📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 লেখকের ভূমিকা

📄 লেখকের ভূমিকা


মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের নিবিষ্ট পাঠকমাত্রই জানেন যে, কোনো একটি চিন্তাধারা অন্যের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়ার বা কোনো একটি মর্মকে পাঠক ও শ্রোতার কাছে বোধগম্য করে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ঘটনা বর্ণনার ধারা অন্যতম মৌলিক রীতি হিসেবে বিবেচিত হয়। পবিত্র কুরআনের চিন্তাশীল পাঠকের কাছে এ বিষয়টিও সুস্পষ্ট যে, কুরআনে যেসব ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো না কোনো শিক্ষা-উপদেশ বা কল্যাণবার্তা ধারণ করেই উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআন বিভিন্ন ঘটনাকে এমনভাবে চিত্রায়িত করেছে যে, ঘটনাগুলোকে আমাদের যাপিত জীবনের অতি ঘনিষ্ঠ বলে মনে হয়। পাঠক ভাবতে থাকেন—তিনি যেন স্বচক্ষে ঘটনাপ্রবাহ অবলোকন করছেন। মনে হয়—আরে! এদেরকে তো আমি চিনি! ব্যক্তিজীবনে তো এদের সঙ্গেই আমার ওঠা-বসা, সহাবস্থান; নামগুলোই শুধু ভিন্ন! আমাদের সমাজের অমুক ব্যক্তির আচরণ তো এই ঘটনার ফেরাউনের ন্যায়! অমুকের আচরণ কারুনের ন্যায়! আচরণে-উচ্চারণে অমুক যেন তালুতেরই প্রতিচ্ছবি আর অমুকের চরিত্রে যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে জুলকারনাইনের কর্মধারা! জীবনের নির্দিষ্ট একটি অঙ্গনে অমুক জাতির কর্মকাণ্ড যেন বনি ইসরাইলের মতো আর অমুক গোষ্ঠীর মাঝে যেন পাওয়া যাচ্ছে কুরআনে বর্ণিত ছামুদ জাতির আচার-আচরণ!

আমাদের বাস্তব জীবন ও জীবনযাত্রায় আমরা যা কিছু দেখি, সবকিছুরই সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত রয়েছে আল-কুরআনে। তাই যে জীবনপদ্ধতি আমাদের অনুসরণ করা উচিত, আল-কুরআন তার সুস্পষ্ট দলিল ও নির্দেশক। আর সেই পদ্ধতির পুরোটাই কুরআনে বিবৃত হয়েছে ঘটনা বর্ণনার শৈলীতে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা মুমিনদের ঘটনা ও ইতিহাস বর্ণনার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—
(فَاقْصُصِ الْقَصَصَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ)
সুতরাং আপনি (তাদেরকে) এসব ঘটনা শোনাতে থাকুন, যাতে তারা চিন্তা করে। [সুরা আ'রাফ : ১৭৬]

বিশ্ব মানবতার ইতিহাস এক অমূল্য জ্ঞানসম্পদ। মানব-ইতিহাসে আছে অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতার নির্যাস। একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির জন্য এমন ভুল করা মোটেও সমীচীন নয়, যা পূর্ববর্তী কেউ করেছে। নিষ্কৃতির উপায় সামনে থাকা সত্ত্বেও জীবনে চলার পথে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হওয়া বিবেচিত হয় মহা অন্যায় হিসেবে।

আপন ইতিহাস ও মানবেতিহাসকে তুচ্ছজ্ঞান করার কারণে মুসলিম উম্মাহ যুগে যুগে বহুবার পথ হারিয়েছে। বরং আরও অনুতাপের বিষয় হলো, জাতির কোমলমতি সন্তানরা যখন আপন জাতির ইতিহাস পাঠের মনস্থ করে, তখন তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ইতিহাস বিকৃতকারী লেখকদের রচিত ইতিহাস; যাতে তারা যুক্ত করেছে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জাল-বানোয়াট গল্প-কাহিনি, বিকৃত করেছে তথ্য-উপাত্ত, বদলে দিয়েছে প্রকৃত ঘটনা ও ঘটনাপ্রবাহ। ফলে ইতিহাসের সৎ চরিত্র পরিণত হয়েছে অসৎ চরিত্রে, অন্যায়ের দোসর পরিণত হয়েছে প্রজ্ঞাবان ব্যক্তিতে! এভাবে ঘটনা ও ইতিহাসের শিক্ষা ও মর্ম বদলে গেছে, হারিয়ে গেছে মূল উপদেশ ও দীক্ষার মর্মবাণী; মুসলিম উম্মাহ হারিয়ে ফেলেছে তাদের অতি মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদ।

সুতরাং আমাদের কর্তব্য হলো, আমরা ইসলামি ইতিহাসের প্রতিটি দিক নিয়ে সমৃদ্ধ অধ্যয়নের এক প্রচারণা ও আন্দোলন শুরু করব। এর মাধ্যমে আমরা উল্লিখিত সীমালঙ্ঘনসমূহের সংশোধন ও প্রতিকারবিধান করতে পারব এবং প্রতিটি বিষয়কে সঠিকভাবে জানতে পারব। আর ইনশাআল্লাহ এ পথ ধরেই আমরা এই সুবিশাল জ্ঞানসম্পদের সঠিক ব্যবহার করতে পারব।

বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি তেমনই একটি কর্মপ্রচেষ্টার ফসল। ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের সঠিক বিবরণ জানা এবং এ সম্পর্কিত ভুল ধ্যান-ধারণার অপনোদনের লক্ষ্যেই এই গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে। আর তা হচ্ছে ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস। 'ক্রুসেড যুদ্ধ' ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। অতীত ইতিহাস ও আমাদের যাপিত জীবনের বাস্তবতা— উভয় ক্ষেত্রের বিভিন্ন বিষয় সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হলে এ ইতিহাস অধ্যয়ন করা অপরিহার্য। অর্থাৎ ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস অধ্যয়ন ইসলামি ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধির জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ আমাদের বর্তমান জীবনের গতিধারা অনুধাবনের জন্যও।

বেশ কিছু কারণে আমরা ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিকে বেছে নিয়েছি। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ হলো—
[এক]
ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস কেবল ইসলামি ইতিহাস নয় বরং মানবেতিহাসেরই একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের বিবরণ। এর ব্যাপ্তি দুইশ বছরেরও অধিক। অর্থাৎ ইসলামি ইতিহাসের এক-সপ্তমাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে এই ইতিহাস। ইসলামি ইতিহাসের অধ্যয়ন যদি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, তাহলে এই সময়ের ইতিহাস অধ্যয়ন নিশ্চিত করেই আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হবে।

এ সময়ের ইতিহাস কেবল মুসলমানদের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের জ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাশীল সমাজও একে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ক্রুসেড যুদ্ধ ইউরোপীয় চিন্তা-চেতনা এবং কবি-সাহিত্যিক ও আপামর জনসাধারণের মন-মানসকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল একটানা তিন শতাব্দীরও অধিক সময়কাল ধরে; নির্দিষ্ট করে বললে ক্রুসেড যুদ্ধের সূচনাকাল ৪৮৮ হিজরি (১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) হতে শুরু করে সমাপ্তিরও পূর্ণ একশ বছর পর ৮০২ হিজরি (১৪০০ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত। বরং এখনো ইউরোপ-আমেরিকার প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রুসেড যুদ্ধ-ইতিহাসের গুরুত্ব সগৌরবে অধিষ্ঠিত আছে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ নরম্যান ফ্র্যাঙ্ক ক্যান্টোরের (৩) এক জরিপ অনুযায়ী আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হতে পাশ করা সাধারণ ছাত্ররা মধ্যযুগের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত কেবল একটি ঘটনার কথাই জানে— প্রথম ক্রুসেড অভিযানের ইতিহাস! তিনি জরিপে আরও জানতে পেরেছেন যে, এই অভিযান সম্পর্কে এসব ছাত্রের অনুভব-অনুভূতি অত্যন্ত ইতিবাচক। (৪)

[দুই]
যেহেতু কালগত দৃষ্টিকোণ থেকে ক্রুসেড ইতিহাসের ব্যাপ্তি বেশ দীর্ঘ, তাই এ ইতিহাস অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা ক্রুসেড যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিবাদমান পক্ষগুলোর নীতি-আদর্শও পর্যবেক্ষণ করতে পারব। সাময়িক ও অস্থায়ী বিষয়াদির ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য সমাজের চিন্তাধারা এবং সামরিক, রাজনৈতিক ও আইনের অঙ্গনের নীতি-নির্ধারকদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনেক সময়ই প্রচলিত ধারা হতে ব্যতিক্রমী হয়; কিন্তু ক্রুসেড যুদ্ধ তো কোনো সাময়িক বিষয় ছিল না। আর তাই ক্রুসেড-সংশ্লিষ্ট নীতি- আদর্শসমূহ টিকে ছিল দশকের পর দশক; বরং দুই শতাব্দী ধরে। এর অর্থ হলো-এসব নীতি ও আদর্শ সুদৃঢ় ও অটল বিশ্বাস-নির্ভর ছিল; কোনো অবিবেচক, হঠকারী বা নির্বোধের মস্তিষ্কপ্রসূত আকস্মিক পরিকল্পনা ছিল না।

ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা ইউরোপীয়দের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও পটভূমিও উপলব্ধি করতে সক্ষম হব। মূলত এসব পটভূমিকে কেন্দ্র করেই প্রাচীনকালে (রোমান সাম্রাজ্যের) খ্রিষ্টান জাতি ও মুসলিম জাতির মাঝে লড়াই ও সংঘাত আবর্তিত হতো। পাশাপাশি আমরা অবগতি লাভ করতে পারব মুসলিম নেতৃবৃন্দ, সেনানায়ক ও যোদ্ধাদের লড়াইয়ের পটভূমি, যুদ্ধনীতি, চুক্তিনীতি, অমুসলিমদের সঙ্গে আচরণনীতি এবং সংস্কার ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাদের গৃহীত নীতি সম্পর্কেও।

আর তাই এ দাবি করা যায় যে, নিঃসন্দেহে এই গ্রন্থ মানবজাতির মনোবৃত্তি ও মানসিকতা, চরিত্র ও নৈতিকতা এবং বিরোধ ও সংঘাতকালের নীতি ও শিষ্টাচার-বিশেষত সংঘাতের এক পক্ষ যদি হয় ইসলামি পরিচয় ধারণকারী-ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে অতি চমৎকার ও উৎকৃষ্ট এক গবেষণার নির্যাস।

[তিন]
ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা আরও অধিক ও সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়, যখন আমরা দেখতে পাই যে, নয়শ বছরেরও অধিক সময় পূর্বের সেই কালের সঙ্গে আমাদের বর্তমানের যাপিত কালের আশ্চর্য সাদৃশ্য রয়েছে।

নয়শ বছর পূর্বের সেই যুগসন্ধিক্ষণে যেমন ইসলামি বিশ্বের বিরুদ্ধে পুরো পশ্চিমা মিত্রশক্তি একজোট হয়েছিল, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সকলে অগ্রসর হয়েছিল একটি যুদ্ধের জন্য; রাজনীতিবিদ, সমরবিদ, অর্থনীতিবিদ, ধর্মগুরু, বিত্তশালী ও জ্ঞানীসমাজ সকলে সেই অভিযানের সফল বাস্তবায়ন ও সমাপনের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা করেছিল; আজকের পৃথিবীতেও নানা ভূখণ্ডে ইসলামি বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঐক্য, সহযোগিতা ও সমন্বয়ের সেই একই দৃশ্য।

ইতিহাসের পাতায় আমরা যেমন দেখি শাম অঞ্চলে (৫), ফিলিস্তিনে, তুরস্কের বিভিন্ন অংশে, মিশরে এমনকি হিজায-ভূমিতেও ক্রুসেডারদের আক্রমণ; এখনো আমরা দেখছি ফিলিস্তিন, ইরাক, আফগানিস্তান, চেচনিয়া, কাশ্মীর, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও কসোেভাসহ বিভিন্ন ইসলামি ভূখণ্ডে অব্যাহত হামলা ও আগ্রাসন। আমরা দেখছি নবোদ্যমে নানাবিধ কৌশলে সুদান, সোমালিয়া, লেবানন ও সিরিয়ায় আক্রমণের আয়োজন। মিশর, ইরান, পাকিস্তান বা তুরস্কও নীলনকশা ও লক্ষ্যবস্তুর বাইরে নয়। অতীতে ক্রুসেড যুদ্ধের কালে আমরা দেখেছি, ফিলিস্তিনে বহিরাগত এক রাষ্ট্রসত্তার বীজ রোপণ করা হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে The Kingdom of Jerusalem বা বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্য নামে পরিচিতি লাভ করে।

আমরা দেখেছি রোপিত সেই ক্রুসেড রাষ্ট্রকাঠামো বছরের পর বছর সগৌরবে টিকে থেকেছে এবং পশ্চিমা ক্রুসেডারদের সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতায় পুষ্ট হয়ে তার পরিধি ও প্রভাব দিনে দিনে বিস্তৃত হয়েছে। ঠিক তেমনই বর্তমানে আমরা দেখছি, সেই ফিলিস্তিন-ভূমিতেই এক ইহুদি রাষ্ট্রের বীজ রোপণ করা হয়েছে এবং পশ্চিমা ক্রুসেডারদেরই সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা পেয়ে তার আয়তন ও প্রভাব দিনে দিনে আরও বিস্তৃত ও ভয়ংকর হচ্ছে।

ইতিহাসের পাতায় আমরা পড়েছি-উপনিবেশনীতিই ছিল ক্রুসেড যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি; ইউরোপের খ্রিষ্টানসমাজের নারী-পুরুষ, আবালবৃদ্ধবনিতা নির্বিশেষে সকলে ইসলামি ভূখণ্ড অভিমুখে ছুটে এসেছিল যুদ্ধে জয়লাভ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে নয়; বরং নিজেদের সুপ্রাচীন নাড়ি ও শেকড়ের পরিচয় পুরোপুরি বিস্মৃত হয়ে বিজিত ভূখণ্ডের ভূ-মালিকানা লাভ করে সেখানেই বসতি স্থাপন করতে। আজ আমরা দেখছি, ইহুদি জাতি ঠিক একই কাজ করছে এবং না-ফেরার-সংকল্প লালন করে নিজেদের পরিবার-পরিজনসহ পবিত্র ভূমিতে স্থানান্তরিত হচ্ছে।

ক্রুসেড যুদ্ধের সেই চরম ক্রান্তিকালে আমরা আরব ও মুসলিম নেতৃবৃন্দের অনেকের মাঝেই দেখেছি হীনম্মন্যতা ও পরাভব মানসিকতা, দেখেছি এমন কিছু লাঞ্ছনাকর আচরণের বহিঃপ্রকাশ, যার একটাই অর্থ করা যেতে পারে-ক্রুসেড আগ্রাসনের মোকাবিলায় মুসলিম জাতির প্রতিরোধশক্তির আশঙ্কাজনক ক্ষয় ও পতন। ঠিক তেমনই বর্তমানেও আমরা দেখছি সেই একই ধরনের হীনম্মন্যতা ও চেতনাশূন্যতা; যেন একই দৃশ্যের পুনঃমঞ্চায়ন! সেদিনের মতো আজও ইসলামি বিশ্বের অধিকৃত রাষ্ট্র ও অঞ্চলগুলোর আক্রান্ত-নির্যাতিত মুসলমানদের সহযোগিতায় কোনো বাহিনীকে অগ্রসর হতে বা কোনো নেতাকে উদ্যোগী হতে দেখা যায় না।

অতীত ইতিহাসে আমরা যেমন দেখেছি, শাম অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন অংশগুলো যেন এক ও ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে, যেন একজোট হতে না পারে মিশর ও শাম, ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে কোনো দুই মুসলিম নেতা, সেজন্য ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর শত্রুরা প্রাণান্তকর অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে গেছে। কেননা, তারা যথার্থই উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে, মুসলিম শক্তির অনৈক্যের মাঝেই তাদের টিকে থাকা ও বেঁচে থাকার রহস্য নিহিত। ঠিক তেমনই প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আমাদের যাপিত যুগের পশ্চিমা ক্রুসেড শক্তিও। আর এ প্রচেষ্টায় তারা বলতে গেলে শতভাগ সফল। তাই তো বিশ্ব মানচিত্রে এমন দুটি প্রতিবেশী মুসলিম দেশ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যাদের মাঝে নেই কোনো বিরোধ ও সংঘাত! এভাবে তুলনা করলে ক্রুসেডকাল ও বর্তমান কালের মাঝে অসংখ্য সাদৃশ্য পাওয়া যাবে। আর তাই ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস আমরা যদি অধ্যয়ন করি বিস্তৃত পরিসরে, তাহলে অবশ্যই আমরা উপলব্ধি করব যে, আমরা যেন অতীতের কোনো ইতিহাস পাঠ করছি না; পাঠ করছি আমাদের যাপিত সময়ের বিবরণ, আমাদের বর্তমানের গল্প।

