📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী সামরিক বাহিনীসমূহ

📄 ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী সামরিক বাহিনীসমূহ


প্রথম ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষিত বাহিনীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাব যে, বাহিনীটি মূলত পাঁচটি আলাদা আলাদা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল।
ইংল্যান্ড ওয়েলস পোমেরানিয়া + প্রথম বাহিনী তৃতীয় বাহিনী নরম্যান প্যারিস জার্মানি চতুর্থ বাহিনী অস্ট্রিয়া ফ্রান্স: পোল্যান্ড হাঙ্গেরি নাফার ক্যাস্টোলা রাজ্য মুরাবিতি রাষ্ট্র দ্বিতীয় বাহিনী বাচ্ছা বার্সেলোনা রাজ্য ভূমধ্যসাগর মানচিত্র নং-১১ ক্রোয়েশিয়া পঞ্চম ইতালি বাহিনী রোম
প্রথম ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী বাহিনীসমূহ

১. প্রথম বাহিনীটি ছিল ফরাসি নাগরিক গডফ্রে ডি বোলোন (Godfrey de bouillon)-এর নেতৃত্বাধীন। গডফ্রে ছিলেন লুক্সেমবার্গের দক্ষিণে অবস্থিত বোলোন নগরীর প্রশাসক। এরপর তিনি লোথারিঙ্গিয়া সাম্রাজ্যের ডিউক নির্বাচিত হন। তার সঙ্গে তার ভাই যুবরাজ বল্ডউইন (Baldwin I)-ও ছিলেন। (১৯০) এ ছাড়াও তার বাহিনীতে বেশ কয়েকজন সামন্ত ছিল, যাদের অধিকাংশই ছিল ফ্রান্সের। বেশ কয়েকজন সামন্তের উপস্থিতির কারণে গডফ্রের বাহিনীটি বিশেষ গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছিল। (১৯১) বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য ছিল উত্তর ফ্রান্সের লোরেন (Lorraine) অঞ্চলের। অবশ্য কিছু জার্মান সৈন্যও তাদের সঙ্গে ছিল। (১৯২)

ফরাসি নাগরিক হলেও গডফ্রে কিন্তু তৎকালীন ফ্রান্সের দুর্বল রাজা ১ম ফিলিপের অনুগত ছিলেন না, তিনি আনুগত্য করতেন জার্মানির শক্তিমান রাজা ৪র্থ হেনরির। (১৯৩) গডফ্রের স্বপ্ন ছিল, তিনিই হবেন সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তার বাহিনীতে অধিক সংখ্যক সামন্তের উপস্থিতি তাকে এক্ষেত্রে শক্তি জোগাচ্ছিল।

২. দ্বিতীয় বাহিনীটিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে আগত বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন তুলুজ (Toulouse) ও প্রভিন্স (Provence)-এর ডিউক ৪র্থ রেমন্ড (Raymond IV)। রেমন্ডের উপস্থিতিই বাহিনীটির গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। গডফ্রের ন্যায় রেমন্ডও নিজেকে ক্রুসেডার বাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি মনে করতেন। ডিউক রেমন্ড ছিলেন বয়সে সবচেয়ে প্রবীণ সেনাপতি; অধিকন্তু তিনি পোপ ২য় আরবানের আহ্বানে শুরুতেই সাড়া দিয়েছিলেন। যোদ্ধা সংগ্রহের লক্ষ্যে পোপ যেসব সভার আয়োজন করেছিলেন, রেমন্ড তার অধিকাংশতেই যোগ দিয়েছিলেন। ইতিপূর্বে তার আন্দালুস ভূমিতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতাও ছিল। রেমন্ড সুস্পষ্ট ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি পোপেরও অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। এ কারণেই পোপ অন্য সব বাহিনী বাদ দিয়ে রেমন্ডের বাহিনীর সঙ্গেই রোমের গির্জার প্রতিনিধি হিসেবে লি পাই কার্থিডালের (Le Puy Cathedral) বিশপ অ্যাডমারকে পাঠিয়েছিলেন। (১৯৪) সবচেয়ে বড় কথা—রেমন্ডের বাহিনীই ছিল ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী সর্ববৃহৎ বাহিনী। এসব দিক বিবেচনা করে ৪র্থ রেমন্ড স্বপ্ন দেখছিলেন যে, অন্য কেউ নয়; তিনিই হবেন ক্রুসেডার বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। (১৯৫)

