📘 ছোটদের নবী রাসুল সাঃ > 📄 হযরত মূসা আলাইহিস সালাম

📄 হযরত মূসা আলাইহিস সালাম


হযরত মূসা আলাইহিস সালাম মিসরে জন্মলাভ করেছিলেন। তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী হযরত ইয়াকুবের (আ) বংশধর। তাঁর পিতার নাম ছিল ইমরান। হযরত মূসা (আ) বনী ইসরাঈল বংশের লোক। বনী ইসরাঈলগণ কিনআন থেকে হযরত ইউসুফের (আ) যুগে মিসরে আসেন এবং বসবাস করতে থাকেন। তাঁর সময়েও মিসরের শাসক রাজাদের উপাধি হতো ফিরআউন। হযরত ইউসুফের (আ) সময়ের ফিরআউন হযরত ইউসুফের সুমধুর চরিত্র, জ্ঞান-গরিমা ও বুদ্ধিমত্তা দেখে মুগ্ধ হন এবং মিসরের শাসনভার তাঁর ওপর অর্পণ করে নিজে নাম মাত্র শাসক থাকেন। এ সময়ে বনী ইসরাঈলগণ কিনআন থেকে মিসরে আগমন করেন।

হযরত মূসা (আ) যে সময় জন্মলাভ করেন সে সময় মিসরের শাসক ছিল ফিরআউন দ্বিতীয় রা'মসীস। এ সময় বিভিন্ন কারণে মিসরের আদি অধিবাসী কিবতিরা বনী ইসরাঈলদের ওপর অত্যাচার শুরু করেছিল। ফিরআউন রা'মসীসের হুকুমে বনী ইসরাঈলদের ঘরে কোন পুত্র সন্তান হলে তাকে সরকারী লোকজন গিয়ে মেরে ফেলতো। আরো বিভিন্ন ভাবে তাদের ওপর অত্যাচার করা হতো। তাদের দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রমের কাজ করানো হতো। এ যখন অবস্থা তখন বনী ইসরাঈলদের মধ্যে মূসা (আ) জন্মলাভ করেন। সরকারী লোকজন খবর পেলেই এসে তাঁকে মেরে ফেলবে, এ চিন্তায় হযরত মূসার মা অস্থির হয়ে উঠলেন। অবশেষে তিনি একটি ফন্দি করলেন। একটি কাঠের বাক্স তৈরী করে তার মধ্যে মূসাকে শুইয়ে দিয়ে বাক্সটি নীল নদীতে ভাসিয়ে দিলেন। বাক্স ভাসতে ভাসতে ফিরআউনের মহলের ঘাটে গিয়ে ভিড়লো। লোকজন বাক্সটি তুলে এনে দেখলো তার মধ্যে ফুটফুটে একটি শিশু হাত-পা নেড়ে খেলা করছে। ফিরআউন তাকে কোন বনী ইসরাইল ঘরের সন্তান মনে করে মেরে ফেলতে চাইলো। কিন্তু ফিরআউনের স্ত্রী তাকে নিজের সন্তান হিসেবে লালন-পালন করতে চাইলেন। ফিরাউন এতে রাজি হলো এবং পরে টাকার বিনিময়ে মূসার মাকেই দাই হিসেবে ডেকে আনা হলো। এভাবে আল্লাহর মহান কুদরতে হযরত মূসা (আ) রক্ষা পেলেন এবং নিজের মায়ের কোলেই লালিত পালিত হতে লাগলেন।

ফিরআউনের মহলেই হযরত মূসা (আ) ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলেন। বড় হয়ে তিনি দেখলেন মিসরে বনী ইসরাঈলদের ওপর চলছে নানা প্রকার জুলুম। মাঝে মাঝে তিনি এ সব জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন। একদিন তিনি বাজারের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন এক কিবতী বনী ইসরাঈলের একজন লোকের ওপর জুলুম করছে। হযরত মূসা (আ) কিবতীকে নিবৃত্ত করতে চাইলেন। কিন্তু সে হযরত মূসা (আ)-কেই আক্রমণ করে বসলো। তখন তিনি কিবতীকে সজোরে এক ঘুষি লাগালেন। এতে হঠাৎ করে সে মারা গেল। পরে মূসা (আ) জানতে পারলেন ফিরআউন বিষয়টি জানতে পেরেছে এবং তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করছে। এ খবর পেয়ে হযরত মূসা (আ) মিসর ছেড়ে বের হলেন এবং কয়েক দিন পর মাদায়েন এলাকায় গিয়ে উপস্থিত হলেন।

বেশ কয়েক বছর তিনি মাদায়েনে কাটালেন এবং সেখানেই বিয়ে করলেন। পরে ক্ষমতাসীন ফিরআউন দ্বিতীয় রামসীসের মৃত্যু হলে এবং তার পুত্র মিনফাতাহ ফিরআউন হলে তিনি মাদায়েন থেকে মিসরে ফিরে যেতে মনস্থ করলেন। তাই একদিন স্ত্রীকে সাথে নিয়ে মিসরে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে সিনাই মরুভূমিতে একদিন রাত্রি বেলা আগুনের দরকার হলো। হযরত মূসা (আ) পাহাড়ের উপর আগুন দেখে তা আনতে গেলেন। পাহাড়টির নাম ছিল তূর পাহাড়। আর আগুন ছিল মহান আল্লাহর নূর। সেখানেই আল্লাহ তা'আলা তাঁকে নবুওয়াত দান করলেন। আল্লাহ তাঁকে আদেশ করলেন: তুমি ফিরআউনের কাছে যাও। সে বাড়াবাড়ি করছে। তাকে আমার আদেশ নিষেধ শুনিয়ে সৎপথে আসতে বলো। এই সাথে আল্লাহ তা'আলা মূসা (আ)-কে কিছু মুজিযাও দান করলেন।

