📄 হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম
হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর একজন শ্রেষ্ঠ রসূল। তিনি বনী ইসরাঈল বংশে জন্মলাভ করেছিলেন এবং তাদের জন্যই রসূল হিসেবে এসেছিলেন। তাঁর জন্ম আল্লাহ তা'আলার অসীম শক্তির প্রমাণ। আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আলাইহিস সালামকে মাতা-পিতা ছাড়াই সৃষ্টি করেছিলেন। আর হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করেছিলেন পিতা ছাড়াই। হযরত মারিয়াম (আ) ছিলেন তাঁর মা। তাই তাঁকে ঈসা ইবনে মারিয়াম বলা হয়।
হযরত ঈসার (আ) মা হযরত মারিয়াম (আ) মায়ের পেটে থাকতেই তাঁর মা হান্না বিবি মানত করেছিলেন যে, তাঁর গর্ভের সন্তানকে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ঘর বায়তুল মাকদাসের খাদেম বানাবেন। কিন্তু সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে দেখা গেল পুত্র সন্তান জন্মলাভ না করে মেযে সন্তান জন্মলাভ করেছে। তিনি তাঁর এ মেয়ের নাম রাখলেন মারিয়াম। একটু বড় হলে মেয়েকেই তিনি বায়তুল মাকদাসের খেদমতের জন্য নিয়োজিত করলেন। হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম ছিলেন বায়তুল মাকদাসের মোতাওয়াল্লী। তিনি ছিলেন হযরত মারিয়ামের আত্মীয়। তাঁর তত্ত্বাবধানে তিনি বায়তুল মাকদাস সংলগ্ন একটি আলাদা কামরায় থাকতেন। অত্যন্ত পবিত্র পরিবেশে তিনি লালিত পালিত এবং বড় হতে থাকলেন। যাকারিয়া (আ) খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য মাঝে মাঝে তাঁর কামরায় প্রবেশ করতেন। যখনই তিনি যেতেন তখনই দেখতেন বালিকা মারিয়ামের কামরায় অনেক সুমিষ্ট ফল-মূল। এ দেখে তিনি আশ্চর্য হয়ে যেতেন। ভাবতেন অসময়ে মারিয়াম এসব কোথা থেকে পায়? একদিন তিনি মারিয়ামকে জিজ্ঞেস করলেনঃ মারিয়াম তুমি এসব ফল-মূল কোথা থেকে পাও? এ সর্ তো এখন পাওয়ার কথা নয়! মারিয়াম বললেনঃ মহান আল্লাহ আমাকে এ সব ফল-মূল দান করেন। এ সব ঘটনা থেকেই বুঝা যায় যে, হযরত মারিয়াম ছিলেন আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় পাত্রী।
মারিয়াম সেখানে বড় হলেন এবং যৌবনে পদার্পণ করলেন। এ সময় একদিন আল্লাহর ফেরেশতা হযরত জিব্রাঈল (আ) তাঁর কাছে এসে বললেনঃ আমি আল্লাহর দূত। আল্লাহ আমাকে তোমার কাছে পাঠিয়েছেন। আমি তোমাকে (আল্লাহর হুকুমে) একটা সন্তান দান করবো। এ বলে হযরত জিব্রাঈল (আ) তাঁর বুকে একটি ফুঁ দিলেন। হযরত মারিয়াম গর্ভবতী হলেন এবং বায়তুল মাকদাসের অদূরে এক স্থানে একটি সন্তান প্রসব করলেন। তিনি সন্তানের নাম রাখলেন ঈসা। মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ট হওয়ার পর পরই ঈসা কথা বলে উঠলেন। হযরত মারিয়াম অত্যন্ত খুশী হলেন। তাঁর সব দুঃখ দূর হয়ে গেল। লজ্জা ভয় কোন কিছুই আর তাঁর থাকলো না। শিশু সন্তান কোলে নিয়ে ফিরে আসতে দেখে দুশ্চরিত্র ইয়াহুদীরা তাঁকে অনেক গাল-মন্দ দিতে লাগলো। কিন্তু তিনি কোন কথা বললেন না, শুধু শিশুর দিকে ইশারা করলেন অর্থাৎ এ শিশুই সব কথা বলবে। সবাই বলে উঠলো, এ দোলনায় শায়িত শিশুর সাথে আমরা কেমন করে কথা বলবো? সে কি কথা বলতে পারবে? তখন শিশু নবী হযরত ঈসা (আ) কথা বলে উঠলেন।
তিনি বললেন, "আমি আল্লাহর বান্দা। আল্লাহ মানুষের হেদায়াতের জন্য আমাকে কিতাব দান করেছেন। তিনি আমাকে নবী হিসেবে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন।" সদ্য প্রসূত শিশুর মুখে এসব কথা শুনে সবাই তাজ্জব বনে গেল। তারা তাঁকে বিশ্বাস করলো এবং কোন কিছু না বলে চলে গেল।
হযরত ঈসা (আ) ধীরে ধীরে বড় হলেন এবং নবুওয়াত লাভ করলেন। এ সময় বনী ইসরাঈলগণ আল্লাহর সব নির্দেশ ভুলে গিয়েছিল। তারা শির্ক ও আরো অনেক গোনাহর কাজে লিপ্ত ছিল। রাজা বাদশারাই আবার বেশী করে আল্লাহ ও তাঁর আদেশ নির্দেশ ভুলে গিয়েছিল। এনটিওকস নামে এক রাজা তার আমলে জোর পূর্বক বায়তুল মাকদাসের মধ্যে মূর্তি স্থাপন এবং লোকজনকে তার পূজা করতে বাধ্য করেছিল। আল্লাহর নামে কুরবানী করা বন্ধ করে দিয়েছিল। যারা বাড়িতে তাওরাত গ্রন্থ রাখতো সে তাদের মৃত্যুদন্ড দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল। হযরত ঈসা (আ) তাদের এসব অন্যায় কাজ করতে নিষেধ করলেন। তারা যে সব অন্যায় কাজ করতো তিনি সে সব কাজ সম্পর্কেও তাদের সাবধান করে দিলেন।
ইয়াহুদরা তাঁর এসব কথা ভাল মনে করলো না। তারা তাঁর বিরোধিতা শুরু করলো। কেউ যাতে তাঁর কথা না মানে সেজন্যও তারা চেষ্টা করতে লাগলো। ইয়াহুদ আলেমরাও তাঁকে নবী বলে স্বীকার করলো না। হযরত ঈসা (আ) যখন দেখলেন যে, কেউ তাঁর কথা শুনছে না তখন তিনি সবাইকে ডেকে বললেন: আল্লাহর দ্বীনের কাজে আমাকে কে সাহায্য করতে পার? তাঁর এ আহবানে একদল মৎস্যজীবী জেলে তাঁর ওপর ঈমান এনে তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। এঁদেরকে কোরআন মজীদে হাওয়ারী বলা হয়েছে। হাওয়ারীরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হযরত ঈসা (আ) কে সাহায্য করেছেন।
হযরত ঈসাকে (আ) আল্লাহ তা'আলা অনেক মু'জিযা দান করেছিলেন। তিনি আল্লাহর হুকুমে মৃত মানুষকে জীবিত করতে পারতেন। কুষ্ঠ ও অন্যান্য কঠিন রোগ ভাল করতে পারতেন। মাটি দিয়ে পাখি তৈরী করে তাতে ফুঁক দিলে তা জীবিত হয়ে উড়ে যেতো। লোকেরা কি খেতো এবং বাড়িতে কি জমা করে রাখতো আল্লাহর হুকুমে তাও তিনি বলতে পারতেন।
