📄 ইউরোপের পথে পথে উচ্ছৃঙ্খল জনতার ধ্বংসযজ্ঞ
দুঃসহ কষ্টের জীবন থেকে নিষ্কৃতি লাভের আশায় ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকশ্রেণি প্রবল উদ্দীপনা নিয়ে নিজ নিজ এলাকা থেকে রওনা হয়। তারা এমনকি নিয়মিত ও প্রশিক্ষিত বাহিনী প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেও রাজি ছিল না। নিজেদের সংখ্যাধিক্য ও প্রবল উদ্দীপনায় বিভ্রান্ত ও প্রবঞ্চিত হয়ে তারা নিজেরাই ইসলামি ভূখণ্ড অভিমুখে রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অথচ সম্মুখ সমর সম্পর্কে কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা দূরে থাক, সম্ভবত তাদের অধিকাংশের ইতিপূর্বে কখনো তরবারি ধরার অভিজ্ঞতাও ছিল না!
মানচিত্র নং-১০ অনিয়মিত বাহিনীগুলোর গতিপথ
উচ্ছৃঙ্খল জনতার একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন 'কাঙাল'-খ্যাত ধর্মযাজক ওয়ালটার। ওয়ালটার ছিলেন বাওয়াসি (Boissy-sans-Avoir) অঞ্চলের একজন দুর্বৃত্ত যোদ্ধা। ওয়ালটারের নেতৃত্বাধীন বাহিনীটিতে মাত্র আটজন নিয়মিত যোদ্ধা ছিল। (১৭৪)
অনিয়মিত বাহিনীটি ফ্রান্স থেকে রওনা হয়ে প্রথমে জার্মানি অতিক্রম করে। পথে অতি-উৎসাহী অনেকে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এ সময় যদিও ওয়ালটার তার বাহিনীকে বিন্যস্ত করে নেন; কিন্তু তারপরও বাহিনীর সদস্যদের আচার-আচরণে সুস্পষ্টভাবেই অনভিজ্ঞতা ও অব্যবস্থাপনা প্রকাশ পাচ্ছিল।
জার্মানি অতিক্রম করার পর উচ্ছৃঙ্খল জনতার বাহিনীটি হাঙ্গেরির ভূখণ্ড পাড়ি দিয়ে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে পা রাখে। এ পর্যায়ে এসে তাদের এই অভিযানের উগ্র মনোবৃত্তি ও অনৈতিক স্বভাব-প্রকৃতি পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে পড়ে।
উচ্ছৃঙ্খল কৃষক-জনতার বাহিনীটি নিজেদের বিশাল জনশক্তির কথা ভেবে উন্মত্ত হয়ে পড়ে। নিজেদের অতীত জীবনের লাঞ্ছনা-বঞ্চনা ও ক্ষুৎপিপাসার ইতিহাস স্মরণ করে তারা ভুলে যায় আপন গন্তব্যের কথা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথা। তারা তো রওনা হয়েছিল প্রাচ্যের 'নিপীড়িত' খ্রিষ্টানদের উদ্ধার করতে। কিন্তু সে কথা ভুলে গিয়ে পথেই তারা বিভিন্ন নগর ও জনপদে আক্রমণ চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। অথচ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ এসব জনপদ ছিল সম্পূর্ণই খ্রিষ্টানঅধ্যুষিত! স্বাভাবিক প্রত্যাশা এটাই ছিল যে, ক্রুসেডার বাহিনী খ্রিষ্টানজাতির রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে, যমদূত নয়! (১৭৫)
নিঃসন্দেহে ওয়ালটারের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর এই সিদ্ধান্ত ছিল খ্রিষ্টান ইউরোপের ইতিহাসে এক অমোচনীয় কলঙ্ক-দাগ। উচ্ছৃঙ্খল কৃষকরা পথে বিভিন্ন জনপদের অধিবাসীদের ওপর হামলা চালানোর পাশাপাশি নির্বিচারে ধনসম্পদ লুট করতে থাকে।
রাজ্যের অভ্যন্তরে হঠাৎ সৃষ্ট নৈরাজ্যে বাইজান্টাইন রাজা হতভম্ব হয়ে পড়েন। ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামরিক—সব ধরনের বোধ-উপলব্ধিশূন্য এই বিশাল বাহিনীকে তিনি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?! তাদের ধর্মীয় চেতনাশূন্যতার বিষয়টি তো একেবারেই সুস্পষ্ট। কারণ, তারা ন্যূনতম যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়াই স্বজাতীয় খ্রিষ্টানদের হত্যা করছে। রাজনৈতিক চেতনাশূন্যতার দিকটিও সুস্পষ্ট। কারণ, তারা এই হত্যাযজ্ঞ ও লুটতরাজ চালাচ্ছিল সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে, যার আছে সুবিশাল ও অভাবনীয় সামরিক শক্তি। আর পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের সামরিক জ্ঞানও ছিল শূন্যের কোঠায়, যা তাদের বাহিনী-বিন্যাস ও যুদ্ধ-আচরণেই সুস্পষ্ট অনুমিত হচ্ছিল।
বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস সার্বিক দিক বিবেচনা করে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আক্রমণ করে নিঃশেষ করে দেওয়ার পরিবর্তে ধৈর্যধারণ করাই সমীচীন মনে করেন। কারণ, তিনি তাদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করতে চাচ্ছিলেন। আর তাই কাঙাল ওয়ালটারের বাহিনী কনস্টান্টিনোপলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বিবেচিত হলেও সম্রাট তাদের কোনো ক্ষতি না করে তাদেরকে অন্যান্য বাহিনীর অপেক্ষায় নগরপ্রাচীরের বাইরে অবস্থান করার নির্দেশ দেন। (১৭৬)
ওদিকে ধর্মযাজক পিটারও ততদিনে দরিদ্র কৃষকশ্রেণির প্রচুর নারী-পুরুষ-শিশু সমবেত করে ফেলেছেন। ভবঘুরে, অপরাধী ও ব্যভিচারিণী নারীদের একটি বড় অংশও তাদের সঙ্গে সমবেত হয়েছিল। (১৭৭) তারা সকলে জার্মানির রাইন নদীর অববাহিকায় একত্র হয়ে ৪৮৯ হিজরি সনে (১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ২০ এপ্রিল) জার্মানি ত্যাগ করে। এ দলেও অতি অল্প সংখ্যক পেশাদার সৈন্য ছিল। ধর্মযাজক পিটার তার ল্যাংড়া গাধায় চড়ে বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। (১৭৮)
কাঙাল ওয়ালটারের বাহিনী যেমন কনস্টান্টিনোপলের পথে সন্ত্রাস ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছিল, ধর্মযাজক পিটারের বাহিনীও একই ঘটনা ঘটায়। পিটারের বাহিনী হাঙ্গেরির সীমানায় প্রবেশ করতেই ব্যাপক ও বিস্তৃত পরিসরে লুটতরাজ ও নৈরাজ্য শুরু করে। কারণ, তার বাহিনী ছিল কাঙাল ওয়ালটারের বাহিনীর তুলনায় আকারে যেমন বড়, তেমনই স্বভাব-প্রকৃতিতেও তুলনামূলক বেশি উচ্ছৃঙ্খল। এর ফলে ধর্মযাজক পিটারের অভিযানের উদ্দেশ্যও স্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি যদি ও তার বাহিনীর নাম দিয়েছিলেন ‘প্রভুর বাহিনী’; কিন্তু তার বাহিনীর সদস্যরা খ্রিষ্টান নাগরিকদের প্রাণ নিশ্চিহ্ন করতে এবং তাদের ধনসম্পদ লুট করতে সামান্য দ্বিধাও করেনি।
বিশেষ করে হাঙ্গেরির সেমলিন (semlin) নগরীতে ট্র্যাজেডি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ধর্মযাজক পিটারের সঙ্গীরা এই খ্রিষ্টান-অধ্যুষিত নগরীটিতে হামলা চালিয়ে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। একসঙ্গে প্রাণ হারায় চার হাজার খ্রিষ্টান নাগরিক!(১৭৯)
হাঙ্গেরির রাজা কোলোম্যান (Coloman the Learned) বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এমন একদল লোক, যারা নিজেদের প্রতীক হিসেবে ক্রুশ উত্তোলন করেছে, তারা এরূপ ধ্বংসাত্মক আচরণ করবে, তা তিনি মোটেও প্রত্যাশা করেননি। (১৮০) তিনি তৎক্ষণাৎ সৈন্য সমাবেশ করে ধর্মযাজক পিটারের বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালান। ফলে পিটারের সৈন্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে হাঙ্গেরির বন-জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়ে। কিছু মারা পড়ে আর বাকিরা পালিয়ে নিজেদের সন্ত্রাসী অভিযান অব্যাহত রাখতে পার্শ্ববর্তী বাইজান্টাইন ভূমিতে চলে যায়।