মূসা (আ) মিসরে গিয়ে ফিরআউনের দরবারে উপস্থিত হলেন। সংগে ছিলেন তাঁর ভাই আল্লাহর নবী হযরত হারুন (আ)। দরবারে উপস্থিত হয়ে মূসা (আ) ফিরআউনকে বললেনঃ আমাদের দু' ভাইকে আল্লাহ তাঁর রসূল করে তোমার কাছে পাঠিয়েছেন। আমরা তোমার কাছে আল্লাহর দেয়া হিদায়াতের বাণী নিয়ে এসেছি। তুমি আল্লাহকে প্রভু বলে স্বীকার করো। তাঁর আইন-কানুন দেশে চালু করো। তাহলে দেশে সুখ-শান্তি আসবে। আর বনী ইসরাঈলদের ওপর অত্যাচার করা বন্ধ করো। তা না হলে তাদের মিসর থেকে বের করে নিয়ে যেতে দাও।

এসব কথা শুনে ফিরআউন বললোঃ হে মূসা, তোমার রব বা প্রভু কে? মূসা (আ) বললেনঃ যিনি আসমান-যমীন, পাহাড়-পর্বত, জীব-জন্তু সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। যিনি সবাইকে খেতে দেন, যিনি মৃত্যু দেন তিনিই আমার রব বা প্রভু। ফিরআউন বললোঃ তুমি যে আল্লাহর নবী তার প্রমাণ কি? তখন মূসা (আ) তাঁর লাঠিখানা মাটিতে ফেলে দিলেন। সংগে সংগে সেটি সাপ হয়ে গেল। আর হাতখানা বগলের নিচে রেখে তারপর বাইরে বের করলেন, আর সংগে সংগে তা বিদ্যুতের চমক সৃষ্টি করলো। এসব দেখে ফিরআউন মনে করলো মূসা খুব যাদুবিদ্যা শিখে এসেছে। সুতরাং তাঁকে বড় বড় যাদুকর দিয়ে জব্দ করতে হবে। তাই ফিরআউন সারা মিসরের সব বড় বড় যাদুকরকে ডেকে মূসা (আ)-কে মোকাবিলা করতে বললো। একদিন একটা মাঠে অসংখ্য লোকের সামনে হযরত মূসা (আ) ও যাদুকরদের মোকাবিলা হলো। যাদুকররা তাদের যাদুর সাহায্যে বড় বড় সাপ তৈরী করলো এতে ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি হলো। কিন্তু হযরত মূসা (আ) ভয় পেলেন না। তিনি তাঁর লাঠি মাটিতে ফেলা মাত্র তা প্রকান্ড সাপে পরিণত হলো এবং যাদুকরদের বানানো সাপগুলোকে এক এক করে মুহূর্তের মধ্যে গিলে ফেললো। এতে যাদুকররা বুঝতে পারলো যে মূসা (আ) যাদুকর নন। তিনি সত্যই আল্লাহর নবী। সুতরাং যাদুকররা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলো এবং হযরত মূসা (আ)-কে নবী বলে স্বীকার করে নিল। আরো অনেক লোকও ঈমান আনলো। এ দেখে ফিরআউন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো। শুরু হলো মূসা (আ) ও তাঁর লোকদের ওপর আরো বেশী অত্যাচার। সব দেখে মূসা (আ) তাঁর লোকদের বললেন, সবর করো- ধৈর্য ধরো। তোমরা সত্য পথে আছ। সুতরাং তোমরাই জয়ী হবে।

জুলুম, অত্যাচার খুব বেড়ে গেল। যে সব যাদুকর আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল এবং মূসা (আ)-কে নবী বলে স্বীকার করেছিল ফিরআউন তাদের শূলে চড়িয়ে হত্যা করলো। মূসা (আ) দেখলেন এখন আর মিসরে থাকা সম্ভব নয়। তাই আল্লাহর নির্দেশে তিনি মিসর থেকে বনী ইসরাঈলদের নিয়ে অন্য জায়গায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এক রাতে যখন মিসরের অধিবাসীরা এবং ফিরআউনের লোকজন এক আনন্দ উৎসবে মত্ত ছিল তখন মূসা (আ) খবর পাঠিয়ে সমস্ত বনী ইসরাঈলদের জড়ো করলেন এবং মিসর থেকে বের হয়ে পড়লেন। তিনি চাচ্ছিলেন লোহিত সাগর পার হয়ে সিনাই উপত্যকায় পৌঁছবেন। বনী ইসরাঈলরা বের হয়ে পড়ার পরপরই ফিরআউন তা জানতে পারলো। সুতরাং তৎক্ষণাৎ সে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে তাদের পিছু ধাওয়া করলো। সকাল বেলায় বনী ইসরাঈলরা যখন লোহিত সাগরের কিনারে পৌঁছলো তার পরপরই ফিরআউনের বিশাল সৈন্যদল অস্ত্র-শস্ত্র সহ তাদের কাছে পৌঁছে গেল। বনী ইসরাঈলরা ভয়ে শিউরে উঠলো। কিন্তু আল্লাহর নবী মূসা (আ) মোটেই ভয় পেলেন না। তিনি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে আদেশ করলেনঃ তুমি তোমার লাঠি দিয়ে সাগরের পানির উপর আঘাত কর। মূসা (আ) তাই করলেন। সংগে সংগে সাগরের পানি দু' ভাগ হয়ে গেল এবং মাঝখান দিয়ে রাস্তা তৈরি হয়ে গেল। মূসা (আ) সে রাস্তা দিয়ে বনী ইসরাঈলদের নিয়ে পার হয়ে সিনাই উপত্যকায় পৌঁছে গেলেন। ফিরআউন দেখলো সাগরের মধ্য দিয়ে সুন্দর রাস্তা। মূসা দিব্যি এ রাস্তা দিয়ে পার হয়ে গেল। সুতরাং সে তার লোকজন সৈন্য-সামন্তকেও সে রাস্তা দিয়ে পার হতে আদেশ দিল। নিজেও অগ্রসর হলো। কিন্তু সাগরের মাঝখানে পৌঁছলে আল্লাহর আদেশে সাগরের পানি আবার মিশে গেল। ফিরআউন ও তার সৈন্য-সামন্ত সাগরের অথৈ পানিতে হাবুডুবু খেতে লাগলো। এভাবে ফিরআউন ও তার লোকজন লোহিত সাগরে ডুবে মারা গেল। জালিমদের পরিণতি কেমন হয় আল্লাহ পাক এভাবে তা দেখিয়ে দিলেন।

