📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 বিভক্তি ও ভাঙনের মাঝে

📄 বিভক্তি ও ভাঙনের মাঝে


তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর অবস্থার দিকে তাকালে আমরা নিশ্চিতভাবেই উপলব্ধি করতে পারি যে, মুসলিম উম্মাহ শীঘ্রই এক ভয়াবহ সংকটে নিপতিত হতে যাচ্ছে। আসুন, আমরা সে সময় বিদ্যমান ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ও বিভক্ত অঞ্চলগুলোর প্রতি দ্রুত একবার দৃষ্টি বোলাই। তাহলে সহজেই অনুধাবন করতে পারব যে, ক্রুসেড শক্তি কেন বিশেষভাবে এ সময়কালকেই ইসলামি বিশ্বে অভিযান পরিচালনার জন্য বেছে নিয়েছিল? এবং কেনই-বা তারা নির্বাচন করেছিল ইসলামি বিশ্বের এই বিশেষ অঞ্চলটিকে?

৪৭৮ হিজরি সনে (১০৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) সুলায়মান বিন কুতুলমিশের নেতৃত্বাধীন আনাতোলিয়া (এশিয়া মাইনর) অঞ্চলে বসবাসকারী রোমান সেলজুক ও তুতুশ বিন আলপ আরসালানের নেতৃত্বাধীন শামে বসবাসকারী শামীয় সেলজুকদের মধ্যে বিরাট সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এ সময় পারসিক সেলজুকরা ছিল শামীয় সেলজুকদের পক্ষে। এই সংঘাতেই রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের শক্তিশালী শাসক সুলায়মান বিন কুতুলমিশ নিহত হন。(৬৬) ফলে এশিয়া মাইনর অঞ্চলের রোমান সেলজুক রাষ্ট্রে বিরাট প্রশাসনিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়। কারণ, সুলায়মান বিন কুতুলমিশের পুত্র ও ঘোষিত যুবরাজ কিলিজ আরসালান তখন নিতান্তই বালক ছিলেন। ফলে এশিয়া মাইনর অঞ্চল ভেঙে ছোট ছোট বিভক্ত ও হানাহানিরত কয়েকটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

এই আত্মকলহ ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের আরেকটি মন্দ পরিণতি হলো রোমান সেলজুক ও শামীয় সেলজুক উভয় গোষ্ঠী বিপদে-আপদে পরস্পর একতাবদ্ধ হওয়া ও একে অপরকে সহায়তা করার মতো নির্ভরতা ও আস্থা হারিয়ে ফেলে। ইতিহাসের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ক্রুসেডারদের আগ্রাসনের মুখে ইসলামি শক্তির প্রতিরোধ ভেঙে পড়ার ক্ষেত্রে এই আস্থাহীনতার বিরাট ভূমিকা ছিল।(৬৭)

হিজরি পঞ্চম শতকের শেষে (খ্রিষ্টীয় একাদশ শতকের শেষে) সেলজুক সাম্রাজ্য নিম্নে উল্লেখিত অবস্থায় বিভক্ত ছিল।

১. বৃহত্তর সেলজুক রাষ্ট্র (The Great Seljuq Empire)। ১ম মালিকশাহ এর উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। আরবি ইরাকসহ(৬৮) আশেপাশের সুবিস্তৃত অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। আব্বাসি খিলাফতের ওপর এই বৃহত্তর সেলজুক রাষ্ট্রেরই প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল। মোটামুটি পর্যায়ের একতা থাকলেও এই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ছিল গৃহসংঘাত। প্রথম মালিকশাহর মৃত্যুর পর বৃহত্তর সেলজুক রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার জ্যেষ্ঠ পুত্র বারকিয়ারুক। তার বিরুদ্ধে তার চাচা ও নিকটাত্মীয়দের পক্ষ হতে বিভিন্ন সময় বিদ্রোহ সংঘটিত হলেও ৪৯৮ হিজরি (১১০৪ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত আমৃত্যু তিনি শাসক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। (৬৯)

২. কিরমানি সেলজুক রাষ্ট্র (Kermani Seljuqs)। এর অবস্থান ছিল দক্ষিণ পারস্য ও পাকিস্তান অঞ্চলে। কারুত বেগ বিন দাউদ বিন মিকাঈল বিন সেলজুকের বংশধরদের হাতে এই রাষ্ট্রের ক্ষমতা ছিল। কারুত ছিলেন মহান সেনাপতি আলপ আরসালানের সহোদর।

৩. পারসিক সেলজুক রাষ্ট্র। উত্তর ইরাক তথা আজমি ইরাক, রায়, হামাদান ও কুর্দিস্তানজুড়ে ছিল এ রাষ্ট্রের বিস্তৃতি।

৪. শামের সেলজুক রাষ্ট্র। এটি দামেশকের সেলজুক রাষ্ট্র নামেও পরিচিত। আলপ আরসালানের পুত্র তুতুশের পরিবার শামের সেলজুক রাষ্ট্রের হাল ধরেছিল। তারা নিজেরাও বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত ছিল এবং শামকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত করে রেখেছিল। সামনে আমরা এর বিস্তারিত বিবরণ পেশ করব, ইনশাআল্লাহ।