বাইজান্টাইন ভূমিতে গিয়ে তারা নতুন করে সমবেত হয়। বাইজান্টাইন গোয়েন্দারা তাদেরকে কড়া নজরদারিতে রাখলেও ইচ্ছা করেই তাদেরকে কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ করে দেয়। বাইজান্টাইন প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল পিটারের বাহিনীকে কাঙাল ওয়ালটারের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু বাইজান্টাইন প্রশাসনের এই শিথিলতা পিটারের সন্ত্রাসী দলটিকে নতুন করে লুটপাট শুরু করতে প্ররোচিত করে তোলে! সেমলিন-ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটে এবার বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যভুক্ত নিস (Niš) নগরীতে। ধর্মযাজক পিটার ও তার সঙ্গীরা প্রচুর সংখ্যক অর্থোডক্স খ্রিষ্টানকে হত্যা করে এবং বিভিন্ন জনবসতিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। অবস্থাদৃষ্টে বাইজান্টাইন সৈন্যরা নিশ্চুপ বসে না থেকে হামলা চালিয়ে পিটারের বাহিনীর প্রচুর সদস্যকে হত্যা করে। পিটার পশ্চিম ইউরোপ থেকে ইতিপূর্বে যেসব দান-অনুদান সংগ্রহ করেছিলেন, বাইজান্টাইন সৈন্যরা তা-ও ছিনিয়ে নেয়। তবে এত কিছুর পরও বাইজান্টাইনরা চাচ্ছিল এই উচ্ছৃঙ্খল ও সন্ত্রাসী দলটিকে পুরোপুরি নিঃশেষ না করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পাঠাতে।
পিটারের বাহিনী যখন সোফিয়া (Sofia) নগরীর কাছে পৌঁছায়, বাইজান্টাইন সম্রাট তখন তাদের কাছে একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে তাদেরকে এই উচ্ছৃঙ্খল ও বর্বর আচরণের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেন এবং বাইজান্টাইন ভূখণ্ডের কোনো নগরীতে তিনদিনের বেশি অবস্থান না করার নির্দেশ দেন। এরপর বাইজান্টাইন বাহিনীর একটি ইউনিট তাদেরকে কনস্টান্টিনোপলের প্রাচীরের দিকে পরিচালিত করে কাঙাল ওয়ালটারের বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করার দায়িত্ব নেয়। (১৮১)
নিঃসন্দেহে পাঠক এই উচ্ছৃঙ্খল বাহিনীর কর্মকাণ্ড পাঠ করে অত্যন্ত বিস্ময় বোধ করছেন। পাঠক অবাক হয়ে ভাবছেন, এমনটি হওয়াও কি সম্ভব?! কিন্তু ইতিহাসের নিবিষ্ট পাঠক ও সূক্ষ্মভাবে ইতিহাস বিশ্লেষণকারী ব্যক্তিমাত্রই উপলব্ধি করবেন যে, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই; বরং এটি একেবারেই স্বাভাবিক একটি বিষয়। ইতিহাসের পরতে পরতে বহুবার এরূপ ঘটনা ঘটেছে। বস্তুত সমকালীন ইউরোপীয় খ্রিষ্টানসমাজ ছিল এমন এক সম্প্রদায়, যাদের মাঝে দয়া ও মানবতা, ধর্মীয় বোধ ও চারিত্রিক উদারতা—এসব গুণের মোটেও অস্তিত্ব ছিল না। আর যারা এসব চারিত্রিক গুণে গুণান্বিত নয়, নিঃসন্দেহে তারাই এরূপ স্বেচ্ছাচারী ও সন্ত্রাসী সম্প্রদায়ে পরিণত হবে। কাদিসিয়ার প্রান্তরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রওনা হওয়া পারসিক বাহিনীও পথে ঠিক একই কাজ করেছিল। তারা পথে পারস্য ভূখণ্ডের বিভিন্ন নগরী ও গ্রামে হামলা চালিয়েছিল। সেসব জনপদে যারা বসবাস করত, তারা রক্ত ও ধর্ম-পরিচয় উভয় দিক থেকেই পারসিক নাগরিক ছিল। তা সত্ত্বেও পারসিক বাহিনী ভূখণ্ডগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, নাগরিকদের হত্যা করে তাদের ধনসম্পদ ও ঘরবাড়ি লুটপাট করে এবং নারী-শিশুদের ওপর নির্মমতা চালায়।
এমনকি চলমান ঘটনাপ্রবাহে যে বাইজান্টাইন সেনাবাহিনী এসব উচ্ছৃঙ্খল বাহিনীকে শান্তি বজায় রাখার, নিজেদের সাম্প্রদায়িক চেতনা সংবরণ করার এবং আপন ধর্মীয় ভাইদের হত্যা না করার পাঠদান করছে, কালের আয়নায় আমরা তাদের কী চেহারা দেখতে পাই?! তারাই তো শাম অঞ্চলের খ্রিষ্টান নাগরিকদের অত্যাচার ও নিপীড়নের নানা রকম স্বাদ আস্বাদন করিয়েছে, তাদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে এবং তাদের উৎপাদিত ফল-ফসল জোর করে রোমান সাম্রাজ্যে নিয়ে গেছে। মিশরে তো তাদের আচরণ ছিল আরও নিপীড়নমূলক। অথচ শাম ও মিশরবাসী তো ধর্মপরিচয়ে তাদের মতো অর্থোডক্স খ্রিষ্টানই ছিল!