হযরত মূসা (আ) বনী ইসরাঈলদের মিসর থেকে উদ্ধার করে নিয়ে সিনাই উপদ্বীপে পৌঁছলেন। তূর পাহাড় এই স্থানে অবস্থিত। এ পাহাড়েই আল্লাহ তা'আলা মূসা (আ) এর সাথে কথা বার্তা বলতেন। মূসা (আ) কে আল্লাহ তা'আলা 'তাওরাত' নামক আসমানী কিতাব দান করলেন- যাতে তিনি তাঁর জাতিকে আল্লাহর পথে চালাতে পারেন। এখানেই মূসার (আ) বড় ভাই আল্লাহর নবী হযরত হারুন (আ) মৃত্যুবরণ করেন। হযরত মূসাও (আ) দীর্ঘদিন জীবিত থাকার পর এ স্থানেই একশ' বিশ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন এবং তূর পাহাড়ের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। একটি হাদীসে নবী (স) বলেছেন: আমি সেখানে গেলে পথের ধারে বালুর লাল ঢিবিগুলো থেকে সামান্য দূরে তাঁর কবর তোমাদের দেখিয়ে দিতে পারতাম। এভাবেই আল্লাহর সব নবী (আ) মানুষের উপকারের জন্য সারা জীবন কাজ করে গিয়েছেন। তাঁরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেই ভয় করেননি।

অনুশীলনী
১। হযরত মূসা (আ) কোথায় জন্মলাভ করেছিলেন?
২। বনী ইসরাঈলগণ কখন মিসরে গমন করেছিলেন?
৩। একদিন বাজারের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় মূসা (আ) কি দেখলেন? তিনি তখন কি করলেন?
৪। হযরত মূসা (আ) মিসর ছেড়ে গেলেন কেন? তিনি কোথায় গেলেন?
৫। হযরত মূসা (আ) কোন স্থানে নবুওয়াত লাভ করলেন? আল্লাহ তাঁকে কি বললেন?
৬। যাদুকরদের ডেকে ফিরআউন কি করলো? যাদুকররা ঈমান আনলো কেন?
৭। ফিরআউন কিভাবে ডুবে মরলো?
৮। হযরত মূসা (আ) কোথায় ইনতিকাল করেছিলেন? তাঁর বয়স তখন কত ছিল?
৯। মিসরের শাসকদের উপাধি কি ছিল?
১০। হযরত মূসা (আ) এর সময়ে মিসরের শাসক কেমন ছিল? তার নাম কি ছিল?
১১। মূসা (আ) এর ভাইয়ের নাম কি? তিনি কোথায় ইনতিকাল করেন?
১২। মূসা (আ)-কে আল্লাহ তা'আলা যে মুযিজা দিয়েছিলেন তা কি ছিল উল্লেখ করো।
১৩। হযরত মূসা (আ) এর ওপর নাযিলকৃত কিতাবের নাম কি?

📘 ছোটদের নবী রাসুল সাঃ > 📄 হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম

📄 হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম


হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম বনী ইসরাঈল বংশের একজন নবী এবং হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের পুত্র ছিলেন। কোরআন মজীদের বিভিন্ন সূরায় ষোলটি জায়গায় হযরত সুলায়মানের (আ) কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ হযরত দাউদ (আ)-কে নবুওয়াত ও বাদশাহী এক সাথে দান করেছিলেন। হযরত সুলায়মান (আ)-কেও তেমনি নবুওয়াত ও বাদশাহী এক সাথে দান করেছিলেন। তাঁর রাষ্ট্র ছিল যেমন বিশাল তেমনি তিনি ছিলেন অনেক বিস্ময়কর ক্ষমতার অধিকারী এবং বুদ্ধিমান।

