📄 আব্বাসি খিলাফত ও শান্ত-সতর্ক ভাব!
আব্বাসি খিলাফতের সূচনা হয় ১৩২ হিজরি সনে (৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে)। আব্বাসি খিলাফতকালে ইসলামি রাষ্ট্র ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পারস্পরিক সংঘাতের তীব্রতা অনেকটাই ক্ষীণ ও দুর্বল হয়ে পড়ে। এর অন্যতম কারণ এই ছিল যে, আব্বাসি রাজপরিবার শাম অঞ্চলের পরিবর্তে ইরাক অঞ্চলের বাগদাদকে দারুল খিলাফত হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এর ফলে ইসলামি বিশ্বের মূলকেন্দ্র বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য হতে তুলনামূলক দূরে সরে যায়। (৩৪) অবশ্য এ সময় যুদ্ধাবস্থা পুরোপুরি স্থগিতও ছিল না। অধিকাংশ সময় উভয় সাম্রাজ্যের পারস্পরিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র হতো এশিয়া মাইনর অঞ্চল। এ সময়ের বিখ্যাত সংঘাতের মধ্যে আছে ২২৩ হিজরি সনে (৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে) বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য কর্তৃক আব্বাসি খলিফা মুতাসিমের জন্মস্থান যিবাত্রা নগরী (৩৫) ধ্বংস করা, এরপর একই বছর মুসলিম বাহিনী কর্তৃক তৎকালীন বাইজান্টাইন সম্রাট থিওফেল-এর জন্মস্থান আম্মুরিয়া নগরী বিজয়। (৩৬)
কৃষ্ণ সাগর • তুরস্ক ২ আম্মুরিয়া ভূমধ্যসাগর ৩ এন্টিয়ক সিরিয়া ১ যিবাত্রা ইরাক
মানচিত্র নং-৩ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আব্বাসি সাম্রাজ্যের যুদ্ধের ক্ষেত্রসমূহ
হিজরি তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যভাগে (খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীর মধ্যভাগে) আব্বাসি খিলাফতের কাঠামোতে ব্যাপক অবক্ষয় ও অধঃপতন দৃশ্যমান হতে শুরু করে। আব্বাসি সাম্রাজ্যের মাঝে গড়ে ওঠে ছোট ছোট বিভিন্ন রাষ্ট্র। যেমন: গজনবি রাষ্ট্র, সামানি রাষ্ট্র, যিরি রাষ্ট্র, হামদানি রাষ্ট্র, বুওয়াইহি রাষ্ট্র, ইখশিদি রাষ্ট্র ইত্যাদি। (৩৭)
টিকাঃ
৩২. প্রথম উমাইয়া খলিফা হজরত মুয়াবিয়া রাযি. হতে শুরু করে দ্বাদশ উমাইয়া খলিফা ৩য় ইয়াযিদ পর্যন্ত সকল উমাইয়া খলিফার দারুল খিলাফত ও রাজধানী ছিল দামেশক। একমাত্র ত্রয়োদশ ও সর্বশেষ উমাইয়া খলিফা মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ-এর দারুল খিলাফত ছিল 'হাররান'। দামেশক ও হাররান উভয় নগরীই শাম অঞ্চলে অবস্থিত। [অনুবাদক]
৩০. মুহাম্মাদ ইবনে জারীর তাবারি, তারীখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক, ৪/৬১।
৩৪. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৪৭-৪৮।
৩৫. যিবাত্রা: মালাতিয়া হতে চার ফরসখ দূরে অবস্থিত একটি সীমান্ত নগরী। ঘন জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত প্রাচীন এই রোমান নগরীটি ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি দুর্গ। হাবিব বিন মাসলামা আল-ফিহরি রাযি, নগরীটি জয় করেন। খলিফা ওয়ালিদ বিন ইয়াযিদের শাসনামলে রোমানরা দুর্গটি ধ্বংস করলে পুনরায় কোনোমতে দুর্গ নির্মাণ করা হয়। মারওয়ানের ফিতনার আমলে রোমানরা সেটিও ধ্বংস করে ফেলে। আব্বাসি খলিফা মানসুর দুর্গটি পুনর্নির্মাণ করলে রোমানরা আবারও তা ধ্বংস করে ফেলে। খলিফা হারুনুর রশিদ পুনরায় দুর্গ নির্মাণ করে সেখানে বসতি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেন। খলিফা মামুনের শাসনামলে রোমানরা যিবাত্রায় হামলা চালায় এবং অধিবাসীদের গবাদি পশুর পালে হানা দেয়। তখন মামুন দুর্গটির নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও সুদৃঢ় করার নির্দেশ দেন। দেখুন: হিময়ারি, আর-রাওযুল মি'তার ফী খবারিল আক্বতার, পৃষ্ঠা: ১/২৮৫।
