📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 দৃশ্যপটে কিলিজ আরসালান, উচ্ছৃঙ্খল ক্রুসেডার বাহিনীর পতন

📄 দৃশ্যপটে কিলিজ আরসালান, উচ্ছৃঙ্খল ক্রুসেডার বাহিনীর পতন


ওয়ালটার ও পিটারের নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার বাহিনী এশিয়া মাইনর অঞ্চলে প্রবেশ করার পর পেশাদার ও প্রশিক্ষিত বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করার পরিবর্তে বিভিন্ন মুসলিম জনপদে হামলা শুরু করে এবং হত্যা ও লুণ্ঠন চালাতে থাকে। বিপরীত দিক থেকে প্রবল প্রতিরোধ না থাকায় নিজেদের প্রাথমিক সাফল্যে তারা উন্মত্ত হয়ে ওঠে। এতটুকু চিন্তাও তাদের ছিল না যে, তারা ইতিমধ্যে এশিয়া মাইনর অঞ্চলের সেলজুক রাষ্ট্রের তৎকালীন সুলতান কিলিজ আরসালান বিন সুলায়মান বিন কুতুলমিশের ঘাঁটি নিকিয়া নগরীর অল্প কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে চলে এসেছে। (১৮৮)

সুলতান কিলিজ আরসালান একটি সামরিক কৌশল অবলম্বন করেন এবং এই নির্বোধ-অশিক্ষিত বাহিনীটিকে মজবুত ফাঁদে আটকে ফেলতে সক্ষম হন। সেলজুক বাহিনী ক্রুসেডার বাহিনীকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এরপর শুরু হয় দ্রুত যুদ্ধ। যুদ্ধে সাম্প্রদায়িক চেতনা লালনকারী খ্রিষ্টান বাহিনীটির সামরিক অজ্ঞতা পুরোপুরি প্রকাশ পেয়ে যায় এবং তারা সেলজুক বাহিনীর হাতে বেঘোরে মারা পড়ে। অগ্রবর্তী এই বাহিনীটির বিপর্যয়ের সংবাদ পাওয়ার পর বাইজান্টাইন সম্রাট যদি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করতেন, তাহলে তাদের একজনও বাঁচতে পারত না। তিনি দ্রুত তাদের রক্ষায় কিছু বাইজান্টাইন সৈন্যসহ কয়েকটি জাহাজ প্রেরণ করেন। বাইজান্টাইন বাহিনী মাত্র তিন হাজার ক্রুসেডারকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। বাকিরা সকলে সেলজুক বাহিনীর ফাঁদে পড়ে নিহত হয়। যুদ্ধে কাঙাল ওয়ালটারও নিহত হন। তবে ধর্মযাজক পিটার এ সময় বাইজান্টাইন সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে কনস্টান্টিনোপলে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। (১৮৯)

নিঃসন্দেহে এই ঘটনা ছিল বাইজান্টাইন সম্রাটের জন্য এবং স্বাভাবিকভাবেই ধর্মযাজক পিটারের জন্য বিরাট কঠিন এক আঘাত। সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস ধর্মযাজক পিটারসহ বেঁচে যাওয়া লোকদেরকে কনস্টান্টিনোপলেই অবস্থান করে মূল বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে বলেন।

এভাবেই সাধারণ জনগণ ও কৃষকদের সমন্বয়ে গঠিত সবগুলো দলের করুণ ও বেদনাদায়ক পতন ঘটে। কেউ মারা যায় হাঙ্গেরির রাজার হাতে, কেউ নিহত হয় মুসলিম সেলজুক সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। ইউরোপের দরিদ্র ও কৃষকশ্রেণি এভাবেই তাদের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, সামন্ত ও ভূ-স্বامীদের প্রতারণার মূল্য পরিশোধ করে। যুগে যুগে পরাজিত ও পরাভূত জাতিগোষ্ঠী এভাবেই নিজেদের অধঃপতন ও লাঞ্ছনার মূল্য পরিশোধ করে থাকে!