হযরত দাউদের (আ) ইনতিকালের পর বার বছর বয়সে হযরত সুলায়মান (আ) পিতার বিশাল রাজ্যের অধিকারী হলেন। বয়স এতো কম হলে কি হবে? তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন। রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুব পারদর্শী। তিনি বাল্যকাল থেকেই যে কোন মামলা মোকদ্দমার সঠিক ফয়সালা করতে পারতেন। একবার হযরত দাউদের (আ) কাছে এসে এক ব্যক্তি একটি মামলা দায়ের করলো যে, এক ব্যক্তির বকরীর পাল তার ফসলের ক্ষেতে ঢুকে তা নষ্ট করে ফেলেছে। হযরত দাউদ (আ) বকরীর মালিকের বকরীগুলো ক্ষেতের মালিককে দিয়ে দেয়ার ফয়সালা দিলেন। কিন্তু হযরত সুলায়মান (আ) এই ফয়সালা পছন্দ করলেন না। তিনি ফয়সালা করলেন যে, বকরীর মালিক ক্ষেতের যত্ন নেবে ও দেখা-শোনা করবে। ক্ষেত পূর্বের মত না হওয়া পর্যন্ত বকরীগুলো ক্ষেতের মালিকের কাছে থাকবে এবং ক্ষেতের মালিক বকরীগুলো থেকে উপকৃত হতে পারবে। এ ফয়সালা হযরত দাউদ (আ) ও অন্য সবাই পছন্দ করলেন।

বায়তুল মাকদাসের নির্মাণ
বাদশাহ হিসেবে ক্ষমতা লাভের পর হযরত সুলায়মান (আ) পিতার অসিয়াত অনুসারে বায়তুল মাকদাসের নির্মাণ শুরু করেন। প্রচুর অর্থ ব্যয় করে সাত বছরে তিনি এ মহৎ কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হন। তিনি ইয়ারূসালেম (জেরুজালেম) শহরের চারদিকে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে শহরকে সুরক্ষিত করেন। বায়তুল মাকদাস নির্মাণ শেষ হওয়ার পর তিনি হাইকালে সুলায়মানী নামক মহল নির্মাণ করেন। এভাবে সংস্কার ও নির্মাণ কাজের প্রতি তিনি খুব গুরুত্ব প্রদান করেন। অনেকে লিখেছেন, হযরত সুলায়মানের (আ) একটা বৃহৎ নৌ-বহর ছিল। এ নৌ-বহরের মাধ্যমে তিনি ভারত থেকে সোনা, রূপা ও অন্যান্য মুল্যবান সামগ্রী নিয়ে যেতেন। তিনি আল্লাহর ও তাঁর ইসলামী রাষ্ট্রের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উত্তম জাতের বহু ঘোড়া পালতেন।

হযরত সুলয়মানের (আ) প্রতি আল্লাহর নিয়ামত
আল্লাহ তা'আলা হযরত সুলায়মানকে (আ) পশু-পাখীর ভাষা বুঝার ক্ষমতা দিয়েছিলেন। যেমন হুদহুদ নামক পাখী ও পিঁপড়ার কথা বুঝার বিষয় কোরআন মজীদে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বাল্যকাল থেকেই হিকমত বা বুদ্ধিমত্তা দান করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে বাতাসের ওপরও কর্তৃত্ব দান করেছিলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় পশু-পাখী ও জ্বিন, এমন কি বিদ্রোহী শয়তানদের উপরও আধিপত্য লাভ করেছিলেন। এরা সবাই ছিল তাঁর প্রজা। তাঁর শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল এদের সবার ওপর। এমন কি তাঁর সৈন্যদলে মানুষ ছাড়া জ্বিন এবং পাখীও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি দুষ্ট ও বিদ্রোহী জ্বিনদের ধরে ধরে শাস্তি দিতেন এবং বন্দী করে রাখতেন। তাদের দিয়ে কঠিন কাজও আদায় করতেন। এ ভাবে তাদের ক্ষতিকর প্রভাব থেকেও মানুষকে রক্ষা করতেন।

সাবার রাণী বিলকিসের ইসলাম গ্রহণ
সুলায়মানের (আ) সময়ে সাবা নামে আরবের সর্ব দক্ষিণে একটি রাজ্য ছিল। রাণী বিলকিস সে দেশ শাসন করতেন। সে দেশের সব মানুষ সূর্যের পূজা করতো। দেশটি ছিল খুবই সুন্দর। হুদহুদ পাখীর মুখে হযরত সুলায়মান (আ) সে দেশের ও রাণীর খবর জানতে পারলেন। তিনি পাখীর মাধ্যমে রাণীকে ইসলাম গ্রহণ করে তাঁর কাছে হাজির হওয়ার জন্য পত্র পাঠালেন। পাখী পত্র খানা রাণীর কাছে পৌঁছে দিলে রাণী তাঁর সব লোকজনকে ডেকে পরামর্শ করলেন এবং নির্দেশ মত সুলায়মানের (আ) কাছে হাজির হওয়ার জন্য রওয়ানা হলেন। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে তিনি হযরত সুলায়মান (আ) দরবারে হাজির হলেন এবং তাঁর চরিত্র, বুদ্ধিমত্তা, শাসন ক্ষমতা ও জাঁক-জমক দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন। তিনি সমস্ত দলবলসহ ইসলাম গ্রহণ করলেন। এভাবে হযরত সুলায়মানের (আ) সময়েই সুদূর সাবায় ইসলামের বাণী ছড়িয়ে পড়লো।

হযরত সুলায়মান (আ) শুধু নবী ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিশাল এক রাজ্যের বাদশাহও। তাই বলে তিনি বাদশাহীর মোহে পড়ে এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহকে ভূলেননি। আল্লাহর নির্দেশ মতই তিনি রাজকার্য পরিচালনা করতেন, নিজেও সে ভাবে চলতেন। সব ব্যাপারেই তিনি ন্যায় ও ইনসাফ অনুসারে ফয়সালা করতেন। তিনি সামান্য কোন অন্যায় করেছেন একথা বিশ্বাস করা একেবারেই অসম্ভব। তাই বলে ভাল মানুষকেও খারাপ বলার লোকের কিন্তু অভাব হয় না। আল্লাহর লানতপ্রাপ্ত ইয়াহুদীরা তাঁকে নানাভাবে দোষঅরোপ করেছে। কারণ, তিনি তাদের খারাপ কাজ করতে মানা করতেন।

