📄 গির্জার বিচ্যুতি
তৎকালীন ইউরোপে গির্জাগুলো চাইলেই শাসক ও রাজন্যবর্গ হতে আস্থা প্রত্যাহার করে নিতে পারত। গির্জা কোনো শাসক বা প্রশাসকের ওপর থেকে আস্থা প্রত্যাহার করে নিলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যেত এবং দল-মত নির্বিশেষে সকলে উক্ত শাসককে প্রত্যাখ্যান করত। এ কারণেই সকলে গির্জার মতামতের প্রতি অত্যন্ত ভীতি ও আতঙ্ক এবং মর্যাদা ও সমীহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। তৎকালীন পোপদের প্রভাব-প্রতিপত্তির পরিধি ও পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পেতে নিম্নোক্ত ঘটনাটি সহায়ক হতে পারে।
জার্মান সম্রাট ৪র্থ হেনরি ছিলেন সমকালীন ইউরোপের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সম্রাট। একবার কোনো এক কারণে তৎকালীন পোপ ৭ম গ্রেগরি (Gregory VII) তার প্রতি বিরাগভাজন হলেন। সম্রাট প্রথমে পোপের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে অস্বীকৃতি জানালেন। তখন পোপ ৭ম গ্রেগরি সম্রাটের প্রতি তার আস্থা প্রত্যাহার করলেন, সম্রাটকে গির্জার সন্তুষ্টি হতে বঞ্চিত ঘোষণা করলেন এবং এর অনিবার্য পরিণাম হিসেবে তার মতবিশ্বাস অনুযায়ী হেনরিকে স্বর্গ হতেও বঞ্চিত ঘোষণা করলেন! ফলে জনগণ তার প্রতি আনুগত্য প্রত্যাহার করতে লাগল। পরিস্থিতি এ পর্যায়ে পৌঁছল যে, তার রাজক্ষমতা নিয়েই টানাটানি! তখন সম্রাটের শুভানুধ্যায়ী ও ঘনিষ্টজনেরা তাকে পোপের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করার পরামর্শ দিল। বিশাল ক্ষমতাধর জার্মান সম্রাট তখন কী করলেন?! তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তার প্রতি পোপের অসন্তুষ্টিতে তিনি যে অত্যন্ত অনুতপ্ত ও লজ্জিত, তা প্রকাশ করতে তিনি জার্মানি থেকে রোম পর্যন্ত নগ্নপদে হেঁটে যাবেন!
সম্রাট রোমে পৌঁছার পর পোপ পূর্ণ তিন দিন পর্যন্ত তার সঙ্গে সাক্ষাতে অস্বীকৃতি জানালেন। এই তিন দিন সম্রাট হেনরি পোপের সাক্ষাৎলাভের অনুমতির অপেক্ষায় বৃষ্টি ও প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে গির্জার বাইরেই দাঁড়িয়ে রইলেন। অবশেষে সাক্ষাতের অনুমতি পেয়ে সম্রাট ক্ষমালাভের উদ্দেশ্যে পোপের সামনে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং পোপের পদযুগল চুম্বন করতে লাগলেন!! (৮৯)
আপন রাজত্ব রক্ষায় মহান সম্রাটের সামনে এটাই ছিল একমাত্র সমাধান! রোমের গির্জা ছিল সকল গির্জার মূলকেন্দ্র বা সদর দফতর। রোমে অবস্থিত ক্যাথলিক রোমান গির্জার প্রধান কর্তা পোপ ইউরোপের সকল ক্যাথলিক গির্জা নিয়ন্ত্রণ করতেন। এর মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন রাষ্ট্রের ঘটনাপ্রবাহের ওপরও কর্তৃত্ব খাটাতে পারতেন। গির্জা তখন কেবল উপাসনার স্থান বা ধর্মীয় বিষয়াদির শিক্ষাদান-কেন্দ্রই ছিল না; গির্জা ছিল এমন এক বিশাল প্রতিষ্ঠান, যেখানে বার্ষিক বিরাট অঙ্কের সম্পদ জমা হতো। এ কারণেই গির্জাগুলো ইউরোপে বিশাল জায়গিরের মালিক ছিল। বরং এসব জায়গিরের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন সামরিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণও গির্জার হাতেই থাকত। এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রয়োজনে গির্জার অধিপতিগণ অন্যান্য সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মৈত্রীচুক্তিও করত। আর তাই পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ দেশের মাঝে দৃশ্যমান ও বোধগম্য অর্থে কোনো ঐক্যবন্ধন না থাকা সত্ত্বেও রোমের গির্জা এসব রাষ্ট্রের ওপর প্রকৃত শাসকের ন্যায় ক্ষমতা ও অধিকার ফলাতে পারত।