৫. রোমান সেলজুক রাষ্ট্র (Sultanate of Rum)। এর অবস্থান ছিল এশিয়া মাইনর অঞ্চলে। কুতুলমিশ (Qutalmish) বিন ইসরাইল বিন সেলজুক-এর পরিবার রোমান সেলজুক রাষ্ট্র পরিচালনা করত। পরিবারের প্রধান পুরুষ ছিলেন তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক সুলায়মান বিন কুতুলমিশ। তার নিহত হওয়ার বিবরণ আমরা ইতিপূর্বে দিয়ে এসেছি।

মানচিত্র নং-b সেলজুক সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির চিত্র

এই অব্যাহত সংঘাত ও আতঙ্কের কারণে ক্রুসেডার বাহিনী প্রবেশের অব্যবহিত পূর্বে মুসলিম ভূখণ্ডের পরিস্থিতি একেবারেই দুর্বল ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।

শام ভূখণ্ডে রিদওয়ান বিন তুশ-এর নেতৃত্বে আলেপ্পোতে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠিত হয়। দামেশকে গঠিত হয় দাক্কাক বিন তুশ-এর নেতৃত্বে আরেকটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র। ফিলিস্তিনে ছিল উরতুখ তুর্মানির দুই পুত্র সুকমান ও ইলগাজীর শাসন। উল্লেখ্য, উরতুখ তুর্মানি ছিলেন তুতুশ বিন আলপ আরসালানের অনুগত সেনাপতিদের একজন।(৯০)

তৎকালীন মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্য নেতৃত্ব দিতে সেলজুকদের চেয়ে অগ্রগামী ছিল। ফলে সুর (Tyre), সিডন (Sidon), আক্কা (Acre), ব্যালকস(৯১) (Byblos)-সহ শাম অঞ্চলের বিভিন্ন নৌবন্দর উবায়দিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অবশ্য আরেক গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় নগরী ত্রিপোলি (তারাবলুস)(৭২) তখন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র ছিল। রাষ্ট্রটির শাসক ইবনে আম্মার আবু তালিব শিয়া মতাদর্শী হলেও উবায়দি রাষ্ট্র হতে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। (৭৩) আর কদিন পরই যে শাম অঞ্চল হতে যাচ্ছে ক্রুসেড আগ্রাসনের লক্ষ্যবস্তু, সেই শামের এই ছিল পরিস্থিতি!

অবশ্য এশিয়া মাইনর অঞ্চলের অবস্থাও এর চেয়ে সুখকর কিছু ছিল না। বিশেষত ৪৭৮ হিজরি সনে (১০৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) সুলায়মান বিন কুতুলমিশ নিহত হওয়ার পর উক্ত অঞ্চলের পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। (৭৪) সুলতান ১ম মালিকশাহ সুলায়মান-পুত্র কিলিজ আরসালানকে পারস্যে নিজ প্রহরা ও তত্ত্বাবধানে বন্দি করে রাখেন। (৭৫) অবশ্য মালিকশাহর মৃত্যু ও তার পুত্র বারকিয়ারুকের ক্ষমতা গ্রহণের সময় কিলিজ আরসালানকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিলিজ আরসালান এবার রোমান সেলজুকদের নতুন নেতায় পরিণত হন। (৭৬) অবশ্য তিনি পুরো এশিয়া মাইনর অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হননি। এ বিষয়টিও প্রণিধানযোগ্য যে, এশিয়া মাইনরের মতো ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ও দুর্যোগ-ফিতনায় তরঙ্গায়িত একটি অঞ্চলে দৃঢ়তার সঙ্গে টিকে থাকার জন্য যে মানের নেতৃত্ব-যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন, কিলিজ আরসালানের তা ছিল না। এশিয়া মাইনর অঞ্চল মুসলিম-অমুসলিম উভয় শক্তি দ্বারাই আক্রান্ত হতো। একদিকে যেমন এখানে বসবাসকারী বিভিন্ন তুর্কি গোত্র-উপগোত্রের মাঝে বিরোধ-সংঘাত লেগেই থাকত, অপরদিকে শামের সেলজুকদের সঙ্গেও এ অঞ্চলের প্রশাসনের বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে জিইয়ে ছিল। অধিকন্তু বিগত পাঁচ শতাব্দী ধরে মুসলমানদের ঐতিহ্যগত শত্রুর ভূমিকা পালনকারী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পাশেই ছিল এশিয়া মাইনরের অবস্থান। এ সবকিছু মিলিয়ে এ অঞ্চলের নেতৃত্বদানের জন্য প্রয়োজন ছিল অত্যুচ্চ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক দক্ষতার।

তা ছাড়া এশিয়া মাইনর তখন একক কোনো রাষ্ট্র ছিল না। ইজমির (İzmir) অঞ্চল ছিল যাখারিশের শাসনাধীন। দানিশমান্দ নামে আরেকটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রও এশিয়া মাইনর অঞ্চলে ছিল। আহমাদ গাজি নামক জনৈক তুর্কমেন সেনাপতি রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এশিয়া মাইনরের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলজুড়ে ছিল এর বিস্তৃতি। এশিয়া মাইনর অঞ্চলের বিভিন্ন অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রোমান সেলজুক ও দানিশমান্দ রাষ্ট্রের মধ্যে সর্বদাই বিরোধ লেগে থাকত। আর তাই খুব কঠিন ও জটিল পরিস্থিতিতেও পরস্পরের ঐক্য ও মিত্রতার সম্ভাবনা ছিল একেবারেই বিরল। (৭৭)

