📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 প্রাচ্যভূমি নিয়ে গির্জার প্রচারণা

📄 প্রাচ্যভূমি নিয়ে গির্জার প্রচারণা


অবশ্য এক্ষেত্রে পোপ ও পাদরিরা আরও একটি পদ্ধতিকে পাপমোচনের মাধ্যম হিসেবে প্রচার করত। আমাদের আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে এর যথেষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। আর তা হলো, পাপমোচনের জন্য হজরত ঈসা মাসিহ আ.-এর জন্মভূমি ফিলিস্তিনে তীর্থযাত্রার প্রতি উদ্বুদ্ধকরণ। (১০১) প্রায়শ্চিত্তমূলক এই তীর্থযাত্রায় 'যিশুখ্রিষ্ট'র অনুসারীদের প্রচুর পরিশ্রম ও দীর্ঘ সময় ব্যয় হতো। কখনো কখনো একবারের তীর্থযাত্রায়ই কেটে যেত সাত বছর! পাপমোচনের ক্ষেত্রে গির্জাকে বড় অঙ্কের অর্থপ্রদানের বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে ফিলিস্তিন অভিমুখে তীর্থযাত্রাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। (১০২) এ কারণেই যেসব দরিদ্র খ্রিষ্টান অর্থের বিনিময়ে গির্জার সন্তুষ্টি ক্রয় করতে অক্ষম ছিল, তারা তীর্থযাত্রায় আগ্রহী হতো। এভাবেই খ্রিষ্টানসমাজে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড অভিমুখে তীর্থযাত্রা এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত স্থান ও নিদর্শনসমূহের দর্শন-সৌভাগ্য লাভের এক অনিঃশেষ ধারা শুরু হয়। ক্রমান্বয়ে এই তীর্থযাত্রা খ্রিষ্টসমাজের সাধারণ সংস্কৃতিতে পরিণত হয় এবং ফিলিস্তিনের নাম তাদের মাঝে বহুল প্রচলন লাভ করে। নিঃসন্দেহে এই প্রচারণা পরবর্তী সময়ে সংঘটিত ক্রুসেড যুদ্ধের চিন্তাধারাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে মানসিকভাবে সহায়ক ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। কেননা, ক্রুসেড অভিযান তো এমন অঞ্চলে পরিচালিত হবে, যে অঞ্চল খ্রিষ্টানসমাজে প্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত, যার নাম তারা বহুবার শুনে এসেছে। কেবল শোনাই নয়; তাদেরকে ফিলিস্তিন যেতে উদ্বুদ্ধও করা হয়েছে। বরং পৃথিবীর মহাপ্রলয়ের পূর্বেই যারা নিজেদের পাপ মোচন করতে আগ্রহী, কিন্তু তীর্থযাত্রার উপযুক্ত দৈহিক বা আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই, তাদের কাছে তো ততদিনে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড এক স্বপ্নভূমিতে পরিণত হয়েছে। নিঃসন্দেহে এ সবকিছু পশ্চিমা খ্রিষ্টানদের চোখে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের গুরুত্ব ও আকর্ষণ স্ফীত করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। (১০৩)

ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্র ও দলিল-দস্তাবেজে এ বিষয়ে ইঙ্গিত রয়েছে যে, তৎকালে শাম ও ফিলিস্তিন শাসনকারী মুসলমানগণ তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিনে আগমনকারী খ্রিষ্টানদের অত্যন্ত উদারতা ও উষ্ণতার সঙ্গে স্বাগত জানাত। এক্ষেত্রে তাদেরকে কোনো ধরনের বাধাদান প্রচেষ্টার কথা ঐতিহাসিক কোনো সূত্রেই প্রমাণিত নয়। অথচ তৎকালীন পোপগণ তীর্থযাত্রীদের বাধাগ্রস্ত হওয়ার নানা ধরনের কল্পকাহিনি প্রচার করে ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের তীর্থযাত্রা সহজ ও কণ্টকমুক্ত করার লক্ষ্যে ফিলিস্তিনে হামলার পরিকল্পনাকে বৈধতাদানের চেষ্টা করত। (১০৪) সাধারণ জনগণের মনমস্তিষ্ক ও ধনসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে গির্জাগুলোর অনিঃশেষ লোভ ও চাহিদা, নিজেদের পাপ-আধিক্য ও মহাপ্রলয়ের আসন্নতার কারণে জনগণের ব্যাপক ভীতি, মাসিহের জন্মভূমি ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ এবং সেখানে তীর্থযাত্রার মাধ্যমে সারা জীবনের সকল পাপ মোচনের সুবর্ণ সুযোগ—এই সবকিছু মিলে যে ধর্মীয় আবহ ও পটভূমি তৈরি হয়েছিল, নিঃসন্দেহে তা ক্রুসেড যুদ্ধ ও ফিলিস্তিন আক্রমণ পরিকল্পনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল।

