📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 মিশর আরেক মৃত্যু গহ্বরে!

📄 মিশর আরেক মৃত্যু গহ্বরে!


মিশরে তখন ফাতিমি নামধারী উবায়দিদের শাসন চলছিল। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময়ের অব্যাহত প্রচেষ্টার পর ৩৫৮ হিজরি সনে (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) উবায়দি রাজপরিবার মিশরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এর ফলে উত্তর আফ্রিকার পর মিশরেও উবায়দি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে শাম ও হিজায অঞ্চলেও উবায়দিদের শাসনক্ষমতা বিস্তৃত হয়।

উবায়দিরা ছিল শিয়াদের একটি চরমপন্থী ও উগ্রবাদী দল। শিয়াদের যাবতীয় ভ্রান্ত আকিদা তো তারা লালন করতই; সঙ্গে অতিরিক্ত বিভিন্ন মনগড়া আকিদাও তারা যুক্ত করে নিয়েছিল। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসসমূহে তাদের বিকৃতি ও বিভ্রান্তি মূলধারার শিয়াদের চেয়েও অনেক বেশি ও ভয়াবহ। নিজেদেরকে তারা নবী-তনয়া হজরত ফাতিমা রাযি.-এর বংশধর দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে তারা মাগরিব অঞ্চলের জনৈক ইহুদির বংশধর। ২৯৬ হিজরি সনে (৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে) উবায়দিরা প্রথম মাগরিবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এরপর তারা ধীরে ধীরে উত্তর আফ্রিকায় কর্তৃত্ব বিস্তার করে এবং ফাতিমি খিলাফত নামে স্বতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। অথচ প্রকৃত বিচারে তাদের এই রাষ্ট্রব্যবস্থা না খিলাফত নামের উপযুক্ত, না ফাতিমি উপাধির। দুষ্ট উবায়দি রাষ্ট্র মূলত গড়ে উঠেছিল আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর আলিমসমাজকে হত্যা ও নির্যাতন-নিপীড়নের ওপর ভিত্তি করে। একদিকে তারা সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়েছে, অন্যদিকে অন্যায়-অনাচার, পাপ-পঙ্কিলতা ইত্যাদির বিস্তার ঘটিয়েছে। সঠিক আকিদা ও ধর্মবিশ্বাস এবং নীতি ও নৈতিকতায় বিকৃতি সাধনের ক্ষেত্রে তাদের কর্মধারা ছিল কল্পনাতীত ভয়ংকর। উবায়দিরা ছিল শিয়া ইসমাইলি সম্প্রদায়ভুক্ত। (৮৪) ইসমাইলি সম্প্রদায় মূল শিয়া গোষ্ঠী হতে বিচ্ছিন্ন একটি দল, যারা নিজেদেরকে ইসমাইল বিন জাফর সাদিক-এর প্রতি সম্বন্ধ করে থাকে। (৮৫) ইসমাইলিদের দাবি মতে শিয়াদের সপ্তম ইমাম হলেন জাফর সাদিক-পুত্র ইসমাইল। অপরদিকে শিয়াদের আরেক শাখা ভ্রান্ত ইছনা আশারিয়া বা দ্বাদশ ইমামবাদী সম্প্রদায়ের দাবি মতে সপ্তম ইমাম হলেন জাফর সাদিকের অপর পুত্র মুসা কাজিম। ইসমাইলিরা আরও দাবি করে যে, ইমাম ইসমাইল-পরবর্তী তিন ইমাম লুক্কায়িত ছিলেন; এরপর একাদশ ইমাম হলেন উবায়দি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা আল-মাহদি। ইসমাইলি সম্প্রদায় নিজেদের ইমামদের সম্পর্কে বিভিন্ন অবাস্তব ও গর্হিত আকিদা পোষণ করে এবং তাদের সম্পর্কে ভ্রান্ত ও অমূলক বিভিন্ন কারামতের দাবি করে। তারা এ দাবিও করে যে, আল্লাহ তাদের ইমামদের মাঝে দেহগ্রহণ করেন। প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ তাআলা এসব ভ্রান্ত বিশ্বাস হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। এই ভ্রান্ত আকিদাকে পুঁজি করেই ইসমাইলি শাসকদের কেউ কেউ নিজেকে নবী বাদ দিয়ে স্বয়ং স্রষ্টা ও ইলাহ পর্যন্ত দাবি করেছে। তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধতম হলো ষষ্ঠ উবায়দি খলিফা হাকিম বি-আমরিল্লাহ। তাকে সম্বোধন করেই জনৈক শিয়া কবি নিম্নোক্ত পঙ্ক্তি রচনা করেছিল-
مَا شِئْتَ لَا مَا شَاءَتِ الْأَقْدَارُ فَاحْكُمْ فَأَنْتَ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ
তাকদির কিছুই নয়; তা-ই হয় যা আপনি চান। তাই শাসন করুন ইচ্ছেমতো, আপনিই তো একক ও মহাশক্তিমান!
এসব ভ্রান্ত আকিদা পোষণকারী ও গর্হিত অন্যায়-অনাচার বিস্তারকারী ফাসিক ইসমাইলি শাসকগণই নিজেদের বিষাক্ত মতাদর্শ ও উগ্রবাদী চিন্তাধারা বিস্তারের লক্ষ্যে মিশরে জামে আযহার প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলা তাদের কূট-কৌশল তাদের বক্ষমূলেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। কয়েক শতকের পরিক্রমায় জামে আযহার পরিণত হয়েছে ইসলামি বিশ্বে বিশুদ্ধ সুন্নাহর বিকিরণ ও বিচ্ছুরণের অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে।