ইনতিকাল
সাবার রাণী বিলকিসের সাথে হযরত সুলায়মানের বিয়ে হয়ে যায়। রাণী বিলকিসের জন্য তিনি বা'লাবাক শহরে একটি প্রকান্ড মহল নির্মাণ করেছিলেন। তিনি নিজেও এটি দেখাশুনা করছিলেন। এ অবস্থায় তিনি একদিন ইনতিকাল করেন। তখন তিনি লাঠির উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ইনতিকালের পরেও লাঠির উপর ভর দেয়া অবস্থায় তিনি থাকলেন। কেউ বুঝতে পারল না যে তিনি ইনতিকাল করেছেন। অনেকদিন পরে উই পোকা তাঁর লাঠি খেয়ে ফেললে লাঠি ভেঙে তাঁর শরীরটা পড়ে গেল। তখন সবাই বুঝতে পারলো যে তিনি ইনতিকাল করেছেন। বায়তুল মাকদাসে তাঁকে দাফন করা হয়। ইনতিকালের সময় তাঁর বয়স ছিল বায়ান্ন বছর। তিনি সারা জীবন মানুষকে আল্লাহর দীনের পথে ডেকেছেন এবং সে অনুযায়ী দেশ শাসন করেছেন।

অনুশীলনী
১। হযরত সুলায়মান (আ) কে ছিলেন? কোরআন মজীদের কত স্থানে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে?
২। কত বছর বয়সে হযরত সুলায়মান (আ) রাজত্ব লাভ করেছিলেন, তিনি ক্ষেত ও বকরীর মালিকের ব্যাপারটি কিভাবে মীমাংসা করেছিলেন?
৩। বায়তুল মাকদাস ও হায়কালে সুলায়মানীর নির্মাণকারী কে? বায়তুল মাকদাস নির্মাণে কত বছর সময় লেগেছিল?
৪। তিনি ভারত থেকে সোনা, রূপা ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী কিভাবে নিয়ে যেতেন? তিনি ঘোড়া পালতেন কেন?
৫। আল্লাহ তা'আলা হযরত সুলায়মান (আ)-কে কি কি নিয়ামত দান করেছিলেন?
৬। রাণী বিলকিসের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বর্ণনা কর।
৭। হযরত সুলায়মানের ইনতিকালের ঘটনাটি বর্ণনা কর।

📘 ছোটদের নবী রাসুল সাঃ > 📄 হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালাম

📄 হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালাম


হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালাম বনী ইসরাঈলদের একজন বিখ্যাত নবী। তিনি হযরত মূসার (আ) ভাই হযরত হারুনের (আ) বংশধর। তিনি বর্তমান জর্ডান নদীর উত্তর অঞ্চলের জিল'আদ নামক স্থানের "আবেল মাহুলা” নামক জায়গার অধিবাসী ছিলেন। খৃষ্টান এবং ইয়াহুদদের কাছে তিনি ইলিশা নামে পরিচিত। তিনি খৃষ্টপূর্ব ৮৭৫ থেকে ৮৫০ সনের মাঝামাঝি সময়ে জন্মলাভ করেন।

মহান আল্লাহর ইচ্ছায় বনী ইসরাঈলদের মধ্যে বহু নবী আগমন করেন। এর পরও তারা বার বার সত্য পথ থেকে দূরে সরে যায়। যে সময় হযরত ইলিয়াস (আ) জন্মলাভ করেন সে সময় বনী ইসরাঈলগণ আবার আল্লাহর পথ ছেড়ে গোনাহর কাজে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।

হযরত সুলায়মানের (আ) সময় বনী ইসরাঈলদের প্রভাব-প্রতিপত্তি চরম পর্যায়ে উপনীত হয়। কিন্তু তাঁর ইনতিকালের পর পরই বনী ইসরাঈলদের রাষ্ট্র দু' ভাগ হয়ে যায়। দক্ষিণ ফিলিস্তিনে একটি ছোট রাষ্ট্র কায়েম হয়। এর রাজধানী হয় বায়তুল মাকদাস। অন্যদিকে উত্তর ফিলিস্তিনে ইসরাঈল নামে একটি রাষ্ট্র কায়েম হয়। এর রাজধানী ছিল সামেরিয়া। উত্তর এলাকার ইসরাঈল নামক রাষ্ট্রে প্রথম থেকেই শিরক, মূর্তি পূজা, জুলুম-অত্যাচার ও লজ্জাহীনতা বেড়ে যেতে থাকে। এ অবস্থায় এ রাষ্ট্রের শাসক 'আখীআব' লেবাননের মুশরিক রাজ কন্যা ইযবেলকে বিয়ে করে। তার প্রভাবে পড়ে 'আখীআব' ও মুশরিক হয়ে যায়। স্ত্রী ইযবেলের কথামত সে রাজধানী সামেরিয়ায় 'বা'ল' দেবতার মন্দির ও বলির দেবী তৈরী করে এবং এক আল্লাহকে বাদ দিয়ে বা'ল দেবতার পূজা প্রচলনের চেষ্টা চালায়।