[চার]
ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাসে আরও একটি বিষয় সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়। আর তা হলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল একটি ইস্যুতেও মুসলিম উম্মাহর কাঠামোর অভ্যন্তরে ফিকর ও চিন্তাগত, ফিকহ ও বিধানগত এবং আকিদা ও বিশ্বাসগত মতানৈক্য; অন্যভাবে বললে শিয়া-সুন্নি বিরোধ। ক্রুসেড যুদ্ধ মূলত আবর্তিত হয়েছিল শাম ও মিশর অঞ্চলকে কেন্দ্র করে আর এ দুটি অঞ্চলে তখন একদিকে সুন্নি সেলজুক পরিবার ও অপরদিকে শিয়া উবায়দি পরিবারের কর্তৃত্ব ছিল। আর তাই আমাদের বর্তমান কালের এবং আগামীর পৃথিবীর বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের নেপথ্যের কার্যকারণসমূহ যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস নিশ্চিত করেই যথেষ্ট সহায়ক বিবেচিত হবে।

[পাঁচ]
ক্রুসেডারদের সঙ্গে সংঘাতের ইতিহাস অধ্যয়ন আমাদের বর্তমানের জন্যই কেবল উপকারী নয়; বরং আমাদের ভবিষ্যতের জন্যও পাথেয়রূপে গণ্য হবে। কেননা, এটি একটি সুস্পষ্ট বিষয় যে, কোনো কালেই এই সংঘাত শেষ হবে না, বিরোধ ও লড়াইয়ের চেতনা বিস্মৃত হবে না। হ্যাঁ, কখনো হয়তো স্তিমিত হবে, আবার কখনো নবোদ্যমে জোরদার হবে। এ সংঘাত চলবে কিয়ামত পর্যন্ত। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিভিন্ন হাদিসে এ বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী বর্ণিত হয়েছে। বিশুদ্ধ হাদিসে হিলাল ও ছালিবের (*) পারস্পরিক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সম্পর্কের চিত্র অব্যাহত থাকার বিষয়টি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ একটি হাদিস উল্লেখ করছি। হজরত আবু হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى يَنْزِلَ الرُّوْمُ بِالْأَعْمَاقِ أَوْ بِدَابِقٍ، فَيَخْرُجُ إِلَيْهِمْ جَيْشُ مِنَ الْمَدِينَةِ مِنْ خِيَارِ أَهْلِ الْأَرْضِ يَوْمَئِذٍ، فَإِذَا تَصَافُوْا قَالَتِ الرُّوْمُ : خَلُّوْا بَيْنَنَا وَبَيْنَ الَّذِينَ سَبَوْا مِنَّا نُقَاتِلْهُمْ. فَيَقُولُ الْمُسْلِمُوْنَ : لَا، وَاللَّهِ لَا تُخَلِّي بَيْنَكُمْ وَبَيْنَ إِخْوَانِنَا. فَيُقَاتِلُوْنَهُمْ، فَيَنْهَزِمُ ثُلُثُ، لَا يَتُوْبُ اللهُ عَلَيْهِمْ أَبَدًا، وَيُقْتَلُ ثُلُثُهُمْ، أَفْضَلُ الشُّهَدَاءِ عِنْدَ اللهِ، وَيَفْتَتِحُ الثُّلُثُ، لَا يُفْتَنُوْنَ أَبَدًا، فَيَفْتَتِحُوْنَ قُسْطَنْطِينِيَّةَ، فَبَيْنَمَا هُمْ يَقْتَسِمُوْنَ الْغَنَائِمَ قَدْ عَلَّقُوْا سُيُوفَهُمْ بِالزَّيْتُونِ إِذْ صَاحَ فِيهِمُ الشَّيْطَانُ : إِنَّ الْمَسِيحَ قَدْ خَلَفَكُمْ فِي أَهْلِيْكُمْ. فَيَخْرُجُونَ؛ وَذُلِكَ بَاطِلُ، فَإِذَا جَاءُوا الشَّامَ خَرَجَ، فَبَيْنَمَا هُمْ يُعِدُّوْنَ لِلْقِتَالِ يُسَوَّوْنَ الصُّفُوْفَ إِذْ أُقِيمَتِ الصَّلَاةُ، فَيَنْزِلُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ، فَأَمَّهُمْ، فَإِذَا رَآهُ عَدُوٌّ اللَّهِ ذَابَ كَمَا يَذُوبُ الْمِلْحُ فِي الْمَاءِ، فَلَوْ تَرَكَهُ لَا نُذَابَ حَتَّى يَهْلِكَ؛ وَلَكِنْ يَقْتُلُهُ اللهُ بِيَدِهِ، فَيُرِيْهِمْ دَمَهُ فِي حَرْبَتِهِ
কিয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত কায়েম হবে না, যতক্ষণ না রোমান সেনাবাহিনী (শামের অন্তর্গত) আ'মাক বা দাবিক নগরীতে অবতরণ করবে। তখন মদীনা হতে সমকালীন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনী তাদের মোকাবিলায় বের হবে। উভয় দল যুদ্ধক্ষেত্রে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানোর পর রোমানরা বলবে, 'তোমরা ওই সমস্ত লোকদের পৃথক করে দাও, যারা আমাদের লোকদের বন্দি করেছে; আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।' মুসলমানগণ উত্তর দেবে, 'না, আল্লাহর শপথ! আমরা কক্ষনো আমাদের ভাইদের তোমাদের জন্য পৃথক করে দেব না।'
অতঃপর মুসলমানরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। এ যুদ্ধে মুসলমানদের এক-তৃতীয়াংশ পালিয়ে যাবে; আল্লাহ তাআলা কক্ষনো তাদের তাওবা কবুল করবেন না। এক-তৃতীয়াংশ নিহত হবে; তারা আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম শহিদ বিবেচিত হবে। আর এক-তৃতীয়াংশ বিজয়ী হবে; জীবনে কখনো তারা (কুফরির) ফিতনার শিকার হবে না। তারাই কনস্টান্টিনোপল জয় করবে। তারা নিজেদের তরবারি যায়তুন গাছে ঝুলিয়ে রেখে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টন করতে থাকবে। ইত্যবসরে শয়তান তাদের মাঝে চিৎকার করে বলতে থাকবে, 'দাজ্জাল তোমাদের পেছনে তোমাদের পরিবার-পরিজনের মাঝে চলে এসেছে।' এ কথা শুনে মুসলমানরা সেখান থেকে বের হবে। অথচ তা ছিল মিথ্যা সংবাদ (গুজব)। তারা যখন শামে পৌঁছবে, তখন তার (দাজ্জালের) আবির্ভাব হবে। মুসলিম বাহিনী যখন যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করবে এবং সারিবদ্ধ হতে শুরু করবে, তখন নামাজের সময় হবে। অতঃপর ঈসা বিন মরিয়ম অবতরণ করবেন এবং নামাজে ইমামতি করবেন। আল্লাহর শত্রু (দাজ্জাল) তাকে দেখামাত্রই বিগলিত হতে শুরু করবে, যেমন লবণ পানিতে গলে যায়। যদি ঈসা তাকে এমনিই ছেড়ে দিতেন, তবুও সে বিগলিত হতে হতে ধ্বংস হয়ে যেত। অবশ্য আল্লাহ তাআলা ঈসার হাতে তাকে হত্যা করবেন এবং সবাইকে তার বর্শায় দাজ্জালের রক্ত দেখিয়ে দেবেন। (৭)

[ছয়]
উম্মাহর ইতিহাসের এই জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি অধ্যয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক ও কার্যকারণ হলো—ইতিহাসের এই অধ্যায়টিতে সংঘটিত ঘটনাসমূহের বর্ণনায় প্রচুর পরিমাণে মিথ্যা সংযুক্ত করা হয়েছে। সে সময়কার ঘটনাপ্রবাহের সাহিত্যমূল্য এবং লেখক, সংকলক ও সাহিত্যিকগণের এ বিষয়ের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণের কারণে মুসলিম ও পাশ্চাত্য উভয় পক্ষ হতেই এ কাজটি হয়েছে।

এটি কারও অজানা নয় যে, সাহিত্যিক ও ঔপন্যাসিকগণ অনেক সময় ঐতিহাসিক ঘটনার সত্যতার প্রতি তেমন একটা গুরুত্বারোপ করেন না; বরং ঘটনাকে চমকপ্রদ করে তুলতে কাজে লাগবে বলে মনে হয়, এমন কিছু পেলেই তা কাহিনির সঙ্গে জুড়ে দেন। অনেক সময় তারা কাল্পনিক চরিত্রও সৃষ্টি করেন; আবার বাস্তব চরিত্রের জন্য সৃষ্টি করেন কাল্পনিক কাহিনি। উদ্দেশ্য কোনো দাবিকে দৃঢ়মূল করা কিংবা কোনো চিন্তাধারাকে প্রতিষ্ঠিত করা। এর ফলে পাঠকের সামনে কিছুতেই প্রকৃত বাস্তবতা ফুটে ওঠে না; বরং পাঠক ও শ্রোতা লেখক-সাহিত্যিকের চিন্তাধারার গণ্ডিতে বন্দি হয়ে যায়।

