📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 সুদৃঢ় ও গঠনমূলক পরিকল্পনা

📄 সুদৃঢ় ও গঠনমূলক পরিকল্পনা


পোপ কিন্তু জনসমাবেশের এই কল্পনাতীত উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনাতেই তুষ্ট হয়ে বসে থাকেননি। তিনি এই উদ্দীপনাকে অব্যাহত রাখতে এবং প্রতিক্রিয়াকে আরও জোরালো করতে এর পরপরই অত্যন্ত শক্তিশালী ও গঠনমূলক এক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং কার্যকর ও ফলপ্রসূ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—

১. একেবারে শুরু থেকেই যেন অভিযান-প্রস্তুতির প্রতিটি পদক্ষেপ পোপ ও রোমান ক্যাথলিক গির্জার নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়, পোপ ২য় আরবান তা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হন। এ উদ্দেশ্যে তিনি ক্লেরমন্ট সম্মেলনের দিনই ফ্রান্সের লি-পিউ অঞ্চল (Le Puy)-এর বিশপ ও গির্জাধ্যক্ষ অ্যাডমার ডি মনটেইল (Adhemar de Monteil)-কে আসন্ন অভিযানের আধ্যাত্মিক সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করেন। সংশ্লিষ্ট সকলকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, অভিযানে অ্যাডমার পোপের প্রতিনিধির ভূমিকা পালন করবেন। (১৫৩)

২. পশ্চিম ইউরোপের প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেন নিজ নিজ অঞ্চলের জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়, এজন্য পোপ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। পোপের আশা ছিল—এই পদক্ষেপের ফলে যুদ্ধের প্রচারণা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়বে। (১৫৪)

৩. ইউরোপজুড়ে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধকরণ এবং ফিলিস্তিন অভিযানের জন্য যোদ্ধাসংগ্রহের জোরদার প্রচেষ্টা নিশ্চিত করতে পোপ আরবান এমিয়েন্স (Amiens) অঞ্চলের পিটার (Peter the Hermit) নামক জনৈক ধর্মযাজককে দায়িত্ব প্রদান করেন। ধর্মযাজক পিটার ছিলেন স্বভাব বাগ্মিতার অধিকারী। তিনি অতি সাধারণ পোশাক পরিধান করতেন এবং নগ্নপদে পথ চলতেন। গন্তব্য অধিক দূরত্বের হলে তার সঙ্গে বাহন হিসাবে থাকত একটি ল্যাংড়া গাধা।

পিটার পোপ-প্রদত্ত দায়িত্ব সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ফ্রান্সসহ ফ্রান্সের আনাচে-কানাচে প্রচারণা চালাতে থাকেন। সাধারণ জনগণের মাঝে তার এই প্রচারণার জাদুকরী প্রভাব পড়ে। (১৫৫) মানুষ দলে দলে তার অনুসরণ করতে থাকে। ফলে অল্প কয়েক মাসের প্রচেষ্টায় পিটার পনেরো হাজার লোক জমা করে ফেলেন। এ হিসাব কেবল পুরুষদের; নারী ও শিশুরা ছিল এ হিসাবের বাইরে। (১৫৬) অবশ্য পিটারের সঙ্গে যোগ দেওয়া অধিকাংশ মানুষ ছিল সাধারণ দরিদ্র শ্রেণির জনগণ এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন আইন ভঙ্গকারী অপরাধীদের দল। অতি নগণ্য সংখ্যক যোদ্ধাপুরুষ এবং কয়েকজন সামন্তও অবশ্য পিটারের বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। যেহেতু ধর্মযাজক পিটারের গঠিত এ বাহিনীটির সদস্যদের মাঝে যোদ্ধাবাহিনী বা মিলিশিয়া বাহিনীর কোনো বৈশিষ্ট্য ও ছাপ ছিল না, তাই তারা 'কৃষকদের বাহিনী' (Peasants Crusade), 'ভিখারিদের বাহিনী' (Paupers Crusade) ইত্যাদি নামে পরিচিতি লাভ করে। (১৫৭)

পিটারের ন্যায় ওয়ালটার (Walter Sans Avoir) নামক আরেক ধর্মযাজক সন্ন্যাসীও ক্রুসেড অভিযানের প্রচারণা চালাতে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল প্রদক্ষিণ করেন। তিনিও প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর সঙ্গে অভিযানে শরিক হতে আগ্রহী স্বেচ্ছাসেবক সৈন্যদের বড় একটি দল সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। (১৫৮) ধর্মযাজক ওয়ালটার 'কাঙাল ওয়ালটার' (Walter the Penniless) নামে পরিচিত ছিলেন।

৪. সৈন্যসংগ্রহ ও যুদ্ধপ্রস্তুতির প্রচেষ্টা মাত্রাতিরিক্ত দীর্ঘ হয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় পোপ ২য় আরবান অভিযান শুরুর সময় অনির্ধারিত ও উন্মুক্ত রেখে দিতে রাজি ছিলেন না। তিনি বিভিন্ন নগরী থেকে আগত বিচ্ছিন্ন দল ও সৈন্যদের সমবেত হওয়ার নির্দিষ্ট তারিখ ও স্থানও ঘোষণা করে দেন। তারিখ নির্ধারণ করা হয় ১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ আগস্ট (৪৮৯ হিজরির ২৩ শাবান) আর সকলের সমবেত হওয়ার স্থান নির্ধারণ করা হয় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল। বিলম্বিত তারিখ নির্ধারণের উদ্দেশ্য ছিল যেন সৈন্যসংগ্রহের জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যায় এবং বসন্তের শুরুতে সংগৃহীত ফল-ফসলও বাহিনীর রসদ হিসেবে সঙ্গে নেওয়া যায়। (১৫৯) সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়-প্রয়োজনীয় রসদসামগ্রী সংগ্রহ করার পর কালবিলম্ব না করে প্রতিটি বাহিনী কনস্টান্টিনোপল অভিমুখে রওনা হয়ে যাবে। এরপরও পথে কেটে যাবে প্রায় তিন মাস। আর সমবেত হওয়ার স্থান হিসেবে কনস্টান্টিনোপলকে নির্বাচনের কারণ হলো, ক্রুসেডারদের পরিকল্পনা ছিল প্রথমে তারা এশিয়া মাইনর অঞ্চলে সেলজুকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে; এরপর শাম অঞ্চলে অভিযান চালাবে এবং সবশেষে পৌঁছবে তাদের মূল ও শেষ লক্ষ্যস্থল ফিলিস্তিনে, বিশেষ করে বাইতুল মুকাদ্দাসে। আর প্রথম লক্ষ্য এশিয়া মাইনরের ইসলামি ভূখণ্ডে প্রবেশের পূর্বে কনস্টান্টিনোপলই ছিল খ্রিষ্টান শাসনাধীন সর্বশেষ ঘাঁটি। তা ছাড়া ক্রুসেড অভিযানের যাবতীয় প্রক্রিয়া সহজে সম্পন্ন করার জন্য পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতার পথ ও পদ্ধতি সুবিন্যস্ত করার জন্য বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোসের সঙ্গে পোপের সাক্ষাৎ করারও প্রয়োজন ছিল।

৫. পোপ আরবান অভিযানে গমনে উদ্বুদ্ধ করতে ইউরোপের বিভিন্ন রাজা, শাসক ও সামন্তদের কাছে পত্র প্রেরণ করেন। পোপের প্রেরিত পত্র রাজা ও রাষ্ট্রনায়কদের মাঝে উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে না পারলেও সামন্ত বা রাজন্যবর্গের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। যেসব রাজন্য তার পত্র পেয়ে সাড়া প্রদান করে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ফ্রান্সের তুলুজ (Toulouse) ও প্রভিন্স (Provence) অঞ্চলের কাউন্ট ৪র্থ রেমন্ড (Raymond IV)। মুসলমানদের বিরুদ্ধে আসন্ন যুদ্ধে ৪র্থ রেমন্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন সেনাপতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিলেন। কারণ, ইতিপূর্বে তিনি আন্দালুসের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। অধিকন্তু তার তীর্থযাত্রী হিসেবে বাইতুল মুকাদ্দাসে গমনের অভিজ্ঞতাও ছিল। (১৬০) রেমন্ড নিজেকে পুরো ক্রুসেডার বাহিনীর নেতৃত্বদানের উপযুক্ত মনে করতেন। পোপ তার এই সামরিক যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও উদ্দীপনাকে মূল্যায়ন করেন এবং তার সঙ্গে কয়েকবার বৈঠক করেন। এমনকি পরবর্তী সময়ে পোপ যখন অভিযানে অংশগ্রহণের জন্য সমবেত বিশাল এক জনসমাবেশকে উৎসাহ জোগাতে ১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দের জুলাইয়ে নিম (Nîmes) নগরীতে সম্মেলনের আয়োজন করেন, সেখানে রেমন্ডকেও সঙ্গে নিয়ে যান। (১৬১)

রেমন্ড ছাড়া আরও কয়েকজন রাজন্য পোপের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। তাদের পরিচয়-বিবরণ অভিযানে গমনের পূর্বে ক্রুসেডার বাহিনীর বিন্যাস সংক্রান্ত আলোচনায় আসবে।

৬. কেবল শাসক ও রাজন্যবর্গের কাছে পত্র পাঠিয়েই পোপ ক্ষান্ত হননি। তিনি আসন্ন অভিযান সহজ করতে বিভিন্ন নৌবহরের সহায়তা লাভের জন্য ইতালির জেনোভা বন্দর-সংশ্লিষ্ট সামরিক ও অর্থনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গেও পত্রবিনিময় করেন। তারা পোপের আহ্বানে সাদরে সাড়া দেয় এবং ক্রুসেডারদের সহায়তা করার জন্য বারোটি সমুদ্র-উপযোগী জাহাজসহ বিভিন্ন নৌযান প্রস্তুত রাখে। বিনিময়ে পোপ তাদেরকে আগামী দিনে অধিকৃত শাম অঞ্চলে বিশেষ ছাড়ে বাণিজ্য-সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। (১৬২)

