📄 ১. ধর্মীয় আবেগ
নিঃসন্দেহে ধর্মীয় আবেগ ছিল ক্রুসেডারদের অভিযানে বের হওয়ার অন্যতম মূল অবলম্বন; তবে মোটেই একমাত্র কারণ নয়। পবিত্র কুরআন- সুন্নাহ থেকে আমরা এ বাস্তবতার কথাই জানি যে, ইসলাম ও ইসলামবিরোধীদের পারস্পরিক যুদ্ধ চলবে চিরদিন। ইসলাম যদিও প্রীতি ও ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেয়, তারপরও প্রতিযুগেই এমন কিছু মানুষ থাকে, যারা কিছুতেই ইসলামের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে রাজি হয় না। আর তাই সুনির্দিষ্ট কোনো যৌক্তিক কারণ না থাকা সত্ত্বেও পোপ ২য় আরবান যদি মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দেন, তাতে আশ্চর্যের কিছুই নেই। 'প্রতিপক্ষ মুসলমান'-যুদ্ধ করার জন্য মৌলিকভাবে শুধু এতটুকুই কারণ হিসেবে যথেষ্ট! বিভিন্ন সময় পোপ আরবানের বক্তব্যে এমন সব শব্দ বারবার উচ্চারিত হয়েছে, যা দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, তিনি মৌলিকভাবে ইসলামকে ধর্ম হিসেবেই স্বীকৃতি দিতেন না। যেমন, তিনি মুসলিম জাতির জন্য অবিশ্বাসী, বিধর্মী, পৌত্তলিক ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ করেন। সুতরাং পোপের এ অভিযানে বের হওয়ার পেছনে যে ধর্মীয় অনুপ্রেরণাও কার্যকর ছিল, তা সুস্পষ্ট। তদ্রূপ কোনো কোনো পাদরি ও সন্ন্যাসীর ক্ষেত্রে এবং অভিযানে যোগদানকারী কতিপয় রাজন্যবর্গ ও সেনাপতিদের ক্ষেত্রেও ধর্মীয় আবেগের প্রভাব সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়েছিল।
সবচেয়ে বড় কথা, ধর্মীয় লক্ষ্যের বিষয়টি ক্রুসেড অভিযানের সুস্পষ্ট লক্ষ্য হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। তখন ইউরোপীয়দের মুখেমুখে অভিযানের কারণ হিসেবে মুসলমানদের হাত থেকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার কথাই প্রচলিত ছিল। অধিকন্তু ধর্মীয় আবেগ জাগিয়ে তুলতেই পোপ দাবি করেছিলেন যে, মুসলমানরা তীর্থযাত্রী খ্রিষ্টানদের ওপর জুলুম- নির্যাতন করে। যদিও এ বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, এ দাবির পেছনে তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল খ্রিষ্টান যোদ্ধাপুরুষ ও জনসাধারণকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলা। অন্যথায় এটা কোনোভাবেই প্রমাণিত নয় যে, মুসলমানরা খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের প্রতি কোনো প্রকার অন্যায় আচরণ করেছে। ইউরোপের বিখ্যাত ঐতিহাসিক ভ্যাসিলিভ (Giorgi Vasiliev) উল্লেখ করেন-
খ্রিষ্টানরা নির্বিশেষে সকলে ইসলামি শাসনের ছায়ায় ধর্মীয় ও অন্যান্য ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করত। তাদেরকে শুধু তাদের পুরোনো গির্জাগুলো সংরক্ষণের অনুমতিই দেওয়া হয়নি; বরং নতুন নতুন গির্জা ও মঠ নির্মাণের অনুমতিও দেওয়া হতো। নিজেদের গ্রন্থাগারে তারা খ্রিষ্ট-ধর্মতত্ত্বের গ্রন্থাদি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে পারত। (১৬৬)