ইয়াহুদদের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ এবং অন্যায় কাজ করতে নিষেধ করার কারণে তারা তাঁর শত্রু হয়ে গেল এবং তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করলো। তারা দেশের শাসনকর্তার কাছে গিয়ে হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে এ বলে অভিযোগ করলো যে, তিনি লোকদের তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছেন। শাসনকর্তা ইয়াহুদদের কথায় বিশ্বাস করলো। সে হযরত ঈসা (আ)-কে হত্যা করার জন্য লোক পাঠালো। ইয়াহুদরা তাঁকে গ্রেফতার করার ব্যাপারে সাহায্য করলো। গ্রেফতার করে তাঁকে একটি ঘরে বন্দী করে রাখা হয় এবং পরে শূলে চড়িয়ে হত্যা করার সিদ্ধান্ত হয়। তাঁকে ধরে আনার জন্য প্রথমে ঘরের মধ্যে একটি লোক প্রবেশ করে। কিন্তু সে হযরত ঈসা (আ)-কে সেখানে দেখে আশ্চর্য হয়ে যায়। পরে অন্যান্য লোকেরা সেখানে গিয়ে ঐ লোকটিকে হযরত ঈসা (আ)-এর আকৃতিতে দেখতে পায় এবং তাঁকে ঈসা মনে করে শুলে চড়িয়ে হত্যা করে।
এদিকে হয়েছে কি! আল্লাহ তাঁর প্রিয় রসূলের এরূপ বিপদ দেখে তাঁকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করেন। তিনি নিজের অসীম কুদরতে তাঁকে উঠিয়ে নেন। আর যে লোকটি হযরত ঈসা (আ)-কে ধরে আনার জন্য প্রথমে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেছিল তাকে ঈসার আকৃতি দান করেন। লোকেরা মনে করলো সেই বুঝি ঈসা। তাই তাকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করলো। মহান আল্লাহ এভাবে তাঁর নবীকে রক্ষা করলেন।
কিয়ামতের পূর্বে দাজ্জালকে হত্যা করার জন্য তিনি আবার দুনিয়াতে আসবেন। তবে তখন তিনি নবী হিসেবে আসবেন না।
অনুশীলনী
১। হযরত ঈসাকে (আ) ঈসা ইবনে মারিয়াম বলা হয় কেন?
২। হযরত মারিয়ামের কামরায় গিয়ে হযরত যাকারিয়া (আ) কি দেখতে পেতেন?
৩। কিভাবে বুঝা যায় যে, হযরত মারিয়াম আল্লাহর প্রিয় পাত্রী ছিলেন?
৪। ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল এসে মারিয়ামকে কি বললেন?
৫। দুশ্চরিত্র ইয়াহুদরা হযরত মারিয়ামকে গাল-মন্দ দিল কেন? জবাবে তিনি কি বললেন?
৬। বনী ইসরাঈলদের অবস্থা কিরূপ ছিল?
৭। হযরত ঈসার (আ) ডাকে কারা সাড়া দিয়েছিল? তাঁর কি কি মু'জিযা ছিল?
৮। ইয়াহুদরা তাঁর শত্রু হলো কেন? তিনি আবার কি দুনিয়ায় আসবেন?
📄 শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সালালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
আল্লাহ তা'আলা দুনিয়াতে যত নবী ও রসূল পাঠিয়েছেন হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের মধ্যে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রসুল। তিনি ৫৭০ ঈসায়ী সনে আরব দেশের মক্কা নগরে জন্মলাভ করেছিলেন। তিনি আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ বংশ কুরাইশ বংশে জন্মলাভ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ আর মায়ের নাম আমিনা। জন্মের কয়েক মাস পূর্বেই পিতা ইনতিকাল করেন। আর জন্মের ছয় বছর পর ইনতিকাল করেন মা।
তোমরা জান মানুষ যখনই আল্লাহকে ভুলে যেতো এবং নানা রকম অন্যায় কাজ-কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়তো তখনই আল্লাহ তাদের সৎ পথে আনার জন্য নবী এবং রসূল পাঠাতেন। হযরত মুহাম্মাদ (স)-কেও আল্লাহ তা'আলা একই উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে ছিলেন। তবে তাঁর আগে যত নবী ও রসূল দুনিয়াতে এসেছিলেন তাঁদের একটা জাতি বা এলাকার জন্য পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু হযরত মুহাম্মাদ (সা)-কে পাঠানো হয়েছিল সারা দুনিয়ার জন্য। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে সারা দুনিয়ার মানুষকে হিদায়াত করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন শেষ নবী ও রসূল। তাঁর পর আর কোন নবী বা রসূল আসবেন না।
তিনি যে সময় আরবে জন্মলাভ করেন সে সময় আরবের মানুষেরা পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তারা পরস্পর মারামারি করতো। গোত্রে-গোত্রে ও এলাকায় এলাকায় সব সময় হিংসা বিদ্বেষ লেগেই থাকতো। মানুষ মানুষকে খুন করতে মোটেই পিছপা হতো না। মেয়েদের সাথে তারা জঘণ্য ব্যবহার করতো। কারো ঘরে মেয়ে জন্ম নিলে তাকে জীবিত পুঁতে ফেলতো। ভাল ব্যবহার তারা জানতো না। লজ্জা-শরম বলতে কিছুই তাদের ছিল না। তারা উলঙ্গ হয়ে কা'বা ঘরে তাওয়াফ করতো। হাটে-বাজারে মানুষ কেনা-বেচা করতো। যে সব মানুষদের তারা কিনে আনতো তাদের বলা হতো দাস। দাসদের তারা নির্দয়ভাবে শাস্তি দিতো। তাদের দিয়ে কঠিন কঠিন কাজ করাতো কিন্তু ঠিকমত খেতে দিতো না। আসরে বসে পাল্লা দিয়ে মদ খেতো, জুয়া খেলতো। গর্ব আর অহংকার করা ছিল তাদের স্বভাব। এ ধরনের আরো অনেক খারাপ কাজ তারা করতো।
এরূপ এক অসভ্য সমাজে আমাদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (স) জন্মলাভ করেন। আরবের সম্ভ্রান্ত খানদানের নিয়ম অনুসারে জন্ম লাভের পর নবী (স)-কে মক্কার বাইরের এক বেদুইন পরিবারে হালীমা নাম্নী এক ধাত্রীর কাছে প্রতিপালনের জন্য দিয়ে দেয়া হলো। হালীমা তাঁকে নিজের গ্রামের বাড়িতে নিষে গেলেন। এখানকার মুক্ত আলো বাতাসে নবী (স) বড় হয়ে উঠতে লাগলেন। হালীমা তাঁকে আপন সন্তানের মত আদর যত্ন করতেন। হালীমার আদর-স্নেহ ও যত্নে লালিত পালিত হয়ে একটু বড় হলে তিনি তাঁকে নিয়ে মক্কায় এলেন এবং তাঁর মা আমিনার কাছে নিয়ে গেলেন।