৩. মূলত পশ্চিম ফ্রান্সের নরমান্দে (Normandy) থেকে আগত তৃতীয় বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন নরমান্দে অঞ্চলের ডিউক রবার্ট কার্তুজ (Robert Curthose)। তার সঙ্গে তার ভগ্নিপতি ও ব্লয়েস (Blois) নগরীর কাউন্ট স্টিভেন (Stephen II Henry)-ও ছিলেন। এই বাহিনীটির সঙ্গে অনেক ইংরেজ যোদ্ধাও যোগ দিয়েছিল। (১৯৬)

৪. চতুর্থ বাহিনীটিও ছিল ফরাসি। তবে এই বাহিনীটি ছিল তুলনামূলক ক্ষুদ্র আকৃতির। সম্ভবত এই বাহিনীটি ফ্রান্সের রাজা ১ম ফিলিপের রাজকীয় প্রতিনিধিত্ব করছিল। কারণ, বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন রাজার সহোদর হিউ (Hugh)। হিউ ছিলেন ভার্মান্ডয়েস (Vermandois) অঞ্চলের কাউন্ট। (১৯৭)

৫. পঞ্চম ও শেষ বাহিনীটিও ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক ও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ইতালি থেকে আগত এই বাহিনীটি গঠিত হয়েছিল ভয়ংকর নরম্যান যোদ্ধাদের সমন্বয়ে। বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন আরেক উচ্চাভিলাষী যুবরাজ বোহেমন্ড (Bohemond)। (১৯৮) গডফ্রে ও রেমন্ডের মতো বোহেমন্ডও পুরো বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। তার পক্ষে যেসব বিষয় সহায়ক ছিল সেগুলো হলো— তার বাহিনী ছিল সবচেয়ে বিন্যস্ত, সবচেয়ে রণকুশলী এবং লড়াইয়ের ময়দানে সবচেয়ে অটল-অবিচল। (১৯৯) অধিকন্তু তিনি ছিলেন তৎকালীন পুরো ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাজন্য রবার্ট গোয়েসকার্ডের (Robert Guiscard) পুত্র, যিনি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে বলকান অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। (২০০) বোহেমন্ডের নিজের ১০৮১ খ্রিষ্টাব্দে এন্টিয়ক অবরোধ করার এবং বাইজান্টাইনদের মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা ছিল। বোহেমন্ডের সঙ্গে তার ভাগ্নে টেনক্রেড (Tancred)-ও ছিলেন। টেনক্রেড ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ও কঠোর প্রকৃতির একজন সেনাপতি। বোহেমন্ডের বাহিনীতে টেনক্রেড ছাড়াও আরও কয়েকজন দক্ষ নরম্যান সেনাপতি ছিল। (২০১)

আমাদের সামনে এ বিষয়টি আশা করি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, আসন্ন অভিযানের জন্য সমবেত হওয়া ক্রুসেড বাহিনীগুলোর একক কোনো নেতৃত্ব ছিল না; বরং শুরু থেকেই বাহিনীগুলোর সেনাপতিগণ সর্বাধিনায়ক হওয়ার জন্য পরস্পর স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল এবং আপন আপন রাজ্য সম্প্রসারণের এক বিশাল স্বপ্ন প্রত্যেককেই প্ররোচিত করছিল।

টিকাঃ
১৯০. Michaud: Hist. Des Croisades, 1, pp. 146-147.
১৯১. Runciman: op. cit., 1, p. 147.
১৯২. William Of Tyre 1, pp. 116-120.
১৯৩. Cam. Med Histvol. 5, p. 281.
১৯৪. Grousset: Hist. des Croisades 1, pp. 24-25; Runciman, Hist. of the Crusades, 1, p. 142.
১৯৫. Runciman: op. cit. 1, p. 136.
১৯৬. Raymond d' Aguilers, in Peters (ed.), The first Crusade, pp. 181-211. William of Tyre 1, pp. 139-140.
১৯৭. Anna Comnena, p. 314: AOL, 1, pp. 121-122, 145: Hagenmeyer "Chronologie", p. 248.
১৯৮. Gesta Francorun, pp. 6-13; Anna Comnena, pp. 326-329.
১৯৯. Runciman: op. cit. 1, p. 157.
২০০. Ostrogorsky: op. cit. 11, p. 381.
২০১. Chalandon: Premiere Croisade, p. 132.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ফ্রান্স থেকে কনস্টান্টিনোপলের পথে