ঠিক এ সময় হযরত ইলিয়াস (আ) এর আবির্ভাব ঘটে। তিনি এসব পাপ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। লোকজনকে তিনি এ মূর্তি পূজার অপকারিতা বুঝাতে থাকেন। তিনি বাদশাহ 'আখীআব'কে তার অন্যায় কাজকর্মের জন্য সাবধান করে দেন। তিনি বাদশাহকে বললেনঃ তুমি এসব অন্যায় বন্ধ না করলে তোমার রাষ্ট্রে আর এক বিন্দু বৃষ্টিও হবে না। আল্লাহর নবীর কথাই সত্য প্রমাণিত হলো। সেখানে সাড়ে তিন বছর পর্যন্ত বৃষ্টি হলো না। এমন অবস্থায় বাদশাহ ইলিয়াস (আ)-কে খুঁজে আনলেন এবং বৃষ্টির জন্য আল্লাহর কাছে দো'আ করতে বললেন। এ সময় হযরত ইলিয়াস (আ) বা'ল দেবতা এবং মহান আল্লাহর পার্থক্য মানুষের সামনে প্রকাশ করতে চাইলেন। তিনি বললেনঃ একটি প্রকাশ্য সভায় বা'ল দেবতার পূজারীরা তাদের দেবতার নামে কুরবানী করবে এবং আমি আল্লাহর নামে কুরবানী পেশ করবো। গায়েবী আগুন এসে কুরবানীকে পুড়িয়ে ফেলবে সেই সত্য পথের অনুসারী। 'আখীআব' প্রস্তাবটি মেনে নিল। সুতরাং কারমেল পর্বতে বা'ল দেবতার আটশত পূজারী এবং হযরত ইলিয়াস (আ) হাজার হাজার লোকের সামনে কুরবানী পেশ করলেন। গায়েবী আগুন এসে হযরত ইলিয়াসের (আ) কুরবানী পুড়িয়ে ফেললে সবাই তাঁর প্রভুর সত্যতা মেনে নিল। ইলিয়াস (আ) সেখানেই পূজারীদেরকে হত্যা করালেন। এরপর তিনি দো'আ করলেন। প্রচুর বৃষ্টি হলো। এতে প্রমাণ হলো একমাত্র আল্লাহই সত্যিকার ক্ষমতার অধিকারী। তিনিই সব ইবাদত পাওয়ার যোগ্য। আর হযরত ইলিয়াস (আ) তাঁরই প্রেরিত নবী।

এই ঘটনার পর রাজা 'আখীআব' তার স্ত্রী ইযবেলের প্ররোচনায় হযরত ইলয়াসের (আ) শত্রু হয়ে গেল। সে শপথ করলঃ বা'ল দেবতার পূজারীদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে ইলিয়াসকেও সেভাবে হত্যা করবে। এ অবস্থায় হযরত ইলিয়াস (আ) দেশ ছেড়ে সিনাই মরুভূমির সিনাই পর্বতে গিয়ে আশ্রিয় নিলেন এবং কয়েক বছর পর্যন্ত সেখানেই কাটালেন। ঐ সময় তিনি আল্লাহর কাছে দো'আ করে বলতেনঃ 'হে আল্লাহ, বনী ইসরাঈলরা তোমার হুকুম-আহকাম পরিত্যাগ করেছে। তোমার নবীদের হত্যা করেছে। তোমার নবীদের মধ্যে এখন আমিই শুধু বেঁচে আছি। তারা আমাকেও হত্যা করতে চায়।

এ সময়েই বায়তুল মাকদাসের ইয়াহুদী রাষ্ট্রের শাসক ইয়াহুরাম ইসরাঈলের বাদশাহ 'আখীআবে'র মেয়েকে বিয়ে করে। ফলে তার রাজ্যেও শিরক ও বা'ল দেবতার পূজা শুরু হয়। হযরত ইলিয়াস (আ) ইয়াহুরামের কাছে পত্র লিখে তাকেও সাবধান করে দেন। কিন্তু তারা কেউই তাঁর কথায় কান দিলো না। অবশেষে তাদের ওপর আল্লাহর গযব নেমে আসে। বিদেশীরা ইয়াহুরামের রাজ্যের উপর হামলা করে তাকে হত্যা করে এবং স্ত্রীকে বন্দী করে নিয়ে যায়। কিছু দিন পর সেও কঠিন পেটের পীড়ায় মারা যায়।

এর কয়েক বছর পর হযরত ইলিয়াস (আ) আবার ইসরাঈলে ফিরে গিয়ে 'আখীআব'কে সাবধান করে দেন। তার মৃত্যুর কিছুদিন পর হযরত ইলিয়াস (আ) ইনতিকাল করেন। হযরত ইলিয়াস (আ) সারা জীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তিনি মানুষের কল্যাণ কামনা করেছেন। আর একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করেননি।

অনুশীলনী
১। যার সময়ে বন্দী ইসরাঈলদের প্রভাব প্রতিপত্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল?
২। ইসরাঈল রাষ্ট্রে কি বেড়ে গিয়েছিলো?
৩। শাসক 'আখীআব' কিভাবে মুশরিক হয়েছিলো?
৪। বাল দেবতা ও মহান আল্লাহর মধ্যেযার পার্থক্য তুলে ধরার জন্য হযরত ইলিয়াস (আ) কি করলেন?
৫। হযরত ইলিয়াস (আ) বা'ল দেবতার পূজারীদের কিভাবে হত্যা করাতে সক্ষম হলেন?
৬। বাদশাহ হযরত ইলিয়াস (আ) কে হত্যা করতে চাইলো কেন?
৭। সিনাই পর্বতে হযরত ইলিয়াস (আ) কি বলে আল্লাহর কাছে দো'আ করতেন।
৮। হযরত ইলয়াস (আ) কার কাছে পত্র দিলেন এবং কেন?
৯। ইয়াহুরাম তার ও তার রাজ্যের পরিণতি কি হয়েছিলো লিখ?

