📄 ৪. সামাজিক অনুপ্রেরণা
ক্রুসেড যুদ্ধ-পূর্ব ইউরোপের অবস্থা আলোচনা করতে গিয়ে আমরা পেছনে সেই দুঃসহ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেছি, যার মাঝে তৎকালীন ইউরোপের কৃষক ও দাসশ্রেণি দিনাতিপাত করছিল। পানাহারদ্রব্যের অপ্রতুলতা তো ছিলই; পরিস্থিতি ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের শোচনীয়। কৃষকশ্রেণির ন্যূনতম অধিকারও ছিল না। জমির সঙ্গে তারাও বিক্রি হতো। কোনো ধরনের সম্পদের মালিকানা লাভের অধিকার তাদের ছিল না। একজন মানুষ কখনো কখনো হয়তো ক্ষুধায় ধৈর্যধারণ করতে পারে; কিন্তু আচরণগত অবজ্ঞা ও মানসিক নিপীড়ন অনেক সময় ক্ষুৎপিপাসার চেয়েও অসহ্য হয়ে পড়ে। এ কারণেই ইউরোপের সাধারণ কৃষকশ্রেণি ক্রুসেড অভিযানকে নিজেদের জীবনব্যবস্থা পরিবর্তনের এবং লাঞ্ছনাকর দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে সম্ভাব্য নিষ্কৃতির এক সুবর্ণ সুযোগ মনে করছিল। আর তাই কৃষকরা অভিযানে যোগ দিয়েছিল নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে, নিজেদের অতিসাধারণ সামান্য সামানাটুকুও সঙ্গে নিয়ে। তাদের দৃষ্টিতে এটি ছিল প্রত্যাবর্তনহীন এক অভিযাত্রা, পরিস্থিতির পূর্ণ পরিবর্তন-প্রচেষ্টা এবং দুর্দশা ও শোষণের জীবনের বিরুদ্ধে এক প্রকৃত বিদ্রোহ। এ কারণেই আমরা সামনের ঘটনাপ্রবাহে শীঘ্রই অবলোকন করব যে, এই দুর্দশাগ্রস্ত দলটি এমনকি বাহিনী-বিন্যাস ও পরিকল্পনা চূড়ান্তকরণের সময়টুকু পর্যন্তও ধৈর্য ধরতে পারেনি; বরং মূল প্রশিক্ষিত বাহিনীকে ছাড়া নিজেরাই দ্রুত বেরিয়ে পড়েছে। কার্যত মনে হচ্ছিল-অসহায় এ মানুষগুলো এক দীর্ঘ বন্দিদশা থেকে মুক্তির আশায় ছুটে পালাচ্ছে!
এসব দুস্থ ও বিপর্যস্ত মানুষের সঙ্গে অপরাধী ও রাষ্ট্রীয় আইনভঙ্গকারীদের একটি দলও যোগ দিয়েছিল। তারা বিচারিক আইনে অপরাধী হওয়ায় হয়তো শান্তির সম্মুখীন ছিল কিংবা শান্তির হুমকিতে ছিল। তাদের দৃষ্টিতে ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণ কেবল আইন থেকে নিষ্কৃতির পথই ছিল না; ছিল নিজেদের সন্ত্রাসী-জীবনের নিত্যকর্ম ছিনতাই, রাহাজানি ইত্যাদির অবারিত সুযোগ। আর পরবর্তী সময়ে এ বিষয়টিও ক্রুসেড অভিযানে নানাবিধ অন্যায়-অনাচারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা বিস্মৃত হওয়া মোটেও সম্ভব নয়।