📄 ফ্রান্স থেকে কনস্টান্টিনোপলের পথে


ফ্রান্স থেকে সবার আগে রওনা হয়ে সবার আগেই বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে পৌঁছায় চতুর্থ ও সবচেয়ে ক্ষুদ্র দলটি। কিন্তু তারা নির্মম পরিণতির শিকার হয়। সমুদ্রপথে রওনা হওয়া বাহিনীটি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের উপকূলের কাছে এসে প্রচণ্ড ঝড়ের শিকার হয় এবং প্রচুর সৈন্য নিহত হয়। বাইজান্টাইন নৌবাহিনীর একটি দল বাকিদের উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। (২০২) বাহিনীর প্রধান হিউ বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমিনোসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সম্রাটের মিত্রতা ও আনুগত্যের শপথ করে প্রতিজ্ঞা করেন যে, তিনি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব থেকে মুসলমানদের কেড়ে নেওয়া ভূমি পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। হিউয়ের এই আনুগত্য ও নতজানু নীতি আলোচ্য পরিস্থিতিতে মোটেও আশ্চর্যের কোনো বিষয় ছিল না। (২০৩)

অবশ্য এ বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য যে, চলমান ঘটনাপ্রবাহে এই ক্ষুদ্র বাহিনীটির উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাবও ছিল না।

এরপর কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছায় গডফ্রের নেতৃত্বাধীন প্রথম বাহিনীটি। আলোচনার এ পর্যায়ে এ বাহিনীটি সম্পর্কে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা হচ্ছে।

মানচিত্র নং-১২ ক্রুসেডার বাহিনীগুলোর ইউরোপ থেকে কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে যাত্রা

গডফ্রের বাহিনীটি স্থলপথেই রওনা হয়। এক্ষেত্রে তারা সে পথই অবলম্বন করে, ইতিপূর্বে ধর্মযাজক পিটার ও কাঙাল ওয়ালটারের বাহিনীসহ অন্যান্য অপ্রশিক্ষিত বাহিনী যে পথে যাত্রা করেছিল। (২০৪) এর অর্থ হচ্ছে কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছতে তাদের হাঙ্গেরিসহ পশ্চিম ইউরোপের সেসব অঞ্চল পাড়ি দিতে হবে, যেসব অঞ্চলে ইতিপূর্বে ক্রুসেডারদের অভিযাত্রাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বেদনাদায়ক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। তাদেরকে মুখোমুখি হতে হবে হাঙ্গেরির শক্তিশালী রাজা কোলোম্যানের, যিনি বাধা প্রদান করলে গডফ্রের বাহিনীর অগ্রযাত্রাই কেবল ব্যাহত হবে না; প্রচুর শক্তিক্ষয়, এমনকি শক্তি নিঃশেষও হয়ে যেতে পারে। এসব দিক বিবেচনা করে সুচতুর গডফ্রে সিদ্ধান্ত নেন, হাঙ্গেরিতে প্রবেশের আগে জার্মানি-হাঙ্গেরি সীমান্তে তিনি রাজা কোলোম্যানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়ে তার সঙ্গে সমঝোতা-চুক্তি করে নেবেন।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গডফ্রে হাঙ্গেরির রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চুক্তি সম্পাদন করেন। চুক্তিতে শর্তারোপ করা হয় যে, গডফ্রের বাহিনী হাঙ্গেরি অতিক্রম করার সময় হাঙ্গেরি ভূখণ্ডের কোনো সম্পদ স্পর্শ করবে না, কোনো নাগরিকের কোনো প্রকার ক্ষতি করবে না। গডফ্রের অঙ্গীকারে রাজা যেন আস্থা রাখতে পারেন, এজন্য তিনি তার বাহিনী হাঙ্গেরি অতিক্রমের সময়ে তার ভাই বল্ডউইনকে হাঙ্গেরির রাজার কাছে জামিন রাখার সিদ্ধান্ত নেন। পাশাপাশি গডফ্রে তার বাহিনীর সদস্যদের এ অঞ্চলে কোনো ধরনের লুটতরাজ বা নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে কঠোরভাবে নিষেধ করে দেন।