এদিকে যখন অপ্রশিক্ষিত বাহিনীগুলো নির্বিচারে কচুকাটা হচ্ছিল, ওদিকে পশ্চিম ইউরোপে বিশেষ করে ফ্রান্সে তখন চলছিল প্রশিক্ষিত সৈন্যসমাবেশের বিশাল আয়োজন। এত বড় সৈন্যসমাবেশ ইউরোপের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। বরং সম্ভবত পৃথিবী তার সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় এরূপ বিশাল সৈন্যসমাবেশের দৃশ্য অবলোকন করেনি।

টিকাঃ
১৮৮. Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 8.
১৮৯. অপ্রশিক্ষিত কৃষক-জনতার বাহিনীগুলোর পরিণতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন : Albert D' Aix, in Peters (ed.), 108-112; William of Tyre, 1, pp. 106-109;=Anna Comnena, Alexiade, pp. 311-313; Gesta. Francorum, pp. 2-4; Hagenmeyer. "Chronolgie" pp 245.251-254; Runciman, "Constantinople to Antioch", in setton, 1, pp. 281-284; Badford, The Sword, pp. 38-39. কাসিম আবদুহু কাসিম, আল-খালফিয়্যাতুল আইদুলিজিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১৬৫, জোযেফ নাসিম, আল-আরাব ওয়ার-রূম ওয়াল-লাতীন, পৃষ্ঠা: ১৫৮-১৭০ ও যাবুরূফ, আস-সালিবিয়ান ফিশ-শারকু, পৃষ্ঠা: ৫৭-৯৫।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 প্রথম ক্রুসেড অভিযানের সামরিক প্রস্তুতি

📄 প্রথম ক্রুসেড অভিযানের সামরিক প্রস্তুতি


পশ্চিম ইউরোপ তখন একতা নামক কোনো কিছুর সঙ্গে পরিচিত ছিল না। বরং ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বৃহৎ রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে বিগত ছয় শতাব্দীর অধিক সময় পশ্চিম ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর সেনাবাহিনী কোনো যুদ্ধে একজোট হতে পারেনি। একমাত্র ব্যতিক্রমী ঘটনা হলো আন্দালুসের মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তর আন্দালুসের খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলোর যুদ্ধে এসব রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে ফ্রান্স সামরিক সহায়তা প্রদান করেছিল।

পারস্পরিক ঐক্য দূরে থাক, রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ঐক্যের অনুকূলে ছিল না। সামন্তবাদী নীতির কারণে প্রতিটি সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্র অনেকগুলো জায়গির অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি জায়গির অঞ্চলের ছিল আলাদা রাজন্য ও জমিদার, যিনি নিজ এলাকা অনেকটা স্বায়ত্তশাসন করতেন। যদিও অনেকগুলো জায়গির একটি রাষ্ট্রপরিচয়ের অধীনে আবদ্ধ থাকত এবং রাজন্যবর্গ সেই রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যের শাসক বা সম্রাটের প্রতি আনুগত্যও প্রকাশ করত; কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই আনুগত্য হতো নিছক আনুষ্ঠানিক; বাস্তবে কোনো আনুগত্যের বালাই থাকত না।

এই প্রেক্ষাপটকে মনে রাখলে আমাদের পক্ষে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ উপলব্ধি করা সহজ হবে। আমরা বুঝতে পারব যে, এই সব ভিন্ন ভিন্ন জায়গির অঞ্চলের বাহিনীগুলোর একটি সুবিন্যস্ত বাহিনীতে পরিণত হওয়া কেন অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে; বরং অনেকটা অসম্ভব বিবেচিত হবে।