৭. কেবল পত্র-যোগাযোগেই সীমাবদ্ধ না থেকে অভিযানের সফলতার উদ্দেশ্যে পোপ নিজে অনেকগুলো নগরী ও জনপদে পরিভ্রমণ করেন। তিনি ক্লেরমন্ট সম্মেলনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে ফ্রান্সের লিমোজিস (Limoges) নগরীতে আরেকটি সম্মেলনের আয়োজন করেন। এরপর তিনি ১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মধ্যে তুর্ক্স (Tours), আনজের্স (Angers), মেইন-এট-লরিয়ে (Maine-et-Loire), পয়টিয়ার্স (Poitiers), বর্দো (Bordeaux), তুলুজ, নিম প্রভৃতি নগরীতে সফর করেন। (১৬৩)

পোপের এই অব্যাহত প্রচেষ্টার ফলে বিরাট সংখ্যক জনবল সংগৃহীত হয়। সৈন্যদের অধিকাংশই ছিল ফ্রান্সের নাগরিক। ইতালি, ইংল্যান্ড ও স্পেন থেকেও কিছু সৈন্য যোগ দেয়। এমনকি স্কটল্যান্ড ও ডেনমার্কের মতো দূরবর্তী বিভিন্ন দেশ থেকেও কিছু সৈন্য অভিযানে যোগ দিতে উপস্থিত হয়। (১৬৪)

৮. পোপ এই মর্মেও সতর্কবাণী প্রদান করেন যে, যারা অভিযানে অংশগ্রহণে সম্মতি জানিয়ে ক্রুশ প্রতীক ধারণ করবে, তাদের মধ্য হতে কেউ যদি পরে অভিযানে অংশগ্রহণ না করে, তাহলে সে স্বর্গবঞ্চিত হওয়ার শাস্তি ভোগ করবে। (১৬৫) এই হুমকি প্রদানের কারণ হলো— পোপ বুঝতে পেরেছিলেন যে, জনসাধারণের এই সাময়িক উদ্দীপনা একসময় নিশ্চয়ই স্তিমিত হয়ে যাবে। তখন হয়তো এই বিপুল সংখ্যক জনগণ তার সঙ্গে থাকবে না। ফলে পরিণতি হবে অত্যন্ত মর্মান্তিক ও ভয়াবহ। এই হুমকিদানের মাধ্যমে তিনি এই নিশ্চয়তা পেতে চাচ্ছিলেন যে, যারা অভিযানে যোগ দিতে সম্মতি জানাচ্ছে, তারা সকলেই শেষ পর্যন্ত বের হবে এবং এর মাধ্যমে তিনি তার পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবেন।

নিঃসন্দেহে পোপের পুরো পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সুচিন্তিত ও সুবিন্যস্ত। যথেষ্ট সময়, মেধা, চিন্তা ও অর্থ ব্যয় করে তিনি এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন। তার গঠনমূলক পরিকল্পনার মাধ্যমেই পুরো পশ্চিম ইউরোপের প্রচেষ্টা একটি নির্দিষ্ট ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। বিগত কয়েক শতাব্দীতে বরং নির্দিষ্ট করে বললে সুপ্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে ইউরোপে এরূপ ঐক্য ও উদ্দীপনা কখনো পরিলক্ষিত হয়নি।

টিকাঃ
১৫৩, Cam. Med. Hist. vol. 5 p. 273.
১৫৪, Runciman, A Hist. 1, p. 108-109; Mayer, The Crusades, pp. 42-43.
১৫৫. Grousset: Hist. des Croisades 1, p. 50.
১৫৬. Michaud: op. cit. Tome 1, p.p. 105-106.
১৫৭. ধর্মযাজক পিটারের প্রচারণা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন: Albert d'Aix, in Peters (ed.), The first Crusade, pp. 96-99; William of Tyre, 1, pp. 99-106; Chronique de Zimmen, A OL, 11, pp. 23-24; Anna Comnena, Alexiade, pp. 310-311; Runciman, A Hist. of Crusades, 1, pp. 123-127; Duncalf, "Clermont to Constantinople, p. 260-262.
১৫৮. Vasiliev: op. cit., vol 11, p. 404.
১৫৯. কাসিম আবদুহু কাসিম, মাহিয়াতুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১০৮।
১৬০. Michel Le Syrien: (Rec. Hist. Cr Doc. Arm), 1. p. 372.
১৬১. Cam. Med. Hist. vol. 5, p. 273.
১৬২. Heyd: Hist. du Commerce 1, p. 133; Setton: op. cit, 1, p. 252.
১৬০. Hagenmeyer, Chronologi, ROL, VI, pp. 224-225, p. 226-243; AOL, 1, pp. 109-110, 116, 119.
১৬৪. Runciman, op. cit., vol. 1, p. 112.
১৬৫, Runciman, op. cit., vol. 1, p.p. 108-109.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00