আসুন জার্মান নাৎসি বাহিনীর কথায়। তারা যখন নিজেদের শক্তিমত্তা উপলব্ধি করে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল, তখন কী আচরণ করেছিল?! যেসব জাতিবর্গ জার্মান নাৎসিদের নির্যাতনের শিকার হয়েছিল, তারা সকলে জার্মানদের মতো খ্রিষ্টানই ছিল।
জার্মানদের কথা রাখুন! কোনো ইসলামি বাহিনীও যদি কেবল নামেই ইসলামি বাহিনী হয়, সুষম চরিত্রগুণ-শূন্য এবং শরিয়তের সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন হতে বিমুখ হয়, তাহলে তারাও পরিণত হয় আরেক সন্ত্রাসী বাহিনীতে; অমুসলিমদের পূর্বে মুসলমানরা তাদের অসদাচরণের শিকার হয়। এর বিভিন্ন দৃষ্টান্ত আমরা দেখে থাকি সেসব মুসলিম বাহিনীর ক্ষেত্রে, যারা ইসলাম হতে সম্পূর্ণ দূরে থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে থাকে।
কাঙাল ওয়ালটার ও ধর্মযাজক পিটার-এর অভিযানের এই প্রাথমিক বিবরণই আমাদের সামনে ক্রুসেড যুদ্ধের স্বভাব-প্রকৃতি ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পুরোপুরি সুস্পষ্ট করে দেয়। যদিও প্রতীক হিসেবে ক্রুশ উত্তোলন করা হয়েছিল; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল মূলত লুটতরাজ, জবরদখল ও সম্পদ অর্জন।
উল্লিখিত দুটি দল ছাড়াও আরও কিছু জাতি-গোষ্ঠী একই উদ্দেশ্যে পশ্চিম ইউরোপ থেকে রওনা হয়েছিল। যেমন ভল্কমারের (Volkmar) বাহিনী, গটশকের (Gottschock) বাহিনী, ইমিচের (Emich) বাহিনী। (১৮২) প্রতিটি বাহিনীর বৈশিষ্ট্য ছিল বিভিন্ন ভূখণ্ডে রাহাজানি সৃষ্টি করা। ইমিচের বাহিনী রাইন নদীর উপত্যকায় স্পেয়ার (Spier) নগরীতে বারোজন ইহুদি নাগরিককে হত্যা করে। এরপর তারা উরমুজ নগরীতে হত্যা করে পাঁচশ ইহুদিকে। এটি ১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ২০ মে-এর ঘটনা। (১৮৩) মেইন্জ (Mainz) নগরীতে তারা হত্যা করে এক হাজার ইহুদি নাগরিককে। (১৮৪) ভল্কমারের বাহিনীও প্রাগ (Prague) নগরীতে প্রচুর ইহুদি নাগরিককে হত্যা করে। (১৮৫) এসব অভিযানে ক্রুসেডার বাহিনীগুলোর লালিত উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনা পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে পড়ে। কারণ, তারা ক্যাথলিক রাষ্ট্রগুলোতে ইহুদিদের হত্যা করছিল, প্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থোডক্সদের হত্যা করছিল আর সামনে অগ্রসর হচ্ছিল মুসলমানদের হত্যা করার জন্য।
তবে এই শেষোক্ত বাহিনীগুলো বিশেষ করে ইমিচ ও ভল্কমারের বাহিনী পথে কঠোর প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। হাঙ্গেরির রাজা কোলোম্যান তাদের জন্য ওত পেতে ছিলেন। তিনি আশঙ্কা করছিলেন যে, তারাও কাঙাল ওয়ালটার ও ধর্মযাজক পিটারের বাহিনীর ঘটনার পুনঃমঞ্চায়ন ঘটাতে পারে। এ কারণেই তিনি এই বাহিনীগুলোকে অবরোধ করেন এবং পুরোপুরি নিঃশেষ করে দেন। ফলে ওয়ালটার ও পিটারের বাহিনীর সঙ্গে শরিক হয়ে ইসলামি ভূখণ্ডে ক্রুসেড অভিযান পরিচালনার সুযোগ তাদের হয়নি।
নিঃসন্দেহে এ ঘটনা ছিল দুঃসহ দারিদ্র্যের জীবন থেকে পালিয়ে আসা দুর্ভাগা একদল লোকের অত্যন্ত করুণ এক পরিণতি। হাঙ্গেরির বন-জঙ্গলে অসহায় কিছু লোকেরই কেবল মৃত্যু ঘটেনি; অপমৃত্যু ঘটে তাদের ইসলামি প্রাচ্যে সুখময় জীবনযাপনের স্বপ্নেরও।
আমরা আবারও কনস্টান্টিনোপলের নগরপ্রাচীরের কাছে ফিরে আসছি, যেখানে ১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টের শুরুতেই (৪৮৮ হিজরি সনে) ধর্মযাজক পিটারের বাহিনী কাঙাল ওয়ালটারের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য পৌঁছে গেছে। উভয় বাহিনীর সম্মিলনে ইতিমধ্যেই ক্রুসেডার বাহিনী বিশাল আকার ধারণ করেছে। এসব কৃষক ও দুঃসাহসী জনতার সংখ্যা নির্ণয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনাসমূহে বিরোধ রয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় পঁচিশ হাজারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, আবার কোনো কোনো বর্ণনায় সর্বোচ্চ এক লক্ষের কথাও এসেছে। স্মর্তব্য যে, সব বর্ণনাই ছিল নারী ও শিশুদের বাদ দিয়ে কেবল যোদ্ধাপুরুষদের হিসাব করে। (১৮৬)
