কোনো ক্ষতি বা সংখ্যাহ্রাসের শিকার হতে হয়নি। একমাত্র ব্যতিক্রম চতুর্থ বাহিনীটির কিছু সদস্য সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়ে মারা গিয়েছিল। তবে ওই বাহিনীটি আকারে ছোট হওয়ায় বিষয়টি তেমন প্রভাবক বিবেচিত হয়নি। এককথায় বলা চলে, এশিয়া মাইনরের মুসলিম ভূখণ্ডে সুবিশাল ক্রুসেডার বাহিনী পূর্ণ শক্তি নিয়েই সমবেত হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—প্রথম ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী ক্রুসেডার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা কত ছিল? একেবারে সর্বনিম্ন অনুমান অনুসারে এই হিংস্র ও বর্বর অভিযানে অংশগ্রহণকারী ক্রুসেডার যোদ্ধার সংখ্যা ছিল তিন লক্ষ! তাদের সঙ্গে নারী ও শিশুরা তো ছিলই। সবমিলিয়ে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ! তিন লক্ষ পুরুষ যোদ্ধা সাত লক্ষ নারী ও শিশুকে সঙ্গে নিয়ে ইসলামি ভূখণ্ডে উপস্থিত হয়েছে যুদ্ধ করে ফিরে যাওয়ার জন্য নয়; বসতি স্থাপন করে থেকে যেতে!
ক্রুসেডার বাহিনীর সেনাপতিগণ বাইজান্টাইন সম্রাটকে সম্মিলিত বাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করার প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে নিজে সুরক্ষিত রাজধানী কনস্টান্টিনোপলেই অবস্থান করেন এবং ক্রুসেডার বাহিনীকে 'যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা' অর্জনের পথে ঠেলে দেন। তবে তিনি জরুরি রসদপত্র, গোয়েন্দা ও অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক প্রদান করে ক্রুসেডার বাহিনীকে সহায়তা করেন। পাশাপাশি তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিষয়ে অভিজ্ঞ কয়েকজন বাইজান্টাইন সমরবিশারদকেও তাদের সঙ্গে প্রেরণ করেন। ক্রুসেডার বাহিনী ও মুসলিম বাহিনীর সংঘর্ষ এখন সুনিশ্চিত; মাঝে দূরত্ব দুই ধনুকের কিংবা আরও কম ! (২৩৫)
টিকাঃ
২২৭. Grousset: Hist. des Croisades 1, p.p. 24-25.
২২৮. Runciman: op. cit. 1, p. 136.
২২৯. Raymond d' Aigles: Hist. Occid. 111, p. 238.
২০০. Cam. Med. Hist. vol. 5 p. 283; Anna Comnena, pp. 239-231; Gesta Francorun, p. 13; Raymond d'Agueiler, in petrs (ed.), pp. 140-142; William of Tyre: 1, pp. 139-146.
২০১. Runciman: op. cit. 1, p. 164.
২০২. Michaud: Hist. des Croisades, 1. P. 178.
২০০. Foucher de chartres (Hist. Occid. 111), p.p. 331-332.
২০৪. Chalandon: alexis comnene, p.p. 188-189.
২০৫. Grousset: Hist, des Croisades, 1, p. 27.