যদিও সে কালের ইউরোপীয় খ্রিষ্টসমাজে গির্জা এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের অধিকারী ছিল; কিন্তু গির্জার পাদরি ও যাজকগণ মূর্খতা-ভ্রষ্টতা, বিপথগামিতা ও ভারসাম্যহীনতার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত ছিল। সাধারণত তাদের মাঝে মোটেও ধর্মীয় কুশলতা, প্রশাসনিক যোগ্যতা বা নেতৃত্বসুলভ দক্ষতা থাকত না। (৯০) কেবল এতটুকুই নয়; বরং খ্রিষ্টীয় নবম ও দশম শতকে দায়িত্ব পালনকারী অধিকাংশ পোপ ছিল আর্থিক বা নারীঘটিত বিষয়ে চরম নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার এবং বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। (৯১) নিজেদেরকে তারা সন্ন্যাসী ও দুনিয়াবিরাগী দাবি করলেও তাদের অনেকেই বিভিন্ন অনৈতিক ঘটনায় জড়িয়ে নিহত হয়েছিল। (৯২) তারা ঘোষণা করত যে, আমরা পার্থিব ভোগ-বিলাসমুক্ত, জগৎ ও দাম্পত্য সম্পর্ক-বিমুখ। এরপর তারাই চুরি, অর্থ-আত্মসাৎ ও ব্যভিচারের ন্যায় চরম গর্হিত ও বিকৃত রুচির পরিচায়ক নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ত।
নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ তাআলা সত্য বলেছেন! এসব পাদরি ও ধর্মযাজকেরা খ্রিষ্টধর্মে যেসব বিকৃতি সাধন করেছে, সংযোজন ও পরিবর্তন করেছে, পরে তা পালন করা তাদের জন্যই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তারা নিজেদের ওপর আরোপিত এসব স্বরচিত বিধিবিধান পালনে অক্ষম হয়েছে। তাদের এই অনাচার সম্পর্কে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
﴿وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَهَا عَلَيْهِمْ إِلَّا ابْتِغَاءَ رِضْوَانِ اللَّهِ فَمَا رَعَوْهَا حَقَّ رِعَايَتِهَا
আর সন্ন্যাসবাদের বিষয়টা তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছিল। আমি তাদের ওপর তা বাধ্যতামূলক করিনি। বস্তুত তারা (এর মাধ্যমে) আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধান করতে চেয়েছিল; কিন্তু তারা তা যথাযথভাবে পালন করেনি। [সুরা হাদীদ: ২৭]
গত শতাব্দীর শেষ দিকের একটি ঘটনা সম্ভবত প্রিয় পাঠকসমাজের অজানা নয়। বিখ্যাত আমেরিকান ধর্মযাজক জিমি সোয়াগার্টকে (৯৩) আমেরিকান জনসাধারণ আমেরিকার নিউ অরলিন্সের একটি হোটেলে জনৈকা পতিতার সঙ্গে হাতেনাতে পাকড়াও করেছিল। এই জিমি সোয়াগার্ট সেসব পাদরিদের একজন, যারা মহান ইসলামি দাঈ আহমাদ দিদাত রহ.(৯৪)-এর বিরুদ্ধে ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছিল। এরপর মহান আল্লাহ তাআলা সকলের সামনে তার আসল রূপ উন্মোচন করে দিয়েছেন। আজ যে ব্যক্তিই নিউ অরলিন্সের সেই হোটেলটির পাশ দিয়ে যায়, সে-ই ঘৃণাভরে খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক জিমি সোয়াগার্টের কেলেঙ্কারির ঘটনা স্মরণ করে।