সমস্যা শুধু এতটুকুই নয়; ৪৯০ হিজরি সনে (১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দে) এশিয়া মাইনরের পশ্চিমাংশে শুরু হয় বাইজান্টাইনদের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। এ সময় বাইজান্টাইন বাহিনী উপকূলীয় অঞ্চলের নিসনিয়া ও আবুনিয়া অঞ্চল দখল করে নেয়। (৭৮) এশিয়া মাইনর অঞ্চলের পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আরেকটি কারণ ছিল এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণ আর্মেনীয় নাগরিকের বসবাস। আর্মেনীয়রা আবহমান কাল ধরে এ অঞ্চলে নিজেদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রে বসবাস করত। কিন্তু হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে (খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীতে) বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য আর্মেনিয়া দখল করে নিজ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। এরপর হিজরি পঞ্চম শতকে এশিয়া মাইনর অঞ্চলের বাইজান্টাইন অধিভুক্ত অংশে সেলজুকদের বিজয়াভিযান চলাকালে সেলজুকরা আর্মেনিয়া অঞ্চলেও আক্রমণ চালায় এবং বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস ও বিরান করে ফেলে। বাধ্য হয়ে আর্মেনীয়রা এশিয়া মাইনরের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল কিলিকিয়ায় (Cilicia) চলে যায় এবং সেখানেই নিজেদের মতো করে বসতি স্থাপন করে। এ ছাড়াও আর্মেনীয়দের অনেকে বিক্ষিপ্তভাবে মালাতিয়া (Malatya), এডেসা (Edessa) (৭৯) ও এন্টিয়ক (Antakya) অঞ্চলে আশ্রয় নিয়ে সুসংহত হয়। (৮০) উল্লেখ্য, শেষোক্ত তিনটি অঞ্চলে সুপ্রাচীন কাল থেকেই প্রচুর বাইজান্টাইন নাগরিক বসবাস করত। এবার বিক্ষিপ্ত আর্মেনীয়রা আশ্রয় নেওয়ায় অঞ্চল-তিনটি পরিণত হয় ক্যাথলিক আর্মেনীয় ও অর্থোডক্স বাইজান্টাইনদের যৌথ আবাসভূমিতে। অবশ্য সুলায়মান বিন কুতুলমিশ ৪৭৭ হিজরি সনে (১০৮৫ খ্রিষ্টাব্দে) এন্টিয়ক অঞ্চলকে রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন। এরপর সেখানে বসবাসের জন্য প্রচুর পরিমাণ মুসলিম নাগরিকও আগমন করে এবং পূর্ব থেকেই বসবাসরত আর্মেনীয় জনগোষ্ঠী ও বাইজান্টাইনদের সঙ্গে সহাবস্থান করতে থাকে। (৮১) ওদিকে বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান ১ম মালিকশাহ এডেসায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। অবশ্য তিনি জিজিয়া প্রদানের শর্তে থোরোস নামক জনৈক আর্মেনীয় সেনাপতিকে সেখানে প্রশাসক হিসেবে বহাল রাখেন। (৮২) একই ঘটনা ঘটে মালাতিয়ার ক্ষেত্রেও। সেখানে কর্তৃত্ব ছিল জিবরিল নামক জনৈক আর্মেনীয় সেনাপতির। সেও সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখার শর্তে প্রশাসক পদে বহাল থাকে। (৮৩) এভাবে এই তিনটি এলাকায় আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং এশিয়া মাইনরের দক্ষিণ-পূর্বে কিলিকিয়া অঞ্চলে আর্মেনীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল ও অনিরাপদ করে তোলে। আর এ সবকিছু পরবর্তী সময়ে প্রথম ক্রুসেড আগ্রাসনের সফলতার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে, যেমনটি ক্রুসেডকালের আলোচনায় আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হবে।

একইভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, এশিয়া মাইনর অঞ্চলে সেলজুক-আর্মেনীয়-বাইজান্টাইন মিশ্রিত জনবিন্যাস, শাসনকেন্দ্রগুলোর পারস্পরিক বিভেদ-কলহ, দল-গোষ্ঠীগুলোর মাঝে নেতিবাচক সম্পর্ক, প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কঠিন স্নায়ুবিক উত্তেজনা ও টানাপোড়েন—এ সবকিছু এ অঞ্চলের পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছিল। আশা করি এই সংক্ষিপ্ত ধারণার মাধ্যমে আমরা এশিয়া মাইনর ও আশেপাশের অঞ্চলে আসন্ন ক্রুসেড আগ্রাসনের প্রেক্ষাপট সহজে উপলব্ধি করতে পারব।