বাস্তবেও আমরা দেখব যে, আসন্ন অভিযানে অংশগ্রহণকারী ক্রুসেডার বাহিনী গঠিত হবে ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি দলের সমন্বয়ে; প্রতিটি দলের থাকবে আলাদা সেনাপতি; প্রত্যেক সেনাপতির থাকবে নিজস্ব স্বপ্ন ও নিজস্ব মিত্র। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময়ের ঘটনাও ঘটবে; কিন্তু নিঃসন্দেহে এসব বাহিনীর মধ্যে বিরোধ-বিসংবাদ ও কলহের ঘটনাও ঘটবে। বিশেষ করে প্রথম ক্রুসেড অভিযানে যারা শরিক হয়েছিল, তাদের অনেকেই নিজেদের মধ্যে পূর্ব থেকে বিবাদরত ছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা ছিল। এ সবকিছুই শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করবে যে, তাদের সকলের কিংবা সতর্কতার দাবিতে বললে অধিকাংশের অভিযাত্রার একমাত্র অনুপ্রাণিকা ছিল ব্যক্তিগত লোভ-লালসা এবং বিশেষ স্বার্থ চরিতার্থ করা। তাদের চিন্তা-চেতনায় কক্ষনোই ধর্ম, গির্জা বা ক্রুশ বিদ্যমান ছিল না।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী সামরিক বাহিনীসমূহ

📄 ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী সামরিক বাহিনীসমূহ


প্রথম ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষিত বাহিনীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাব যে, বাহিনীটি মূলত পাঁচটি আলাদা আলাদা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল।
ইংল্যান্ড ওয়েলস পোমেরানিয়া + প্রথম বাহিনী তৃতীয় বাহিনী নরম্যান প্যারিস জার্মানি চতুর্থ বাহিনী অস্ট্রিয়া ফ্রান্স: পোল্যান্ড হাঙ্গেরি নাফার ক্যাস্টোলা রাজ্য মুরাবিতি রাষ্ট্র দ্বিতীয় বাহিনী বাচ্ছা বার্সেলোনা রাজ্য ভূমধ্যসাগর মানচিত্র নং-১১ ক্রোয়েশিয়া পঞ্চম ইতালি বাহিনী রোম
প্রথম ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী বাহিনীসমূহ

১. প্রথম বাহিনীটি ছিল ফরাসি নাগরিক গডফ্রে ডি বোলোন (Godfrey de bouillon)-এর নেতৃত্বাধীন। গডফ্রে ছিলেন লুক্সেমবার্গের দক্ষিণে অবস্থিত বোলোন নগরীর প্রশাসক। এরপর তিনি লোথারিঙ্গিয়া সাম্রাজ্যের ডিউক নির্বাচিত হন। তার সঙ্গে তার ভাই যুবরাজ বল্ডউইন (Baldwin I)-ও ছিলেন। (১৯০) এ ছাড়াও তার বাহিনীতে বেশ কয়েকজন সামন্ত ছিল, যাদের অধিকাংশই ছিল ফ্রান্সের। বেশ কয়েকজন সামন্তের উপস্থিতির কারণে গডফ্রের বাহিনীটি বিশেষ গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছিল। (১৯১) বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য ছিল উত্তর ফ্রান্সের লোরেন (Lorraine) অঞ্চলের। অবশ্য কিছু জার্মান সৈন্যও তাদের সঙ্গে ছিল। (১৯২)

ফরাসি নাগরিক হলেও গডফ্রে কিন্তু তৎকালীন ফ্রান্সের দুর্বল রাজা ১ম ফিলিপের অনুগত ছিলেন না, তিনি আনুগত্য করতেন জার্মানির শক্তিমান রাজা ৪র্থ হেনরির। (১৯৩) গডফ্রের স্বপ্ন ছিল, তিনিই হবেন সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তার বাহিনীতে অধিক সংখ্যক সামন্তের উপস্থিতি তাকে এক্ষেত্রে শক্তি জোগাচ্ছিল।