আরেক প্রখ্যাত ঐতিহাসিক থমসন (James Westfall Thompson) বলেন—
সেলজুক রাষ্ট্রের অধীনে যেসব খ্রিষ্টান বসবাস করত, তারা খোদ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্রে বসবাসকারীদের চেয়ে অধিক সুখ-শান্তিতে ছিল। (১৬৭)
বরং স্বয়ং আল-কুদসের বিশপ ও গির্জাধ্যক্ষ (Patriarch of Jerusalem) থিওডোসিয়াস (Theodosius) কনস্টান্টিনোপলের বিশপের কাছে ২৫৫ হিজরি সনে (৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) পাঠানো এক পত্রে মুসলমানদের মহৎ হৃদয়, গণসহমর্মিতা ইত্যাদি গুণের প্রশংসা করেন। মুসলমানরা যে খ্রিষ্টানদের একান্ত বিষয়াদিতে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা ছাড়া তাদের অধিক হারে গির্জা নির্মাণের সুযোগ দিচ্ছে, তাও তিনি পত্রে উল্লেখ করেন। পত্রে আল-কুদসের (জেরুজালেম) বিশপ একটি অনস্বীকার্য গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন—
মুসলমানরা ন্যায়পরায়ণ জাতি। আমরা তাদের কাছ থেকে কখনো কোনো ধরনের ক্ষতি বা সীমালঙ্ঘনের সম্মুখীন হই না। (১৬৮)
এসব সাক্ষ্য এবং এ জাতীয় অসংখ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে এ কথা প্রমাণ করে যে, পোপ ২য় আরবানের উল্লিখিত দাবি অসার রটনা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রকৃতপক্ষে ক্রুসেড আগ্রাসনের পেছনে যেসব বাস্তব অনুপ্রাণিকা কার্যকর ছিল, সেগুলোকে ঢেকে রাখার অপচেষ্টা হিসেবেই এই বানোয়াট ও মিথ্যা দাবি তোলা হয়েছিল।
এর চেয়েও বড় কথা, ক্রুসেড অভিযানের কোনো পর্যায়েই আমরা ক্রুসেডার যোদ্ধাদের আচরণে ধার্মিকতার কোনো চিহ্ন খুঁজে পাইনি। বরং তারা ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের নির্বোধ ও ধর্মবিমুখ; অপরাধ ও অন্যায়ের নিকৃষ্টতম স্তরে তারা পৌঁছে গিয়েছিল। কেবল মুসলমানদের সঙ্গে নয়; প্রাচ্যের খ্রিষ্টানদের সঙ্গে তাদের কৃত আচরণেও ধার্মিকতার কোনো ছাপ পরিলক্ষিত হয়নি। এই ঘৃণ্য ও জঘন্য আচরণের কিছু নমুনা আমরা আলোচ্য ইতিহাসের বিভিন্ন অংশে অবলোকন করব। আমরা দেখব—ধর্ম ও ধার্মিকদের রক্ষার দোহাই দিয়ে বের হওয়া এসব ক্রুসেডার যোদ্ধাদের আচরণ কেমন ছিল হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া ও বুলগেরিয়ার খ্রিষ্টান নাগরিকদের সঙ্গে কিংবা একেবারে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলের খ্রিষ্টানদের সঙ্গে, যাদের উদ্ধারের দাবিতে তারা অভিযানে বের হয়েছিল। (১৬৯)
সুতরাং এ কথা স্বীকার্য যে, ধর্মীয় অনুপ্রেরণাও ক্রুসেড অভিযানে কার্যকর ছিল; কিন্তু নিঃসন্দেহে এটিই একমাত্র অনুপ্রাণিকা ছিল না। বরং একে বড় করে দেখাও সমীচীন নয়। কারণ, ক্রুসেডার যোদ্ধারা যদিও প্রতিটি ক্রুসেড অভিযানে কাঁধে রক্তবর্ণ ক্রুশ প্রতীক ধারণ করেছিল এবং দাবি করেছিল যে, তারা ধর্মীয় অভিযানে অংশগ্রহণের বিনিময়ে পাপমোচন ও ক্ষমাপ্রাপ্তি কামনা করে; কিন্তু বাস্তবতা হলো—কোনো ক্রুসেড অভিযানেই তাদের মাঝে নিকট-দূর কোনো দিক থেকেই ধর্মের কোনো ছাপ লক্ষ করা যায়নি।