বিবি আমিনা শিশু নবী মুহাম্মাদ (স)-কে সাথে করে মদীনায় তাঁর বাপের বাড়িতে গেলেন। উদ্দেশ্য ছিল সেখানে গিয়ে স্বামীর কবর যিয়ারত করা। মদীনা থেকে ফেরার সময় পথিমধ্যে আমিনাও ইনতিকাল করলেন। তিনি রেখে গেলেন ছয় বছরের ইয়াতীম মুহাম্মাদ (স)-কে। দাসী উম্মে আয়মান তাঁকে সাথে করে মক্কায় ফিরে এলেন। তখন থেকে তাঁকে প্রতিপালনের ভার নিলেন দাদা আবদুল মুত্তালিব। দাদা তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। কিন্তু দু' বছর পর দাদাও মারা গেলেন। এবার মহানবীর লালন-পালন ও দেখা শোনার ভার নিলেন চাচা আবু তালেব। চাচা তাঁকে খুবই স্নেহ করতেন। তিনিও বিভিন্ন কাজে চাচাকে সাহায্য করতেন। একবার ব্যবসা উপলক্ষে চাচা তাঁকে সিরিয়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
নবী (স) কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করলেন। তিনি কাউকে ঠকাতেন না। মিথ্যা কথা বলতেন না। সবাই মদ পান করতো কিন্তু তিনি মদ স্পর্শও করতেন না। কারো সাথে ঝগড়া করতেন না। সাধ্যমত গরীব ও অসহায়দের সাহায্য করতেন। তাঁর চরিত্র ছিল অতি পবিত্র। তাই লোকে তাঁকে আল-আমীন বা বিশ্বাসী বলে ডাকতো। লোকেরা তাঁর কাছে মূল্যবান জিনিস- পত্র আমানত রাখতো।
এ সময় মক্কায় একজন ধনী মহিলা ছিলেন। তাঁর নাম ছিল খাদীজা। তিনি সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের মেয়ে। তাঁর ছিল বিরাট ব্যবসা। অঢেল ছিল তাঁর ধন-সম্পদ। তিনি ছিলেন সৎ। তাঁর ব্যবহার ছিল কোমল। তাঁর সৎ চরিত্র ও কোমল ব্যবহারের কারণে সবাই তাঁকে 'তাহেরা' বা পবিত্র মহিলা বলে ডাকতো। তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য দেখা শোনার জন্য এক সময় একজন সৎ ও বিশ্বাসী লোকের দরকার হয়ে পড়লো। তিনি নবীকে (স) তাঁর এ কাজের জন্য মনোনীত করলেন।
খাদীজার ব্যবসায়ের পণ্য সম্ভার নিয়ে নবী (স) সিরিয়ায় রওয়ানা হলেন। সাথে গেল খাদীজার ক্রীতদাস মায়সারা। এ দীর্ঘ সফরে সে নবী (স) সংগী হলো। নবীর (স) সাহচর্যে থেকে সে তাঁর চরিত্র মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে গেল। সিরিয়া থেকে ফিরে এসে নবী (স) খাদীজাকে অনেক মুনাফা বুঝিয়ে দিলেন। ইতিপূর্বে এতো মুনাফা আর কেউ তাঁকে দেয়নি। ক্রীতদাস মায়সারাও তাঁর চরিত্র, কোমল ব্যবহার, মধুর গুণাবলী ও বুদ্ধিমত্তার কথা খাদীজাকে জানালো। খাদীজা তাঁর সততা ও পবিত্র চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। চাচা আবু তালিবের সাথে পরামর্শ করে নবী (স) খাদীজাকে বিয়ে করলেন।
নবী (স)-র সন্তানদের মধ্যে একমাত্র ইবরাহীম ছাড়া আর সবাই খাদীজার (রা) গর্ভে জন্মলাভ করেন। খাদীজার গর্ভজাত পুত্র সন্তানদের নাম ছিল-কাসেম, তাইয়েব ও তাহের। পুত্র সন্তানদের সবাই তাঁর নবুওয়াত লাভের পূর্বেই ইনতিকাল করেন। মেয়ে সন্তানগণ ছিলেন: যায়নাব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতেমা। এরা সবাই বেঁচে ছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। সবাই আবার তাঁর সাথে মক্কা থেকে হিজরতও করেছিলেন। সর্ব কনিষ্ঠা কন্যা ফাতেমা ছাড়া অন্য কোন কন্যার কোন সন্তান ছিল না।
হেরা গুহায় রাত্রি যাপন ও অহী প্রাপ্তি
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যতই বাড়তে থাকলো ততই তিনি তাঁর কওমের লোকদের অজ্ঞতা ও মুর্খতা দেখে ব্যথিত হয়ে উঠলেন। তিনি দেখতেন সৃষ্টির সেরা মানুষগুলো অসহায় মাটির মূর্তির সামনে মাথা নত করে সিজদা করছে, কাকুতি মিনতি করছে। তিনি প্রায়ই চিন্তা করতেন তাঁর জাতিকে এসব থেকে কি করে উদ্ধার করবেন? এরপর তিনি হেরা পর্বতের গুহায় রাত কাটাতে শুরু করলেন। দু' তিন দিনের খাবার এবং পানি নিয়ে যেতেন এবং তা শেষ হয়ে গেলে আবার এসে নিয়ে যেতেন। কোন কোন সময় স্ত্রী খাদীজাও তাঁর খাবার দিয়ে আসতেন। এ ভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। একদিন প্রত্যুষে তিনি হেরা গুহায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় আল্লাহর ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আ) এসে তাঁকে একখন্ড রেশমী কাপড়ে লেখা আল্লাহর বাণী পড়তে বললেন। তিনি বললেন: আমি তো পড়তে জানি না। তখন ফেরেশতা তাঁকে বুকে চেপে ধরলেন। এরপর আবার আল্লাহর বাণী লিখিত কাপড় খন্ড সামনে ধরে পড়তে বললে নবী (স) তা অনায়াসে পড়লেন। এটি ছিল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীর (স) কাছে প্রথম অহী-সূরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত। আয়াতগুলোর অর্থ হলোঃ পড় তোমার রবের নামে। যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে 'আলাক' হতে সৃষ্টি করেছেন। পড়, তোমার রব সর্বাপেক্ষা অনুগ্রহশীল ও দয়াবান। যিনি কলমের সাহায্যে মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান শিখিয়েছেন যা সে জানতো না।
ভয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরলেন
হেরা গুহার এ ঘটনা ছিল নবীর (স) কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর। ফেরেশতা চলে যাওয়ার পর তিনি ভয় ও বিস্ময় নিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরলেন। খাদীজাকে ডেকে বললেনঃ আমার শরীর কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও। পরে খাদীজাকে সব কথা খুলে বললেন। এতে তাঁর ভয় ও আশংকাও প্রকাশ করলেন। খাদীজা ছিলেন খুব বুদ্ধিমতী মহিলা। তিনি তাঁকে অভয় ও সান্তনা দিলেন। তিনি বললেনঃ আল্লাহ কখনো আপনাকে লাঞ্চিত করবেন না। আপনি তো সব সময় ভাল কাজ করেন। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন। গরীব, দুঃখীদের কষ্ট দূর করেন, আমানতদারী রক্ষা করেন, সত্য কথা বলেন, উপার্জন করে অসহায়দের দান করেন, মেহমানদের আপ্যায়ন করেন এবং ভাল কাজে সাহায্য করেন। অতএব আপনার ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই।