এর বাইরে ইসলামি আদর্শকে কলুষিতকরণ, ক্রুসেডীয় চেতনাকে সমুন্নতকরণ এবং বাস্তবতা-বিবর্জিত পক্ষপাতমূলক তথ্য উপস্থাপনের বিশেষ লক্ষ্যকে সামনে রেখে যেসব জালিয়াতি ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত বিকৃতি করা হয়েছে, তা তো রয়েছেই।

ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বড় জালিয়াতি করা হয়েছে তার নামকরণেই! যুদ্ধ চলাকালে ও পরবর্তী যুগসমূহে 'ক্রুসেড যুদ্ধ' নামে কোনো শব্দের অস্তিত্ব ছিল না। এ নামটি মূলত প্রসিদ্ধি লাভ করে খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতক ও তৎপরবর্তী সময়ে। এর পূর্বে এ যুদ্ধের জন্য সবাই অন্যান্য বিভিন্ন নাম যেমন: অভিযান, তীর্থযাত্রীদের অগ্রযাত্রা, পবিত্র ভূমির সফর, পবিত্র যুদ্ধ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করত। অষ্টাদশ শতাব্দী ও তৎপরবর্তীকালে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নতুন এ নামটি জনপ্রিয় করে তোলা হয়। যেহেতু 'ক্রুসেড' শব্দটি একটি মহৎ ও অভিজাত লড়াইয়ের ভাব ধারণ করে, বীরত্ব ও আত্মত্যাগের চিত্র ফুটিয়ে তোলে এবং খ্রিষ্টান জাতির আত্মোৎসর্গের মর্ম প্রকাশ করে, তাই পরিকল্পিতভাবেই এ নামটি জনপ্রিয় করে তোলা হয়। অথচ নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, ক্রুসেড অভিযানসমূহে কখনোই এসব চেতনা ও বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি ছিল না। বরং প্রতিটি ক্রুসেড অভিযান ছিল হিংস্রতা ও কঠোরতা, নির্দয়তা ও নিষ্ঠুরতা এবং নিপীড়ন ও মানবতালঙ্ঘনের হাজারো দাস্তানে পরিপূর্ণ। কিন্তু ইউরোপীয় ও আমেরিকান সমাজের ব্যাপক ও গণ-অনুভূতি হলো-এ যুদ্ধ ছিল মহৎ ও উন্নত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কৃত সম্পূর্ণ মহান এক যুদ্ধ, যাতে ব্যবহৃত হয়েছিল মহৎ ও কল্যাণকর বিভিন্ন উপকরণ-মাধ্যম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যে ইরাকে আমেরিকার আগ্রাসনকে ‘ক্রুসেড যুদ্ধ’ নামে অভিহিত করেছেন, তার উদ্দেশ্যও এখান থেকে সহজে প্রতিভাত হয়। (৮) তিনি এই শব্দযুগল ব্যবহারের মাধ্যমে এ কথাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইরাকে আমেরিকার আগ্রাসন কোনো আক্রমণাত্মক বা বৈরিতাপূর্ণ প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং তিনি নিজে এবং আমেরিকান ও অন্যান্য অঞ্চলের খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠী যে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির অধিকারী, তারই বহিঃপ্রকাশ! এর মাধ্যমে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রতিটি খ্রিষ্টান জাতিগোষ্ঠীর কাছে এই বার্তা পৌঁছিয়ে দিয়েছেন যে, এটি একটি মহৎ ও কল্যাণকর যুদ্ধ। আমেরিকা মানবতার বৃহত্তর কল্যাণের লক্ষ্যেই এত ত্যাগ স্বীকার করে এ যুদ্ধ শুরু করেছে!

পরিভাষাগত এই মারাত্মক বিভ্রান্তি ও বিকৃতি সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো, এর থেকে বের হয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন। বিশেষত শেষ প্রজন্মের অধিকাংশ মুসলিম ঐতিহাসিকের অধ্যয়ন ও শিক্ষাগ্রহণ ইউরোপীয় শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে হওয়ায় তারা কোনো প্রকার প্রতিরোধ করা ব্যতিরেকেই ইউরোপীয়দের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণ, ইতিহাস-বিভাজন এবং ইতিহাস বর্ণনার ভাষা ও পরিভাষা সবকিছু গ্রহণ করে নিয়েছে। সুতরাং আমরা যদি প্রথম সাম্রাজ্যবাদী অভিযান, পশ্চিম ইউরোপের অভিযান, খ্রিষ্টানদের যুদ্ধ কিংবা এ জাতীয় অন্য কোনো পরিভাষা ব্যবহার করি, তা অনেকের কাছেই মোটেও বোধগম্য ও কার্যকর হবে না। 'ক্রুসেড যুদ্ধ' পরিভাষায় আচ্ছন্ন-মস্তিস্ক এসব পরিভাষা শুনে নিশ্চিতভাবেই এমন কোনো যুদ্ধ-ইতিহাস বা ঘটনাপ্রবাহের প্রতি ধাবিত হবে, যা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। একমাত্র এই কারণেই উক্ত নামকরণ আমাদের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত হওয়া সত্ত্বেও অনেকটা নিরুপায় হয়েই আমরা বক্ষ্যমাণ গ্রন্থের নাম 'ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস'-ই রেখেছি।

[সাত]
আলোচ্য বিষয় অধ্যয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো ক্রুসেডারদের এই হিংস্র আগ্রাসনের পেছনে কী কী কারণ, কার্যকারণ ও অনুপ্রাণিকা কার্যকর ছিল তার সঠিক বিশ্লেষণ করা। কারণ, ঐতিহাসিক ও বিশ্লেষকগণ এ বিষয়ে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কেউ কেউ ধর্মীয় চেতনাকেই ক্রুসেড অভিযানের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারও কারও মত হলো, অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্নই ছিল ক্রুসেড অভিযানের মূল অনুপ্রেরণা। তৃতীয় আরেক দলের মত হলো, প্রকৃতপক্ষে এ যুদ্ধের মূল কার্যকারণ ছিল রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ। চতুর্থ দলের বিশ্লেষকগণ নৈতিক ও চারিত্রিক বিভিন্ন অবক্ষয়কে এর কার্যকারণ সাব্যস্ত করার প্রয়াস চালিয়েছেন। এ ছাড়াও ঐতিহাসিক ও বিশ্লেষকগণের আরও কিছু দল-উপদল আছে, যারা ওপরের দুটি, তিনটি বা সবকটিকেই কার্যকারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অধিকন্তু কোনটি প্রধান কারণ, আর কোনটি কার্যকারণ—তা নির্ণয়েও আছে নানা মুনির নানা মত।

অর্থাৎ ইতিহাস বিশ্লেষকগণের চিন্তা, মেধা ও প্রচেষ্টা এ যুদ্ধের কার্যকারণ নির্ণয়ে যথেষ্ট কাজ করেছে এবং প্রত্যেক বিশ্লেষক ও পাঠকের মেধাগত, বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় পটভূমির আলোকে বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রকাশ পেয়েছে।

[আট]
আমাদের এই গবেষণাকর্মের আরেকটি লক্ষ্য হলো ইসলামি ইতিহাসের মহান মনীষী ও মুজাহিদগণের অনেকের সংগ্রামী জীবনের উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোকে সুস্পষ্ট করা। ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে যারা মোটামুটি ধারণা রাখে, তাদের সিংহভাগই মনে করে যে, ক্রুসেডীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সকল কৃতিত্ব একমাত্র মহাবীর সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ.-এর। হ্যাঁ, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে, সালাহুদ্দিন আইয়ুবি রহ. ছিলেন ইসলামি ইতিহাসের অনন্যসাধারণ এক সংগ্রামী মুজাহিদ, ক্ষণজন্মা এক সমরনায়ক; কিন্তু ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও প্রতিরোধের অবিস্মরণীয় ইতিহাসে তিনিই একমাত্র অগ্রনায়ক নন। তার পূর্বে যেমন অনেক মহান বীরপুরুষ এই দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন, আঞ্জাম দিয়েছেন তার পরেরও অনেকে। অথচ অধিকাংশ মুসলমান তাদের নামও জানে না। মহান মুজাহিদ মওদুদকে কয়জন চেনে? কয়জন চেনে সুকমান বিন উরতুককে? কতজন জানে আক সুনকুর-এর পরিচয় ও ইতিহাস? এমন আরও কত মহান মুজাহিদ রয়েছেন, ক্রুসেড ইতিহাসে যাদের নিবেদন ও অবদান অবিস্মরণীয়। বরং ক্রুসেড যুদ্ধ ইতিহাসের সুপ্রসিদ্ধ শাহসওয়ার যারা ইমাদুদ্দিন জিনকি, নুরুদ্দিন মাহমুদ বা নাজমুদ্দিন আইয়ুব প্রমুখ মুসলিম বীরদের জীবনবৃত্তান্তই জানা আছে কয়জনার?!