টিকাঃ
১৬৬. Vasiliev: A History of the Byzantine Empire, p. 393.
১৬৭. Thompson : Economic and Social Hist. of the Middle Ages. vol. 1, o. 391.
১৬৮. Thompson : Economic and Social Hist. of the Middle Ages. vol. 1, o. 385.
১৬৯. William of Tyre, 1, p. 105-106; Hagenmeyer, Chronologi, o. 243, 245-246; Anna Comnena, Alexiade, pp. 311.
📄 ২. অর্থনৈতিক স্বার্থ
অর্থনৈতিক স্বার্থ ছিল ক্রুসেড অভিযানের অন্যতম অনুপ্রাণিকা। প্রচুর সংখ্যক মানুষ ইউরোপে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের কোনো প্রকার ব্যবস্থা হতে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে এ অভিযানে বের হয়েছিল। তারা বের হয়েছিল ফিলিস্তিনে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের খোঁজে। তারা ভেবেছিল, এ অভিযানে এমনকি মারা গেলেও তাদের হারানোর কিছুই নেই। ইউরোপে জমিদার ও রাজন্যবর্গের নিপীড়নের অধীনে নিদারুণ কষ্টে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু তাদের কাছে শতগুণে শ্রেয়তর ছিল। (১৭০)
অপরদিকে সামন্ত ও রাজন্যবর্গও বের হয়েছিল কেবল সম্পদ ও ভূমি- মালিকানা লাভের আশায়। প্রকৃতপক্ষে ফিলিস্তিনের অভিযান ছিল ইউরোপের অনেক রাজন্যের জন্য এমন এক স্বপ্নপূরণের দারুণ সুযোগ, যা তাদের জন্য ইউরোপে বাস্তবায়ন অসম্ভব ছিল। তৎকালীন ইউরোপীয় আইন অনুসারে মৃতব্যক্তির পরিত্যাজ্য সম্পদ তার সকল পুত্রের মাঝে বণ্টন করা হতো না; বরং জমিদার পিতার মৃত্যুর পর পুরো সম্পদের মালিকানা চলে যেত তার বড় পুত্রের কাছে। এ আইনের উদ্দেশ্য ছিল সম্পদ বিভক্ত হয়ে এবং ভূমির পরিমাণ কমে গিয়ে যেন প্রভাব-প্রতিপত্তি হ্রাস না পায়। (১৭৯) এই আইনের কারণে ইউরোপে রাজন্যপুত্রদের এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হয়েছিল, যাদের সম্পদের মালিক হওয়ার কোনো আশা ও স্বপ্নই ছিল না। তাদের সামনে যখন ফিলিস্তিনে যুদ্ধের দুয়ার উন্মোচিত হলো, তখন তারা নিজেদের বড় ভাইদের সঙ্গে সম্পদের প্রতিযোগিতায় নামতে যেকোনো ধরনের মালিকানা লাভের আশায় ফিলিস্তিন অভিযানে অংশ নিতে ছুটে গিয়েছিল।
তদ্রূপ ইতালিয়ান বিভিন্ন নৌবন্দরের বণিকদের ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক আগ্রহের বিষয়টি সুস্পষ্ট ছিল। এক্ষেত্রে ভেনিস, পিসা ও জেনোভার বণিকগোষ্ঠীর কথা বিশেষ করে উল্লেখ করা যায়। এ ছাড়া ফ্রান্সের মার্সেই (Marseille) নগরীসহ ইউরোপের অন্যান্য নগরীর বণিকদের কথাও বলা যেতে পারে। এসব বণিক দেখছিল যে, যদিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ পোপ ও গির্জার স্বার্থের প্রতিকূলে; কিন্তু এখন পোপের আহ্বানের মাধ্যমে তাদের সামনে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ পূরণের এক দারুণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। (১৭২) প্রকৃতপক্ষে এক্ষেত্রে উভয় পক্ষের মাঝে স্বার্থবিনিময়ের বিষয়টি সুস্পষ্ট