মোটামুটি এই ছিল তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের পূর্ব প্রান্তের পরিস্থিতি। এককথায় বললে—তৎকালীন ইসলামি প্রাচ্যের পরিস্থিতি মোটেও কল্যাণ ও সৌভাগ্যের বার্তা বহন করছিল না। না এশিয়া মাইনর অঞ্চলে; না শাম, ফিলিস্তিন, ইরাক বা পারস্য অঞ্চলে।

বিচ্ছিন্ন কিছু রাষ্ট্রের কথা বাদ দিলে অবশিষ্ট ইসলামি বিশ্বের পরিস্থিতিও সন্তোষজনক ছিল না। আমাদের আলোচ্য বিষয়ের প্রেক্ষাপটে সম্ভবত এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হলো মিশর। কেননা, মিশর ছিল ক্রুসেড অভিযানের লক্ষ্যবস্তুর অতি নিকটে; বরং কোনো কোনো ক্রুসেড অভিযান তো সরাসরি মিশরকে লক্ষ্য করেই পরিচালিত হয়েছিল; যেমনটি সামনে আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হবে।

টিকাঃ
৬৬. শিহাবুদ্দিন আহমাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নুওয়াইরি, নিহায়াতুল আরাব ফী ফুনিল আদাব, ২৭/৯৩।
৬৭. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৮৯-৯০।
৬৮. ফুরাত ও দজলার নিম্নভূমিসহ ইরাকের সুবিস্তৃত সমতলভূমিকে ভৌগোলিকভাবে আরবি ইরাক (Arab Iraq) বলা হতো। আর এর পূর্ব দিকে অবস্থিত ইস্পাহান, রায়, কাজবিন, কির্মানশাহ-সহ বিস্তৃত পাহাড়িভূমিকে বলা হতো আজমি ইরাক (Persian Iraq)। জগ্রোস পর্বতমালাকে উভয় অঞ্চলের বিভক্তি রেখা বিবেচনা করা যায়। আরবি ইরাকের সিংহভাগ বর্তমানে আধুনিক ইরাক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত আর আজমি ইরাক বর্তমান ইরান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। [অনুবাদক]
৬৯. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/১৫০, ১৬৪ ও ইবনুল কালানিসি, যায়লু তারীখি দিমাশক, পৃষ্ঠা: ১২৭।
৯০. সাইদ আতর, আল-হারাকাতুস সালিবিয়া, ১/৪৬ ও ইমাদুদ্দিন খলিল, আল-ইমাদুল উস্তুকিয়া ফিল-জারায়িতি ওয়াম-শাম, পৃষ্ঠা : ৬৫-৬৬।
৯১. আরবি নাম জুবাইল (জুবায়ল)।
৭২. লিবিয়ার রাজধানী ও সর্ববৃহৎ নগরীর নাম আরবিতে তারাবলুস (طرابلس) এবং ইংরেজিতে ত্রিপোলি (Tripoli)। অপরদিকে লেবাননের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী ও দেশটির উত্তর প্রদেশের রাজধানীর নামও তারাবলুস ও ত্রিপোলি। এখানে লেবাননের তারাবলুসের কথা বলা হয়েছে। উভয় তারাবলুসের মাঝে পার্থক্যকরণের জন্য আরবিতে লেবাননের তারাবলুসকে طرابلس الشام (শামের তারাবলুস) এবং লিবিয়ার তারাবলুসকে طرابلس الغرب (পশ্চিমা তারাবলুস) বলা হয়। [অনুবাদক]
৭০. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪২৪-৪২৫।
৭৪. শিহাবুদ্দিন আহমাদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নুওয়াইরি, নিহায়াতুল আরাব ফী ফুনুনিল আদাব, ২৭/৯৩।
৭৫. দেখুন: সিবতু ইবনিল জাওযি, মিরআতুয যামান ফী তাওয়ারীখিল আ'য়ান, পৃষ্ঠা: ৪৪৩।
৭৬. যামবাউর (Zambaur), মুজামুল আনসাব ওয়াল উসুরাতিল হাকিমা ফিত তারীখিল ইসলামি, পৃষ্ঠা: ২১৫।
৭৭. Grousset: Hist. des Croisades 1, L VII-L111.
৭৮. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/১০০।
৭৯. আরবি নাম الرُّهَا (রুহা)। এন্টিয়কের মতো এডেসা নগরীও সেনাপতি সেলিউকা্স নিকাটর প্রতিষ্ঠা করেন। খলিফা উমর রাযি.-এর খিলাফতকালে সপ্তদশ হিজরি সনে বিশিষ্ট সাহাবি ইয়ায বিন গুনম রাযি.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী পুরো জাযিরা অঞ্চল যুদ্ধ ব্যতিরেকে সন্ধির মাধ্যমে জয় করে। তখন এ অঞ্চলের অন্যান্য নগরীর সঙ্গে এডেসাও বিজিত হয়। ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্স ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত লিউসান চুক্তি (The Treaty of Lausanne) অনুসারে আধুনিক তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের যেসব এলাকা তুরস্কের অন্তর্ভুক্ত হয়, এডেসা তার একটি। নগরীটি তুরস্কের উরফা প্রদেশ (Şanlıurfa Province)-এর রাজধানী।
৮০. Lorga: L'Armenie Cilicienne, pp. 7-88.
৮১. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/২৯৪ ও সিবতু ইবনিল জাওযি, মিরআতুয যামান ফী তাওয়ারীখিল আয়ান, পৃষ্ঠা: ৪২২।
৮২. Chalandon: Hist de la Premiere Croisade, p. 175.
৮৩. Setton, op cit 1, p. 299.