পরে তিনি নবীকে (স) সাথে করে ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে নিয়ে গেলেন এবং পুরো ঘটনা তাকে শুনালেন। নওফেল ছিলেন বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে একজন পারদর্শী ব্যক্তি। সব শুনে তিনি বললেনঃ হেরা গুহায় যিনি এসেছিলেন তিনি হলেন আল্লাহর অহী বহনকারী ফেরেশতা জিব্রাঈল (আ)। তিনিই আগের যুগের সব নবীর কাছে অহী আনতেন। ওয়ারাকা ইবনে নওফেল তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝাতে পারলেন যে, হযরত মুহাম্মাদ (স) কে আল্লাহ তা'আলা তার রসূল হিসেবে মনোনীত করেছেন। তাই তিনি তাকে বললেনঃ আমি যদি সে সময় যুবক হতাম এবং বেঁচে থাকতাম যখন আপনার কওম আপনাকে অস্বীকার করবে এবং দেশ থেকে বের করে দেবে তখন আপনাকে যতোপযুক্তভাবে সাহায্য করতে পারতাম। তার একথা শুনে রসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞেস করলেনঃ তারা কি আমাকে বহিস্কার করবে? তিনি বললেনঃ হাঁ, যিনিই এ দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন তার সাথেই তার কওম অনুরূপ আচরণ করেছে।
এরপর নবী (স) ও হযরত খাদীজা (রা) বাড়ি ফিরে আসলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে, অচিরেই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর ওপর একটি গুরু দায়িত্ব অর্পিত হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ আল্লাহর প্রভুত্ব মেনে নেয়ার জন্য গোটা দুনিয়াবাসীকে আহবান জানাতে হবে এবং তা কায়েম করতে হবে। এর অর্থ হলো মানুষকে আহবান জানাতে হবে যেন তারা তাকেই আল্লাহর নবী বলে স্বীকার করে নেয়।
এরপর অল্প কিছু দিন অহী বন্ধ থাকার পর ধারাবাহিকভাবে অহী নাযিল শুরু হয়। নবী (স) কে তাওহীদ ও ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহ অবহিত করা হয়। সাথে সাথে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। সে অনুসারে তিনি গোপনে- চুপিসারে বিশ্বস্তজনদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। তাঁর এ আহবানে দু' একজন করে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকেন। প্রথম দিকে বিবি খাদীজা, হযরত আবু বকর, হযরত আলী, হযরত যায়েদ, হযরত উসমান (রা) প্রমূখ সাহাবাগণ ইসলাম গ্রহণ করলেন। কিন্তু মক্কার বড় বড় নেতারা নবীর (স) শত্রু হয়ে দাঁড়ালো। তারা দেখলো, মুহাম্মাদের (স) প্রচারিত ইসলাম মানলে তাদের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে। তারা আর নেতা থাকতে পারবে না। কারণ, তখন ভাল লোকেরা হবে নেতা। তাই তারা বিরোধিতা শুরু করলো। এসব বিরোধীদের মধ্যে আবু জেহেল, আবু লাহাব ও আবু সুফিয়ান ছিলো অন্যতম। তারা নবী (স) ও তাঁর সাহাবাদের হেয় করার জন্য শুরু করলো ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও হাসি মশকরা। তারা মনে করতো, এভাবে তাদের সমাজের সামনে হেয় ও লজ্জিত করলে তারা হতোদ্যম হয়ে যাবে এবং লোকজনও তাদের কথা শুনবে না। কিন্তু নবী (স) ও ঈমানদারগণ দমলেন না এবং এর পরও লোকজন দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকলো।
শুরু হলো জুলুম
মক্কার নেতারা এবার প্রমাদ গুনলো। তারা দেখলো যত সহজে তারা ইসলামের এ আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দিতে চেয়েছিল, তা তত সহজে সম্ভব নয়। নতুন এ আদর্শ ইসলামের নেতা মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স) তার এ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ। কোন ভাবেই তাকে এ পথ থেকে বিচ্যুত করা সম্ভব নয়। আবার যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তারাও এর মধ্যে কি যেন একটা মনের পরিতৃপ্তি লাভ করেছে, যা তারা কোনভাবেই পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত নয়। তাই তারা জুলুম-অত্যাচার চালানোর সিদ্ধান্ত নিলো। শুরু হলো অত্যাচার নির্যাতন।
নবী (স) ছিলেন মক্কার তথা আরবের শ্রেষ্ঠ গোত্রের শ্রেষ্ঠ শাখার শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁর চাচা আবু তালিব ছিলেন প্রভাবশালী ও সম্মানিত নেতা। তাকে লঞ্ছিত করা ছিল বেশ কঠিন কাজ। তাই কুরাইশরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকলো। কিন্তু অন্যান্য মুসলমানদের ওপর তাৎক্ষণিকভাবেই অত্যাচার শুরু হয়ে গেল। কারণ, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাদের বেশির ভাগই ছিল সমাজের দরিদ্র, প্রভাবহীন, ও ক্রীতদাস। ক্রীতদাসদের মালিকরা, তাদের ক্রীতদাসদের ওপর এবং আশাপাশের প্রভাবশালী ও প্রধানরা নিজ নিজ পরিমন্ডলে দরিদ্র ও অসহায়দের ওপর অত্যাচার চালাতে শুরু করলো। কিন্তু তারা বিস্মিত হয়ে দেখলো, অত্যাচার, লাঞ্চনা ও নান রকম হয়রানি সত্বেও কেউ নতুন দীন ও আদর্শ ইসলাম পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত নয়। বরং ইসলামকে আঁকড়ে থাকার ব্যাপারে তাদের সংকল্প যেন আরো কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে। তাই এবার শুরু হলো নির্দয় ও নির্মম নির্যাতন।
হাবশায় হিজরত