ছিল। একদিকে পোপ ও গির্জাকেন্দ্রিক ক্রুসেডারদের আসন্ন অভিযানের জন্য নৌবন্দরগুলোর সহায়তা গ্রহণ ব্যতীত বিকল্প কোনো উপায় ছিল না, অপরদিকে নৌবন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রক ও বণিকগোষ্ঠীও সহায়তার বিনিময়ে শীঘ্রই অভাবনীয় বিনিময়প্রাপ্তির আশা করছিল। অধিকন্তু ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণকারী ও সহায়তাকারী ইতালিয়ান প্রজাতন্ত্রগুলোকে অধিকৃত অঞ্চলে বিশেষ ছাড় ও সুবিধাদি প্রদানের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। এর অর্থ কেবল বিজিত অঞ্চলে ব্যবসায়িক স্বাধীনতা নয়; বরং তাদেরকে বিজিত প্রতিটি নগরীতে রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, স্নানাগারবিশিষ্ট হোটেল, বেকারি ইত্যাদিও প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। একে কেন্দ্র করে ইতালিয়ান প্রজাতন্ত্রগুলোর মধ্যে প্রচণ্ড রকমের বিরোধ, এমনকি পারস্পরিক সংঘাত ও হানাহানির ঘটনাও ঘটে। মার্সেইয়ের বণিকশ্রেণিও অন্যদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় এবং একেবারে বাইতুল মুকাদ্দাসের অভ্যন্তরে বিশেষ শক্তিশালী অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে সক্ষম হয়। (১৭৩)
এটি সকলের কাছেই সুস্পষ্ট যে, এ ধরনের অতিলোভী বণিকশ্রেণির মন ও মস্তিষ্ক কখনোই ধর্মীয় চেতনা ও আবেগে নিমগ্ন ছিল না। মূলত প্রাচ্যের ধনভান্ডার ও উর্বর ভূমিই ছিল ক্রুসেড অভিযান সফল করার জন্য তাদের যাবতীয় কর্মপ্রচেষ্টার মূল অনুপ্রাণিকা।
টিকাঃ
১৭০. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যাহ, ১/৩৬।
১৭০. সাইদ আশুর, উরুব্বা ফিল উছুরিল উসত্ত্বা, ২/২৬৩।
১৭২. Heyd: Hist. du Commerce I, 132-133.
১৭০, সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যাহ, ১/৩৩-৩৪।
📄 ৩. রাজনৈতিক স্বার্থ
ব্যক্তিগতভাবে স্বয়ং পোপ ২য় আরবানের ক্ষেত্রে এই অভিযানের জন্য এত দৌড়-ঝাঁপের মূল অনুপ্রাণিকা ছিল রাজনৈতিক, অর্থাৎ আপন ক্ষমতার পরিধি ও প্রতিপত্তি বিস্তার এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন। ইউরোপের শাসকবর্গের অনুপ্রাণিকাও এটিই ছিল। এসব শাসকের লোভ ও চাহিদা কোনো কিছুতেই স্তিমিত হতো না। আপন কর্তৃত্বাধীন ভূমির ক্ষমতার জোরে তারা আরও অনেক ভূখণ্ডের মালিকানার জন্য লালায়িত ছিল। আর তাই প্রথম ক্রুসেড অভিযানের সফলতা প্রত্যক্ষ করে পরবর্তী অভিযানগুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের জন্য তারা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল।