📘 ছোটদের নবী রাসুল সাঃ > 📄 হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম

📄 হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম


হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ছিলেন আল্লাহর একজন শ্রেষ্ঠ রসূল। তিনি বনী ইসরাঈল বংশে জন্মলাভ করেছিলেন এবং তাদের জন্যই রসূল হিসেবে এসেছিলেন। তাঁর জন্ম আল্লাহ তা'আলার অসীম শক্তির প্রমাণ। আল্লাহ তা'আলা হযরত আদম আলাইহিস সালামকে মাতা-পিতা ছাড়াই সৃষ্টি করেছিলেন। আর হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করেছিলেন পিতা ছাড়াই। হযরত মারিয়াম (আ) ছিলেন তাঁর মা। তাই তাঁকে ঈসা ইবনে মারিয়াম বলা হয়।

হযরত ঈসার (আ) মা হযরত মারিয়াম (আ) মায়ের পেটে থাকতেই তাঁর মা হান্না বিবি মানত করেছিলেন যে, তাঁর গর্ভের সন্তানকে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ঘর বায়তুল মাকদাসের খাদেম বানাবেন। কিন্তু সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে দেখা গেল পুত্র সন্তান জন্মলাভ না করে মেযে সন্তান জন্মলাভ করেছে। তিনি তাঁর এ মেয়ের নাম রাখলেন মারিয়াম। একটু বড় হলে মেয়েকেই তিনি বায়তুল মাকদাসের খেদমতের জন্য নিয়োজিত করলেন। হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম ছিলেন বায়তুল মাকদাসের মোতাওয়াল্লী। তিনি ছিলেন হযরত মারিয়ামের আত্মীয়। তাঁর তত্ত্বাবধানে তিনি বায়তুল মাকদাস সংলগ্ন একটি আলাদা কামরায় থাকতেন। অত্যন্ত পবিত্র পরিবেশে তিনি লালিত পালিত এবং বড় হতে থাকলেন। যাকারিয়া (আ) খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য মাঝে মাঝে তাঁর কামরায় প্রবেশ করতেন। যখনই তিনি যেতেন তখনই দেখতেন বালিকা মারিয়ামের কামরায় অনেক সুমিষ্ট ফল-মূল। এ দেখে তিনি আশ্চর্য হয়ে যেতেন। ভাবতেন অসময়ে মারিয়াম এসব কোথা থেকে পায়? একদিন তিনি মারিয়ামকে জিজ্ঞেস করলেনঃ মারিয়াম তুমি এসব ফল-মূল কোথা থেকে পাও? এ সর্ তো এখন পাওয়ার কথা নয়! মারিয়াম বললেনঃ মহান আল্লাহ আমাকে এ সব ফল-মূল দান করেন। এ সব ঘটনা থেকেই বুঝা যায় যে, হযরত মারিয়াম ছিলেন আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় পাত্রী।

মারিয়াম সেখানে বড় হলেন এবং যৌবনে পদার্পণ করলেন। এ সময় একদিন আল্লাহর ফেরেশতা হযরত জিব্রাঈল (আ) তাঁর কাছে এসে বললেনঃ আমি আল্লাহর দূত। আল্লাহ আমাকে তোমার কাছে পাঠিয়েছেন। আমি তোমাকে (আল্লাহর হুকুমে) একটা সন্তান দান করবো। এ বলে হযরত জিব্রাঈল (আ) তাঁর বুকে একটি ফুঁ দিলেন। হযরত মারিয়াম গর্ভবতী হলেন এবং বায়তুল মাকদাসের অদূরে এক স্থানে একটি সন্তান প্রসব করলেন। তিনি সন্তানের নাম রাখলেন ঈসা। মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ট হওয়ার পর পরই ঈসা কথা বলে উঠলেন। হযরত মারিয়াম অত্যন্ত খুশী হলেন। তাঁর সব দুঃখ দূর হয়ে গেল। লজ্জা ভয় কোন কিছুই আর তাঁর থাকলো না। শিশু সন্তান কোলে নিয়ে ফিরে আসতে দেখে দুশ্চরিত্র ইয়াহুদীরা তাঁকে অনেক গাল-মন্দ দিতে লাগলো। কিন্তু তিনি কোন কথা বললেন না, শুধু শিশুর দিকে ইশারা করলেন অর্থাৎ এ শিশুই সব কথা বলবে। সবাই বলে উঠলো, এ দোলনায় শায়িত শিশুর সাথে আমরা কেমন করে কথা বলবো? সে কি কথা বলতে পারবে? তখন শিশু নবী হযরত ঈসা (আ) কথা বলে উঠলেন।

তিনি বললেন, "আমি আল্লাহর বান্দা। আল্লাহ মানুষের হেদায়াতের জন্য আমাকে কিতাব দান করেছেন। তিনি আমাকে নবী হিসেবে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন।" সদ্য প্রসূত শিশুর মুখে এসব কথা শুনে সবাই তাজ্জব বনে গেল। তারা তাঁকে বিশ্বাস করলো এবং কোন কিছু না বলে চলে গেল।