২. দ্বিতীয় বাহিনীটিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে আগত বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন তুলুজ (Toulouse) ও প্রভিন্স (Provence)-এর ডিউক ৪র্থ রেমন্ড (Raymond IV)। রেমন্ডের উপস্থিতিই বাহিনীটির গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। গডফ্রের ন্যায় রেমন্ডও নিজেকে ক্রুসেডার বাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি মনে করতেন। ডিউক রেমন্ড ছিলেন বয়সে সবচেয়ে প্রবীণ সেনাপতি; অধিকন্তু তিনি পোপ ২য় আরবানের আহ্বানে শুরুতেই সাড়া দিয়েছিলেন। যোদ্ধা সংগ্রহের লক্ষ্যে পোপ যেসব সভার আয়োজন করেছিলেন, রেমন্ড তার অধিকাংশতেই যোগ দিয়েছিলেন। ইতিপূর্বে তার আন্দালুস ভূমিতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতাও ছিল। রেমন্ড সুস্পষ্ট ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি পোপেরও অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। এ কারণেই পোপ অন্য সব বাহিনী বাদ দিয়ে রেমন্ডের বাহিনীর সঙ্গেই রোমের গির্জার প্রতিনিধি হিসেবে লি পাই কার্থিডালের (Le Puy Cathedral) বিশপ অ্যাডমারকে পাঠিয়েছিলেন। (১৯৪) সবচেয়ে বড় কথা—রেমন্ডের বাহিনীই ছিল ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী সর্ববৃহৎ বাহিনী। এসব দিক বিবেচনা করে ৪র্থ রেমন্ড স্বপ্ন দেখছিলেন যে, অন্য কেউ নয়; তিনিই হবেন ক্রুসেডার বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। (১৯৫)

৩. মূলত পশ্চিম ফ্রান্সের নরমান্দে (Normandy) থেকে আগত তৃতীয় বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন নরমান্দে অঞ্চলের ডিউক রবার্ট কার্তুজ (Robert Curthose)। তার সঙ্গে তার ভগ্নিপতি ও ব্লয়েস (Blois) নগরীর কাউন্ট স্টিভেন (Stephen II Henry)-ও ছিলেন। এই বাহিনীটির সঙ্গে অনেক ইংরেজ যোদ্ধাও যোগ দিয়েছিল। (১৯৬)

৪. চতুর্থ বাহিনীটিও ছিল ফরাসি। তবে এই বাহিনীটি ছিল তুলনামূলক ক্ষুদ্র আকৃতির। সম্ভবত এই বাহিনীটি ফ্রান্সের রাজা ১ম ফিলিপের রাজকীয় প্রতিনিধিত্ব করছিল। কারণ, বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন রাজার সহোদর হিউ (Hugh)। হিউ ছিলেন ভার্মান্ডয়েস (Vermandois) অঞ্চলের কাউন্ট। (১৯৭)

৫. পঞ্চম ও শেষ বাহিনীটিও ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক ও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ইতালি থেকে আগত এই বাহিনীটি গঠিত হয়েছিল ভয়ংকর নরম্যান যোদ্ধাদের সমন্বয়ে। বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন আরেক উচ্চাভিলাষী যুবরাজ বোহেমন্ড (Bohemond)। (১৯৮) গডফ্রে ও রেমন্ডের মতো বোহেমন্ডও পুরো বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। তার পক্ষে যেসব বিষয় সহায়ক ছিল সেগুলো হলো— তার বাহিনী ছিল সবচেয়ে বিন্যস্ত, সবচেয়ে রণকুশলী এবং লড়াইয়ের ময়দানে সবচেয়ে অটল-অবিচল। (১৯৯) অধিকন্তু তিনি ছিলেন তৎকালীন পুরো ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাজন্য রবার্ট গোয়েসকার্ডের (Robert Guiscard) পুত্র, যিনি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে বলকান অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। (২০০) বোহেমন্ডের নিজের ১০৮১ খ্রিষ্টাব্দে এন্টিয়ক অবরোধ করার এবং বাইজান্টাইনদের মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা ছিল। বোহেমন্ডের সঙ্গে তার ভাগ্নে টেনক্রেড (Tancred)-ও ছিলেন। টেনক্রেড ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ও কঠোর প্রকৃতির একজন সেনাপতি। বোহেমন্ডের বাহিনীতে টেনক্রেড ছাড়াও আরও কয়েকজন দক্ষ নরম্যান সেনাপতি ছিল। (২০১)