এই চরম নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক অধঃপতন সত্ত্বেও তৎকালীন পোপ ও পাদরিদের ইউরোপের যাবতীয় পরিস্থিতির ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব ছিল। এক্ষেত্রে তাদেরকে সহায়তা করত তৎকালীন অধিকাংশ ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর মূর্খতা, শিক্ষাহীনতা, বোধ ও উপলব্ধির অগভীরতা ও পশ্চাৎপদ চিন্তাধারা। ধর্মীয় বিষয়েও মূর্খ ইউরোপীয় সমাজে চরম নিম্নগামী মানসিকতা বিরাজমান ছিল। তাদের ধর্ম ছিল রূপকথা, কল্পকথা, কুসংস্কার ও মিথ্যা ধ্যান-ধারণানির্ভর। ভূত-প্রেত, অশরীরী আত্মা, অলৌকিক ও অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা ইত্যাদির চিন্তা তাদেরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, যেমনটি সাধারণত হয়ে থাকে কোনো সরল গ্রামীণ সমাজে। এই নিম্নগামী পরিস্থিতি পোপ ও পাদরিদেরকে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচারের মাধ্যমে মানুষের মনমস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ করার এবং মগজ ধোলাই করে জনগণের চিন্তাশক্তিকে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। (৯৫)
ক্রুসেড যুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে খ্রিষ্টীয় একাদশ শতকে পোপ ও পাদরিরা যেসব চিন্তাধারা ব্যাপকভাবে প্রচার করেছিল, তা হলো— পৃথিবীর ধ্বংস ও সমাপ্তি অত্যাসন্ন, কিয়ামত দিবস অতি সন্নিকটে, ঈসা মাসিহের অন্তর্ধানের এক হাজার বছর পরই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এই প্রচারণার সূচনা হয়েছিল ৪২৪ হিজরি সনে (১o৩৩ খ্রিষ্টাব্দে)। সেকালে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হলেই খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা তাকে নিজেদের এই প্রচারণার সত্যতার প্রমাণ হিসেবে দাবি করত। যেমন ইতালিতে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, বিভিন্ন বজ্রপাত ও ভূমিকম্পের ঘটনা। (৯৬)
এ ধরনের প্রচারণার ফলে একদিকে জনমনে ভয়-ভীতি, শঙ্কা- আতঙ্ক, উদ্বেগ ও অস্থিরতা সৃষ্টি হতো এবং জনগণ নিজেদের পাপ ও অন্যায় নিয়ে চরম আশঙ্কায় দিনাতিপাত করত, অপরদিকে এই মানসিক চাপ হতে জনগণকে উদ্ধার এবং জনগণের পাপমোচনে সহায়তা করতে পোপ, পাদরি ও গির্জার ভূমিকা অধিক গুরুত্ববহ হয়ে দাঁড়াত। ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গ এ নীতিতে কঠোরভাবে অটল ছিল এবং নিজেদের কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে জনগণের দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে একে ব্যবহার করছিল। পাপমোচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি ছিল গির্জাকে অর্থ প্রদান। এ বিষয়টিই পরবর্তীকালে বিবর্তিত হয়ে 'ক্ষমা- চেক' (৯৭)-এর রূপ ধারণ করে। কয়েক শতাব্দী পর খ্রিষ্টীয় প্রোটেস্ট্যান্ট (৯৮) মতবাদের জনক (৯৯) মার্টিন লুথার (১০০) অর্থের বিনিময়ে পাপমুক্তির এই প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও আন্দোলন করেন।
টিকাঃ
*. Cambridge Medievel History, Vol. 5. P. 273.
