📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ৩. রাজনৈতিক স্বার্থ

📄 ৩. রাজনৈতিক স্বার্থ


ব্যক্তিগতভাবে স্বয়ং পোপ ২য় আরবানের ক্ষেত্রে এই অভিযানের জন্য এত দৌড়-ঝাঁপের মূল অনুপ্রাণিকা ছিল রাজনৈতিক, অর্থাৎ আপন ক্ষমতার পরিধি ও প্রতিপত্তি বিস্তার এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন। ইউরোপের শাসকবর্গের অনুপ্রাণিকাও এটিই ছিল। এসব শাসকের লোভ ও চাহিদা কোনো কিছুতেই স্তিমিত হতো না। আপন কর্তৃত্বাধীন ভূমির ক্ষমতার জোরে তারা আরও অনেক ভূখণ্ডের মালিকানার জন্য লালায়িত ছিল। আর তাই প্রথম ক্রুসেড অভিযানের সফলতা প্রত্যক্ষ করে পরবর্তী অভিযানগুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য তারা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল।

তা ছাড়া ইউরোপের শাসকবর্গ প্রত্যক্ষ করছিল যে, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে ইতিমধ্যে দুর্বলতার প্রভাব প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। যেকোনো সময় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের অর্থ হলো, সঙ্গে সঙ্গে সেলজুক বা অন্য কোনো মুসলিম সামরিক শক্তির সামনে ইউরোপের পূর্ব দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে পড়বে। তখন একদিকে প্রাচ্য থেকে আগত মুসলমান এবং অপরদিকে আন্দালুসের মুসলমান—দুই শত্রুর মাঝে পড়ে ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের অবস্থা হবে সাঁড়াশির দুই চোয়ালের মাঝে আটকা পড়ার মতো। এ কারণেই আমরা দেখেছি—ক্রুসেড অভিযানের প্রথম দিকে ইউরোপীয় শাসকগণ গড়িমসি করলেও পরবর্তী অভিযানগুলোতে অংশগ্রহণের জন্য তারা সাগ্রহে ছুটে এসেছিল; বরং তাদের কেউ কেউ নিজ বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে ফিলিস্তিন বা মিশর ভূমিতে পৌঁছে গিয়েছিল।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 ৪. সামাজিক অনুপ্রেরণা

📄 ৪. সামাজিক অনুপ্রেরণা


ক্রুসেড যুদ্ধ-পূর্ব ইউরোপের অবস্থা আলোচনা করতে গিয়ে আমরা পেছনে সেই দুঃসহ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেছি, যার মাঝে তৎকালীন ইউরোপের কৃষক ও দাসশ্রেণি দিনাতিপাত করছিল। পানাহারদ্রব্যের অপ্রতুলতা তো ছিলই; পরিস্থিতি ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের শোচনীয়। কৃষকশ্রেণির ন্যূনতম অধিকারও ছিল না। জমির সঙ্গে তারাও বিক্রি হতো। কোনো ধরনের সম্পদের মালিকানা লাভের অধিকার তাদের ছিল না। একজন মানুষ কখনো কখনো হয়তো ক্ষুধায় ধৈর্যধারণ করতে পারে; কিন্তু আচরণগত অবজ্ঞা ও মানসিক নিপীড়ন অনেক সময় ক্ষুৎপিপাসার চেয়েও অসহ্য হয়ে পড়ে। এ কারণেই ইউরোপের সাধারণ কৃষকশ্রেণি ক্রুসেড অভিযানকে নিজেদের জীবনব্যবস্থা পরিবর্তনের এবং লাঞ্ছনাকর দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে সম্ভাব্য নিষ্কৃতির এক সুবর্ণ সুযোগ মনে করছিল। আর তাই কৃষকরা অভিযানে যোগ দিয়েছিল নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে, নিজেদের অতিসাধারণ সামান্য সামানাটুকুও সঙ্গে নিয়ে। তাদের দৃষ্টিতে এটি ছিল প্রত্যাবর্তনহীন এক অভিযাত্রা, পরিস্থিতির পূর্ণ পরিবর্তন-প্রচেষ্টা এবং দুর্দশা ও শোষণের জীবনের বিরুদ্ধে এক প্রকৃত বিদ্রোহ। এ কারণেই আমরা সামনের ঘটনাপ্রবাহে শীঘ্রই অবলোকন করব যে, এই দুর্দশাগ্রস্ত দলটি এমনকি বাহিনী-বিন্যাস ও পরিকল্পনা চূড়ান্তকরণের সময়টুকু পর্যন্তও ধৈর্য ধরতে পারেনি; বরং মূল প্রশিক্ষিত বাহিনীকে ছাড়া নিজেরাই দ্রুত বেরিয়ে পড়েছে। কার্যত মনে হচ্ছিল-অসহায় এ মানুষগুলো এক দীর্ঘ বন্দিদশা থেকে মুক্তির আশায় ছুটে পালাচ্ছে!

এসব দুস্থ ও বিপর্যস্ত মানুষের সঙ্গে অপরাধী ও রাষ্ট্রীয় আইনভঙ্গকারীদের একটি দলও যোগ দিয়েছিল। তারা বিচারিক আইনে অপরাধী হওয়ায় হয়তো শান্তির সম্মুখীন ছিল কিংবা শান্তির হুমকিতে ছিল। তাদের দৃষ্টিতে ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণ কেবল আইন থেকে নিষ্কৃতির পথই ছিল না; ছিল নিজেদের সন্ত্রাসী-জীবনের নিত্যকর্ম ছিনতাই, রাহাজানি ইত্যাদির অবারিত সুযোগ। আর পরবর্তী সময়ে এ বিষয়টিও ক্রুসেড অভিযানে নানাবিধ অন্যায়-অনাচারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা বিস্মৃত হওয়া মোটেও সম্ভব নয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00