আমাদের সামনে এ বিষয়টি আশা করি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, আসন্ন অভিযানের জন্য সমবেত হওয়া ক্রুসেড বাহিনীগুলোর একক কোনো নেতৃত্ব ছিল না; বরং শুরু থেকেই বাহিনীগুলোর সেনাপতিগণ সর্বাধিনায়ক হওয়ার জন্য পরস্পর স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল এবং আপন আপন রাজ্য সম্প্রসারণের এক বিশাল স্বপ্ন প্রত্যেককেই প্ররোচিত করছিল।

টিকাঃ
১৯০. Michaud: Hist. Des Croisades, 1, pp. 146-147.
১৯১. Runciman: op. cit., 1, p. 147.
১৯২. William Of Tyre 1, pp. 116-120.
১৯৩. Cam. Med Histvol. 5, p. 281.
১৯৪. Grousset: Hist. des Croisades 1, pp. 24-25; Runciman, Hist. of the Crusades, 1, p. 142.
১৯৫. Runciman: op. cit. 1, p. 136.
১৯৬. Raymond d' Aguilers, in Peters (ed.), The first Crusade, pp. 181-211. William of Tyre 1, pp. 139-140.
১৯৭. Anna Comnena, p. 314: AOL, 1, pp. 121-122, 145: Hagenmeyer "Chronologie", p. 248.
১৯৮. Gesta Francorun, pp. 6-13; Anna Comnena, pp. 326-329.
১৯৯. Runciman: op. cit. 1, p. 157.
২০০. Ostrogorsky: op. cit. 11, p. 381.
২০১. Chalandon: Premiere Croisade, p. 132.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ফ্রান্স থেকে কনস্টান্টিনোপলের পথে

📄 ফ্রান্স থেকে কনস্টান্টিনোপলের পথে


ফ্রান্স থেকে সবার আগে রওনা হয়ে সবার আগেই বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে পৌঁছায় চতুর্থ ও সবচেয়ে ক্ষুদ্র দলটি। কিন্তু তারা নির্মম পরিণতির শিকার হয়। সমুদ্রপথে রওনা হওয়া বাহিনীটি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের উপকূলের কাছে এসে প্রচণ্ড ঝড়ের শিকার হয় এবং প্রচুর সৈন্য নিহত হয়। বাইজান্টাইন নৌবাহিনীর একটি দল বাকিদের উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। (২০২) বাহিনীর প্রধান হিউ বাইজান্টাইন সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমিনোসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সম্রাটের মিত্রতা ও আনুগত্যের শপথ করে প্রতিজ্ঞা করেন যে, তিনি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব থেকে মুসলমানদের কেড়ে নেওয়া ভূমি পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। হিউয়ের এই আনুগত্য ও নতজানু নীতি আলোচ্য পরিস্থিতিতে মোটেও আশ্চর্যের কোনো বিষয় ছিল না। (২০৩)

অবশ্য এ বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য যে, চলমান ঘটনাপ্রবাহে এই ক্ষুদ্র বাহিনীটির উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাবও ছিল না।

এরপর কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছায় গডফ্রের নেতৃত্বাধীন প্রথম বাহিনীটি। আলোচনার এ পর্যায়ে এ বাহিনীটি সম্পর্কে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা হচ্ছে।

মানচিত্র নং-১২ ক্রুসেডার বাহিনীগুলোর ইউরোপ থেকে কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে যাত্রা