*. Ephraim Emerton, The correspondence of pope Gregory VII. Selected letters from the Registum pp. 111-112.
৯০. নরম্যান ফ্র্যাঙ্ক ক্যান্টোর, আত-তারীখুল ওয়াসিত, ১/৩০৩।
৯১. Barraclough, The med. Papacy, p. 63.
৯২. দেখুন: কাসিম আবদুহু কাসিম, মাহিয়াতুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৭৯।
১০. জিমি সোয়াগার্ট (Jimmy Lee Swaggart) একজন আমেরিকান ধর্মযাজক। নিজের ব্যক্তিমালিকানাধীন টেলিভিশন স্টেশনের মাধ্যমে তিনি আপন মতাদর্শ অনুযায়ী খ্রিষ্টধর্ম প্রচার ও অন্যান্য কাজ করতেন। তাকে গ্রেফতার করার সময় পাবলিক প্রসিকিউশন তার বিরুদ্ধে চারিত্রিক স্খলনের অভিযোগ দায়ের করে। পরে তিনি আন্তর্জাতিক বড় বড় বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমের সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার করেন এবং জনৈকা দুশ্চরিত্রা পতিতা নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের কথা প্রকাশ করেন। সোয়াগার্ট The Evangelist ম্যাগাজিনেরও মালিক ছিলেন। বিশিষ্ট ইসলামি দাঈ শায়খ আহমাদ দিদাতের সঙ্গে তার বিতর্কের ঘটনা বেশ প্রসিদ্ধ। দেখুন: https://bit.ly/2rUUaIc ও https://bit.ly/2MYntko
১৪. শায়খ আহমাদ দিদাতের জন্ম ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে। নয় বছর বয়সে তিনি হিজরত করে দক্ষিণ আফ্রিকায় চলে যান। শিক্ষাজীবন শুরু করার পর তিনি অল্প সময়ে যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন এবং সমসাময়িকদের ছাড়িয়ে যান। তবে আর্থিক দীনতার কারণে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা সমাপ্ত না করেই কাজে লেগে যেতে বাধ্য হন। জ্ঞানপিপাসু আহমাদ দিদাত কাজের ফাঁকে ফাঁকেই অধ্যয়নের মাধ্যমে নিজের জ্ঞানভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতে থাকেন। খ্রিষ্টান মিশনারিদের দ্বারা প্রভাবিত কিছু সহকর্মী তার সামনে ইসলাম ও ইসলামের নবীকে নিয়ে কটূক্তি করলে তিনি তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি এ বিষয়ের একজন বিখ্যাত বিতার্কিকে পরিণত হন। তিনি বিভিন্ন খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের সঙ্গে বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছেন। তন্মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত বিতর্কটি ছিল খ্রিষ্টান যাজক জিমি সোয়াগার্টের সঙ্গে। তার রচিত বিখ্যাত কয়েকটি গ্রন্থ হলো Al=Quran the Ultimate Miracle (আল-কুরআন চূড়ান্ত মুজিযা), What the Bible Says about Muhammed (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বাইবেল কী বলে?), Is the Bible God's Word (বাইবেল কি আল্লাহর বাণী?) ইত্যাদি। শায়খ আহমাদ দিদাত ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দের ৮ আগস্ট দক্ষিণ আফ্রিকাতেই ইন্তেকাল করেন।
**. Boase, Kingodoms and Strongholds of the Crusaders, pp. 16-17; Bishop, op cit., p. 105; Wolff the Awarkening of Europ, p. 202; Coulton, The Medieval Scene, pp. 33-34.