এই চুক্তির ফলে ক্রুসেডার বাহিনীর প্রথম দলটি নিরাপদে হাঙ্গেরি অতিক্রম করে। বাইজান্টাইন ভূখণ্ডে প্রবেশের সময় বেলগ্রেড ও নিস- এর মধ্যবর্তী এলাকায় পৌঁছে গডফ্রে বাইজান্টাইন সম্রাটের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি প্রতিনিধিদলকেও প্রতিশ্রুতি দেন যে, তার বাহিনী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের কোনো সম্পদ স্পর্শ করবে না। বিপরীতে বাইজান্টাইন প্রশাসন মুসলিম ভূখণ্ডে পৌঁছা পর্যন্ত গডফ্রের বিশাল বাহিনীর রসদ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সামগ্রী প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। (২০৫)

এরপর গডফ্রের নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার বাহিনী পথচলা অব্যাহত রেখে বাইজান্টাইন নগরী সেলিমব্রিয়া (২০৬) এর কাছে মর্মর সাগরের তীরে পৌঁছে যায়। এটি ১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্য ডিসেম্বরের (৪৮৯ হিজরি সনের) কথা। অভিযাত্রায় এ পর্যায়ে এসে গডফ্রে তার বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। তার বাহিনীর সদস্যরা সেলিমব্রিয়ার সম্পদ-প্রাচুর্য দেখে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয় এবং নগরীজুড়ে লুটপাট শুরু করে। (২০৭)

এ ঘটনা ছিল বাইজান্টাইন সম্রাটের জন্য সুস্পষ্ট সতর্কবাণী। পশ্চিম ইউরোপ থেকে আগত এই প্রশিক্ষিত বাহিনীর আচরণ সম্রাটকে অত্যন্ত শঙ্কিত করে তোলে। তিনি সূক্ষ্মভাবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে থাকেন।

সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস কেবল মুসলমানদের হুমকি প্রতিরোধ এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মুসলমানদের কাছে হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের জন্যই পোপের সাহায্য চেয়েছেন এবং এসব বাহিনীকে এ পর্যন্ত আসার সুযোগ দিয়েছেন। আর তাই তার অনুমান ছিল, এসব বাহিনী ভাড়াটিয়া বাহিনীর ন্যায় কাজ করবে। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য পূর্বেও বিভিন্ন প্রয়োজনে ভাড়াটিয়া সৈন্য আমদানি করেছে। সম্রাটের ধারণা ছিল, তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সম্পাদন করবে; এরপর নিজেদের পারিশ্রমিক নিয়ে ফিরে যাবে। ব্যস, এতটুকুতেই তাদের দায়িত্ব ও ভূমিকা শেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু পূর্ববর্তী প্রশিক্ষণহীন ক্রুসেডার বাহিনীগুলোর আচরণ এবং এখন গডফ্রের বাহিনীর কৃত আচরণ অবলোকন করে বাইজান্টাইন সম্রাট গভীর চিন্তায় পড়ে যান। এসব বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে এসেছে। অর্থাৎ তারা যুদ্ধ শেষে ফিরে যেতে নয়, থেকে যাওয়ার লক্ষ্যে আগমন করেছে। অধিকন্তু তারা সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের অধিকারী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের স্বার্থরক্ষার লক্ষ্যেও আগমন করেনি। সম্রাট আরও লক্ষ করেন যে, গডফ্রের নেতৃত্বাধীন এই নিয়মিত বাহিনীটি আকৃতিতে যেমন বড়, তেমনই পেশাদার ও শক্তিশালী। তাদের সঙ্গে যখন অন্যান্য বাহিনীও মিলিত হবে, তখন পরিস্থিতি কেমন হবে?!