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 মিশর আরেক মৃত্যু গহ্বরে!

📄 মিশর আরেক মৃত্যু গহ্বরে!


মিশরে তখন ফাতিমি নামধারী উবায়দিদের শাসন চলছিল। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরেরও অধিক সময়ের অব্যাহত প্রচেষ্টার পর ৩৫৮ হিজরি সনে (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) উবায়দি রাজপরিবার মিশরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এর ফলে উত্তর আফ্রিকার পর মিশরেও উবায়দি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে শাম ও হিজায অঞ্চলেও উবায়দিদের শাসনক্ষমতা বিস্তৃত হয়।

উবায়দিরা ছিল শিয়াদের একটি চরমপন্থী ও উগ্রবাদী দল। শিয়াদের যাবতীয় ভ্রান্ত আকিদা তো তারা লালন করতই; সঙ্গে অতিরিক্ত বিভিন্ন মনগড়া আকিদাও তারা যুক্ত করে নিয়েছিল। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসসমূহে তাদের বিকৃতি ও বিভ্রান্তি মূলধারার শিয়াদের চেয়েও অনেক বেশি ও ভয়াবহ। নিজেদেরকে তারা নবী-তনয়া হজরত ফাতিমা রাযি.-এর বংশধর দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে তারা মাগরিব অঞ্চলের জনৈক ইহুদির বংশধর। ২৯৬ হিজরি সনে (৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে) উবায়দিরা প্রথম মাগরিবে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এরপর তারা ধীরে ধীরে উত্তর আফ্রিকায় কর্তৃত্ব বিস্তার করে এবং ফাতিমি খিলাফত নামে স্বতন্ত্র রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। অথচ প্রকৃত বিচারে তাদের এই রাষ্ট্রব্যবস্থা না খিলাফত নামের উপযুক্ত, না ফাতিমি উপাধির। দুষ্ট উবায়দি রাষ্ট্র মূলত গড়ে উঠেছিল আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর আলিমসমাজকে হত্যা ও নির্যাতন-নিপীড়নের ওপর ভিত্তি করে। একদিকে তারা সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়েছে, অন্যদিকে অন্যায়-অনাচার, পাপ-পঙ্কিলতা ইত্যাদির বিস্তার ঘটিয়েছে। সঠিক আকিদা ও ধর্মবিশ্বাস এবং নীতি ও নৈতিকতায় বিকৃতি সাধনের ক্ষেত্রে তাদের কর্মধারা ছিল কল্পনাতীত ভয়ংকর। উবায়দিরা ছিল শিয়া ইসমাইলি সম্প্রদায়ভুক্ত। (৮৪) ইসমাইলি সম্প্রদায় মূল শিয়া গোষ্ঠী হতে বিচ্ছিন্ন একটি দল, যারা নিজেদেরকে ইসমাইল বিন জাফর সাদিক-এর প্রতি সম্বন্ধ করে থাকে। (৮৫) ইসমাইলিদের দাবি মতে শিয়াদের সপ্তম ইমাম হলেন জাফর সাদিক-পুত্র ইসমাইল। অপরদিকে শিয়াদের আরেক শাখা ভ্রান্ত ইছনা আশারিয়া বা দ্বাদশ ইমামবাদী সম্প্রদায়ের দাবি মতে সপ্তম ইমাম হলেন জাফর সাদিকের অপর পুত্র মুসা কাজিম। ইসমাইলিরা আরও দাবি করে যে, ইমাম ইসমাইল-পরবর্তী তিন ইমাম লুক্কায়িত ছিলেন; এরপর একাদশ ইমাম হলেন উবায়দি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা আল-মাহদি। ইসমাইলি সম্প্রদায় নিজেদের ইমামদের সম্পর্কে বিভিন্ন অবাস্তব ও গর্হিত আকিদা পোষণ করে এবং তাদের সম্পর্কে ভ্রান্ত ও অমূলক বিভিন্ন কারামতের দাবি করে। তারা এ দাবিও করে যে, আল্লাহ তাদের ইমামদের মাঝে দেহগ্রহণ করেন। প্রকৃতপক্ষে মহান আল্লাহ তাআলা এসব ভ্রান্ত বিশ্বাস হতে সম্পূর্ণ পবিত্র। এই ভ্রান্ত আকিদাকে পুঁজি করেই ইসমাইলি শাসকদের কেউ কেউ নিজেকে নবী বাদ দিয়ে স্বয়ং স্রষ্টা ও ইলাহ পর্যন্ত দাবি করেছে। তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধতম হলো ষষ্ঠ উবায়দি খলিফা হাকিম বি-আমরিল্লাহ। তাকে সম্বোধন করেই জনৈক শিয়া কবি নিম্নোক্ত পঙ্ক্তি রচনা করেছিল-
مَا شِئْتَ لَا مَا شَاءَتِ الْأَقْدَارُ فَاحْكُمْ فَأَنْتَ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ
তাকদির কিছুই নয়; তা-ই হয় যা আপনি চান। তাই শাসন করুন ইচ্ছেমতো, আপনিই তো একক ও মহাশক্তিমান!
এসব ভ্রান্ত আকিদা পোষণকারী ও গর্হিত অন্যায়-অনাচার বিস্তারকারী ফাসিক ইসমাইলি শাসকগণই নিজেদের বিষাক্ত মতাদর্শ ও উগ্রবাদী চিন্তাধারা বিস্তারের লক্ষ্যে মিশরে জামে আযহার প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলা তাদের কূট-কৌশল তাদের বক্ষমূলেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। কয়েক শতকের পরিক্রমায় জামে আযহার পরিণত হয়েছে ইসলামি বিশ্বে বিশুদ্ধ সুন্নাহর বিকিরণ ও বিচ্ছুরণের অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে।