মুসলমানদের ওপর অত্যাচার বেড়ে চললো এবং তা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকলো। যারা এসব নির্যাতনের শিকার হলেন তাদের মধ্যে ছিলেন বেলাল, আম্মার, সুহায়েব, খুবায়েব, সুমাইয়া, খাব্বাব এবং আরো অনেকে। তখনো পর্যন্ত নবী (স) এর ওপর তেমন কোন আক্রমণ না হলেও তারা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। কারণ তখনো পর্যন্ত প্রকাশ্যে নবী (স)কে কিছু বলার মত পরিস্থিতি তারা তৈরি করতে পারেনি। সাধারণ মুসলমানদের ওপর অত্যাচার প্রচন্ড আকার ধারণ করলে নবী (স) সবাইকে বললেন: তোমরা যদি এ সময় হাবশায় হিজরত করতে তাহলে সেটিই ভাল হতো। সে দেশ এমন একজন বাদশা শাসন করেন যার শাসনাধীনে কেউ কাউকে জুলুম করতে পারে না। ভাল কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তোমরা সেখানে গিয়েই অবস্থান করো।
রাসূল (স) এর এ ঘোষণার পর কিছু কিছু মুসলমান হাবশায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত নিল। প্রথম পর্যায়ে এগারজন পুরুষ এবং চারজন মহিলা হিজরত করলেন। তারা একটি জাহাজ ভাড়া করে হাবশার উপকূলে অবতরণ করে পরে দেশটির রাজধানীতে গিয়ে পৌঁছলেন। এরপর একের পর এক দলে দলে মুসলমানরা হাবশায় পৌঁছতে থাকলেন। সর্বসাকুল্যে তাদের সংখ্যা দাঁড়ালো একশত একজনে। এর মধ্যে তিরাশি জন ছিলেন পুরুষ ও আঠার জন মহিলা। ঈমান-আকীদা তথা আদর্শের জন্য এ ছিল এক চরম ত্যাগ ও অনুপম দৃষ্টান্ত।
হাবশা থেকে মুসলমানদের প্রত্যাবর্তন
হাবশায় পৌঁছে মুসলমানগণ স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। বাদশাহ নাজ্জাশির সুশাসনের অধীনে মুসলমানগণও বেশ শান্তিতেই বসবাস করতে থাকলেন। কিন্তু কিছুদিন পর মুসলমানদের কাছে এ মর্মে একটা খবর পৌঁছলো যে, মক্কার মুশরিকরা সবাই ইসলাম গ্রহণ করেছে। এখন আর কোন প্রকার জুলুম-নির্যাতন সেখানে নেই। তাই তারা কাল বিলম্ব না করে মক্কায় ফিরে আসার জন্য রওয়ানা হলেন। কিন্তু মক্কা থেকে এক দিনের পথ দূরে থাকতে তারা জানতে পারলেন যে, খবরটি সত্য নয়। মুশরিকদের মুসলমানদের সাথে কোন প্রকার সমঝোতা হয়নি। অনেকেই তাই পথিমধ্যে থেকে পুনরায় ফিরে গেলেন। আর কিছু সংখ্যক মুসলমান চুপিসারে মক্কায় ফিরে এলেন। তাছাড়া কেউ কেউ কোন কোন মুশরিকের নিরাপত্তাধীনে মক্কায় পৌঁছলেন।
হাবশায় দ্বিতীয় হিজরত
যারা হিজরত করেছিলেন এবার তাদের ওপর পুরোদমে নির্যাতন শুরু হলো। প্রত্যেকের পরিবারের লোক তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতে থাকলো। কারণ, তারা অবগত হয়েছিলো যে, হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশি তাদের সাথে খুব ভাল আচরণ করেছেন এবং তারা সেখানে বেশ নিরাপদেই ছিলো। এ অত্যাচার দেখে রাসূলুল্লাহ (স) তাদেরকে আবার হাবশায় হিজরত করার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু কুরাইশরা সতর্ক হয়ে যাওয়ায় এবার হিজরত করা ছিলো অত্যন্ত কঠিন। তা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের সাহায্য করলেন। এবারও তারা কুরাইশদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করে পুনরায় হাবশায় গিয়ে পৌঁছলেন।
মুহাজিরদের বিরুদ্ধে মক্কার কাফেরদের ষড়যন্ত্র
মক্কার মুশরিক নেতারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রোশে ফেটে পড়লো। কারণ মুসলমানরা নিজেদের দীন ও ঈমান রক্ষা করে তাদের নির্যাতনের হাত থেকে বেঁচে একটি নিরাপদ জায়গায় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। তারা পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলো, মুসলামানদের দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং নির্যাতনের মাধ্যমে নতুন ধর্ম ত্যাগ করতে বাধ্য করতে হবে। তাই তারা বাদশাহ নাজ্জাশির দরবারে একটা কূটনৈতিক প্রতিনিধি দল প্রেরণ করবে। অতএব তারা অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও ধুরন্ধর দুইজন লোক বাছাই করলো। তারা হলো আমর ইবনুল 'আস ও আবদুল্লাহ ইবনে আবু রাবি'আ। তারা বাদশা নাজ্জাশি ও তার দরবারের পাদ্রি-পুরোহিতদের জন্য মূল্যবান উপহার সামগ্রী নিয়ে হাবশায় গিয়ে হাজির হলো। পাদ্রি-পুরোহিতগণ বহুমূল্য উপহার সামগ্রী পেয়ে খুশি হয়ে তাদেরকে সহযোগিতা দানের আশ্বাস দিল।
পাদ্রিদের সহযোগিতার আশ্বাস পেয়ে প্রতিনিধি দল বাদশার দরবারে হাজির হলো। তারা বললোঃ হে বাদশাহ, আমাদের কতিপয় অবুঝ যুবক আপনার দেশে পালিয়ে এসেছে। তারা বাপদাদার ধর্ম পরিত্যাগ করেছে। আপনার ধর্মও গ্রহণ করেনি। তারা একটি নতুন ধর্ম গ্রহণ করেছে যা আপনার ও আমার সবাইর অজানা। তাদের বাপ-চাচা ও গোত্রপতিরা আমাদেরকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। কড়া নজরদারির মাধ্যমে তারা এদের সব রকমের কল্যাণ নিশ্চিত করতে চায়। প্রতিনিধি দল এভাবে চটকদার ভাষায় তাদের আবেদন পেশ করলে পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে দরবারের পাদ্রিরা বলে উঠলোঃ বাদশাহ নামদার, তারা ঠিকই বলছেন। আপনি ঐ সব যুবককে তাদের হাতে তুলে দিন। তারা ওদের নিয়ে তাদের দেশে আত্মীয়-স্বজনের কাছে পৌঁছিয়ে দেবেন।'
বাদশাহ তাদের কথা শুনলেন না