৯৬. কাসিম আবদুহু কাসিম, মাহিয়াতুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ১৯।
৯৭. ক্ষমা-চেক (ইংরেজিতে indulgence, ল্যাটিন ভাষায় Indulgentia) হলো মধ্যযুগে ইউরোপে প্রচলিত একধরনের চুক্তিপত্র। নির্ধারিত অর্থ প্রদানের বিনিময়ে খ্রিষ্টান জনগণ রোমান গির্জার কাছ থেকে এই পত্র ক্রয় করতে পারত এবং এর মাধ্যমে নিজেদের পাপমোচনের নিশ্চয়তা লাভ করত। [অনুবাদক]
৯৮. খ্রিষ্টানসমাজে বিভিন্ন দল-উপদলের অস্তিত্ব থাকলেও বৃহৎ ও প্রসিদ্ধ দল তিনটি : ক্যাথলিক, অর্থোডক্স ও প্রোটেস্ট্যান্ট। ৪৫০-৫১ খ্রিষ্টাব্দে ক্যালসিডনে অনুষ্ঠিত খ্রিষ্টানদের ৪র্থ সর্বজনীন মহাসভায় (The Council of Chalcedon) গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে খ্রিষ্টধর্মে ওরিয়েন্টাল অর্থোডক্স ও ক্যালসিডনীয় খ্রিষ্টধর্ম নামে বিভক্তির সূত্রপাত ঘটে। পরবর্তী সময়ে ১০৫৪ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টধর্মের মহাবিভাজনের সময় ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স চার্চের চূড়ান্ত বিভক্তি ঘটে। ষোড়শ শতাব্দীতে পোপ ও চার্চের বিরুদ্ধে ব্যাপক সংস্কার আন্দোলন শুরু হলে একে কেন্দ্র করে ক্যাথলিক চার্চ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রোটেস্ট্যান্ট নামে তৃতীয় আরেকটি বৃহৎ খ্রিষ্টান সম্প্রদায় অস্তিত্ব লাভ করে। ব্যাপকার্থে ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স ব্যতীত অন্যান্য সকল খ্রিষ্টানকেও প্রোটেস্ট্যান্ট বলা হয়। এই বিবেচনায় প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীর সম্মিলিত নাম। [অনুবাদক]
৯৯. কাসিম আবদুহু কাসিম, মাহিয়াতুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ২৩,৩৮।
১০০. মার্টিন লুথার। তিনি রোমান ক্যাথলিক গির্জার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছিলেন এবং এর মাধ্যমে গির্জার বিরুদ্ধে প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মবিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। এ কারণেই তাকে খ্রিষ্টানদের প্রোটেস্ট্যান্ট গোষ্ঠীর জনক বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন কারণে তিনি ক্যাথলিক গির্জার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-ক্যাথলিক গির্জার ক্ষমা-চেক বাণিজ্য, সন্ন্যাসীদের আজীবন কুমারব্রত পালন ইত্যাদি। মার্টিন লুথার= নিজে জনৈকা সন্ন্যাসিনীকে বিয়ে করেন এবং তাদের ছয়জন সন্তান হয়। ক্যাথলিক গির্জা এই বিদ্রোহের কারণে মার্টিন লুথারের নিন্দা করে এবং তার প্রতি নাস্তিকতার অপবাদ আরোপ করে।
📄 প্রাচ্যভূমি নিয়ে গির্জার প্রচারণা
অবশ্য এক্ষেত্রে পোপ ও পাদরিরা আরও একটি পদ্ধতিকে পাপমোচনের মাধ্যম হিসেবে প্রচার করত। আমাদের আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে এর যথেষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। আর তা হলো, পাপমোচনের জন্য হজরত ঈসা মাসিহ আ.