ইসমাইলি সম্প্রদায় সাহাবায়ে কেরাম এমনকি খোদ নবীদেরকেও গালমন্দ ও সমালোচনা করে। এমনকি তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানেও বিভিন্ন কটুবাক্য উচ্চারণ করে থাকে। দ্বিতীয় উবায়দি শাসক আল-কায়িম মুহাম্মাদ আবুল কাসিমের নির্দেশে তার অনুচরেরা হাটে-বাজারে ঘুরে ঘুরে ঘোষণা করত- 'আয়েশা ও তার স্বামীকে অভিসম্পাত করো, গুহা ও গুহায় আশ্রয়গ্রহণকারীদের অভিসম্পাত করো।' যারা হজরত আবুবকর রাযি. ও হজরত উমর রাযি.- এর প্রতি হৃদ্যতা প্রকাশ করত, ইসমাইলিরা তাদেরকে হত্যা করত। আজানে কেউ 'হাইয়া আলাল ফালাহ' বললে তারা তার জিহ্বা কেটে ফেলত। উবায়দি সাম্রাজ্যে আজানে 'হাইয়া আলাল ফালাহ'-এর বদলে 'হাইয়া আলা খাইরিল আমাল' বলার রীতি চালু করা হয়েছিল। তাদের এ জাতীয় আরও অনেক অন্যায়-অপকর্মের ফিরিস্তি ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে রয়েছে। (৮৬)

এই দুষ্ট ইসমাইলি উবায়দি সম্প্রদায়ই তৎকালীন মিশর শাসন করত। ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) অষ্টম উবায়দি শাসক আল-মুসতানসিরের মৃত্যু হলে উবায়দিরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক ভাগ মিশরে বসবাস করত এবং মিশর শাসন করত। তারা আল-মুসতানসিরের পুত্র মুসতালির প্রতি সম্বন্ধিত হয়ে 'মুসতালিয়া' নামে পরিচিত। আরেক অংশ মুসতালির ভাই নিযার বিন আল-মুসতানসিরের প্রতি সম্বন্ধিত হয়ে 'নিযারিয়া' নামে পরিচিত। অনাচার ও অনিষ্টতায় এবং নৃশংসতা ও নির্মমতায় নিযারিয়া গোষ্ঠী ছিল পূর্বের সকল শিয়া গোষ্ঠীর চেয়ে কয়েক গুণ অগ্রসর। তারা ধর্মীয় নিদর্শনসমূহকে বিলুপ্ত করেছিল, দ্বীনের ফরজ বিধানসমূহের বাস্তবায়ন নিষিদ্ধ করেছিল। তারপরও তারা নিজেদেরকে 'মুসলমান' দাবি করত! ইতিহাসে তারাই বাতিনি বা হাশাশিন ফিরকা নামে পরিচিত। মুখে তারা একরকম প্রকাশ করত, আর অন্তরে লালন করত আরেক রকম চিন্তা। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নিজেদের প্রশিক্ষিত গুপ্তঘাতকদের মাধ্যমে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর বিশিষ্ট আলিম ও বীরযোদ্ধাদের হত্যা করা। সামনে বর্ণিত ইতিহাসে দেখা যাবে, মুসলমানদের ভূখণ্ড হতে আগ্রাসী ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত সংগ্রামী আন্দোলন চলাকালে তাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক। বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে অনেকগুলো সুরক্ষিত দুর্গের অধিকারী বাতিনি সম্প্রদায়ের ছিল প্রচুর প্রশিক্ষিত যোদ্ধাপুরুষ। এসব যোদ্ধারা রণক্ষেত্রে ছিল চরম নির্মম ও পরাক্রান্ত। বাতিনিরা বিভিন্ন কৌশলে নিরাপদ ও নির্ঝঞ্ঝাট জনপদগুলোতে সাম্প্রদায়িকতা ও গোষ্ঠীগত দাঙ্গার আগুন উসকে দিত এবং বিভিন্ন জনপদে ধ্বংসযজ্ঞ চালাত। প্রকৃত বিচারে শিয়া বাতিনি ফিরকা মুসলিম উম্মাহর জন্য বাইজান্টাইন ও ক্রুসেডারদের চেয়েও অধিক ক্ষতির কারণ হয়েছিল।