সম্রাটের অতীত স্মৃতি মনে পড়ে যায়। ইতিপূর্বে একবার বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ইতালি থেকে কিছু ভাড়াটে সৈনিক সংগ্রহ করেছিল। তাদেরই একজন রাসেল ডি ব্যালিউল (Roussel de Bailleul) নামক জনৈক দুঃসাহসী নরম্যান সেনাপতি ১০৭৩ খ্রিষ্টাব্দে (৪৬৫ হিজরি সনে) বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এবং তাদের প্রচুর ক্ষতিসাধনে সক্ষম হয়। রাসেল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। শেষ পর্যন্ত তার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য মুসলিম সেলজুকদের শরণাপন্ন হয় এবং এ মর্মে চুক্তি করে যে, সেলজুকরা যদি রাসেলকে পরাভূত করে বাইজান্টাইন প্রশাসনের হাতে তুলে দিতে পারে, তাহলে বাইজান্টাইনরা রাসেলের দখলে থাকা অঞ্চলগুলো সেলজুকদের দিয়ে নেবে। সেলজুকরা রাসেলকে পাকড়াও করে বাইজান্টাইনদের হাতে তুলে দেয় এবং চুক্তিমতো রাসেলের দখলকৃত অঞ্চলগুলোর কর্তৃত্ব বুঝে নেয়। সম্রাট ভাবতে থাকেন, এক রাসেল যদি মাত্র তিন হাজার ভাড়াটে সৈন্য নিয়ে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে এভাবে নাকানিচুবানি খাওয়াতে পারে, তাহলে গডফ্রের এই বিশাল বাহিনীর কারণে আগামীর পরিস্থিতি কেমন হবে! আর ক্রুসেডার বাহিনীর সবগুলো অংশ যদি একত্র হয়, তখন পরিস্থিতি কেমন ভয়ানক হবে তা ভাবতেই সম্রাটের দেহ-মন শিউরে ওঠে।

টিকাঃ
২০২. কাসিম আবদুহু কাসিম, মাহিয়াতুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১১৮।
২০৩. Anna Comnena, p. 315; Fulcherde Chartres, p. 72.
২০৪, Setton: op. cit., 1, p. 12.
২০৫. Albert d' Aix, lv. pp. 299-305.
২০৬. পূর্বের নাম Selymbria, বর্তমান নাম Silivri। [অনুবাদক]
২০৭. Idem, p.p. 304-305.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 বাইজান্টাইন সম্রাট ও গডফ্রের মধ্যে চুক্তি

📄 বাইজান্টাইন সম্রাট ও গডফ্রের মধ্যে চুক্তি


সবদিকে ভেবে-চিন্তে অবশেষে ঝানু সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস উপলব্ধি করেন যে, গডফ্রের বাহিনীর বিষয়ে এখনই কোনো দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। আর তাই অন্যান্য ক্রুসেডার বাহিনী উপস্থিত হয়ে সমস্যা আরও জটিল করে তোলার পূর্বেই তিনি সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পূর্ণ তৎপর হয়ে ওঠেন। (২০৮)

কী ছিল বাইজান্টাইন সম্রাটের সেই তৎপরতা?!
বাইজান্টাইন সম্রাট ও গডফ্রের মধ্যে চুক্তি
বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস সেনাপতি গডফ্রের কাছে দাবি জানান যে, তাকে বাইজান্টাইন সম্রাটের আনুগত্যের শপথ করতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে, প্রকারান্তরে তার এ অঙ্গীকারও করতে হবে যে, মুসলমানদের অধিকারে থাকা ভূখণ্ডে পৌঁছার পরও তিনি বাইজান্টাইন সম্রাটের অধীনস্থ থাকবেন এবং তিনি যদি সেসব ভূখণ্ড উদ্ধার করতে সক্ষম হন, তাহলে তা তার নিজের নয়; বরং বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের ভূসম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে। (২০৯) এই শপথের ফলে সেসব অঞ্চলের আইনগত অবস্থান শুরুতেই নির্দিষ্ট হয়ে যাবে এবং বাইজান্টাইন সম্রাট সেসব অঞ্চলের যাবতীয় অধিকার সংরক্ষণ করবেন।

নিঃসন্দেহে এটি ছিল অত্যন্ত কঠিন দাবি ও সুকঠিন শর্ত!