ধর্মযাজক পিটার কনস্টান্টিনোপলের কাছে পৌঁছলে বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস তাকে সাদর সম্ভাষণ জানান। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাকে সহায়তা করার জন্য ইউরোপের পাঠানো এই বিশাল উচ্ছৃঙ্খল জমায়েত দেখে যদিও তিনি মুগ্ধ হন; কিন্তু তিনি জানতেন যে, এটি মূল ক্রুসেডার বাহিনী নয়; বরং মূল প্রশিক্ষিত বাহিনীর অগ্রবর্তী দল মাত্র। এ কারণেই তিনি ধর্মযাজক পিটারকে মূল বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে বলেন এবং প্রশিক্ষিত সেলজুক বাহিনীর মোকাবিলায় তাড়াহুড়া বা দুর্বিনীত ভাব প্রকাশ করতে নিষেধ করেন।
কিন্তু দারিদ্র্য ও নিপীড়নের যাতাকলে পিষ্ট উচ্ছৃঙ্খল খ্রিষ্টান বাহিনীর ধৈর্যধারণের সময় কোথায়! তারা এবার বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের আশেপাশের বিভিন্ন জনপদেই লুটতরাজ শুরু করে। অবস্থাদৃষ্টে বাইজান্টাইন সম্রাট আশঙ্কা করেন যে, এভাবে চলতে থাকলে বাইজান্টাইন সৈন্যরা সাম্রাজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণই হারিয়ে ফেলবে। পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করে এবং কনস্টান্টিনোপল ও আশেপাশের অঞ্চলের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি এবার সমবেত ক্রুসেডার বাহিনীকে কালবিলম্ব না করে দ্রুত বসফরাস প্রণালি পার করিয়ে এশিয়া মাইনরের ইসলামি ভূখণ্ড অভিমুখে রওনা করিয়ে দেওয়াই সমীচীন মনে করেন। যদিও সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস তাদের হঠকারিতাপূর্ণ কর্মকাণ্ডে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ ছিলেন, তথাপি তিনি তাদেরকে সদুপদেশ প্রদান করেন এবং বাইজান্টাইন জাহাজ দিয়ে প্রণালি পার হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। তিনি তাদেরকে কিছু অস্ত্রশস্ত্রও প্রদান করেন এবং আসন্ন অভিযানে সহায়তা করার জন্য তাদের সঙ্গে কয়েকজন গোয়েন্দা ও সমরবিশেষজ্ঞ প্রেরণ করেন। (১৮৭)
টিকাঃ
১৭৪. Albert D' Aix, in Peters (ed)., The First Crusades, pp. 95-96.
১৭৫. Vasiliev: op. cit., vol.II, p. 404.
১৭৬. Chalandom: Premiere Croisade, p. 61-62; Cam. Med. Hist. Vol. 5,p.p. 275-276.
১৭৭. William of Tyre, p. 105; Hagenmeyer, "Chronologi", p. 243.
১৭৮. Setton: op. cit. 1, pp. 263-265.
১৭৯. Albert d' Aix: Rec. Hist. (cr) Hist. Occid., IV, p. 279.
১৮০. Ekkhrad D' Aura, in Petes (ed), pp. 100-101; Albert d' Aix, pp. 100; William of Tyre, p. 112; "Clermont to Constantinople", pp. 262-265.
১৮১. William of Tyre, p. 105; Hagenmeyer, "Chronologi", p. 243.
১৮২. Setton: op.city. 1. pp. 263-265.
১৮৩. Cam. Med. Hist. Vol.5. p.277.
১৮৪. Albert d' Aix Iv, pp.292-293.
১৮৫. Runciman: Op. City. 1. pp 134-141.
১৮৬. Ostrogorsky: op. cit., p. 321.
১৮৭. William of Tyre, 1. Pp. 105-106; Anna Comnena, Alexiade, pp. 311; Duncalf, "Clermont to Constantinople:, p. 259-260; Hagenmeyer, "Chronolgie", pp. 245-246.
📄 দৃশ্যপটে কিলিজ আরসালান, উচ্ছৃঙ্খল ক্রুসেডার বাহিনীর পতন
ওয়ালটার ও পিটারের নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার বাহিনী এশিয়া মাইনর অঞ্চলে প্রবেশ করার পর পেশাদার ও প্রশিক্ষিত বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করার পরিবর্তে বিভিন্ন মুসলিম জনপদে হামলা শুরু করে এবং হত্যা ও লুণ্ঠন চালাতে থাকে। বিপরীত দিক থেকে প্রবল প্রতিরোধ না থাকায় নিজেদের প্রাথমিক সাফল্যে তারা উন্মত্ত হয়ে ওঠে। এতটুকু চিন্তাও তাদের ছিল না যে, তারা ইতিমধ্যে এশিয়া মাইনর অঞ্চলের সেলজুক রাষ্ট্রের তৎকালীন সুলতান কিলিজ আরসালান বিন সুলায়মান বিন কুতুলমিশের ঘাঁটি নিকিয়া নগরীর অল্প কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে চলে এসেছে। (১৮৮)