হিজরি পঞ্চম শতকের শেষভাগে ক্রুসেডার বাহিনীর আগ্রাসনের প্রাক্কালে মিশরের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল ইসমাইলি মুসতালিয়া সম্প্রদায়। ততদিনে তারা উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার অঞ্চলগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল এবং তাদের ক্ষমতা মিশরে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। অবশ্য সবসময়ের মতোই তখনও শাম অঞ্চল ও ফিলিস্তিনের প্রতি তাদের লোলুপ দৃষ্টি ছিল। এ কারণেই তারা শামের সুন্নি মতাদর্শী সেলজুক রাষ্ট্রের সঙ্গে সব সময় যুদ্ধে জড়িয়ে থাকত। সেলজুক রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন এবং শাম ও ফিলিস্তিন ভূমির বিভিন্ন অংশ দখল করার লক্ষ্যে উবায়দি সরকার কখনো রোমান বাইজান্টাইনদের সঙ্গে, আবার কখনো সরাসরি ক্রুসেডারদের সঙ্গেও মৈত্রী স্থাপনে সামান্য দ্বিধা করত না। এককথায়, সন্দেহাতীতভাবেই শিয়া উবায়দি রাষ্ট্রের নীতি ও কর্মনীতি ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক।

ইসমাইলি উবায়দি সরকার নিয়ন্ত্রিত তৎকালীন মিশরীয় সেনাবাহিনী ছিল মুসলিম উম্মাহর গলার কাঁটার ন্যায়। এই পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল দীর্ঘ দিন। পরবর্তী সময়ে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে ইসলামি ইতিহাসের দুই প্রাতঃস্মরণীয় মহান বীর সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ রহ. ও সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ.-এর এ অঞ্চলে আবির্ভাবের মাধ্যমে। ইনশাআল্লাহ, ঘটনাবিবরণীর ধারাবাহিকতায় সামনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

মোটামুটি এই ছিল এশিয়া মাইনর, শাম, ইরাক ও মিশরের তৎকালীন পরিস্থিতি। নিঃসন্দেহে এক বা একাধিক কারণে এ পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অবশ্য ইসলামি বিশ্বের অন্যান্য ভূখণ্ডের পরিস্থিতিও এর চেয়ে সুখকর কিছু ছিল না।

টিকাঃ
৮৪. যেহেতু শিয়া সম্প্রদায়ের আকিদা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণই উদ্ভট মস্তিষ্কপ্রসূত; বরং বিশুদ্ধ ইসলামি আকিদা ও বিশ্বাসকে কলুষিত করার অসৎ উদ্দেশ্যে রচিত, তাই কালের পরিক্রমায় তাদের মাঝে নতুন নতুন বিভিন্ন মত ও বিশ্বাসের উদ্ভব হতে থাকে এবং একে কেন্দ্র করে অসংখ্য দল-উপদল সৃষ্টি হতে থাকে। আর তাই ইতিহাস পর্যালোচনা করলে শিয়াদের দল-উপদলের সংখ্যা একশ-এর কাছাকাছি পাওয়া যায়। তবে এসব দল-উপদলের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলো ইমামিয়া সম্প্রদায়। বর্তমানে পৃথিবীতে যত শিয়া সম্প্রদায় আছে, সব ইমামিয়া সম্প্রদায়েরই শাখা-উপশাখা। ইমামিয়া সম্প্রদায় হজরত আলি রাযি.-এর পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে ইমামগণের বিদ্যমানতার আকিদা পোষণ করে এবং ইমামদের সম্পর্কে নানা রকম ভ্রান্ত আকিদা পোষণ করে। ইমামিয়া সম্প্রদায়েরও অনেকগুলো শাখা আছে। তন্মধ্যে তিনটি শাখা সবচেয়ে প্রসিদ্ধ : ইছনা আশারিয়া, ইসমাইলিয়া ও যায়দিয়া। শিয়া মতাদর্শের উৎপত্তি, পরিচিতি ও শাখা-প্রশাখা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভের জন্য দেখুন মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিত— ইসলামি ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ, ৩য় খণ্ড। [অনুবাদক]
৮৫. জাফর সাদিক ছিলেন ইসমাইলি ও দ্বাদশ ইমামবাদী উভয় সম্প্রদায়ের ঐকমত্যে শিয়াদের ষষ্ঠ ইমাম।
৮৬. শিয়া ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের বিস্তারিত ইতিহাস জানতে দেখুন: ইবনুল আছির কৃত আল-কামিল ফিত-তারীখ, ইবনে কাছির কৃত আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ও আবু শামা আল-মাকদিসি কৃত আর-রাওযাতাইন ফি তারীখিদ দাওলাতাইন আন-নূরিয়া ওয়াস-সালাহিয়া।

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 মাগরিব অঞ্চল ও আন্দালুসের পরিস্থিতি