গডফ্রের বাহিনীটি স্থলপথেই রওনা হয়। এক্ষেত্রে তারা সে পথই অবলম্বন করে, ইতিপূর্বে ধর্মযাজক পিটার ও কাঙাল ওয়ালটারের বাহিনীসহ অন্যান্য অপ্রশিক্ষিত বাহিনী যে পথে যাত্রা করেছিল। (২০৪) এর অর্থ হচ্ছে কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছতে তাদের হাঙ্গেরিসহ পশ্চিম ইউরোপের সেসব অঞ্চল পাড়ি দিতে হবে, যেসব অঞ্চলে ইতিপূর্বে ক্রুসেডারদের অভিযাত্রাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বেদনাদায়ক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। তাদেরকে মুখোমুখি হতে হবে হাঙ্গেরির শক্তিশালী রাজা কোলোম্যানের, যিনি বাধা প্রদান করলে গডফ্রের বাহিনীর অগ্রযাত্রাই কেবল ব্যাহত হবে না; প্রচুর শক্তিক্ষয়, এমনকি শক্তি নিঃশেষও হয়ে যেতে পারে। এসব দিক বিবেচনা করে সুচতুর গডফ্রে সিদ্ধান্ত নেন, হাঙ্গেরিতে প্রবেশের আগে জার্মানি-হাঙ্গেরি সীমান্তে তিনি রাজা কোলোম্যানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়ে তার সঙ্গে সমঝোতা-চুক্তি করে নেবেন।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গডফ্রে হাঙ্গেরির রাজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চুক্তি সম্পাদন করেন। চুক্তিতে শর্তারোপ করা হয় যে, গডফ্রের বাহিনী হাঙ্গেরি অতিক্রম করার সময় হাঙ্গেরি ভূখণ্ডের কোনো সম্পদ স্পর্শ করবে না, কোনো নাগরিকের কোনো প্রকার ক্ষতি করবে না। গডফ্রের অঙ্গীকারে রাজা যেন আস্থা রাখতে পারেন, এজন্য তিনি তার বাহিনী হাঙ্গেরি অতিক্রমের সময়ে তার ভাই বল্ডউইনকে হাঙ্গেরির রাজার কাছে জামিন রাখার সিদ্ধান্ত নেন। পাশাপাশি গডফ্রে তার বাহিনীর সদস্যদের এ অঞ্চলে কোনো ধরনের লুটতরাজ বা নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে কঠোরভাবে নিষেধ করে দেন।

এই চুক্তির ফলে ক্রুসেডার বাহিনীর প্রথম দলটি নিরাপদে হাঙ্গেরি অতিক্রম করে। বাইজান্টাইন ভূখণ্ডে প্রবেশের সময় বেলগ্রেড ও নিস- এর মধ্যবর্তী এলাকায় পৌঁছে গডফ্রে বাইজান্টাইন সম্রাটের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি প্রতিনিধিদলকেও প্রতিশ্রুতি দেন যে, তার বাহিনী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের কোনো সম্পদ স্পর্শ করবে না। বিপরীতে বাইজান্টাইন প্রশাসন মুসলিম ভূখণ্ডে পৌঁছা পর্যন্ত গডফ্রের বিশাল বাহিনীর রসদ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সামগ্রী প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। (২০৫)

এরপর গডফ্রের নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার বাহিনী পথচলা অব্যাহত রেখে বাইজান্টাইন নগরী সেলিমব্রিয়া (২০৬) এর কাছে মর্মর সাগরের তীরে পৌঁছে যায়। এটি ১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্য ডিসেম্বরের (৪৮৯ হিজরি সনের) কথা। অভিযাত্রায় এ পর্যায়ে এসে গডফ্রে তার বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। তার বাহিনীর সদস্যরা সেলিমব্রিয়ার সম্পদ-প্রাচুর্য দেখে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয় এবং নগরীজুড়ে লুটপাট শুরু করে। (২০৭)

এ ঘটনা ছিল বাইজান্টাইন সম্রাটের জন্য সুস্পষ্ট সতর্কবাণী। পশ্চিম ইউরোপ থেকে আগত এই প্রশিক্ষিত বাহিনীর আচরণ সম্রাটকে অত্যন্ত শঙ্কিত করে তোলে। তিনি সূক্ষ্মভাবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে থাকেন।

সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস কেবল মুসলমানদের হুমকি প্রতিরোধ এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মুসলমানদের কাছে হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের জন্যই পোপের সাহায্য চেয়েছেন এবং এসব বাহিনীকে এ পর্যন্ত আসার সুযোগ দিয়েছেন। আর তাই তার অনুমান ছিল, এসব বাহিনী ভাড়াটিয়া বাহিনীর ন্যায় কাজ করবে। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য পূর্বেও বিভিন্ন প্রয়োজনে ভাড়াটিয়া সৈন্য আমদানি করেছে। সম্রাটের ধারণা ছিল, তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সম্পাদন করবে; এরপর নিজেদের পারিশ্রমিক নিয়ে ফিরে যাবে। ব্যস, এতটুকুতেই তাদের দায়িত্ব ও ভূমিকা শেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু পূর্ববর্তী প্রশিক্ষণহীন ক্রুসেডার বাহিনীগুলোর আচরণ এবং এখন গডফ্রের বাহিনীর কৃত আচরণ অবলোকন করে বাইজান্টাইন সম্রাট গভীর চিন্তায় পড়ে যান। এসব বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে এসেছে। অর্থাৎ তারা যুদ্ধ শেষে ফিরে যেতে নয়, থেকে যাওয়ার লক্ষ্যে আগমন করেছে। অধিকন্তু তারা সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের অধিকারী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের স্বার্থরক্ষার লক্ষ্যেও আগমন করেনি। সম্রাট আরও লক্ষ করেন যে, গডফ্রের নেতৃত্বাধীন এই নিয়মিত বাহিনীটি আকৃতিতে যেমন বড়, তেমনই পেশাদার ও শক্তিশালী। তাদের সঙ্গে যখন অন্যান্য বাহিনীও মিলিত হবে, তখন পরিস্থিতি কেমন হবে?!

সম্রাটের অতীত স্মৃতি মনে পড়ে যায়। ইতিপূর্বে একবার বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ইতালি থেকে কিছু ভাড়াটে সৈনিক সংগ্রহ করেছিল। তাদেরই একজন রাসেল ডি ব্যালিউল (Roussel de Bailleul) নামক জনৈক দুঃসাহসী নরম্যান সেনাপতি ১০৭৩ খ্রিষ্টাব্দে (৪৬৫ হিজরি সনে) বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এবং তাদের প্রচুর ক্ষতিসাধনে সক্ষম হয়। রাসেল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। শেষ পর্যন্ত তার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য মুসলিম সেলজুকদের শরণাপন্ন হয় এবং এ মর্মে চুক্তি করে যে, সেলজুকরা যদি রাসেলকে পরাভূত করে বাইজান্টাইন প্রশাসনের হাতে তুলে দিতে পারে, তাহলে বাইজান্টাইনরা রাসেলের দখলে থাকা অঞ্চলগুলো সেলজুকদের দিয়ে নেবে। সেলজুকরা রাসেলকে পাকড়াও করে বাইজান্টাইনদের হাতে তুলে দেয় এবং চুক্তিমতো রাসেলের দখলকৃত অঞ্চলগুলোর কর্তৃত্ব বুঝে নেয়। সম্রাট ভাবতে থাকেন, এক রাসেল যদি মাত্র তিন হাজার ভাড়াটে সৈন্য নিয়ে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে এভাবে নাকানিচুবানি খাওয়াতে পারে, তাহলে গডফ্রের এই বিশাল বাহিনীর কারণে আগামীর পরিস্থিতি কেমন হবে! আর ক্রুসেডার বাহিনীর সবগুলো অংশ যদি একত্র হয়, তখন পরিস্থিতি কেমন ভয়ানক হবে তা ভাবতেই সম্রাটের দেহ-মন শিউরে ওঠে।

টিকাঃ
২০২. কাসিম আবদুহু কাসিম, মাহিয়াতুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১১৮।
২০৩. Anna Comnena, p. 315; Fulcherde Chartres, p. 72.
২০৪, Setton: op. cit., 1, p. 12.
২০৫. Albert d' Aix, lv. pp. 299-305.
২০৬. পূর্বের নাম Selymbria, বর্তমান নাম Silivri। [অনুবাদক]
২০৭. Idem, p.p. 304-305.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00