বাদশাহ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলেন। তিনি ভাবলেন, এ লোকগুলো আর কোন দেশে না গিয়ে আমার দেশে আশ্রয় নিয়েছে। সবদিক বিবেচনা না করে তাদেরকে ফেরত পাঠানো ঠিক হবে না। তাই তিনি আশ্রয়প্রার্থী মুসলমানদের পরের দিন দরবারে ডেকে পাঠালেন। খবর পেয়ে মুসলমাগণ নাজ্জাশির রাজ দরবারে হাজির হলেন। তাদের সিদ্ধান্ত হলো, পরিণতি যাই হোক না কেন তারা প্রকৃত ঘটনা বাদশাহর সামনে তুলে ধরবেন। মুসলমানদের পক্ষ থেকে নবী (স) এর চাচাতো ভাই জা'ফর ইবনে আবু তালেব বক্তব্য পেশ করার দায়িত্ব পেলেন। মুসলমাগণ হাজির হলে বাদশাহ তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ যে দীনের কারণে তোমরা বাপদাদার ধর্ম পরিত্যাগ করেছো আবার আমার ধর্মও গ্রহণ করোনি, সেটা কেমন ধর্ম? মুসলমানদের পক্ষে হযরত জা'ফর ইবনে আবু তালেব (রা) জবাব দিতে গিয়ে বললেনঃ হে বাদশাহ, আমরা ছিলাম এমন এক জাতি যারা জাহেলিয়াত তথা অজ্ঞতার গভীর পঙ্কে নিমজ্জিত ছিলাম। আমরা মূর্তির পূজা করতাম। মৃত জন্তু খেতাম। ব্যভিচার করতাম, প্রতিবেশীদের সাথে খারাপ আচরণ করতাম। আমাদের শক্তিশালীরা দুর্বলদের অধিকার নস্যাৎ করতো। আমরা যখন এ অবস্থার মধ্যে ডুবে ছিলাম তখন আল্লাহ তা'আলা আমাদের মধ্যে থেকে আমাদের কাছে একজন রাসূল পাঠালেন। তার বংশমর্যাদা ও সততা সম্পর্কে আমরা অবহিত ছিলাম। তিনি আমানতদার ও সম্ভ্রমশালী। তিনি আমাদেরকে এক আল্লাহর উপাসনা করতে এবং যেসব দেবদেবীর পূজা আমরা করতাম তা পরিত্যাগ করতে আহবান জানালেন। তিনি আমাদের আহবান জানালেন আমানত আদায় করতে, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করতে, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাল আচরণ করতে, হারাম কাজ করা ও রক্তপাত থেকে বিরত থাকতে। তিনি আমাদের নিষেধ করলেন ব্যভিচার করতে, মিথ্যা বলতে, ইয়াতীমের মাল খেতে, পবিত্র নারীদের অপবাদ দিতে। তিনি আমাদেরকে আদেশ দিলেন একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে এবং তার সাথে কাউকে শরীক না করতে। আদেশ দিলেন নামায পড়তে, যাকাত দিতে, রোযা রাখতে এবং আরো অনেক সুকৃতি করতে ও দুষ্কৃতি বর্জন করতে। আমরা তাকে সত্য বলে মেনে নিলাম এবং তিনি আল্লাহর যে সব নির্দেশ জানালেন তা অনুসরণ করতে থাকলাম। এতে আমাদের কওমের লোকজন আমাদের প্রতি চরম বৈরী আচরণ শুরু করলো এবং এ বিশ্বাস ত্যাগ করানোর জন্য আমাদের প্রতি নিষ্ঠুর হয়ে উঠলো। অবস্থা যখন আমাদের বরদাশতের বাইরে চলে গেল তখন আমরা অন্য কোথাও না গিয়ে আপনাকে এবং আপনার দেশকে আশ্রয়স্থল হিসেবে বেছে নিলাম। হে বাদশাহ, আমাদের বিশ্বাস যে, এখানে আমাদের ওপর কোন নির্যাতন হবে না।
সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে নাজ্জাশি জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের নবীর কাছে যেসব বাণী এসেছে তার কোন অংশ কি তোমাদের কাছে আছে? হযরত জা'ফর (রা) বললেন, হ্যাঁ। নাজ্জাশী বললেনঃ আমাকে পড়ে শুনাও। হযরত জা'ফর (রা) সূরা মারিয়াম এর প্রথম দিকের কিছু অংশ তেলাওয়াত করলেন। তা শুনে নাজ্জাশীর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকলো। এমনকি তার দাড়ি ভিজে গেল। দরবারের পাদ্রি-পুরোহিতগণও কাঁদলেন। অশ্রুতে তাদের বই পুস্তকও ভিজে গেল। নাজ্জাশী বললেন, এ বাণী এবং ঈসা (আ) এর ওপর নাযিল হওয়া বাণী একই উৎস থেকে নির্গত। তারপর তিনি কুরাইশ প্রতিনিধি দু'জনকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ তোমরা চলে যাও। আল্লাহর শপথ! আমি তাদেরকে কখনো তোমাদের হাতে তুলে দেবনা। তারা এবার ব্যর্থতা নিয়ে মক্কায় ফিরে এলো।
হযরত উমর (রা) এর ইসলাম গ্রহণ
আমর ইবনুল 'আস ও আব্দুল্লাহ ইবনে আবু রাবি'আ চরম ব্যর্থতা নিয়ে হাবশা থেকে ফিরে এলে কুরাইশদের ক্রোধের আগুন আরো জ্বলে উঠলো। ঠিক এই সময়েই হযরত উমর (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটা ঘটে আকস্মিকভাবে। তার বোন ফাতেমা ও ভগ্নিপতি সাঈদ ইবনে যায়েদ গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত খাব্বাব ইবনুল আরাত ফাতেমাকে কুরআন শিক্ষা দিতেন।
আমর ইবনুল 'আস ও আবদুল্লাহ ইবনে আবু রাবি'আ হাবশা থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার পর একদিন নবী (স) সাফা পর্বতের পাদদেশে একটি বাড়িতে কিছু সংখ্যক সাহাবার সাথে সমবেত হন। এ খবর পেয়ে উমর ইবনুল খাত্তাব খোলা তরবারি নিয়ে সেদিকে রওয়ানা হন। পথে নাঈম ইবনে আবদুল্লাহর সাথে তার সাক্ষাত হয়। নাঈমও গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কেউ তা জানতো না। উমরের গতিবিধি তার কাছে ভাল মনে না হওয়ায় তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ উমর কোথায় যাচ্ছ? উমর জবাব দিলেনঃ ধর্মত্যাগী মুহাম্মদ (স) এর সাথে বুঝাপড়া করতে যাচ্ছি। নাঈম ইবনে আবদুল্লা তাকে বললেনঃ উমর, তুমি কি মনে করো মুহাম্মাদকে হত্যা করার পর বনী আবদে ও মানাফ তোমাকে জীবিত ছেড়ে দেবে? এর চেয়ে বরং নিজের পরিবার ও আপনজনদের খবর নাও এবং তাদেরকে সংশোধন করো। উমর জিজ্ঞেস করলেন, আমার পরিবারের কে? নাঈম বললেনঃ তোমার ভগ্নিপতি সাঈদ ইবনে যায়েদ ও বোন ফাতেমা বিনতে খাত্তাব ইসলাম গ্রহণ করেছে।
উমর বোনের বাড়িতে উপস্থিত হলেন
একথা শোনার পর কালবিলম্ব না করে উমর বোনের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হলেন। সে সময় খাব্বাব ইবনুল আরাতও তাদের বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন। তাদের কাছে একটি সহীফায় সূরা ত্ব-হা লেখা ছিল। তিনি তাদেরকে তা শিক্ষা দিচ্ছিলেন। উমরের উপস্থিতি বুঝতে পেরে তারা খাব্বাবকে ঘরের মধ্যেই এক জায়গায় লুকিয়ে রাখলেন। আর ফাতেমা সহীফাখানা নিজের উরুর নীচে লুকিয়ে ফেললেন। বাড়িতে প্রবেশের মুহূর্তেই উমর শুনতে পেলেন খাব্বাব কি যেন পড়ে শুনাচ্ছেন। ভিতরে প্রবেশ করে উমর জিজ্ঞেস করলেনঃ আমি কিসের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম? তারা বললেনঃ কিছু না।