📄 মাগরিব অঞ্চল ও আন্দালুসের পরিস্থিতি


আফগানিস্তান ও ভারতবর্ষে তখন চলছিল গজনবি পরিবারের শাসন। পরিতাপের বিষয় হলো, গজনবি রাজপরিবার তখন নিজেদের অস্তগামী সময়ে উপনীত হয়েছিল। ফলে ক্রুসেড আগ্রাসনের কেন্দ্রবিন্দু শাম অঞ্চলকে সহায়তা করার মতো শক্তি তাদের ছিল না। অধিকন্তু গজনবি রাষ্ট্রের অবস্থান ছিল শাম অঞ্চল থেকে বেশ দূরে।

ইয়ামেন ভূখণ্ডের শাসনক্ষমতা তিনটি গোত্রের মাঝে বিভক্ত ছিল—বনু নাজাহ, বনু ছুলায়হি ও বনু যুরাই। ক্ষমতা ও ভূখণ্ড দখল নিয়ে তাদের মধ্যে হানাহানি-সংঘাত লেগেই থাকত। অধিকন্তু তাদের অধিকাংশ ছিল শিয়া মতাবলম্বী। গোত্র-তিনটি মিশরের শিয়া উবায়দি সরকারের বশ্যতা স্বীকার করে চলত।

মাগরিব অঞ্চল ও আন্দালুসের পরিস্থিতি
তিউনিসিয়ায় তখন ছিল বনু যিরির শাসন। যিরি রাজপরিবারও ততদিনে ক্ষয়িষ্ণুপ্রায় শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। ফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক নগরী সিসিলি দ্বীপ মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। ইতালির নরম্যান গোষ্ঠী ৪৮৪ হিজরি সনে (১০৯১ খ্রিষ্টাব্দে) সিসিলিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং সেখানে যিরি রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের অবসান ঘটায়। এর ফলে একটানা দুইশ সত্তর বছরের ইসলামি শাসনের পর সিসিলি দ্বীপে মুসলিম-অস্তিত্বের বিলোপ ঘটে। (৮৭)

সমকালীন ইসলামি বিশ্বের একটিমাত্র অঞ্চলে তখন ইসলামি কর্তৃত্ব ও প্রভাব-প্রতিপত্তি বিদ্যমান ছিল; আর সেটি হলো মরক্কো, পশ্চিম আফ্রিকা ও আন্দালুস অঞ্চল। এই পুরো অঞ্চল তখন সুবিশাল মুরাবিতি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সময় মুরাবিতি সাম্রাজ্যের কান্ডারি ছিলেন ইসলামি ইতিহাসের অনন্যসাধারণ মহান সেনাপতি ও কালজয়ী মুরাবিতি শাসক ইউসুফ বিন তাশফিন রহ.। তিনিই ৪৭৯ হিজরি সনে (১০৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) আন্দালুসের মধ্যভাগে অবস্থিত যাল্লাকা প্রান্তরে সংঘটিত অবিস্মরণীয় এক যুদ্ধে স্পেন ও ফ্রান্স থেকে আগত ক্রুসেডার বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিলেন।

কিন্তু এই সুবিশাল ও শক্তিশালী মুরাবিতি সাম্রাজ্যও ক্রুসেড আগ্রাসনের মোকাবিলার ইসলামি প্রাচ্যকে সহায়তা করতে সক্ষম ছিল না। এর কারণ কেবল ভৌগোলিক দূরত্বই নয়; বরং মুরাবিতি সাম্রাজ্যের শতভাগ সামরিক শক্তি তখন সার্বক্ষণিকভাবে ব্যস্ত ছিল একদিকে উত্তর আন্দালুসের ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে, আরেকদিকে পশ্চিম আফ্রিকা ও মধ্য আফ্রিকার বিভিন্ন পৌত্তলিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে।

মোটামুটি এই হলো হিজরি পঞ্চম শতকের শেষভাগে (খ্রিষ্টীয় একাদশ শতকের শেষভাগে) ইসলামি বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর সাধারণ পর্যালোচনা। এই অধঃপতিত পরিস্থিতিই মূলত ক্রুসেডারদের সামনে আমাদের দুর্গসমূহে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত করেছিল। সামনের আলোচনায়ও এ বিষয়টি সুস্পষ্ট প্রতিভাত হবে যে, ক্রুসেডারদের আগ্রাসন তাদের সামরিক শক্তিবৃদ্ধির কারণে ছিল না; প্রকৃতপক্ষে আমাদের দুর্বলতা, বিভেদ-অনৈক্য, আমাদের শক্তির বিভক্তি এবং আমাদের দ্বীনবিমুখতাই ছিল এর কারণ। নিঃসন্দেহে এগুলো এমন কার্যকারণ, যার ধ্বংসাত্মক প্রভাবের বিষয়টি কোনো জ্ঞানী ও বোধসম্পন্ন ব্যক্তির কাছেই অস্পষ্ট নয়।

ক্রুসেড যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে এই ছিল মুসলিম বিশ্বের পরিস্থিতি। জানার বিষয় হলো, সেই যুগসন্ধিক্ষণে খ্রিষ্টান ইউরোপের পরিস্থিতি কেমন ছিল? সামনের পরিচ্ছেদে আমরা সে বিষয়টিই জানার চেষ্টা করব।

টিকাঃ
৮৭. দেখুন: ইবনে খালদুন, তারীখু ইবনি খালদুন, ৬/১৫৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00