ইসমাইলি সম্প্রদায় সাহাবায়ে কেরাম এমনকি খোদ নবীদেরকেও গালমন্দ ও সমালোচনা করে। এমনকি তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানেও বিভিন্ন কটুবাক্য উচ্চারণ করে থাকে। দ্বিতীয় উবায়দি শাসক আল-কায়িম মুহাম্মাদ আবুল কাসিমের নির্দেশে তার অনুচরেরা হাটে-বাজারে ঘুরে ঘুরে ঘোষণা করত- 'আয়েশা ও তার স্বামীকে অভিসম্পাত করো, গুহা ও গুহায় আশ্রয়গ্রহণকারীদের অভিসম্পাত করো।' যারা হজরত আবুবকর রাযি. ও হজরত উমর রাযি.- এর প্রতি হৃদ্যতা প্রকাশ করত, ইসমাইলিরা তাদেরকে হত্যা করত। আজানে কেউ 'হাইয়া আলাল ফালাহ' বললে তারা তার জিহ্বা কেটে ফেলত। উবায়দি সাম্রাজ্যে আজানে 'হাইয়া আলাল ফালাহ'-এর বদলে 'হাইয়া আলা খাইরিল আমাল' বলার রীতি চালু করা হয়েছিল। তাদের এ জাতীয় আরও অনেক অন্যায়-অপকর্মের ফিরিস্তি ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে রয়েছে। (৮৬)