গডফ্রে তো পূর্ব থেকেই অন্য এক সম্রাটের বশ্যতা স্বীকার করে আছেন, যার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও আদেশ-নির্দেশ বাইজান্টাইন সম্রাটের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। তা ছাড়া গডফ্রে এখানে এসেছেন ক্যাথলিক গির্জার আহ্বানের ভিত্তিতে। তিনি কী করে অর্থোডক্স গির্জার পরিচালক বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রতি মিত্রতা ও আনুগত্য প্রকাশ করবেন! সবচেয়ে বড় কথা—তিনি তো নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও ভূ-মালিকানা বিস্তৃতির লক্ষ্যে বের হয়েছেন। অতীত কোনো অধিকার, ঐতিহাসিক কোনো বাস্তবতা তার মানসপটে বিবেচ্য নয়। তিনি এসেছেন দস্যুর ন্যায় সবকিছু কেড়ে নিতে; অন্যের ভূখণ্ড দখল করার জন্য তার তো কোনো যৌক্তিকতা বা কার্যকারণের প্রয়োজন নেই! (২১০)

সর্বদিক বিবেচনা করে গডফ্রে বাইজান্টাইন সম্রাটের দাবিতে সাড়া দিতে গড়িমসি করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আশা করছিলেন যে, এর মধ্যেই অন্যান্য ক্রুসেডার বাহিনীও চলে আসবে এবং তখন সকলে মিলে এমন কোনো সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পাওয়া যাবে, যাতে সকলের স্বার্থ রক্ষা হয় এবং সম্রাট তাদেরকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো জটিলতায় ফেলতে না পারেন।

কিন্তু বাইজান্টাইন সম্রাট গডফ্রের গড়িমসির কারণ অনুমান করে ফেলেন। তিনি অপেক্ষা না করার সিদ্ধান্ত নেন এবং গডফ্রের বাহিনীকে প্রদত্ত খাদ্যসরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু হতে না হতেই গডফ্রের বাহিনী তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। তারা এবার কনস্টান্টিনোপলের আশেপাশের জনপদগুলোতে লুটতরাজ শুরু করে। ফলে বাইজান্টাইন সম্রাট প্রভাবিত হন এবং সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মনস্থ করে পুনরায় ক্রুসেডার বাহিনীকে রসদপ্রদান শুরু করেন; বরং এবার তিনি কনস্টান্টিনোপলের উপকণ্ঠে পেইরা (২১১) এলাকায় ক্রুসেডার বাহিনীর অবস্থান ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন। (২১২) পাশাপাশি তিনি কোমলভাবে গডফ্রেকে তার আনুগত্য ও মিত্রতার শপথ করার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকেন। গডফ্রেও নতুন করে টালবাহানা শুরু করেন। এভাবে টালবাহানার মধ্যেই ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি থেকে মার্চ পূর্ণ তিন মাস কেটে যায়। একপর্যায়ে তিনি বাইজান্টাইন সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেন।

এপ্রিলের শুরুতে বাইজান্টাইন সম্রাট জানতে পারেন যে, ইতালিয়ান নরম্যান বাহিনী (পঞ্চম ক্রুসেডার বাহিনী) কনস্টান্টিনোপলের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সম্রাট এই বাহিনীটির শক্তিমত্তা সম্পর্কে ভালো করেই জানতেন। গডফ্রে-সমস্যা সমাধানের পূর্বে অন্য কোনো বাহিনী কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছে যাক, সম্রাট তা মোটেও চাচ্ছিলেন না। এ কারণেই তিনি নতুন করে আবারও রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে গডফ্রেকে উত্তেজিত করার সিদ্ধান্ত নেন। গডফ্রেও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পেইরা অঞ্চলে হামলা চালিয়ে প্রথমে লুটতরাজ ও পরে অগ্নিসংযোগ করেন। এমনকি তিনি কনস্টান্টিনোপলের নগরপ্রাচীরেও হামলা চালান। (২১৩) নিরুপায় হয়ে বাইজান্টাইন সম্রাট পূর্ণ শক্তির বাইজান্টাইন বাহিনী নিয়ে বেরিয়ে আসেন। বাইজান্টাইন বাহিনীর সামনে গডফ্রে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে ব্যর্থ হন এবং বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের প্রকৃত শক্তি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। এবার তিনি সহজেই নিজের নীতি ও মিত্রতা পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেন এবং বাইজান্টাইন সম্রাটের প্রতি আনুগত্য ও অধীনতার শপথ গ্রহণ করেন! (২১৪)