হযরত ঈসা (আ) ধীরে ধীরে বড় হলেন এবং নবুওয়াত লাভ করলেন। এ সময় বনী ইসরাঈলগণ আল্লাহর সব নির্দেশ ভুলে গিয়েছিল। তারা শির্ক ও আরো অনেক গোনাহর কাজে লিপ্ত ছিল। রাজা বাদশারাই আবার বেশী করে আল্লাহ ও তাঁর আদেশ নির্দেশ ভুলে গিয়েছিল। এনটিওকস নামে এক রাজা তার আমলে জোর পূর্বক বায়তুল মাকদাসের মধ্যে মূর্তি স্থাপন এবং লোকজনকে তার পূজা করতে বাধ্য করেছিল। আল্লাহর নামে কুরবানী করা বন্ধ করে দিয়েছিল। যারা বাড়িতে তাওরাত গ্রন্থ রাখতো সে তাদের মৃত্যুদন্ড দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল। হযরত ঈসা (আ) তাদের এসব অন্যায় কাজ করতে নিষেধ করলেন। তারা যে সব অন্যায় কাজ করতো তিনি সে সব কাজ সম্পর্কেও তাদের সাবধান করে দিলেন।

ইয়াহুদরা তাঁর এসব কথা ভাল মনে করলো না। তারা তাঁর বিরোধিতা শুরু করলো। কেউ যাতে তাঁর কথা না মানে সেজন্যও তারা চেষ্টা করতে লাগলো। ইয়াহুদ আলেমরাও তাঁকে নবী বলে স্বীকার করলো না। হযরত ঈসা (আ) যখন দেখলেন যে, কেউ তাঁর কথা শুনছে না তখন তিনি সবাইকে ডেকে বললেন: আল্লাহর দ্বীনের কাজে আমাকে কে সাহায্য করতে পার? তাঁর এ আহবানে একদল মৎস্যজীবী জেলে তাঁর ওপর ঈমান এনে তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। এঁদেরকে কোরআন মজীদে হাওয়ারী বলা হয়েছে। হাওয়ারীরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হযরত ঈসা (আ) কে সাহায্য করেছেন।

হযরত ঈসাকে (আ) আল্লাহ তা'আলা অনেক মু'জিযা দান করেছিলেন। তিনি আল্লাহর হুকুমে মৃত মানুষকে জীবিত করতে পারতেন। কুষ্ঠ ও অন্যান্য কঠিন রোগ ভাল করতে পারতেন। মাটি দিয়ে পাখি তৈরী করে তাতে ফুঁক দিলে তা জীবিত হয়ে উড়ে যেতো। লোকেরা কি খেতো এবং বাড়িতে কি জমা করে রাখতো আল্লাহর হুকুমে তাও তিনি বলতে পারতেন।

ইয়াহুদদের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ এবং অন্যায় কাজ করতে নিষেধ করার কারণে তারা তাঁর শত্রু হয়ে গেল এবং তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করলো। তারা দেশের শাসনকর্তার কাছে গিয়ে হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে এ বলে অভিযোগ করলো যে, তিনি লোকদের তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছেন। শাসনকর্তা ইয়াহুদদের কথায় বিশ্বাস করলো। সে হযরত ঈসা (আ)-কে হত্যা করার জন্য লোক পাঠালো। ইয়াহুদরা তাঁকে গ্রেফতার করার ব্যাপারে সাহায্য করলো। গ্রেফতার করে তাঁকে একটি ঘরে বন্দী করে রাখা হয় এবং পরে শূলে চড়িয়ে হত্যা করার সিদ্ধান্ত হয়। তাঁকে ধরে আনার জন্য প্রথমে ঘরের মধ্যে একটি লোক প্রবেশ করে। কিন্তু সে হযরত ঈসা (আ)-কে সেখানে দেখে আশ্চর্য হয়ে যায়। পরে অন্যান্য লোকেরা সেখানে গিয়ে ঐ লোকটিকে হযরত ঈসা (আ)-এর আকৃতিতে দেখতে পায় এবং তাঁকে ঈসা মনে করে শুলে চড়িয়ে হত্যা করে।

এদিকে হয়েছে কি! আল্লাহ তাঁর প্রিয় রসূলের এরূপ বিপদ দেখে তাঁকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করেন। তিনি নিজের অসীম কুদরতে তাঁকে উঠিয়ে নেন। আর যে লোকটি হযরত ঈসা (আ)-কে ধরে আনার জন্য প্রথমে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেছিল তাকে ঈসার আকৃতি দান করেন। লোকেরা মনে করলো সেই বুঝি ঈসা। তাই তাকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করলো। মহান আল্লাহ এভাবে তাঁর নবীকে রক্ষা করলেন।

কিয়ামতের পূর্বে দাজ্জালকে হত্যা করার জন্য তিনি আবার দুনিয়াতে আসবেন। তবে তখন তিনি নবী হিসেবে আসবেন না।

অনুশীলনী
১। হযরত ঈসাকে (আ) ঈসা ইবনে মারিয়াম বলা হয় কেন?
২। হযরত মারিয়ামের কামরায় গিয়ে হযরত যাকারিয়া (আ) কি দেখতে পেতেন?
৩। কিভাবে বুঝা যায় যে, হযরত মারিয়াম আল্লাহর প্রিয় পাত্রী ছিলেন?
৪। ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল এসে মারিয়ামকে কি বললেন?
৫। দুশ্চরিত্র ইয়াহুদরা হযরত মারিয়ামকে গাল-মন্দ দিল কেন? জবাবে তিনি কি বললেন?
৬। বনী ইসরাঈলদের অবস্থা কিরূপ ছিল?
৭। হযরত ঈসার (আ) ডাকে কারা সাড়া দিয়েছিল? তাঁর কি কি মু'জিযা ছিল?
৮। ইয়াহুদরা তাঁর শত্রু হলো কেন? তিনি আবার কি দুনিয়ায় আসবেন?

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00