উমর বললেনঃ আমি জানতে পেরেছি, তোমরা মুহাম্মাদ (স) এর দ্বীন গ্রহণ করেছো। এ কথা বলেই তিনি ভগ্নিপতি সাঈদ ইবনে যায়েদকে ধরলেন। ফাতেমা স্বামীকে রক্ষা করতে অগ্রসর হলে উমর তাকে আঘাত করে আহত করলেন। এতে ফাতেমা ও তার স্বামী দৃঢ় কণ্ঠে বললেন: হাঁ, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। এখন তোমার যা ইচ্ছা করতে পার। এতে উমর লজ্জিত হলেন। তিনি বোনকে বললেনঃ তোমরা এইমাত্র যা পড়ছিলে তা আমাকে দাও। আমি দেখতে চাই মুহাম্মাদ (স) কি নিয়ে এসেছেন? এতে ফাতেমা তার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে কিঞ্চিত আশাবাদী হয়ে বললেনঃ ভাইজান, আপনি মুশরিক, আপনি অপবিত্র। ঐ জিনিস পবিত্রতা ছাড়া কেউ স্পর্শও করতে পারে না। এ কথা শুনে উমর গোসল করে পবিত্র হলেন। অতঃপর সহীফাখানা নিয়ে পড়লেন। কিছুটা পাঠ করার পরই বলে উঠলেনঃ কি সুন্দর ও কত উন্নত এই কথাগুলো! উমরের মুখ থেকে একথা উচ্চারিত হতে দেখে খাব্বাব (রা) গোপন স্থান থেকে বেরিয়ে উমরের সামনে এসে বললেনঃ হে উমর, আল্লাহর শপথ! আমার মনে হয় আল্লাহর নবী (স) এর দোয়া তোমার জন্যই নির্দিষ্ট হয়েছে। গতকালও আমি নবী (স)কে এ বলে দোয়া করতে শুনেছিঃ হে আল্লাহ, আবুল হাকাম ইবনে হিশাম (আবু জেহেল) অথবা উমর ইবনুল খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করো। হে উমর আল্লাহকে ভয় করো।'
উমর বললেনঃ হে খাব্বাব, মুহাম্মাদ (স) কোথায় আছেন আমাকে সেখানে নিয়ে চলো। আমি ইসলাম গ্রহণ করবো। খাব্বাব তাকে বললেন যে, তিনি এখন সাফা পর্বতের পাদদেশে একটি বাড়িতে আছেন। 'উমর উন্মুক্ত তরবারি হাতে রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁর সাহাবাগণ যেখানে আছেন সেদিকে রওয়ানা হলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে গিয়ে পৌঁছলেন। তিনি বাড়ির দরজায় করাঘাত করলেন। রাসূলুল্লাহ (স) এর সাহাবাদের একজন উঠে গিয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলেন উমর দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। তার হাতে খোলা তরবারি। তিনি ভীত হয়ে ফিরে এসে আল্লাহর রাসুল (স) কে তা বললেন। হযরত হামযা বললেনঃ সে যদি ভাল উদ্দেশ্যে এসে থাকে তা হলে আমরাও ভাল আচরণ করবো। আর যদি কোন খারাপ মতলবে এসে থাকে তাহলে তার তরবারি দিয়েই তাকে হত্যা করবো। রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, তাকে আসতে দাও। এরপর উমর রাসূলুল্লাহ (স) এর সামনে উপস্থিত হলে তিনি তার কোমরের পার্শ্বদেশ ধরে সজোরে আকর্ষণ করে বললেনঃ হে খাত্তাবের পুত্র, কি উদ্দেশ্যে তোমার আগমন বলতো।' উমর বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল, আমি আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল (স) এবং তিনি যা এনেছেন তার প্রতি ঈমান ঘোষণার জন্য এসেছি।'
মুসলমানগণ উৎসাহিত হয়ে উঠলেন
হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণে মুসলমানগণ আরো উৎসাহিত হলেন। হযরত উমর বায়তুল্লায় গিয়ে প্রকাশ্যে নামায আদায় করলেন এবং পরদিনই অতি প্রত্যুষে রাসূলুল্লাহ (স) এর প্রধান শত্রু আবু জেহেলের বাড়ি গিয়ে তাকে জানিয়ে আসলেন যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
এভাবে ইসলামের শক্তি ও প্রভাব ক্রমেই বেড়ে চললো। কাফেররাও সাধারণ মুসলমানদের ওপর তাদের আক্রমন ও নির্যাতন ক্রমশঃ তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুললো। নবী (স) এর আপন চাচা আবু লাহাবও কাফেরদের দলে ভিড়ে তাঁকে অনেক কষ্ট দিলো। আবু লাহাব ও রাসূলুল্লাহ (স) এর বাড়ি ছিল একই সাথে লাগোয়া। মাঝে ছিল শুধু একটি প্রাচীর। উম্মুল মু'মিনীন হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা) যখন বাড়ির আঙ্গিনায় প্রাচীরের পাশে খাবার পাকাতেন তখন প্রাচীরের ওপাশ থেকে খাবারের ওপর ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করে তা নষ্ট করে দেয়া হতো। এ ছাড়া মারওয়ানের পিতা হাকাম ইবনুল আস, উকবা ইবনে আবু মু'আইত, আদি ইবনে হামরা এবং ইবনুল আসদা আল হুযালীও আবু লাহাবের মত রাসূলুল্লাহ (স) এর নিকটতম প্রতিবেশী ছিল।
তারাও নবী (স) এর সাথে একই আচরণ করতো। আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীল (আবু সুফিয়ানের বোন) রাতের অন্ধকারে কাঁটাযুক্ত ডালপালা ও আবর্জনা এনে নবী (স) এর ঘরের দরজায় ও বের হওয়ার পথে ফেলে রাখতো যাতে সকালে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে তিনি ও তার ছোট ছোট সন্তানেরা কষ্ট পান। এ ছাড়া আরো অনেকভাবে তারা নবী (স) কে কষ্ট দিতো।
হযরত খাদীজা (রা) ও আবু তালেবের ইনতিকাল
কুরাইশদের নানাবিধ বিরোধিতা, শত্রুতা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির পাশাপাশি নবী (স) ও মুসলমানদের চরম ধৈর্য, সাহস ও আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে ইসলামের প্রচার ও প্রসার চলতে থাকে। এভাবে নবুওয়াতের ১০ম বছর এসে যায়। এটি ছিল নবী (স) এর জন্য সবচেয়ে দুঃখবহ বছর। এ বছরই নবী (স) এর প্রিয়তমা স্ত্রী ও পরামর্শদাতা হযরত খাদীজা (রা) এবং পৃষ্ঠপোষক ও পরম হিতৈষী চাচা আবু তালিব ইনতিকাল করেন। আবু তালিবের ইনতিকালে কুরাইশরা নবী (স) এর ওপর জুলুম নির্যাতনের এক মহাসুযোগ লাভ করে। এর সাথে চলতে থাকে চরম বিরোধিতা। কুরাইশরা ইসলামী দাওয়াতকে ধ্বংস করতে এ সময় থেকে মারমুখী হয়ে ওঠে।