এই দুষ্ট ইসমাইলি উবায়দি সম্প্রদায়ই তৎকালীন মিশর শাসন করত। ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) অষ্টম উবায়দি শাসক আল-মুসতানসিরের মৃত্যু হলে উবায়দিরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক ভাগ মিশরে বসবাস করত এবং মিশর শাসন করত। তারা আল-মুসতানসিরের পুত্র মুসতালির প্রতি সম্বন্ধিত হয়ে 'মুসতালিয়া' নামে পরিচিত। আরেক অংশ মুসতালির ভাই নিযার বিন আল-মুসতানসিরের প্রতি সম্বন্ধিত হয়ে 'নিযারিয়া' নামে পরিচিত। অনাচার ও অনিষ্টতায় এবং নৃশংসতা ও নির্মমতায় নিযারিয়া গোষ্ঠী ছিল পূর্বের সকল শিয়া গোষ্ঠীর চেয়ে কয়েক গুণ অগ্রসর। তারা ধর্মীয় নিদর্শনসমূহকে বিলুপ্ত করেছিল, দ্বীনের ফরজ বিধানসমূহের বাস্তবায়ন নিষিদ্ধ করেছিল। তারপরও তারা নিজেদেরকে 'মুসলমান' দাবি করত! ইতিহাসে তারাই বাতিনি বা হাশাশিন ফিরকা নামে পরিচিত। মুখে তারা একরকম প্রকাশ করত, আর অন্তরে লালন করত আরেক রকম চিন্তা। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নিজেদের প্রশিক্ষিত গুপ্তঘাতকদের মাধ্যমে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর বিশিষ্ট আলিম ও বীরযোদ্ধাদের হত্যা করা। সামনে বর্ণিত ইতিহাসে দেখা যাবে, মুসলমানদের ভূখণ্ড হতে আগ্রাসী ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত সংগ্রামী আন্দোলন চলাকালে তাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক। বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে অনেকগুলো সুরক্ষিত দুর্গের অধিকারী বাতিনি সম্প্রদায়ের ছিল প্রচুর প্রশিক্ষিত যোদ্ধাপুরুষ। এসব যোদ্ধারা রণক্ষেত্রে ছিল চরম নির্মম ও পরাক্রান্ত। বাতিনিরা বিভিন্ন কৌশলে নিরাপদ ও নির্ঝঞ্ঝাট জনপদগুলোতে সাম্প্রদায়িকতা ও গোষ্ঠীগত দাঙ্গার আগুন উসকে দিত এবং বিভিন্ন জনপদে ধ্বংসযজ্ঞ চালাত। প্রকৃত বিচারে শিয়া বাতিনি ফিরকা মুসলিম উম্মাহর জন্য বাইজান্টাইন ও ক্রুসেডারদের চেয়েও অধিক ক্ষতির কারণ হয়েছিল।

হিজরি পঞ্চম শতকের শেষভাগে ক্রুসেডার বাহিনীর আগ্রাসনের প্রাক্কালে মিশরের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল ইসমাইলি মুসতালিয়া সম্প্রদায়। ততদিনে তারা উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার অঞ্চলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল এবং তাদের ক্ষমতা মিশরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। অবশ্য সবসময়ের মতোই তখনও শাম অঞ্চল ও ফিলিস্তিনের প্রতি তাদের লোলুপ দৃষ্টি ছিল। এ কারণেই তারা শামের সুন্নি মতাদর্শী সেলজুক রাষ্ট্রের সঙ্গে সব সময় যুদ্ধে জড়িয়ে থাকত। সেলজুক রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন এবং শাম ও ফিলিস্তিন ভূমির বিভিন্ন অংশ দখল করার লক্ষ্যে উবায়দি সরকার কখনো রোমান বাইজান্টাইনদের সঙ্গে, আবার কখনো সরাসরি ক্রুসেডারদের সঙ্গেও মৈত্রী স্থাপনে সামান্য দ্বিধা করত না। এককথায়, সন্দেহাতীতভাবেই শিয়া উবায়দি রাষ্ট্রের নীতি ও কর্মনীতি ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক।

ইসমাইলি উবায়দি সরকার নিয়ন্ত্রিত তৎকালীন মিশরীয় সেনাবাহিনী ছিল মুসলিম উম্মাহর গলার কাঁটার ন্যায়। এই পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল দীর্ঘ দিন। পরবর্তী সময়ে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে ইসলামি ইতিহাসের দুই প্রাতঃস্মরণীয় মহান বীর সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ রহ. ও সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ.-এর এ অঞ্চলে আবির্ভাবের মাধ্যমে। ইনশাআল্লাহ, ঘটনাবিবরণীর ধারাবাহিকতায় সামনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

মোটামুটি এই ছিল এশিয়া মাইনর, শাম, ইরাক ও মিশরের তৎকালীন পরিস্থিতি। নিঃসন্দেহে এক বা একাধিক কারণে এ পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অবশ্য ইসলামি বিশ্বের অন্যান্য ভূখণ্ডের পরিস্থিতিও এর চেয়ে সুখকর কিছু ছিল না।

