📄 চার. সামাজিক পটভূমি
তৎকালীন ইউরোপীয় জনসাধারণ নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসে অভ্যস্ত ছিল না। তারা পরিভ্রমণরত যাযাবর বেদুইনদের ন্যায় জীবনযাপন করত। পানাহারদ্রব্য বা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে তারা বারবার স্থান পরিবর্তন করত বলে একটি নির্দিষ্ট ভূমিতে অবস্থান ও বসবাসের চেতনা ও রীতি তাদের মাঝে অনুপস্থিত ছিল। সম্ভবত এ বিষয়টিও তৎকালীন ইউরোপের অনেক মানুষকে তুলনামূলক উন্নত ও সচ্ছল জীবনব্যবস্থার খোঁজে পুরো ইউরোপ ছেড়ে ফিলিস্তিনে গমনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। (১২২)
সামন্তবাদনির্ভর ব্যবস্থা চালু থাকায় ইউরোপের কৃষকসমাজ সামন্ত ও জমিদারদের পক্ষ থেকে প্রচণ্ড নিপীড়ন ও জুলুমের শিকার হতো। তৎকালীন ইউরোপে কৃষকদের সামান্য অধিকারও ছিল না। জমির সঙ্গে কৃষকরাও বিক্রি হতো; একই সঙ্গে মালিক বদল ঘটত ভূমি ও ভূমি-শ্রমিকের। জমিদারদের প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধি নিশ্চিতকরণের পেছনেই কৃষকদের রক্ত পানি হতো। এর ফলে ইউরোপীয় কৃষকসমাজে ধীরে ধীরে ভূমি-মালিক ও সামন্তদের প্রতি ক্ষোভ সঞ্চারিত হতে থাকে। কিন্তু এ সংকট থেকে নিষ্কৃতির কোনো সুযোগ দূরে থাক, স্বপ্ন ও আশাও তাদের মানসপটে ছিল না। (১২৩)
কেবল এই শোষণ ও লাঞ্ছনাকর জীবনব্যবস্থাই নয়; পুরো ইউরোপ তখন নিরক্ষরতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। মূর্খতা ও শিক্ষাবিমুখতার শিকার ছিল সমাজের বিশেষ ও সাধারণ উভয় শ্রেণি। জ্ঞান ও জ্ঞানচর্চার প্রতি সামান্য আকর্ষণ ও অনুরাগ সমকালীন ইউরোপে ছিল না। এই জ্ঞানদীনতা ও পশ্চাৎপদতার কারণে যেকোনো চিন্তাধারা বা অনুপ্রাণিকা অতি সহজে তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারত। তাদের সামনে কেউ কোনো চিন্তাধারা তুলে ধরলে সেটি ভালো না মন্দ, তার পরিণতিই-বা কী হতে পারে-এসব বিশ্লেষণ করার মতো বুদ্ধি, মনোবৃত্তি বা মানসিক যোগ্যতা তাদের ছিল না। ছিল না পরস্পর সাংঘর্ষিক দুটি মতাদর্শ সামনে এলে একটিকে বেছে নেওয়ার মতো জ্ঞান-যোগ্যতা। নিঃসন্দেহে এসব বিষয়ও তাদেরকে সবকিছু ছেড়ে যুদ্ধের জন্য ফিলিস্তিন অভিমুখে অগ্রসর হতে সহায়তা করেছিল। (১২৪)
উল্লিখিত আলোচনায় যেসব পটভূমি ও প্রেক্ষাপটের কথা এসেছে, তার মাধ্যমে আমাদের সামনে এ বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয় যে, তৎকালীন ইউরোপীয় সমাজ ছিল ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জাতিগত বিবেচনায় বিভক্ত অনেকগুলো দল-উপদলের সমষ্টি। প্রতিটি দল-উপদলেরই ছিল আপন আপন আয়তন ও সামর্থ্য অনুপাতে ছোট-বড় আশা-প্রত্যাশা, অভিলাষ-স্বার্থচিন্তা ও বিস্তৃত পরিকল্পনা। সুতরাং প্রিয় পাঠক, এই শতধা বিভক্ত ইউরোপিয়ান জাতি-গোষ্ঠীর মাঝে যদি এমন কোনো ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটে, যিনি তার জাদুকরী যোগ্যতাবলে সকলের বিভিন্নমুখী চিন্তা-চেতনাকে এক-অভিন্ন উদ্দেশ্যে পরিচালিত করতে সক্ষম হবেন এবং বস্তুগত ও বুদ্ধিগত স্তরের ভিন্নতা সত্ত্বেও সকলকে ধাবিত করবেন এক লক্ষ্য পানে; সবাই ছুটে যাবে অভিন্ন গন্তব্য অভিমুখে নিজেদের সৌভাগ্যের সন্ধানে, তাহলে নিশ্চিত করেই কি তা চরম বিস্ময়ের বিষয় হবে না?! অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, সমকালীন ইউরোপে সেই চরম বিস্ময়কর ঘটনাই ঘটেছিল!
তাহলে দেখার বিষয়-
কে সেই জাদুকরী যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি? কীভাবে তিনি শতধাবিভক্ত ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীকে এক সুতোয় গাঁথতে সক্ষম হলেন?
আর কীই-বা ছিল ক্রুসেড অভিযানগুলোর প্রকৃত কারণ ও কার্যকারণ, অনুঘটক ও অনুপ্রাণিকা? ক্রুসেড অভিযান কেবলই একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ ছিল, না অর্থনৈতিক লড়াই, নাকি ধর্মীয় সংঘাত?
সামনের পরিচ্ছেদে আমরা এসব প্রশ্নের উত্তরই খুঁজে নেব, ইনশাআল্লাহ।
টিকাঃ
১২২. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৩৬।
১২৩. Boissonade: Life and Work in Med Europe, p. 85.
১২৪. Boase, Kingdoms and Strongholds of the Crusaders, pp. 16-17; Bishop, op. cit., p. 105. Wolff the Awarkening of Europ, p. 202; Coulton, The Medleval Scene, pp. 33-34.