এই গবেষণাপত্র আমাদের সামনে এ বিষয়টি সুপ্রতিষ্ঠিত করবে যে, ইসলামি ভূখণ্ডকে ক্রুসেডারদের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে যে কর্মপ্রচেষ্টা সাধিত হয়েছে, তা গুটিকয়েক ব্যক্তির প্রচেষ্টা নয়; বরং একটি সম্মিলিত ও জাতীয় প্রচেষ্টা। এ বিষয়টিও সুপ্রমাণিত হবে যে, আমাদের ইতিহাসে এমন অনেক নিভৃতচারী ধর্মীয় ব্যক্তি রয়েছেন, কোনো মানুষ যাদের কথা ভাবেও না। প্রমাণিত হবে, মুসলিম উম্মাহ কল্যাণের পথে ছিল-আছে এবং থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত।

[নয়]
ক্রুসেডারদের হাত থেকে মুসলমানদের ভূখণ্ড মুক্ত করতে আলিমসমাজেরও যে বিরাট ভূমিকা আছে, তা ঐতিহাসিকগণের অনেকেই উপেক্ষা করেন এবং এড়িয়ে যান। তাদের আলোচনায় উল্লেখ থাকে কেবল রাষ্ট্রনায়ক, সেনাপতি ও যোদ্ধাদের ভূমিকা ও অবদানের কথা এবং যুদ্ধ ও সামরিক তৎপরতার বিবরণ। অথচ এটি সম্পূর্ণই বস্তুনিচয়ের স্বভাব-প্রকৃতি এবং মুসলিম উম্মাহর সংস্কার ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার শাশ্বত রীতির বিরোধী। সুন্নাতুল্লাহ ও শাশ্বত রীতির সুদৃঢ় সংযোগ ও সংশ্লিষ্টতা তো আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তন, প্রায়োগিক জীবনে শরিয়তের বাস্তবায়ন, হালাল ও ন্যায়ের প্রতি আগ্রহ এবং হারাম ও অন্যায়কে প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে। আর প্রতিযুগে এ দায়িত্বটি আঞ্জাম দিয়েছেন উম্মাহর একনিষ্ঠ উলামায়ে কেরাম। ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাসেও এমন আলিমের সংখ্যা অনেক। কিন্তু খুব কম সংখ্যক লেখক ও বিশ্লেষক তাদের প্রতি গুরুত্ব নিবদ্ধ করেছেন। অথচ ক্রুসেড যুদ্ধ-ইতিহাসে তাদের ভূমিকা ও অবদান উপলব্ধি করা এবং তাদের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা ব্যতীত আমরা কিছুতেই জাতির নির্মাণ ও বিনির্মাণের পথ এবং সংকট হতে নিষ্কৃতি ও উত্তরণের পদ্ধতি উপলব্ধি করতে পারব না।

[দশ]
ক্রুসেড যুদ্ধ-ইতিহাস অধ্যয়নের আরেকটি কারণ হলো, এ যুদ্ধের সৃষ্ট প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি। এ যুদ্ধের প্রভাব কেবল যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার দুইশ বছরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এরপরও দীর্ঘ কাল ধরে এর প্রভাব কার্যকর ছিল। ক্রুসেড যুদ্ধের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কয়েক বছর নয়; কয়েক শতাব্দী বিস্তৃত। বরং আমরা আমাদের এই বর্তমান যুগেও ক্রুসেড যুদ্ধের তিক্ত প্রতিক্রিয়া ভোগ করছি। সম্ভবত এই যুদ্ধের সবচেয়ে সুস্পষ্ট ও সরাসরি প্রভাব হলো সুমহান ইসলামি সভ্যতার অগ্রযাত্রা থমকে যাওয়া। ইসলামি সভ্যতা যখন উপনীত হয়েছিল মর্যাদার সুউচ্চ শিখরে এবং ছড়িয়ে পড়ছিল আপন অনুপম রূপ-গুণ ও মাধুর্য নিয়ে, তখনই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল খ্রিষ্টান ক্রুসেড শক্তি। তখন সবকিছু বাদ দিয়ে মুসলিম উম্মাহ তার যাবতীয় শক্তি ও প্রচেষ্টা নিবদ্ধ রেখেছিল প্রতিরোধ যুদ্ধে; এ কাজেই ক্ষয় ও নিঃশেষ করেছিল নিজেদের সর্বোচ্চ সামর্থ্যটুকু। ফলে বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে মুসলিম জাতি যেভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে সভ্যতা ও সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছিল, হঠাৎ করেই যেন তা স্তিমিত হয়ে পড়েছিল।

ক্রুসেড আগ্রাসনের কারণে শুধু যে ইসলামি সভ্যতার অগ্রযাত্রা স্থগিত হয়ে গেছে তা-ই নয়; আরেক দিক থেকেও হয়েছে উম্মাহর অপূরণীয় ক্ষতি। ভয়াবহ ক্রুসেড যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইসলামি ভূখণ্ডগুলো থেকে, বিশেষ করে আন্দালুস উপদ্বীপ ও সিসিলি(৯) দ্বীপ থেকে, কখনো শাম অঞ্চল থেকে ক্রুসেডার শক্তি লুট করে নিয়ে গেছে 'তুরাসুল ইসলামি' ও সুমহান ইসলামি জ্ঞানসম্পদ। এরপর তারা প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও গুরুত্বের সঙ্গে সেগুলোর অনুবাদ শুরু করেছে এবং নিবেদিতপ্রাণ হয়ে সেগুলোর অধ্যয়ন ও বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করেছে। খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দী ও তৎপরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠিত ইউরোপিয়ান সভ্যতার মূল ভিত্তি নিঃসন্দেহে সেই 'চুরি-করা জ্ঞানসম্পদে'র ওপরই স্থাপিত।

আজ আমরা দেখছি, এই পরিবর্তনগুলোর কারণে মানবতার গতিপথই বদলে গেছে। একটি জাতি দিনে দিনে পতন ও অধঃপতনের অতল গহ্বরে নিপতিত হয়েছে, আরেকটি জাতি উন্নতি ও অগ্রগতির পথে অগ্রসর হয়েছে। স্বীকার করি, এটিই মুসলিম উম্মাহর চলমান সংকটের একমাত্র কারণ নয়; কিন্তু নিশ্চিত করেই এটি সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারণ।

আর হয়তো একে কেন্দ্র করেই আমাদের আলোচনা-পর্যালোচনা মাঝেমধ্যেই চলে যাবে ইসলামি বিজয়াভিযানের ইতিহাসের দিকে। প্রসঙ্গক্রমেই আসবে ক্রুসেড অভিযান ও ইসলামি বিজয়াভিযানের তুলনা। কত পার্থক্য দুটির মাঝে! কার্যকারণ ও চালিকাশক্তি, মাধ্যম ও উপকরণ এবং প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল—সব বিচারেই দুয়ের মাঝে আকাশপাতাল তফাত।

ইসলামি বিজয়াভিযানের কার্যকারণ ও অনুপ্রাণিকা ছিল জনসাধারণের স্কন্ধমূল থেকে নিপীড়ন ও অনাচারের জোয়াল অপসারণ করা এবং কোনো প্রকার জবরদস্তি ও বাধ্যবাধকতা ব্যতীত সকলকে সুমহান ধর্ম ইসলামের সঙ্গে পরিচিত করা। আবার অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামি বিজয়াভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি ভূখণ্ড ঘিরে-থাকা বিভিন্ন বিধর্মী শক্তির বেপরোয়া সীমালঙ্ঘন থেকে আত্মরক্ষা করা।

যুদ্ধক্ষেত্রে উপায়-উপকরণ ও নীতি-আদর্শ অবলম্বনের ক্ষেত্রেও ইসলামি বিজয়াভিযানসমূহ ছিল আভিজাত্যের সর্বোচ্চ স্তরের নমুনা। সম্ভবত মুসলিম উম্মাহই একমাত্র জাতি, যারা জানে যুদ্ধনীতি ও যুদ্ধ-আচরণনীতির মর্ম। ইসলামি বিজয়াভিযান ও ক্রুসেড অভিযানের মাঝে মোটা দাগের একটি পার্থক্য হলো, ইসলামি অভিযানসমূহ বিজিত অঞ্চলের সাধারণ নাগরিকদের কষ্টপ্রদান হতে পুরোপুরি মুক্ত। এ ছাড়াও যুদ্ধবন্দিদের সঙ্গে সদাচরণ, শত্রুপক্ষের সেনাপতি ও নেতৃবৃন্দ বন্দি হলে তাদের সঙ্গে উদার, মহৎ ও অনুপম আচরণ ইত্যাদি তো আছেই।