১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে উভয়ের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী গডফ্রে বাইজান্টাইন সম্রাটের আনুগত্য ও বশ্যতার শপথ করেন। চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা হয় যে, মানজিকার্টের যুদ্ধের পূর্বে যেসব ভূখণ্ড বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত ছিল, গডফ্রে ও তার বাহিনীর হাতে সেসব ভূখণ্ড বিজিত হলে তা পুনরায় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হবে। এর অর্থ হচ্ছে বাইজান্টাইন সম্রাটের লালসা কেবল এশিয়া মাইনরেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এন্টিয়ক ও এডেসাসহ শামের উচ্চ অঞ্চল এবং ইরাকের বিভিন্ন নগরীও তার চাহিদার অন্তর্ভুক্ত! বরং বাইজান্টাইন বিভিন্ন বর্ণনা অনুসারে বাইতুল মুকাদ্দাসও চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। যুক্তি এই ছিল যে, সম্রাট ১ম জাস্টিনিয়ান (Justinian I)-এর আমলে (রাজত্বকাল : ৫২৭-৫৬৫ খ্রিষ্টাব্দ) বাইতুল মুকাদ্দাস বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত ছিল। চুক্তির এই ধারাটি পরবর্তী শতাব্দীকাল ধরে বাইজান্টাইন ও ক্রুসেডারদের মাঝে এক দীর্ঘ সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। (২১৫)

চুক্তি সম্পাদনের পর বাইজান্টাইন সম্রাট গডফ্রের প্রতি যথেষ্ট আন্তরিকতা প্রদর্শন করতে থাকেন এবং তাকে বহুমূল্যের উপঢৌকন প্রদান করেন। (২১৬) তবে কনস্টান্টিনোপলেই যেন গডফ্রের সঙ্গে বোহেমন্ডের বাহিনীর সাক্ষাৎ না হয়ে যায়, এ উদ্দেশ্যে তিনি দ্রুত গডফ্রের বাহিনীকে এশিয়া মাইনর অভিমুখে রওনা করিয়ে দেন। এখন তিনি নিশ্চিন্তে সঙ্গীহীন বোহেমন্ডের সঙ্গে দরকষাকষি করতে পারবেন!(২১৭)

গডফ্রে তার বাহিনী নিয়ে বসফরাস প্রণালি পাড়ি দিয়ে এশিয়া মাইনরে পা রাখতেই বোহেমন্ড তার বাহিনী নিয়ে কনস্টান্টিনোপলে এসে পৌঁছেন! বোহেমন্ডের বাহিনী ইতালি থেকে সমুদ্রপথে আলবেনিয়ার সামুদ্রিক নগরী এভলোনাতে (Avlona) অবতরণ করে; এরপর সেখান থেকে বলকান অঞ্চল হয়ে কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছায়।(২১৮) বোহেমন্ডের বাহিনীর আগমনে বাইজান্টাইন সম্রাট সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। ভীত হওয়ার কারণ শুধু বাহিনীটির শক্তিমত্তাই ছিল না; বরং সম্রাটের রাসেল ডি ব্যালিউলের স্মৃতি মনে পড়ে যায়।(২১৯) সম্রাটের আরও মনে পড়ে স্বয়ং বোহেমন্ড কর্তৃক ১০৮১ খ্রিষ্টাব্দে (৪৭৩ হিজরি সনে) কনস্টান্টিনোপল অবরোধের স্মৃতি। এখন তো বোহেমন্ড আগের চেয়ে কয়েকগুণ বড় বাহিনী নিয়ে আগমন করেছেন। আর অন্যান্য ক্রুসেডার বাহিনী তো আছেই!(২২০)

টিকাঃ
২০৮. Chalandon: Premiere Croisade, p.p. 119-121.
২০৯. Runciman :oip. Cit., p. 149.
২১০. Cam. Med. Hist. vol. 5, p. 281.
২১১. বর্তমান নাম Beyoğlu। [অনুবাদক]
২১২. Brehier, op. cit., p 113; Chalandon: Alexis Comnene, p.p. 178-179.
২০. Albert d’ Aix p.p. 307-308.
২১৪. Runciman: op. cit., p. 151.
২১৫. Guillaman: de tyr, 1, p.p. 87-88; Grousset: op. cit. 1, p. 19.
২১৬. Michaud: Hist. des Croisades, 1, p. 179.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 বোহেমন্ডের বিনম্র আচরণ!