সুলতান কিলিজ আরসালান একটি সামরিক কৌশল অবলম্বন করেন এবং এই নির্বোধ-অশিক্ষিত বাহিনীটিকে মজবুত ফাঁদে আটকে ফেলতে সক্ষম হন। সেলজুক বাহিনী ক্রুসেডার বাহিনীকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এরপর শুরু হয় দ্রুত যুদ্ধ। যুদ্ধে সাম্প্রদায়িক চেতনা লালনকারী খ্রিষ্টান বাহিনীটির সামরিক অজ্ঞতা পুরোপুরি প্রকাশ পেয়ে যায় এবং তারা সেলজুক বাহিনীর হাতে বেঘোরে মারা পড়ে। অগ্রবর্তী এই বাহিনীটির বিপর্যয়ের সংবাদ পাওয়ার পর বাইজান্টাইন সম্রাট যদি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করতেন, তাহলে তাদের একজনও বাঁচতে পারত না। তিনি দ্রুত তাদের রক্ষায় কিছু বাইজান্টাইন সৈন্যসহ কয়েকটি জাহাজ প্রেরণ করেন। বাইজান্টাইন বাহিনী মাত্র তিন হাজার ক্রুসেডারকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। বাকিরা সকলে সেলজুক বাহিনীর ফাঁদে পড়ে নিহত হয়। যুদ্ধে কাঙাল ওয়ালটারও নিহত হন। তবে ধর্মযাজক পিটার এ সময় বাইজান্টাইন সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে কনস্টান্টিনোপলে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। (১৮৯)
নিঃসন্দেহে এই ঘটনা ছিল বাইজান্টাইন সম্রাটের জন্য এবং স্বাভাবিকভাবেই ধর্মযাজক পিটারের জন্য বিরাট কঠিন এক আঘাত। সম্রাট অ্যালেক্সিয়াস ধর্মযাজক পিটারসহ বেঁচে যাওয়া লোকদেরকে কনস্টান্টিনোপলেই অবস্থান করে মূল বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে বলেন।
এভাবেই সাধারণ জনগণ ও কৃষকদের সমন্বয়ে গঠিত সবগুলো দলের করুণ ও বেদনাদায়ক পতন ঘটে। কেউ মারা যায় হাঙ্গেরির রাজার হাতে, কেউ নিহত হয় মুসলিম সেলজুক সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। ইউরোপের দরিদ্র ও কৃষকশ্রেণি এভাবেই তাদের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, সামন্ত ও ভূ-স্বامীদের প্রতারণার মূল্য পরিশোধ করে। যুগে যুগে পরাজিত ও পরাভূত জাতিগোষ্ঠী এভাবেই নিজেদের অধঃপতন ও লাঞ্ছনার মূল্য পরিশোধ করে থাকে!
এদিকে যখন অপ্রশিক্ষিত বাহিনীগুলো নির্বিচারে কচুকাটা হচ্ছিল, ওদিকে পশ্চিম ইউরোপে বিশেষ করে ফ্রান্সে তখন চলছিল প্রশিক্ষিত সৈন্যসমাবেশের বিশাল আয়োজন। এত বড় সৈন্যসমাবেশ ইউরোপের ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। বরং সম্ভবত পৃথিবী তার সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় এরূপ বিশাল সৈন্যসমাবেশের দৃশ্য অবলোকন করেনি।
টিকাঃ
১৮৮. Grousset: Hist. des Croisades, 1, p. 8.
১৮৯. অপ্রশিক্ষিত কৃষক-জনতার বাহিনীগুলোর পরিণতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন : Albert D' Aix, in Peters (ed.), 108-112; William of Tyre, 1, pp. 106-109;=Anna Comnena, Alexiade, pp. 311-313; Gesta. Francorum, pp. 2-4; Hagenmeyer. "Chronolgie" pp 245.251-254; Runciman, "Constantinople to Antioch", in setton, 1, pp. 281-284; Badford, The Sword, pp. 38-39. কাসিম আবদুহু কাসিম, আল-খালফিয়্যাতুল আইদুলিজিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১৬৫, জোযেফ নাসিম, আল-আরাব ওয়ার-রূম ওয়াল-লাতীন, পৃষ্ঠা: ১৫৮-১৭০ ও যাবুরূফ, আস-সালিবিয়ান ফিশ-শারকু, পৃষ্ঠা: ৫৭-৯৫।
📄 প্রথম ক্রুসেড অভিযানের সামরিক প্রস্তুতি
পশ্চিম ইউরোপ তখন একতা নামক কোনো কিছুর সঙ্গে পরিচিত ছিল না। বরং ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বৃহৎ রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে বিগত ছয় শতাব্দীর অধিক সময় পশ্চিম ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর সেনাবাহিনী কোনো যুদ্ধে একজোট হতে পারেনি। একমাত্র ব্যতিক্রমী ঘটনা হলো আন্দালুসের মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তর আন্দালুসের খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলোর যুদ্ধে এসব রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে ফ্রান্স সামরিক সহায়তা প্রদান করেছিল।
পারস্পরিক ঐক্য দূরে থাক, রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও ঐক্যের অনুকূলে ছিল না। সামন্তবাদী নীতির কারণে প্রতিটি সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্র অনেকগুলো জায়গির অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। প্রতিটি জায়গির অঞ্চলের ছিল আলাদা রাজন্য ও জমিদার, যিনি নিজ এলাকা অনেকটা স্বায়ত্তশাসন করতেন। যদিও অনেকগুলো জায়গির একটি রাষ্ট্রপরিচয়ের অধীনে আবদ্ধ থাকত এবং রাজন্যবর্গ সেই রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যের শাসক বা সম্রাটের প্রতি আনুগত্যও প্রকাশ করত; কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই আনুগত্য হতো নিছক আনুষ্ঠানিক; বাস্তবে কোনো আনুগত্যের বালাই থাকত না।