ইসলামি বিজয়াভিযানের প্রতিক্রিয়া ও ফলাফলও অন্যান্য জাতির যুদ্ধাভিযানের ফলাফল হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্যান্য জাতির যুদ্ধাভিযানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে প্রতিপক্ষের সভ্যতা-সংস্কৃতি ধ্বংস করে ফেলা এবং মানবতার অগ্রযাত্রাকে প্রতিরোধ ও স্তিমিত করা। অপরদিকে মুসলিম অভিযাত্রীদের সংকল্প ও আকাঙ্ক্ষা থাকে জ্ঞানের প্রসার ও গুণের বিকাশ এবং বিজিত জনগোষ্ঠীকে হাতে ধরে উন্নতি-অগ্রগতির মহিমান্বিত স্তরে পৌঁছিয়ে দেওয়া।

নিরপেক্ষ যে কেউ তাকাতে পারে ইসলামপূর্ব আন্দালুস ও ইসলামি আন্দালুসের দিকে।
অধ্যয়ন করতে পারে ইসলামপূর্ব মিশর ও ইসলাম-পরবর্তী মিশরের ইতিহাস।
অবলোকন করতে পারে ইসলামপূর্ব মাগরিব (১০) ও ইসলামি মাগরিব অঞ্চলকে।
বুখারা, সমরকন্দ, শাম ও ইয়ামেনের বিভিন্ন অঞ্চল এবং আরও অনেক দেশের ইসলামপূর্ব পরিস্থিতি এবং ইসলামের আগমনপরবর্তী পরিস্থিতি অধ্যয়ন করতে পারে যেকোনো ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি।

সর্ব বিবেচনায় এবং সকল মানদণ্ডে ইসলামি বিজয়াভিযানসমূহ ছিল মানবিক সভ্যতার ধারক ও পরিবাহক।
ক্রুসেড যুদ্ধ-ইতিহাসে আমরা কখনো এর ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাইনি; পাইনি অন্য এমন কোনো বিজয়াভিযানে, যা কোনো বিশুদ্ধ ধর্ম বা সুদৃঢ় নীতির দ্বারস্থ হয়নি।