📄 বোহেমন্ডের বিনম্র আচরণ!


এসব বিষয় চিন্তা করে বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায় বোহেমন্ডের অভিনব কৌশলে। আরও বড় দাঁও মারার নিশ্চয়তায় বোহেমন্ড কল্পনাতীত ভিন্ন এক পন্থা অবলম্বন করেন!

বোহেমন্ড বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সামরিক শক্তি সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। তার এও জানা ছিল যে, বাইজান্টাইনদের সহায়তা ব্যতীত ক্রুসেডার বাহিনী কস্মিনকালেও ইসলামি ভূখণ্ড দখল করতে পারবে না।(২২১) সবচেয়ে বড় কথা—অতি সম্প্রতি সম্রাট ও গডফ্রের মধ্যে যে মতবিরোধের ঘটনা ঘটেছে এবং গডফ্রে যে শেষ পর্যন্ত নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি বিসর্জন দিয়ে বাইজান্টাইন সম্রাটের আনুগত্যের শপথ করতে বাধ্য হয়েছেন, বোহেমন্ড তাও জেনেছিলেন।

পরিস্থিতির আগা-গোড়া বিশ্লেষণ করে বোহেমন্ড উপলব্ধি করেন যে, প্রতাপশালী বাইজান্টাইন সম্রাট যদি তাকে সহায়তা করেন, তাহলে তার সামনে পুরো ক্রুসেডার বাহিনীর নেতৃত্বলাভের সুযোগ চলে আসবে। সবকিছু বিবেচনা করে বোহেমন্ড তার বাহিনীকে বাইজান্টাইন ভূখণ্ডে প্রবেশ করার পর শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। (২২২) এরপর তিনি সরাসরি কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে রওনা হন। নগরপ্রাচীরের কাছে পৌঁছে বোহেমন্ড তার ভাগ্নে টেনক্রেডের কাছে বাহিনীর দায়িত্ব দিয়ে নিজে রওনা হন সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য ও মিত্রতার শপথ করতে! (২২৩)

সুচতুর বোহেমন্ড প্রথমেই সরাসরি আনুগত্যের কথা ঘোষণা না করে সুস্পষ্ট দাবি জানান যে, তাকে এন্টিয়ক অঞ্চলে বড় ধরনের জায়গির প্রদান করতে হবে। বাইজান্টাইন সম্রাট এতে সম্মতি প্রকাশ করেন। ক্রুসেড যুদ্ধ চলাকালে এন্টিয়কে যে নরম্যান রাজ্যের অভ্যুদয় হয়েছিল, এ চুক্তি যেন ছিল সেই রাজ্যের প্রথম জন্মদিনের ঘোষণা! (২২৪) বোহেমন্ড তাকে ক্রুসেডার বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণারও দাবি জানান। তবে বাইজান্টাইন সম্রাট তার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। (২২৫) বাইজান্টাইন সম্রাট চাচ্ছিলেন কোনো সেনাপতিকে অসন্তুষ্ট না করে সবার নিয়ন্ত্রণ-চাবি নিজের হাতে রাখতে।

চুক্তি সম্পাদনের পরই বাইজান্টাইন সম্রাট নরম্যান বাহিনীটিকে গডফ্রের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য এশিয়া মাইনর অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন। এটি ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ এপ্রিলের ঘটনা। (২২৬)

টিকাঃ
২17. Chalandon: Alexis Comnene, p. 138.
২18. Setton: op., p. 155; Runciman: op. cit. 1, 155.
২19, Schomberger: Racit de Byzanceet des Croisades. Vol II, p. 82.
২২০. Cam. Med. Hist. vol. 5 p. 282.
২২১, Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 21.
২২২. Chalandon: Premiere Croisade, p.p. 133-136.
২২৩. Chalandon: Premiere Croisade, p. 132.
২২৪, Iorga: Brave Hist. des Croisades, p. 51.
২২৫. Brehier: op. cit., p. 311.
২২৬. Cam. Med. Hist. vol. 5 p. 281.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00