উল্লিখিত বিষয়গুলোর সঙ্গে আরও কিছু পটভূমি যুক্ত করা উচিত, যার দ্বারা বিশেষ করে ফিলিস্তিনের প্রতি এবং সাধারণভাবে ইসলামি প্রাচ্যের প্রতি পশ্চিমাদের গভীর আকর্ষণের প্রেক্ষাপট বুঝতে সুবিধা হবে। আর তা হলো, রোমের কোনো কোনো পোপ রোমান (পশ্চিমা) ক্যাথলিক গির্জা ও ইস্টার্ন (প্রাচ্যের) অর্থোডক্স গির্জা—উভয় গির্জাকে এক ছাদের নিচে সমবেত করার এবং এর মাধ্যমে ইউরোপীয় খ্রিষ্টসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার স্বপ্ন লালন করত। স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রত্যাশা ছিল, এই ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফরমের নেতৃত্ব দেবে ক্যাথলিক ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ। ইতিহাসে প্রথম সক্রিয়ভাবে এই পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেন পোপ ৭ম গ্রেগরি। ক্রুসেড যুদ্ধের সূচনা যার আমলে হয়েছিল, সেই পোপ ২য় আরবান (Pope Urban II)-এর পূর্ববর্তী পোপ হলেন এই গ্রেগরি। পোপ গ্রেগরি এই বিরল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল তৎকালীন বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস (Alexios I Komnenos)-এর সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে সচেষ্ট হওয়া। (১০৫) সম্রাট অ্যালেক্সিয়াসের শাসনামলেই ক্রুসেড যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল।

সুসম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে পোপ গ্রেগরি সম্রাট অ্যালেক্সিয়াসের সঙ্গে পত্রবিনিময় অব্যাহত রেখেছিলেন। এই যোগাযোগের ওপর ভরসা করেই বাইজান্টাইন সম্রাট কিছুদিন পর সেলজুক মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পশ্চিমা ক্যাথলিকদের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। অথচ অর্থোডক্স মতাদর্শের অভিভাবক ও তত্ত্বাবধায়ক সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস ছিলেন পোপ, ইউরোপীয় ক্যাথলিক জনগণ ও শাসকদের প্রতি চরম বিদ্বেষী।

আশা করি, উল্লিখিত প্রেক্ষাপট ও পটভূমিকাসমূহ ক্রুসেড হামলায় অংশগ্রহণের জন্য পশ্চিমাদের চূড়ান্ত পর্যায়ের উন্মাদনার কারণ সুস্পষ্ট করতে পেরেছে। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে যে, এই ধর্মীয় প্রেক্ষাপটই তৎকালীন ইউরোপীয় জনগণের ক্রুসেড অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়ার একমাত্র কার্যকারণ ছিল না। বরং ক্রুসেড যুদ্ধের পেছনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটসহ আরও কিছু কার্যকারণ।

টিকাঃ
১০১. John Wilkinson(ed.), Jerusalem Pilgrims before the Crusades, p. 42.
১০২. কাসিম আবদুহু কাসিম, মাহিয়াতুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৪০।
১০৩. Bradford, The Sword and the Scimitar the Sage of the Crusades, pp. 13-14; Michaud Hist. des Croisades, 1, p. 14; Runciman, “The Pilgrimages to Palestine before 1095” in Setton (ed): A history of the Crusades, vol. pp. 74-75.
১০৪. এ জাতীয় স্বীকৃতি সংক্রান্ত ডায়েরিটি জেরুজালেম-গির্জার স্মারক নামে প্রসিদ্ধ। দেখুন: commeroratorium of the churches of jerusalem, in Palestine Pilgrims, pp. 138-139.
আর খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দী পর্যন্ত তীর্থযাত্রার আন্দোলনের বিস্তারিত ইতিহাস জানতে দেখুন: Runciman, A History of the Cruseds, vol., 1, pp. 39-44.
১০৫. এ বিষয়ে জানতে দেখুন : ইসহাক উবায়দ, রুমা ওয়া বাইজানতা: মিন ক্বাতীআ'তি ফুশিউস হাত্তাল গাযবিল লাতীনী কন্সতানতাইন, ৮৬৯-১২০৪ খ্রি., পৃষ্ঠা: ২৫ : ৩৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00