টিকাঃ
৮৪. যেহেতু শিয়া সম্প্রদায়ের আকিদা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণই উদ্ভট মস্তিষ্কপ্রসূত; বরং বিশুদ্ধ ইসলামি আকিদা ও বিশ্বাসকে কলুষিত করার অসৎ উদ্দেশ্যে রচিত, তাই কালের পরিক্রমায় তাদের মাঝে নতুন নতুন বিভিন্ন মত ও বিশ্বাসের উদ্ভব হতে থাকে এবং একে কেন্দ্র করে অসংখ্য দল-উপদল সৃষ্টি হতে থাকে। আর তাই ইতিহাস পর্যালোচনা করলে শিয়াদের দল-উপদলের সংখ্যা একশ-এর কাছাকাছি পাওয়া যায়। তবে এসব দল-উপদলের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো ইমামিয়া সম্প্রদায়। বর্তমানে পৃথিবীতে যত শিয়া সম্প্রদায় আছে, সব ইমামিয়া সম্প্রদায়েরই শাখা-উপশাখা। ইমামিয়া সম্প্রদায় হজরত আলি রাযি.-এর পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে ইমামগণের বিদ্যমানতার আকিদা পোষণ করে এবং ইমামদের সম্পর্কে নানা রকম ভ্রান্ত আকিদা পোষণ করে। ইমামিয়া সম্প্রদায়েরও অনেকগুলো শাখা আছে। তন্মধ্যে তিনটি শাখা সবচেয়ে প্রসিদ্ধ : ইছনা আশারিয়া, ইসমাইলিয়া ও যায়দিয়া। শিয়া মতাদর্শের উৎপত্তি, পরিচিতি ও শাখা-প্রশাখা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভের জন্য দেখুন মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিত— ইসলামি ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ, ৩য় খণ্ড। [অনুবাদক]
৮৫. জাফর সাদিক ছিলেন ইসমাইলি ও দ্বাদশ ইমামবাদী উভয় সম্প্রদায়ের ঐকমত্যে শিয়াদের ষষ্ঠ ইমাম।
৮৬. শিয়া ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের বিস্তারিত ইতিহাস জানতে দেখুন: ইবনুল আছির কৃত আল-কামিল ফিত-তারীখ, ইবনে কাছির কৃত আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ও আবু শামা আল-মাকদিসি কৃত আর-রাওযাতাইন ফি তারীখিদ দাওলাতাইন আন-নূরিয়া ওয়াস-সালাহিয়া।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 মাগরিব অঞ্চল ও আন্দালুসের পরিস্থিতি

📄 মাগরিব অঞ্চল ও আন্দালুসের পরিস্থিতি


আফগানিস্তান ও ভারতবর্ষে তখন চলছিল গজনবি পরিবারের শাসন। পরিতাপের বিষয় হলো, গজনবি রাজপরিবার তখন নিজেদের অস্তগামী সময়ে উপনীত হয়েছিল। ফলে ক্রুসেড আগ্রাসনের কেন্দ্রবিন্দু শাম অঞ্চলকে সহায়তা করার মতো শক্তি তাদের ছিল না। অধিকন্তু গজনবি রাষ্ট্রের অবস্থান ছিল শাম অঞ্চল থেকে বেশ দূরে।

ইয়ামেন ভূখণ্ডের শাসনক্ষমতা তিনটি গোত্রের মাঝে বিভক্ত ছিল—বনু নাজাহ, বনু ছুলায়হি ও বনু যুরাই। ক্ষমতা ও ভূখণ্ড দখল নিয়ে তাদের মধ্যে হানাহানি-সংঘাত লেগেই থাকত। অধিকন্তু তাদের অধিকাংশ ছিল শিয়া মতাবলম্বী। গোত্র-তিনটি মিশরের শিয়া উবায়দি সরকারের বশ্যতা স্বীকার করে চলত।