তা ছাড়া ইউরোপের শাসকবর্গ প্রত্যক্ষ করছিল যে, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে ইতিমধ্যে দুর্বলতার প্রভাব প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। যেকোনো সময় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের অর্থ হলো, সঙ্গে সঙ্গে সেলজুক বা অন্য কোনো মুসলিম সামরিক শক্তির সামনে ইউরোপের পূর্ব দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে পড়বে। তখন একদিকে প্রাচ্য থেকে আগত মুসলমান এবং অপরদিকে আন্দালুসের মুসলমান—দুই শত্রুর মাঝে পড়ে ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের অবস্থা হবে সাঁড়াশির দুই চোয়ালের মাঝে আটকা পড়ার মতো। এ কারণেই আমরা দেখেছি—ক্রুসেড অভিযানের প্রথম দিকে ইউরোপীয় শাসকগণ গড়িমসি করলেও পরবর্তী অভিযানগুলোতে অংশগ্রহণের জন্য তারা সাগ্রহে ছুটে এসেছিল; বরং তাদের কেউ কেউ নিজ বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে ফিলিস্তিন বা মিশর ভূমিতে পৌঁছে গিয়েছিল।
📄 ৪. সামাজিক অনুপ্রেরণা
ক্রুসেড যুদ্ধ-পূর্ব ইউরোপের অবস্থা আলোচনা করতে গিয়ে আমরা পেছনে সেই দুঃসহ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেছি, যার মাঝে তৎকালীন ইউরোপের কৃষক ও দাসশ্রেণি দিনাতিপাত করছিল। পানাহারদ্রব্যের অপ্রতুলতা তো ছিলই; পরিস্থিতি ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ের শোচনীয়। কৃষকশ্রেণির ন্যূনতম অধিকারও ছিল না। জমির সঙ্গে তারাও বিক্রি হতো। কোনো ধরনের সম্পদের মালিকানা লাভের অধিকার তাদের ছিল না। একজন মানুষ কখনো কখনো হয়তো ক্ষুধায় ধৈর্যধারণ করতে পারে; কিন্তু আচরণগত অবজ্ঞা ও মানসিক নিপীড়ন অনেক সময় ক্ষুৎপিপাসার চেয়েও অসহ্য হয়ে পড়ে। এ কারণেই ইউরোপের সাধারণ কৃষকশ্রেণি ক্রুসেড অভিযানকে নিজেদের জীবনব্যবস্থা পরিবর্তনের এবং লাঞ্ছনাকর দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে সম্ভাব্য নিষ্কৃতির এক সুবর্ণ সুযোগ মনে করছিল। আর তাই কৃষকরা অভিযানে যোগ দিয়েছিল নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে, নিজেদের অতিসাধারণ সামান্য সামানাটুকুও সঙ্গে নিয়ে। তাদের দৃষ্টিতে এটি ছিল প্রত্যাবর্তনহীন এক অভিযাত্রা, পরিস্থিতির পূর্ণ পরিবর্তন-প্রচেষ্টা এবং দুর্দশা ও শোষণের জীবনের বিরুদ্ধে এক প্রকৃত বিদ্রোহ। এ কারণেই আমরা সামনের ঘটনাপ্রবাহে শীঘ্রই অবলোকন করব যে, এই দুর্দশাগ্রস্ত দলটি এমনকি বাহিনী-বিন্যাস ও পরিকল্পনা চূড়ান্তকরণের সময়টুকু পর্যন্তও ধৈর্য ধরতে পারেনি; বরং মূল প্রশিক্ষিত বাহিনীকে ছাড়া নিজেরাই দ্রুত বেরিয়ে পড়েছে। কার্যত মনে হচ্ছিল-অসহায় এ মানুষগুলো এক দীর্ঘ বন্দিদশা থেকে মুক্তির আশায় ছুটে পালাচ্ছে!
এসব দুস্থ ও বিপর্যস্ত মানুষের সঙ্গে অপরাধী ও রাষ্ট্রীয় আইনভঙ্গকারীদের একটি দলও যোগ দিয়েছিল। তারা বিচারিক আইনে অপরাধী হওয়ায় হয়তো শান্তির সম্মুখীন ছিল কিংবা শান্তির হুমকিতে ছিল। তাদের দৃষ্টিতে ক্রুসেড অভিযানে অংশগ্রহণ কেবল আইন থেকে নিষ্কৃতির পথই ছিল না; ছিল নিজেদের সন্ত্রাসী-জীবনের নিত্যকর্ম ছিনতাই, রাহাজানি ইত্যাদির অবারিত সুযোগ। আর পরবর্তী সময়ে এ বিষয়টিও ক্রুসেড অভিযানে নানাবিধ অন্যায়-অনাচারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা বিস্মৃত হওয়া মোটেও সম্ভব নয়।