টিকাঃ
৩. কানাডা ও আমেরিকার যৌথ নাগরিক নরম্যান ফ্র্যাঙ্ক ক্যান্টোর (Norman Frank Cantor) ছিলেন নিজ যুগের একজন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও লেখক। তার অধ্যয়ন ও গবেষণার মূল বিষয় ছিল মধ্যযুগের ইতিহাস। জন্ম ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ নভেম্বর কানাডার উইনিপেগে, মৃত্যু ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে। তার রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ Medieval history: the life and death of a civilization আরবিতে التاريخ الوسيط : قصة الحضارة - البداية والنهاية নামে ড. কাসিম আবদুহু কাসিম কর্তৃক অনূদিত হয়েছে। [অনুবাদক]
৪. নরম্যান ফ্রাঙ্ক ক্যান্টোর, আত-তারীখুল ওয়াসিত কিসসাতুল হাযারা-আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২/৩৯১-৩৯২।
৫. প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধ মূলত তিনটি অঞ্চলকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছিল। ১. এশিয়া মাইনর অঞ্চল ২. শাম অঞ্চল ৩. ফিলিস্তিন অঞ্চল। এখানে আমরা সংক্ষেপে অঞ্চল-তিনটির পরিচিতি তুলে ধরছি। [এক] এশিয়া মাইনর অঞ্চল এশিয়া মহাদেশের একটি বিশেষ অংশের নাম এশিয়া মাইনর। ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগরের মধ্যে সীমাবদ্ধ অঞ্চলটি আনাতোলিয়া নামেও পরিচিত ছিল। এ অঞ্চলটিই বর্তমানে আধুনিক তুরস্ক রাষ্ট্র। অঞ্চলটির উত্তরে কৃষ্ণসাগর, পশ্চিমে এজিয়ান সাগর, দক্ষিণে আধুনিক সিরিয়া ও ভূমধ্যসাগর। আর পূর্ব সীমান্তে আছে বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চল, যা আধুনিক রাষ্ট্রসীমায় আর্মেনিয়া ও ইরানের মধ্যে পড়েছে। মার্সিন (Mersin) নগরীর নিকটবর্তী ভূমধ্যসাগরের উপকূলীয় এলাকা থেকে শুরু হয়ে উত্তর-পূর্বে আর্মেনিয়ান মালভূমির কৃষ্ণসাগরের নিকটবর্তী অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত তোরোস পর্বতমালা এশিয়া মাইনর অঞ্চলের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব সীমানার প্রাকৃতিক প্রহরীরূপে কাজ করে বিধায় বাইজান্টাইন শাসকপরিবার এশিয়া মহাদেশের এই অঞ্চলটিকে নিজেদের সাম্রাজ্যের কেন্দ্রভূমি নির্বাচন করেছিল। [দুই] শাম অঞ্চল প্রাচীন শাম বা সিরিয়া একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলের নাম, যার বিস্তৃতি ছিল ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীর হতে মেসোপটেমিয়া (Mesopotamia) অঞ্চল পর্যন্ত। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন (ইসরাইল অধিকৃত অঞ্চলসহ পশ্চিম তীর ও গাজা) এবং আধুনিক সউদি আরবের আল-জাওফ প্রদেশ ও উত্তর সীমান্ত অঞ্চল ঐতিহাসিক শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়াও ১৯২১ সালে ফ্রান্স ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত আঙ্কারা চুক্তি অনুযায়ী বর্তমান দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের যেসব এলাকা তুরস্কের অন্তর্ভুক্ত হয়, সেগুলোও ঐতিহাসিক শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তুরস্কের সানজাকে ইসকানদার (The Sanjak of Alexandretta) অঞ্চলও শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়াও আধুনিক মিশরের সিনাই উপদ্বীপ ও ইরাকের মসুল অঞ্চলের কিছু অংশও শাম অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। একদল ঐতিহাসিকের মতে পুরো সিনাই উপদ্বীপ ও সাইপ্রাসও ঐতিহাসিক শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অবশ্য খ্রিষ্টপূর্ব ৬৪ সালে রোমানরা শাম অধিকার করার বহু পূর্বে মেসোপটেমিয়া অঞ্চল শাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের অধিকারে চলে যায় এবং পরবর্তী সময়ে (পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের স্থলাভিষিক্ত) সাসানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ফলে শামের আয়তনে পরিবর্তন ঘটে এবং শাম ভূমধ্যসাগরের তীর হতে ফুরাত নদীর তীর পর্যন্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বর্তমান সউদি আরবের আল-জাওফ প্রদেশের অন্তর্গত দুমাতুল জান্দাল ছিল তৎকালীন শামের দক্ষিণ সীমান্ত আর উত্তর সীমান্ত ছিল দক্ষিণ তুরস্কের তোরোস পবর্তমালা। প্রাক-ইসলামি যুগ ও ইসলামি যুগে শাম বলে উল্লিখিত অঞ্চলকেই বোঝানো হতো। বলাবাহুল্য, প্রাচীন শাম বা সিরিয়াকে আধুনিক সিরিয়া রাষ্ট্রের পরিসরে সীমাবদ্ধ মনে করলে অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বোধ্যতা ও জটিলতা সৃষ্টি হবে। [তিন] ফিলিস্তিন অঞ্চল ফিলিস্তিন মূলত শাম অঞ্চলেরই একটি অংশ। তবে ঐতিহাসিক পটভূমিসহ বিভিন্ন গুরুত্ব বিবেচনায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকায় অঞ্চলটি আলাদাভাবেও আলোচিত হয়। অতীতে ফিলিস্তিন শব্দটি শাম অঞ্চলের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের জন্য ব্যবহৃত হতো। শামের এ অংশটি এশিয়া মহাদেশের পশ্চিম অংশে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের সংযোগস্থল এবং ইসলামি বিশ্বের দুই ডানার মিলনস্থল বিবেচনা করা হয়। ১৯২০ থেকে ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ব্রিটিশ দখলদারিত্বের সময়ের পূর্বে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের সীমানা কখনোই নিখুঁতভাবে সুনির্দিষ্ট ছিল না। বরং এর পূর্বে কালের পরিক্রমায় ফিলিস্তিনের সীমানায় বিভিন্ন সময়ই হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটেছে। তবে সাধারণত ফিলিস্তিন বলে পশ্চিমের ভূমধ্যসাগর হতে পূর্বের মৃত সাগর ও জর্ডান নদীর মধ্যবর্তী ভূখণ্ডকেই বোঝানো হতো।
বিশ্বমানচিত্রে সবার উত্তরে এশিয়া মাইনর অঞ্চলের অবস্থান, তার দক্ষিণে শাম অঞ্চল এবং সবার দক্ষিণে ফিলিস্তিন অঞ্চল। [অনুবাদক]
*. হিলাল, ক্রিসেন্ট বা নবচন্দ্র ইসলামের প্রতীক হিসেবে এবং ছালিব, ক্রুশ বা কাষ্ঠদণ্ড খ্রিষ্টবাদের প্রতীক হিসেবে প্রসিদ্ধ। [অনুবাদক]।
৭. ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৮৯৭, হাকিম, মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং ৮৪৮৬ ও ইমাম ইবনে হিব্বান আল-বুসতি, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৬৮১৩। আলোচ্য হাদিসটির কিছু কিছু অংশের মর্ম উপলব্ধি করা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ বিধায় শাইখুল ইসলাম আল্লামা মুফতি তকি উসমানি দা. বা.-কৃত সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম' (৬/২৩১-২৩৫) হতে নির্বাচিত কিছু অংশের ব্যাখ্যা উল্লেখ করা হলো। [অনুবাদক]
আ'মাক: এটি একটি স্থানের নাম। আল্লামা তীবি রহ. মিশকাতের ব্যাখ্যাগ্রন্থে (১০/৭৮) তুরিবিশতি রহ.-এর বরাতে উল্লেখ করেছেন, 'এটি মদিনার প্রান্তে অবস্থিত একটি স্থান।' অপরদিকে নববি রহ. উল্লেখ করেছেন, 'এটি আলেপ্পোর নিকটবর্তী একটি স্থান।' ইয়াকুত আল-হামাবির মত দ্বিতীয় উক্তিটিকে সমর্থন করে। তিনি বলেছেন, 'এটি আলেপ্পো ও এন্টিয়কের মাঝে অবস্থিত দাবিকের নিকটবর্তী ছোট একটি বসতি।' (মুজামুল বুলদান, ১/২২২)।
দাবিক: এটিও একটি স্থানের নাম। তুরিবিশতি রহ. এর পরিচিতি-ব্যাখ্যায় বলেছেন, 'এটি মদিনার নিকটবর্তী খেজুরকুঞ্জবিশিষ্ট একটি বাজারের নাম।' কিন্তু অন্যান্য গ্রন্থের বিবরণ এর বিপরীত। ইয়াকুত আল-হামাবি মুজামুল বুলদান গ্রন্থে (৩/৪১৬) বলেছেন, 'এটি আলেপ্পোর নিকটবর্তী আযায অঞ্চলভুক্ত একটি গ্রাম। আলেপ্পো থেকে দাবিকের দূরত্ব চার ফরসখ।'= =তখন মদিনা হতে... একটি বাহিনী তাদের মোকাবিলায় বের হবে: আবী রহ. বলেছেন, 'মদিনা শব্দটি দ্বারা মদিনাতুন্নবী উদ্দেশ্য হতে পারে। কারণ, (আরবি) মদিনা শব্দটি উক্ত নগরীর নামে পরিণত হয়েছে। অপরদিকে হাদিসের পূর্বাপর বর্ণনাধারা দ্বারা অনুমিত হয় যে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য শামের কোনো নগরী।' আলি ক্বারি রহ. মিরকাত গ্রন্থে (১০/১৪৬) উল্লেখ করেছেন, "ইবনুল মালাক বলেছেন, 'এক মত অনুসারে এর (মদিনা) দ্বারা উদ্দেশ্য আলেপ্পো। আর আমাক ও দাবিক তো আলেপ্পোরই নিকটবর্তী দুটি স্থান। আরেক মতানুসারে এর দ্বারা উদ্দেশ্য দামেশক নগরী।' ইবনুল মালাক-ই মাবারিকুল আযহার গ্রন্থে বলেছেন, 'মদিনা দ্বারা মদিনাতুন্নবী উদ্দেশ্য হওয়ার মতটি দুর্বল। কারণ, হাদিসের শেষাংশে এ নির্দেশনা রয়েছে যে, রোম অভিমুখে বের হওয়া বাহিনী দ্বারা উদ্দেশ্য মাহদির বাহিনী।'...।"
যারা আমাদের লোকদের বন্দি করেছে; আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব: আলোচ্য অংশের শব্দটিকে কেউ কেউ 'সীন' ও 'বা' অক্ষরে যবর চিহ্নযোগে কর্তৃবাচ্যবোধক ক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে বাক্যটির অর্থ হলো, 'আমরা শুধু তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব, যারা ইতিপূর্বে আমাদের দেশে গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং আমাদের সন্তানদের বন্দি করেছে।' মূলত তারা এ কথা বলে যেসব মুসলমান ইতিপূর্বে তাদের ভূখণ্ডে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি, তাদের প্রতি কৃত্রিম হৃদ্যতা প্রকাশ করবে এবং তাদেরকে প্রবঞ্চিত করে মুসলমানদের মাঝে পারস্পরিক বিভেদ সৃষ্টি করতে চেষ্টা করবে।
অন্যদের মতে হাদিসের উক্ত শব্দটি 'সীন' ও 'বা' অক্ষরে পেশ চিহ্নযোগে কর্মবাচ্যমূলক ক্রিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাদের মতে বাক্যটির অর্থ হলো, 'আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাই, যারা ইতিপূর্বে আমাদের দলভুক্ত ছিল, এরপর মুসলমানরা তাদের বন্দি করে নিয়ে এসেছে, এরপর কিছুদিন ইসলামি রাষ্ট্রে অবস্থান করে তারা মুসলমান হয়ে গেছে এবং পরবর্তী সময়ে তারা আমাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করতে শুরু করেছে।'
কাজি ইয়াজ রহ. প্রথম মতটিকে সঠিক বলেছেন। কিন্তু আল্লামা নববি রহ. বলেছেন, 'আমার মতে উভয় মতই সঠিক। কারণ, তারা প্রথমে বন্দি হয়েছে, এরপর কাফিরদের বন্দি করেছে। আমাদের বর্তমান যুগে এমন অনেক মানুষই আছে। বরং শাম অঞ্চল ও মিশরের ইসলামি বাহিনীসমূহের অধিকাংশ সদস্য প্রথমে বন্দি ক্রীতদাস ছিল; এখন তারাই (ইসলামে দীক্ষিত হয়ে) কাফিরদের বন্দি করছে। ....'
আল্লাহ তাআলা কক্ষনো তাদের তাওবা কবুল করবেন না: অর্থাৎ মুসলিম জামাতের এক- তৃতীয়াংশ সৈন্য রোমকদের কাছে পরাজয় স্বীকার করে পালিয়ে যাবে। এরপর তাদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়নের গুনাহ থেকে তাওবার তাওফিক হবে না এবং আমলনামায় এ গুনাহ নিয়েই তারা মারা যাবে। আলি ক্বারি রহ. মিরকাত গ্রন্থে (১০/১৪৭) বলেছেন, 'হাদিসে এ বিষয়ের ইঙ্গিত রয়েছে যে, তারা কাফির অবস্থায় মারা যাবে এবং চিরস্থায়ী শাস্তি ভোগ করবে।'
তারাই কনস্টান্টিনোপল জয় করবে: কনস্টান্টিনোপলের বর্তমান নাম ইস্তাম্বুল। হাদিসের এ অংশটি বাহ্যত এ কারণে দুর্বোধ্য মনে হয় যে, ইতিহাস-বিখ্যাত উসমানি সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ (বহু বছর পূর্বে) ৮৫৭ হিজরির জুমাদাল উলা মাসে =কনস্টান্টিনোপল জয় করেছেন এবং তখন থেকে এখনো পর্যন্ত সেখানে মুসলমানদের কর্তৃত্ব বজায় আছে। কিন্তু কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর তো (দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও) এখনো দাজ্জাল আবির্ভূত হয়নি। অথচ হাদিসের বাহ্যিক বর্ণনাভঙ্গিতে প্রতীয়মান হয় যে, মুসলমানরা কনস্টান্টিনোপল জয় করে শামে ফেরার অব্যবহিত পরেই দাজ্জাল আবির্ভূত হবে?!
এই প্রশ্নের উত্তর দু-ভাবে দেওয়া যায়।
১. হাদিসটি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, দাজ্জালের আবির্ভাবের পূর্বে অবশ্যই কনস্টান্টিনোপল আবারও কাফিরদের দখলে চলে যাবে। এরপর মুসলমানরা তা পুনঃবিজয় করবে। শায়খ সাহারানপুরি রহ. বাজলুল মাজহুদ গ্রন্থে (১৭/২০৯) এ দিকে ইঙ্গিত করেই লিখেছেন, 'কনস্টান্টিনোপল বিজয় দ্বারা উদ্দেশ্য মাহদি কর্তৃক বিজয়।'
২. নবীযুগ ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে কনস্টান্টিনোপল ছিল রোমান কাফিরদের রাজধানী। কাজেই আলোচ্য হাদিসে কনস্টান্টিনোপল দ্বারা বর্তমানে ইস্তাম্বুল নামে পরিচিত কনস্টান্টিনোপল নগরী উদ্দেশ্য না হয়ে কাফির রাষ্ট্রসমূহের বড় কোনো রাজধানী উদ্দেশ্য হতে পারে। এ কারণেই হাদিসটির কোনো কোনো বর্ণনায় কনস্টান্টিনোপলের পরিবর্তে মদিনা (নগরী) শব্দটি এসেছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থের ৪২৯৬ নং হাদিস।...।
এখানে এ বিষয়টিও জ্ঞাতব্য যে, কিয়ামতের নিদর্শন-সংক্রান্ত হাদিসসমূহে কেবল সেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথাই উল্লেখ করা হয়েছে, যা কিয়ামত সন্নিকটতার বিশেষ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হবে। কোনো কোনো বর্ণনায় এসব নিদর্শন একটির পর আরেকটি এমনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাহ্যত মনে হবে, নিদর্শনগুলো কালের ব্যবধান ব্যতিরেকে অনবরত সংঘটিত হতে থাকবে। অথচ এমনটি ঘটা মোটেও অসম্ভব নয় যে, দুটি নিদর্শনের মাঝে বিরাট কালগত দূরত্ব থাকবে।... সুতরাং আলোচ্য হাদিসের ভিত্তিতে সুনিশ্চিতভাবে এ দাবি করা যায় না যে, মহাযুদ্ধের পরপরই কনস্টান্টিনোপল বিজিত হবে বা কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের অব্যবহিত পরেই দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে। বরং প্রত্যেক দুই ঘটনার মাঝে কয়েক বছরের বা কয়েক শতাব্দীর ব্যবধানও হতে পারে।
তারা যখন শামে পৌঁছবে, তখন তার (দাজ্জালের) আবির্ভাব হবে: হতে পারে মুসলিম বাহিনীর শামে আগমন এবং দাজ্জালের আবির্ভাব কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পরপরই হবে, আবার উভয় ঘটনার মাঝে কালগত বিরাট দূরত্বও হতে পারে; যেমনটি আমরা পূর্বে বলে এসেছি। বাহ্যত যদিও প্রথম সম্ভাবনাটি প্রকাশ পাচ্ছে; কিন্তু উভয় সম্ভাবনার কোনোটিকেই সুনিশ্চিত বলা যায় না।
৮. প্রেসিডেন্ট বুশের এ জাতীয় উক্তিসমূহ সম্পর্কে জানতে দেখুন : https://bit.ly/27.yH9m4। [অনুবাদক]
৯. সিসিলি: সিসিলি (Sicily) ভূমধ্যসাগরের সর্ববৃহৎ দ্বীপ। পার্শ্ববর্তী আরও কিছু ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে বর্তমানে এটি ইতালির একটি সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। সমৃদ্ধ ও বিরল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারী সুপ্রাচীন সিসিলি দ্বীপে ইসলামি বিজয়াভিযানের প্রথম যুগেই অভিযান পরিচালিত হয় এবং বিজিত হয়। এরপর কালের পরিক্রমায় বিভিন্ন সময় দ্বীপটির ওপর মুসলমানদের কর্তৃত্ব হাতছাড়া যেমন হয়েছে, পুনঃপ্রতিষ্ঠিতও হয়েছে। সর্বশেষ ১০৭২ খ্রিষ্টাব্দে নরম্যানদের হাতে সিসিলির পতন ঘটে। মধ্যযুগে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সিসিলি দ্বীপ বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী ছিল। আরবিতে দ্বীপটিকে صقلية )সিকিল্লিয়া) বলা হয়। [অনুবাদক]
১০. বর্তমানে আফ্রিকা মহাদেশের রাষ্ট্র মরক্কোকে আরবিতে 'মাগরিব' বলা হলেও অতীতে মাগরিব বলে উত্তর আফ্রিকার বিস্তৃত একটি অঞ্চলকে বোঝানো হতো। বর্তমান মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার যেসব অংশ সুউচ্চ অ্যাটলাস পর্বতমালার উত্তরে ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত, সেগুলোকে বলা হতো 'মাগরিব'। ব্যাপকতর অর্থে কেউ কেউ লিবিয়া ও মৌরিতানিয়াকেও এর অন্তর্ভুক্ত ধরতেন। অ্যাটলাস পর্বতমালা ও সাহারা মরুভূমির কারণে মাগরিব অঞ্চলটি ছিল আফ্রিকার অন্যান্য অংশ থেকে তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন।
এরপর হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দী হতে আরবগণের ভাষা-ব্যবহারে মাগরিব অঞ্চলকে তিনভাগে বিভক্তিকরণ পাওয়া যায়-১. (আল-মাগরিবুল আদনা) নিকট-মাগরিব অঞ্চল ২. (আল-মাগরিবুল আওসাত) মধ্য-মাগরিব অঞ্চল ও ৩. (আল-মাগরিবুল আকছা) দূর-মাগরিব অঞ্চল।
আল-মাগরিবুল আদনার বিস্তৃতি ছিল পূর্বে ত্রিপোলি হতে পশ্চিমে বিজায়া নগরী পর্যন্ত; আধুনিক রাষ্ট্রসীমায় যার অবস্থান লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও পূর্ব আলজেরিয়াজুড়ে। আল-মাগরিবুল আওসাতের বিস্তৃতি ছিল পূর্বে তিয়ারিত নগরী হতে পশ্চিমে মাওলাওয়া নদী (The Moulouya River) ও তাজা (Taza) পর্বতমালা পর্যন্ত; আধুনিক রাষ্ট্রসীমায় যার অবস্থান আলজেরিয়ার বাকি অংশ ও মরক্কোর কিছু অংশজুড়ে। আর আল-মাগরিবুল আকছার বিস্তৃতি ছিল পূর্বে মাওলাওয়া নদী হতে পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত; আধুনিক রাষ্ট্রসীমায় যার অবস্থান মরক্কো রাষ্ট্রজুড়ে। [অনুবাদক]