এই প্রেক্ষাপটকে মনে রাখলে আমাদের পক্ষে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ উপলব্ধি করা সহজ হবে। আমরা বুঝতে পারব যে, এই সব ভিন্ন ভিন্ন জায়গির অঞ্চলের বাহিনীগুলোর একটি সুবিন্যস্ত বাহিনীতে পরিণত হওয়া কেন অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে; বরং অনেকটা অসম্ভব বিবেচিত হবে।
বাস্তবেও আমরা দেখব যে, আসন্ন অভিযানে অংশগ্রহণকারী ক্রুসেডার বাহিনী গঠিত হবে ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি দলের সমন্বয়ে; প্রতিটি দলের থাকবে আলাদা সেনাপতি; প্রত্যেক সেনাপতির থাকবে নিজস্ব স্বপ্ন ও নিজস্ব মিত্র। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বিনিময়ের ঘটনাও ঘটবে; কিন্তু নিঃসন্দেহে এসব বাহিনীর মধ্যে বিরোধ-বিসংবাদ ও কলহের ঘটনাও ঘটবে। বিশেষ করে প্রথম ক্রুসেড অভিযানে যারা শরিক হয়েছিল, তাদের অনেকেই নিজেদের মধ্যে পূর্ব থেকে বিবাদরত ছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা ছিল। এ সবকিছুই শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করবে যে, তাদের সকলের কিংবা সতর্কতার দাবিতে বললে অধিকাংশের অভিযাত্রার একমাত্র অনুপ্রাণিকা ছিল ব্যক্তিগত লোভ-লালসা এবং বিশেষ স্বার্থ চরিতার্থ করা। তাদের চিন্তা-চেতনায় কক্ষনোই ধর্ম, গির্জা বা ক্রুশ বিদ্যমান ছিল না।
📄 ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী সামরিক বাহিনীসমূহ
প্রথম ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষিত বাহিনীর প্রতি দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাব যে, বাহিনীটি মূলত পাঁচটি আলাদা আলাদা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল।
ইংল্যান্ড ওয়েলস পোমেরানিয়া + প্রথম বাহিনী তৃতীয় বাহিনী নরম্যান প্যারিস জার্মানি চতুর্থ বাহিনী অস্ট্রিয়া ফ্রান্স: পোল্যান্ড হাঙ্গেরি নাফার ক্যাস্টোলা রাজ্য মুরাবিতি রাষ্ট্র দ্বিতীয় বাহিনী বাচ্ছা বার্সেলোনা রাজ্য ভূমধ্যসাগর মানচিত্র নং-১১ ক্রোয়েশিয়া পঞ্চম ইতালি বাহিনী রোম
প্রথম ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী বাহিনীসমূহ
১. প্রথম বাহিনীটি ছিল ফরাসি নাগরিক গডফ্রে ডি বোলোন (Godfrey de bouillon)-এর নেতৃত্বাধীন। গডফ্রে ছিলেন লুক্সেমবার্গের দক্ষিণে অবস্থিত বোলোন নগরীর প্রশাসক। এরপর তিনি লোথারিঙ্গিয়া সাম্রাজ্যের ডিউক নির্বাচিত হন। তার সঙ্গে তার ভাই যুবরাজ বল্ডউইন (Baldwin I)-ও ছিলেন। (১৯০) এ ছাড়াও তার বাহিনীতে বেশ কয়েকজন সামন্ত ছিল, যাদের অধিকাংশই ছিল ফ্রান্সের। বেশ কয়েকজন সামন্তের উপস্থিতির কারণে গডফ্রের বাহিনীটি বিশেষ গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছিল। (১৯১) বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য ছিল উত্তর ফ্রান্সের লোরেন (Lorraine) অঞ্চলের। অবশ্য কিছু জার্মান সৈন্যও তাদের সঙ্গে ছিল। (১৯২)
ফরাসি নাগরিক হলেও গডফ্রে কিন্তু তৎকালীন ফ্রান্সের দুর্বল রাজা ১ম ফিলিপের অনুগত ছিলেন না, তিনি আনুগত্য করতেন জার্মানির শক্তিমান রাজা ৪র্থ হেনরির। (১৯৩) গডফ্রের স্বপ্ন ছিল, তিনিই হবেন সম্মিলিত ক্রুসেডার বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তার বাহিনীতে অধিক সংখ্যক সামন্তের উপস্থিতি তাকে এক্ষেত্রে শক্তি জোগাচ্ছিল।
২. দ্বিতীয় বাহিনীটিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ফ্রান্স থেকে আগত বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন তুলুজ (Toulouse) ও প্রভিন্স (Provence)-এর ডিউক ৪র্থ রেমন্ড (Raymond IV)। রেমন্ডের উপস্থিতিই বাহিনীটির গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। গডফ্রের ন্যায় রেমন্ডও নিজেকে ক্রুসেডার বাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি মনে করতেন। ডিউক রেমন্ড ছিলেন বয়সে সবচেয়ে প্রবীণ সেনাপতি; অধিকন্তু তিনি পোপ ২য় আরবানের আহ্বানে শুরুতেই সাড়া দিয়েছিলেন। যোদ্ধা সংগ্রহের লক্ষ্যে পোপ যেসব সভার আয়োজন করেছিলেন, রেমন্ড তার অধিকাংশতেই যোগ দিয়েছিলেন। ইতিপূর্বে তার আন্দালুস ভূমিতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতাও ছিল। রেমন্ড সুস্পষ্ট ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি পোপেরও অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। এ কারণেই পোপ অন্য সব বাহিনী বাদ দিয়ে রেমন্ডের বাহিনীর সঙ্গেই রোমের গির্জার প্রতিনিধি হিসেবে লি পাই কার্থিডালের (Le Puy Cathedral) বিশপ অ্যাডমারকে পাঠিয়েছিলেন। (১৯৪) সবচেয়ে বড় কথা—রেমন্ডের বাহিনীই ছিল ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী সর্ববৃহৎ বাহিনী। এসব দিক বিবেচনা করে ৪র্থ রেমন্ড স্বপ্ন দেখছিলেন যে, অন্য কেউ নয়; তিনিই হবেন ক্রুসেডার বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। (১৯৫)
৩. মূলত পশ্চিম ফ্রান্সের নরমান্দে (Normandy) থেকে আগত তৃতীয় বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন নরমান্দে অঞ্চলের ডিউক রবার্ট কার্তুজ (Robert Curthose)। তার সঙ্গে তার ভগ্নিপতি ও ব্লয়েস (Blois) নগরীর কাউন্ট স্টিভেন (Stephen II Henry)-ও ছিলেন। এই বাহিনীটির সঙ্গে অনেক ইংরেজ যোদ্ধাও যোগ দিয়েছিল। (১৯৬)
৪. চতুর্থ বাহিনীটিও ছিল ফরাসি। তবে এই বাহিনীটি ছিল তুলনামূলক ক্ষুদ্র আকৃতির। সম্ভবত এই বাহিনীটি ফ্রান্সের রাজা ১ম ফিলিপের রাজকীয় প্রতিনিধিত্ব করছিল। কারণ, বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন রাজার সহোদর হিউ (Hugh)। হিউ ছিলেন ভার্মান্ডয়েস (Vermandois) অঞ্চলের কাউন্ট। (১৯৭)
৫. পঞ্চম ও শেষ বাহিনীটিও ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক ও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ইতালি থেকে আগত এই বাহিনীটি গঠিত হয়েছিল ভয়ংকর নরম্যান যোদ্ধাদের সমন্বয়ে। বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন আরেক উচ্চাভিলাষী যুবরাজ বোহেমন্ড (Bohemond)। (১৯৮) গডফ্রে ও রেমন্ডের মতো বোহেমন্ডও পুরো বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। তার পক্ষে যেসব বিষয় সহায়ক ছিল সেগুলো হলো— তার বাহিনী ছিল সবচেয়ে বিন্যস্ত, সবচেয়ে রণকুশলী এবং লড়াইয়ের ময়দানে সবচেয়ে অটল-অবিচল। (১৯৯) অধিকন্তু তিনি ছিলেন তৎকালীন পুরো ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাজন্য রবার্ট গোয়েসকার্ডের (Robert Guiscard) পুত্র, যিনি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে বলকান অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। (২০০) বোহেমন্ডের নিজের ১০৮১ খ্রিষ্টাব্দে এন্টিয়ক অবরোধ করার এবং বাইজান্টাইনদের মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা ছিল। বোহেমন্ডের সঙ্গে তার ভাগ্নে টেনক্রেড (Tancred)-ও ছিলেন। টেনক্রেড ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ও কঠোর প্রকৃতির একজন সেনাপতি। বোহেমন্ডের বাহিনীতে টেনক্রেড ছাড়াও আরও কয়েকজন দক্ষ নরম্যান সেনাপতি ছিল। (২০১)
আমাদের সামনে এ বিষয়টি আশা করি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, আসন্ন অভিযানের জন্য সমবেত হওয়া ক্রুসেড বাহিনীগুলোর একক কোনো নেতৃত্ব ছিল না; বরং শুরু থেকেই বাহিনীগুলোর সেনাপতিগণ সর্বাধিনায়ক হওয়ার জন্য পরস্পর স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল এবং আপন আপন রাজ্য সম্প্রসারণের এক বিশাল স্বপ্ন প্রত্যেককেই প্ররোচিত করছিল।
টিকাঃ
১৯০. Michaud: Hist. Des Croisades, 1, pp. 146-147.
১৯১. Runciman: op. cit., 1, p. 147.
১৯২. William Of Tyre 1, pp. 116-120.
১৯৩. Cam. Med Histvol. 5, p. 281.
১৯৪. Grousset: Hist. des Croisades 1, pp. 24-25; Runciman, Hist. of the Crusades, 1, p. 142.
১৯৫. Runciman: op. cit. 1, p. 136.
১৯৬. Raymond d' Aguilers, in Peters (ed.), The first Crusade, pp. 181-211. William of Tyre 1, pp. 139-140.
১৯৭. Anna Comnena, p. 314: AOL, 1, pp. 121-122, 145: Hagenmeyer "Chronologie", p. 248.
১৯৮. Gesta Francorun, pp. 6-13; Anna Comnena, pp. 326-329.
১৯৯. Runciman: op. cit. 1, p. 157.
২০০. Ostrogorsky: op. cit. 11, p. 381.
২০১. Chalandon: Premiere Croisade, p. 132.