৩৬. মুহাম্মাদ ইবনে জারীর তাবারি, তারীখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক, ৫/২৩৫।
৩৭. সাইদ আশুর, আল-হারাকাতুস সালীবিয়্যা, ১/৫০।
উল্লিখিত রাষ্ট্রগুলোর পরিচিতি, প্রতিষ্ঠা ও পতনকাল সম্পর্কে জানতে দেখুন- মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিত ইসলামি ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ, ৩য় খণ্ড।
📄 ইসলামি রাষ্ট্রের প্রভাব-প্রতিপত্তিতে ভাঙন
এর ফলে মুসলিম আব্বাসি খিলাফতের শক্তি, দাপট ও প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে। সুযোগ পেয়ে বাইজান্টাইনরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে আগ্রাসী অবস্থান গ্রহণ করে। এমনকি হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর শুরুতে (খ্রিস্টীয় দশম শতকে) জাযিরা অঞ্চলের(৩৮) বিভিন্ন নগরী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের দখলে চলে যায়। এরপর ৩৫০ হিজরি সনে (৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে) ক্রিট ও সাইপ্রাসসহ ভূমধ্যসাগরের মুসলিম নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন দ্বীপেরও পতন ঘটে। এর ফলে বাইজান্টাইন নৌবহর নতুন করে ভূমধ্যসাগরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ৩৫৮ হিজরি সনে (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) সংঘটিত হয় আরও ভয়াবহ দুর্যোগ, পতন ঘটে এন্টিয়ক(৩৯) নগরীর। ভৌগোলিক বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নগরী এন্টিয়কের পতন-ঘটনা ছিল ইসলামি বিশ্ব ও খ্রিস্টান বিশ্ব-উভয় সমাজের জন্যই ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। (৪০)
ইসলামি রাষ্ট্রের প্রভাব-প্রতিপত্তিতে ভাঙন
৩৫৮ হিজরি সনেই (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে এক ভয়াবহ দুর্যোগ সংঘটিত হয়। 'ফাতিমি সাম্রাজ্য' নামে প্রসিদ্ধ শিয়া উবায়দি রাষ্ট্রের হাতে পতন ঘটে সুন্নি মিশর অঞ্চলের। (৪১) এর ফলে ইসলামি বিশ্ব বড় দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে শিয়া বুওয়াইহি পরিবার নিয়ন্ত্রিত দুর্বল সুন্নি আব্বাসি খিলাফত, অপরদিকে শিয়া উবায়দি সাম্রাজ্য। উবায়দিরা ততদিনে উত্তর আফ্রিকা, মিশর ও শামের বিভিন্ন অংশে কর্তৃত্ব প্রতিষ্টা করেছিল। এই বিভক্তির অনিবার্য পরিণতি হিসেবেই মুসলিম উম্মাহর বিভেদ ও দুর্বলতা বৃদ্ধি পায়। ফলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যও ইসলামি ভূখণ্ডের বিভিন্ন অংশে নিয়মিত আক্রমণ হানার দুঃসাহস দেখাতে থাকে। হিজরি চতুর্থ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ (খ্রিষ্টীয় দশম শতকের দ্বিতীয়ার্ধ) ছিল বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সুবর্ণ কাল। এ সময় তারা ইরাক ও শামের উচ্চভূমিতে আক্রমণ চালায়। পরিস্থিতি এতটা শোচনীয় পর্যায়ে উপনীত হয় যে, মসুল, সিলভান (Meyafarikin/Silvan), দিয়ারে বকর (Diyarbakır) বরং হিমস ও দামেশক নগরীও তৎকালীন বাইজান্টাইন সম্রাট জন টিজিমিসকেস (John Tzimiskes)-কে জিজিয়া প্রদান করতে শুরু করে। (৪২)