তায়েফ গমন
নবী (স) বুঝতে পারলেন যে, মক্কার লোকেরা তার আহবানে সাড়া দিতে প্রস্তুত নয়। তাই তিনি এবার তায়েফে গিয়ে সেখানকার লোকদের সামনে ইসলাম পেশ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। হযরত যায়েদ ইবনে হারেসাকে (রা) সাথে নিয়ে তিনি তায়েফে গিয়ে উপস্থিত হলেন। বনী সাকীফ গোত্রের নেতাদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন। কিন্তু তারা নবী (স) এর সাথে অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ করলো। তিনি সেখান থেকে ফিরে মুত'েয়ম ইবনে আদীর নিরাপত্তায় মক্কায় প্রবেশ করলেন এবং পুনরায় ঘরে ঘরে প্রত্যেক মানুষের কাছে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকলেন।
হজ্জের মওসুমে প্রত্যেক গোত্রের লোকদের কাছে দাওয়াত
হজ্জের মওসুমে সমগ্র আরব উপদ্বীপের আনাচে কানাচে থেকে বিভিন্ন গোত্রের লোকজন হজ্জের জন্য মক্কায় আগমন করলে তিনি প্রত্যেক গোত্রের তাঁবুতে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত পেশ করতে থাকলেন। একদিন তিনি ইয়াসরিব (মদীনার পূর্ব নাম) থেকে আগত কিছু লোকের তাঁবুতে গেলেন এবং তাদের নিকট থেকে অনুকূল সাড়া পেলেন। তারা হজ্জ শেষে ইয়াসরিবে ফিরে গেলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর নির্দেশনা মোতাবেক ইসলাম প্রচার করতে থাকলেন। পরের বছর হজ্জের মওসূমে তারা আরো কিছু লোককে সাথে করে আনলেন। আকাবা নামক স্থানে রাতের বেলা নবী (স) এর সাথে তারা একত্রিত হলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে নবী (স) এর হাতে বাইয়াত হলেন। তাদের সংখ্যা ছিল মোট বারজন। একেই আকাবার প্রথম বাইয়াত বলা হয়। নবী (স) মদীনায় তাদের গোত্রের মধ্যে কুরআন মজীদ ও ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য হযরত মুস'আব ইবনে উমায়ের (রা) কে পাঠালেন। তিনি মদীনায় আস'য়াদ ইবনে যুরারা'র বাড়িতে থেকে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে কাজ করে চললেন। পরের বছর হজ্জের মওসূমে আকাবায় মদীনার তিয়াত্তর জন লোকের সাথে নবী (স) এর কথা হলো। তারা সবাই ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং তাকে মদীনায় যাওয়ার আহবান জানালেন। সিদ্ধান্ত হলো, সুবিধাজনক সময়ে অদূর ভবিষ্যতে নবী (স) মদীনায় চলে যাবেন।
মদীনার লোকেরা ছিল সৎ। তারা প্রায় সকলেই ইসলাম গ্রহণ করলে নবী (স) সেখানে একটি ছোট ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করলেন। এ রাষ্ট্রের প্রধান হলেন নবী (স) নিজে। এসব দেখে মক্কার কাফেররা সহ্য করতে পারলো না। তারা মদীনা আক্রমণ করলো। বদর, ওহুদ, খন্দক ও হুনায়েনে এরূপ অনেকগুলো যুদ্ধ হলো। একমাত্র ওহুদের যুদ্ধ ছাড়া সব যুদ্ধে মুসলমানরা জয় লাভ করলো। কাফেররা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়লো। বিভিন্ন যুদ্ধে তাদের অনেক বড় বড় নেতা মারা গেল।
হিজরী আট সনে নবী (স) দশ হাজার সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী নিয়ে মক্কা জয় করলেন। কাবা ঘরের মধ্যে যে তিন শত ষাটটি মূর্তি রাখা ছিল তা বের করে ফেললেন। এ সময় মক্কার সব লোক ইসলাম গ্রহণ করলো। তিনি তাদের সবাইকে মাফ করে দিলেন। এরপর সারা আরবের লোক দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করলো এবং সমগ্র আরবে একটা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলো।
হিজরী দশ সনে নবী (স) সারা আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় সোয়া লক্ষ সাহাবা সাথে করে হজ্জ করলেন। আরাফাতের মাঠে দাঁড়িয়ে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দান করলেন। মানুষের জীবনকে সঠিকভাবে চালানোর জন্য এ ভাষণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। নবীর (স) এ হজ্জকে বলা হয় বিদায় হজ্জ। এ হজ্জের পর তিনি আর হজ্জ করার সুযোগ পাননি।
হজ্জ শেষে মদীনায় ফিরে যাওয়ার পর নবী (স) অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং হিজরী ১১ সনের রবিউল আউয়াল মাসের বার তারিখে এ দুনিয়া ছেড়ে মহান আল্লাহর কাছে ফিরে গেলেন। ইনতিকালের সময় তাঁর বয়স ছিল ৬৩ বছর। পবিত্র মদীনা শরীফে মসজিদে নববীর মধ্যে তাঁর রওযা মোবারক অবস্থিত।
অনুশীলনী
১। সর্বশেষ রসুল কে? তিনি কত সনে কোথায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন? তাঁর বংশ কেমন ছিল?
২। হযরত মুহাম্মদের (স) জন্মের সময় আরবের লোকেরা কেমন ছিল?
৩। তাঁকে লালন- পালনের জন্য মক্কার বাইরে কোথায় পাঠানো হয়েছিল।
৪। রসূলুল্লাহ (স) এর মা আমিনা মদীনায় গিয়েছিলেন কেন? মদীনা থেকে ফিরে আসার সময় কি ঘটেছিল?
৫। যৌবন লাভ করার পর নবী (স)-এর চরিত্র কেমন ছিল?
৬। মক্কার ধনী মহিলাটির নাম কি ছিল? তাঁকে সবাই 'তাহেরা' বলে ডাকতো কেন?
৭। নবী (স) কি দেখে বিচলিত হয়ে উঠতেন? তিনি হেরা পর্বতের গুহায় কিভাবে রাত কাটাতেন?
৮। তিনি কবে এবং কিভাবে আল্লাহর অহী পেলেন? অহী পাওয়ার পর তিনি কি করতেন?
৯। প্রথমে কে কে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন? ইসলামের মূল কথা কি?
১০। মক্কার বড় বড় নেতারা বিরোধিতা করলো কেন? তারা কিভাবে বিরোধিতা করলো?
১১। মদীনায় হিজরতের পর মক্কার কাফেররা কি করলো?
১২। নবী (স) কবে মক্কা জয় করলেন? তাঁর সাথে কত সৈন্য ছিল?