মাগরিব অঞ্চল ও আন্দালুসের পরিস্থিতি
তিউনিসিয়ায় তখন ছিল বনু যিরির শাসন। যিরি রাজপরিবারও ততদিনে ক্ষয়িষ্ণুপ্রায় শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। ফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক নগরী সিসিলি দ্বীপ মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। ইতালির নরম্যান গোষ্ঠী ৪৮৪ হিজরি সনে (১০৯১ খ্রিষ্টাব্দে) সিসিলিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং সেখানে যিরি রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের অবসান ঘটায়। এর ফলে একটানা দুইশ সত্তর বছরের ইসলামি শাসনের পর সিসিলি দ্বীপে মুসলিম-অস্তিত্বের বিলোপ ঘটে। (৮৭)

সমকালীন ইসলামি বিশ্বের একটিমাত্র অঞ্চলে তখন ইসলামি কর্তৃত্ব ও প্রভাব-প্রতিপত্তি বিদ্যমান ছিল; আর সেটি হলো মরক্কো, পশ্চিম আফ্রিকা ও আন্দালুস অঞ্চল। এই পুরো অঞ্চল তখন সুবিশাল মুরাবিতি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সময় মুরাবিতি সাম্রাজ্যের কান্ডারি ছিলেন ইসলামি ইতিহাসের অনন্যসাধারণ মহান সেনাপতি ও কালজয়ী মুরাবিতি শাসক ইউসুফ বিন তাশফিন রহ.। তিনিই ৪৭৯ হিজরি সনে (১০৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) আন্দালুসের মধ্যভাগে অবস্থিত যাল্লাকা প্রান্তরে সংঘটিত অবিস্মরণীয় এক যুদ্ধে স্পেন ও ফ্রান্স থেকে আগত ক্রুসেডার বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিলেন।

কিন্তু এই সুবিশাল ও শক্তিশালী মুরাবিতি সাম্রাজ্যও ক্রুসেড আগ্রাসনের মোকাবিলার ইসলামি প্রাচ্যকে সহায়তা করতে সক্ষম ছিল না। এর কারণ কেবল ভৌগোলিক দূরত্বই নয়; বরং মুরাবিতি সাম্রাজ্যের শতভাগ সামরিক শক্তি তখন সার্বক্ষণিকভাবে ব্যস্ত ছিল একদিকে উত্তর আন্দালুসের ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে, আরেকদিকে পশ্চিম আফ্রিকা ও মধ্য আফ্রিকার বিভিন্ন পৌত্তলিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে।

মোটামুটি এই হলো হিজরি পঞ্চম শতকের শেষভাগে (খ্রিষ্টীয় একাদশ শতকের শেষভাগে) ইসলামি বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর সাধারণ পর্যালোচনা। এই অধঃপতিত পরিস্থিতিই মূলত ক্রুসেডারদের সামনে আমাদের দুর্গসমূহে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত করেছিল। সামনের আলোচনায়ও এ বিষয়টি সুস্পষ্ট প্রতিভাত হবে যে, ক্রুসেডারদের আগ্রাসন তাদের সামরিক শক্তিবৃদ্ধির কারণে ছিল না; প্রকৃতপক্ষে আমাদের দুর্বলতা, বিভেদ-অনৈক্য, আমাদের শক্তির বিভক্তি এবং আমাদের দ্বীনবিমুখতাই ছিল এর কারণ। নিঃসন্দেহে এগুলো এমন কার্যকারণ, যার ধ্বংসাত্মক প্রভাবের বিষয়টি কোনো জ্ঞানী ও বোধসম্পন্ন ব্যক্তির কাছেই অস্পষ্ট নয়।

ক্রুসেড যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে এই ছিল মুসলিম বিশ্বের পরিস্থিতি। জানার বিষয় হলো, সেই যুগসন্ধিক্ষণে খ্রিষ্টান ইউরোপের পরিস্থিতি কেমন ছিল? সামনের পরিচ্ছেদে আমরা সে বিষয়টিই জানার চেষ্টা করব।

টিকাঃ
৮৭. দেখুন: ইবনে খালদুন, তারীখু ইবনি খালদুন, ৬/১৫৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00