এ বিষয়টিও এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বাইজান্টাইন সম্রাটের উল্লিখিত শেষ অভিযানটি ছিল আল-কুদস লক্ষ্য করে; কিন্তু তিনি আল-কুদস পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম হননি। এ যুদ্ধ চলাকালে তার বিভিন্ন উক্তি ও বার্তায় এমন সব ধর্মীয় উদ্ধৃতি ছিল, যা তার যুদ্ধনীতি ক্রুসেডীয় চেতনায় পূর্ণ থাকাকে সমর্থন করে। (৪৩)
এর শতাব্দীকাল পর ক্রুসেড যুদ্ধ চলাকালে শাম ও এন্টিয়ক অঞ্চলের বিভিন্ন নগরীর আইনগত অধিকার নিয়ে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য ও পশ্চিমা ক্রুসেডারদের মাঝে যে বিরোধ সংঘটিত হয়েছিল, তার পটভূমি ও প্রেক্ষাপট সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে শাম ও এন্টিয়ক অঞ্চলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের এই উপস্থিতির বিবরণ সহায়ক বিবেচিত হবে।
হিজরি পঞ্চম শতাব্দী (খ্রিষ্টীয় একাদশ শতাব্দী) ছিল উবায়দি সাম্রাজ্যের উত্থান ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অবসন্নতার কাল। এ সময় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য বুলগেরিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত ছিল। পাশাপাশি তারা ব্যস্ত ছিল খ্রিষ্টান আর্মেনিয়া রাজ্যের ভূমি দখলে। আর্মেনিয়ার সমৃদ্ধ, উর্বর ও প্রাচুর্যপূর্ণ উন্নত ভূমি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকে সেখানে হামলা চালাতে প্রলুব্ধ করেছিল। এই সুযোগে উবায়দিরা আলেপ্পো(৪৪) ও এন্টিয়ক বাদে শামের অধিকাংশ এলাকায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
টিকাঃ
৩৮. আল-জাযিরাতুল ফুরাতিয়া সংক্ষেপে 'জাযিরা' একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলের নাম। পূর্বে (পশ্চিম ইরানের) জাগ্রোস পর্বতমালা (The Zagros Mountains) থেকে নিয়ে উত্তরে (দক্ষিণ তুরস্কের) তোরোস পর্বতমালা (The Taurus Mountains) এবং দক্ষিণে শামের সামাওয়া মরুভূমি (The Syrian Desert) ও (ইরাকের) থার্চার হ্রদ (Lake Tharthar) পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। বর্তমান সিরিয়ার উত্তর-পূর্ব অংশ, ইরাকের উত্তর-পশ্চিম অংশ এবং তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইংরেজিতে অঞ্চলটিকে Upper Mesopotamia (মেসোপটেমিয়া উচ্চভূমি) বলা হয়। [অনুবাদক]
৩৯. এন্টিয়ক (Antioch) অতি প্রাচীন একটি নগরী। গ্রিক বীর আলেকজান্ডার (Alexander the Great)-এর সেনাপতি সেলিউকাস নিকাটর (Seleucus I Nicator) খ্রিষ্টপূর্ব ৩০১ সালে ভূমধ্যসাগরের উপকূল হতে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার পূর্বে আছি নদী (Orontes river) -এর তীরে নগরীটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজ পুত্র এন্টিওকাস (Antiochus I Soter)-এর নামে নগরীটির নাম 'এন্টিয়ক' রাখেন। আধুনিক তুরস্কের হাতায় প্রদেশ (Hatay Province)-এর অন্তর্গত নগরীটির বর্তমান নাম এন্টাকিয়া (Antakya)। আরবিতে নগরীটির নাম أنطاكية (আনতাকিয়া) [অনুবাদক]
40. Schlumberger: Un Empereur byzantin au Dixième siècle, Nicé-phore Phocas, 723.
৪১. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১১/২৬৬।
৪২. প্রাগুক্ত, ১১/২৭১।
8. Grousset: Hist, de IP' Armenie, p. 484. & Cam. Med. Vol. 4, p. 148.