-এর জন্মভূমি ফিলিস্তিনে তীর্থযাত্রার প্রতি উদ্বুদ্ধকরণ। (১০১) প্রায়শ্চিত্তমূলক এই তীর্থযাত্রায় 'যিশুখ্রিষ্ট'র অনুসারীদের প্রচুর পরিশ্রম ও দীর্ঘ সময় ব্যয় হতো। কখনো কখনো একবারের তীর্থযাত্রায়ই কেটে যেত সাত বছর! পাপমোচনের ক্ষেত্রে গির্জাকে বড় অঙ্কের অর্থপ্রদানের বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে ফিলিস্তিন অভিমুখে তীর্থযাত্রাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। (১০২) এ কারণেই যেসব দরিদ্র খ্রিষ্টান অর্থের বিনিময়ে গির্জার সন্তুষ্টি ক্রয় করতে অক্ষম ছিল, তারা তীর্থযাত্রায় আগ্রহী হতো। এভাবেই খ্রিষ্টানসমাজে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড অভিমুখে তীর্থযাত্রা এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত স্থান ও নিদর্শনসমূহের দর্শন-সৌভাগ্য লাভের এক অনিঃশেষ ধারা শুরু হয়। ক্রমান্বয়ে এই তীর্থযাত্রা খ্রিষ্টসমাজের সাধারণ সংস্কৃতিতে পরিণত হয় এবং ফিলিস্তিনের নাম তাদের মাঝে বহুল প্রচলন লাভ করে। নিঃসন্দেহে এই প্রচারণা পরবর্তী সময়ে সংঘটিত ক্রুসেড যুদ্ধের চিন্তাধারাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে মানসিকভাবে সহায়ক ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। কেননা, ক্রুসেড অভিযান তো এমন অঞ্চলে পরিচালিত হবে, যে অঞ্চল খ্রিষ্টানসমাজে প্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত, যার নাম তারা বহুবার শুনে এসেছে। কেবল শোনাই নয়; তাদেরকে ফিলিস্তিন যেতে উদ্বুদ্ধও করা হয়েছে। বরং পৃথিবীর মহাপ্রলয়ের পূর্বেই যারা নিজেদের পাপ মোচন করতে আগ্রহী, কিন্তু তীর্থযাত্রার উপযুক্ত দৈহিক বা আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই, তাদের কাছে তো ততদিনে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড এক স্বপ্নভূমিতে পরিণত হয়েছে। নিঃসন্দেহে এ সবকিছু পশ্চিমা খ্রিষ্টানদের চোখে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের গুরুত্ব ও আকর্ষণ স্ফীত করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। (১০৩)
ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্র ও দলিল-দস্তাবেজে এ বিষয়ে ইঙ্গিত রয়েছে যে, তৎকালে শাম ও ফিলিস্তিন শাসনকারী মুসলমানগণ তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিনে আগমনকারী খ্রিষ্টানদের অত্যন্ত উদারতা ও উষ্ণতার সঙ্গে স্বাগত জানাত। এক্ষেত্রে তাদেরকে কোনো ধরনের বাধাদান প্রচেষ্টার কথা ঐতিহাসিক কোনো সূত্রেই প্রমাণিত নয়। অথচ তৎকালীন পোপগণ তীর্থযাত্রীদের বাধাগ্রস্ত হওয়ার নানা ধরনের কল্পকাহিনি প্রচার করে ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের তীর্থযাত্রা সহজ ও কণ্টকমুক্ত করার লক্ষ্যে ফিলিস্তিনে হামলার পরিকল্পনাকে বৈধতাদানের চেষ্টা করত। (১০৪) সাধারণ জনগণের মনমস্তিষ্ক ও ধনসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে গির্জাগুলোর অনিঃশেষ লোভ ও চাহিদা, নিজেদের পাপ-আধিক্য ও মহাপ্রলয়ের আসন্নতার কারণে জনগণের ব্যাপক ভীতি, মাসিহের জন্মভূমি ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ এবং সেখানে তীর্থযাত্রার মাধ্যমে সারা জীবনের সকল পাপ মোচনের সুবর্ণ সুযোগ—এই সবকিছু মিলে যে ধর্মীয় আবহ ও পটভূমি তৈরি হয়েছিল, নিঃসন্দেহে তা ক্রুসেড যুদ্ধ ও ফিলিস্তিন আক্রমণ পরিকল্পনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল।