📘 ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


এমনটি হওয়া সমীচীন নয় যে, আমাদের ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস অধ্যয়ন আমাদের যাপিত জীবনের বাস্তবতা হতে বিচ্ছিন্ন থেকে যাবে। বরং এমনটিই হওয়া সমীচীন যে, আমরা যখন এই ইতিহাস পাঠ করব, তখন আমাদের চিন্তাজগৎজুড়ে বিচরণ করবে ফিলিস্তিন, ইরাক, আফগানিস্তান, চেচনিয়া, কাশ্মীর ও মুসলিম উম্মাহর কাছ থেকে লুণ্ঠিত প্রতিটি জনপদ।
ইহুদি, আমেরিকান, রুশ ও হিন্দুদের কাছে আমাদের এসব ভূখণ্ড হারানোর কারণ ও কার্যকারণ সেগুলোই, যেগুলো ছিল ক্রুসেডারদের হাতে শাম ও ফিলিস্তিন পতনের কারণ। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের এই বর্তমান সংকট হতে উত্তরণের পথ ও পদ্ধতি ঠিক সেটিই, যে পথে উম্মাহর সংগ্রামী যোদ্ধাগণ এবং সংস্কারকগণ চলেছেন।
আমরা এ গ্রন্থে ক্রুসেড যুদ্ধের সূচনা-ইতিহাস ও ইমাদুদ্দিন জিনকি রহ.-এর ইতিহাস আলোচনা করেছি; এখনো রয়ে গেছে নুরুদ্দিন মাহমুদ, সালাহুদ্দিন আইয়ুবি ও তাদের পরবর্তী অনেক মুজাদ্দিদ ও সমাজ সংস্কারকের ইতিহাসের অনেক পৃষ্ঠা। আমাদের এই পরিভ্রমণের দৈর্ঘ্য তো দুইশ বছর; আমরা অতিক্রম করেছি মাত্র পঞ্চাশ বছর!
নিঃসন্দেহে ইতিহাস অত্যন্ত উপভোগ্য ও আগ্রহ সৃষ্টিকারী, কৌতূহলোদ্দীপক ও মুগ্ধকর। কিন্তু ইতিহাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তার উপভোগ্যতায় বা মুগ্ধতা সৃষ্টি করায় নয়। ইতিহাসের 'অমূল্য' মূল্যমানের কারণ ইতিহাসের বারংবার পুনরাবৃত্তি। আর তাই ইতিহাস অধ্যয়নের অর্থ কল্যাণ ও উপকারের পুনরাবৃত্তি, ভুলত্রুটি ও সমস্যা থেকে নিষ্কৃতি। ইতিহাস এক অনিঃশেষ সম্পদভান্ডার, কূল-কিনারাহীন এক সাগর। আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের জন্য সকল কাঙ্ক্ষিত বিষয় বাস্তবায়ন করেন, ইতিহাসের শিক্ষা-উপদেশ ও কল্যাণ-ছোঁয়ায় আমাদেরকে সংকট ও দুর্যোগ থেকে উদ্ধার করেন।
নিঃসন্দেহে তিনি তা বাস্তবায়নে সক্ষম। তিনি বান্দার আহ্বানে সাড়া প্রদানে ক্ষমতাবান।
আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে সম্মান ও মর্যাদা দান করেন।
-ড. রাগিব সারজানি কায়রো ১ মার্চ, ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00