📄 মাগরিব অঞ্চল ও আন্দালুসের পরিস্থিতি
আফগানিস্তান ও ভারতবর্ষে তখন চলছিল গজনবি পরিবারের শাসন। পরিতাপের বিষয় হলো, গজনবি রাজপরিবার তখন নিজেদের অস্তগামী সময়ে উপনীত হয়েছিল। ফলে ক্রুসেড আগ্রাসনের কেন্দ্রবিন্দু শাম অঞ্চলকে সহায়তা করার মতো শক্তি তাদের ছিল না। অধিকন্তু গজনবি রাষ্ট্রের অবস্থান ছিল শাম অঞ্চল থেকে বেশ দূরে।
ইয়ামেন ভূখণ্ডের শাসনক্ষমতা তিনটি গোত্রের মাঝে বিভক্ত ছিল—বনু নাজাহ, বনু ছুলায়হি ও বনু যুরাই। ক্ষমতা ও ভূখণ্ড দখল নিয়ে তাদের মধ্যে হানাহানি-সংঘাত লেগেই থাকত। অধিকন্তু তাদের অধিকাংশ ছিল শিয়া মতাবলম্বী। গোত্র-তিনটি মিশরের শিয়া উবায়দি সরকারের বশ্যতা স্বীকার করে চলত।
মাগরিব অঞ্চল ও আন্দালুসের পরিস্থিতি
তিউনিসিয়ায় তখন ছিল বনু যিরির শাসন। যিরি রাজপরিবারও ততদিনে ক্ষয়িষ্ণুপ্রায় শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। ফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক নগরী সিসিলি দ্বীপ মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। ইতালির নরম্যান গোষ্ঠী ৪৮৪ হিজরি সনে (১০৯১ খ্রিষ্টাব্দে) সিসিলিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং সেখানে যিরি রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের অবসান ঘটায়। এর ফলে একটানা দুইশ সত্তর বছরের ইসলামি শাসনের পর সিসিলি দ্বীপে মুসলিম-অস্তিত্বের বিলোপ ঘটে। (৮৭)
সমকালীন ইসলামি বিশ্বের একটিমাত্র অঞ্চলে তখন ইসলামি কর্তৃত্ব ও প্রভাব-প্রতিপত্তি বিদ্যমান ছিল; আর সেটি হলো মরক্কো, পশ্চিম আফ্রিকা ও আন্দালুস অঞ্চল। এই পুরো অঞ্চল তখন সুবিশাল মুরাবিতি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সময় মুরাবিতি সাম্রাজ্যের কান্ডারি ছিলেন ইসলামি ইতিহাসের অনন্যসাধারণ মহান সেনাপতি ও কালজয়ী মুরাবিতি শাসক ইউসুফ বিন তাশফিন রহ.। তিনিই ৪৭৯ হিজরি সনে (১০৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) আন্দালুসের মধ্যভাগে অবস্থিত যাল্লাকা প্রান্তরে সংঘটিত অবিস্মরণীয় এক যুদ্ধে স্পেন ও ফ্রান্স থেকে আগত ক্রুসেডার বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিলেন।
কিন্তু এই সুবিশাল ও শক্তিশালী মুরাবিতি সাম্রাজ্যও ক্রুসেড আগ্রাসনের মোকাবিলার ইসলামি প্রাচ্যকে সহায়তা করতে সক্ষম ছিল না। এর কারণ কেবল ভৌগোলিক দূরত্বই নয়; বরং মুরাবিতি সাম্রাজ্যের শতভাগ সামরিক শক্তি তখন সার্বক্ষণিকভাবে ব্যস্ত ছিল একদিকে উত্তর আন্দালুসের ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে, আরেকদিকে পশ্চিম আফ্রিকা ও মধ্য আফ্রিকার বিভিন্ন পৌত্তলিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে।
মোটামুটি এই হলো হিজরি পঞ্চম শতকের শেষভাগে (খ্রিষ্টীয় একাদশ শতকের শেষভাগে) ইসলামি বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর সাধারণ পর্যালোচনা। এই অধঃপতিত পরিস্থিতিই মূলত ক্রুসেডারদের সামনে আমাদের দুর্গসমূহে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত করেছিল। সামনের আলোচনায়ও এ বিষয়টি সুস্পষ্ট প্রতিভাত হবে যে, ক্রুসেডারদের আগ্রাসন তাদের সামরিক শক্তিবৃদ্ধির কারণে ছিল না; প্রকৃতপক্ষে আমাদের দুর্বলতা, বিভেদ-অনৈক্য, আমাদের শক্তির বিভক্তি এবং আমাদের দ্বীনবিমুখতাই ছিল এর কারণ। নিঃসন্দেহে এগুলো এমন কার্যকারণ, যার ধ্বংসাত্মক প্রভাবের বিষয়টি কোনো জ্ঞানী ও বোধসম্পন্ন ব্যক্তির কাছেই অস্পষ্ট নয়।
ক্রুসেড যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে এই ছিল মুসলিম বিশ্বের পরিস্থিতি। জানার বিষয় হলো, সেই যুগসন্ধিক্ষণে খ্রিষ্টান ইউরোপের পরিস্থিতি কেমন ছিল? সামনের পরিচ্ছেদে আমরা সে বিষয়টিই জানার চেষ্টা করব।
টিকাঃ
৮৭. দেখুন: ইবনে খালদুন, তারীখু ইবনি খালদুন, ৬/১৫৫।