উল্লিখিত বিষয়গুলোর সঙ্গে আরও কিছু পটভূমি যুক্ত করা উচিত, যার দ্বারা বিশেষ করে ফিলিস্তিনের প্রতি এবং সাধারণভাবে ইসলামি প্রাচ্যের প্রতি পশ্চিমাদের গভীর আকর্ষণের প্রেক্ষাপট বুঝতে সুবিধা হবে। আর তা হলো, রোমের কোনো কোনো পোপ রোমান (পশ্চিমা) ক্যাথলিক গির্জা ও ইস্টার্ন (প্রাচ্যের) অর্থোডক্স গির্জা—উভয় গির্জাকে এক ছাদের নিচে সমবেত করার এবং এর মাধ্যমে ইউরোপীয় খ্রিষ্টসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার স্বপ্ন লালন করত। স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রত্যাশা ছিল, এই ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফরমের নেতৃত্ব দেবে ক্যাথলিক ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ। ইতিহাসে প্রথম সক্রিয়ভাবে এই পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেন পোপ ৭ম গ্রেগরি। ক্রুসেড যুদ্ধের সূচনা যার আমলে হয়েছিল, সেই পোপ ২য় আরবান (Pope Urban II)-এর পূর্ববর্তী পোপ হলেন এই গ্রেগরি। পোপ গ্রেগরি এই বিরল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল তৎকালীন বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস (Alexios I Komnenos)-এর সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে সচেষ্ট হওয়া। (১০৫) সম্রাট অ্যালেক্সিয়াসের শাসনামলেই ক্রুসেড যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল।
সুসম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে পোপ গ্রেগরি সম্রাট অ্যালেক্সিয়াসের সঙ্গে পত্রবিনিময় অব্যাহত রেখেছিলেন। এই যোগাযোগের ওপর ভরসা করেই বাইজান্টাইন সম্রাট কিছুদিন পর সেলজুক মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পশ্চিমা ক্যাথলিকদের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। অথচ অর্থোডক্স মতাদর্শের অভিভাবক ও তত্ত্বাবধায়ক সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস ছিলেন পোপ, ইউরোপীয় ক্যাথলিক জনগণ ও শাসকদের প্রতি চরম বিদ্বেষী।
আশা করি, উল্লিখিত প্রেক্ষাপট ও পটভূমিকাসমূহ ক্রুসেড হামলায় অংশগ্রহণের জন্য পশ্চিমাদের চূড়ান্ত পর্যায়ের উন্মাদনার কারণ সুস্পষ্ট করতে পেরেছে। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে যে, এই ধর্মীয় প্রেক্ষাপটই তৎকালীন ইউরোপীয় জনগণের ক্রুসেড অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়ার একমাত্র কার্যকারণ ছিল না। বরং ক্রুসেড যুদ্ধের পেছনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটসহ আরও কিছু কার্যকারণ।
টিকাঃ
১০১. John Wilkinson(ed.), Jerusalem Pilgrims before the Crusades, p. 42.
১০২. কাসিম আবদুহু কাসিম, মাহিয়াতুল হুরূবিস সালীবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৪০।
১০৩. Bradford, The Sword and the Scimitar the Sage of the Crusades, pp. 13-14; Michaud Hist. des Croisades, 1, p. 14; Runciman, “The Pilgrimages to Palestine before 1095” in Setton (ed): A history of the Crusades, vol. pp. 74-75.
১০৪. এ জাতীয় স্বীকৃতি সংক্রান্ত ডায়েরিটি জেরুজালেম-গির্জার স্মারক নামে প্রসিদ্ধ। দেখুন: commeroratorium of the churches of jerusalem, in Palestine Pilgrims, pp. 138-139.
আর খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দী পর্যন্ত তীর্থযাত্রার আন্দোলনের বিস্তারিত ইতিহাস জানতে দেখুন: Runciman, A History of the Cruseds, vol., 1, pp. 39-44.
১০৫. এ বিষয়ে জানতে দেখুন : ইসহাক উবায়দ, রুমা ওয়া বাইজানতা: মিন ক্বাতীআ'তি ফুশিউস হাত্তাল গাযবিল লাতীনী কন্সতানতাইন, ৮৬৯-১২০৪ খ্রি., পৃষ্ঠা: ২৫ : ৩৯।