📄 হযরত নূহ আলাইহিস সালাম
জন্মস্থান প্রাচীন ধর্মগ্রন্থসমূহ, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ইতিহাস ও পবিত্র কুরআন মজীদের ইংগিত থেকে যা জানা যায় তাতে একথা সুস্পষ্ট ভাবে বলা যায় যে, আধুনিক কালের ইরাকই ছিল হযরত নূহ আলাইহিস সালামের কওমের আবাসভূমি এবং ইরাকের মুসেল ও কুর্দিস্তান এবং আর্মেনিয়ার মধ্যবর্তী কোন একটি স্থান ছিল তার জন্মস্থান।
হযরত আদম (আ) এর ইনতিকালের পর অনেক দিন কেটে গেল। তাঁর ছেলেমেয়েদের বংশবৃদ্ধি হল। পৃথিবীতে এখন অনেক লোক। আদম (আ) ছিলেন আল্লাহর নবী। আল্লাহর পক্ষ থেকে অহীর মাধ্যমে পৃথিবীতে জীবন যাপনের সব নিয়ম-কানুন তিনি জানতে পারতেন এবং সে ভাবে জীবন যাপন করতেন। তাঁর ইনতিকালের পর তার বংশধররা বহুদিন পর্যন্ত ঐ সব নিয়ম- মেনে পৃথিবীতে বসবাস করতে থাকলো। কিন্তু দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার কারণে আল্লাহ তা'আয়ালার হুকুম আহকাম মানার ব্যাপারে শিথিলতা দেখা দিল। ধীরে ধীরে তারা নিজেদের মনগড়া নিয়ম কানুনের প্রতি ঝুঁকে পড়লো। আল্লাহর দেয়া আইন কানুনের চর্চা ও অনুশীলন না থাকায় তা তাদের মধ্য থেকে হারিয়ে গেল। এভাবে সমাজে এক আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্যের প্রতি বিদ্রোহের অবস্থা সৃষ্টি হলো এবং তারা নিজেদের ইচ্ছামত চলতে শুরু করলো।
তাই আল্লাহ তা'আলা তাদের কাছে হযরত নূহ (আ)-কে রসূল করে পাঠালেন। তিনি যখন রসূল হয়ে এলেন তখন লোকেরা ভুলে গিয়েছিল যে, শুধু আল্লাহকেই ইলাহ বা রব বলে মানতে হবে, তাঁর ছাড়া আর কারো আইন মানা যাবে না। একমাত্র তাঁরই ইবাদত করতে হবে। নবী ও রসূলদের কাজ হলো মানুষকে হিদায়াতের পথের দিকে ডাকা। হযরত নূহ (আ) তাঁর কওমের লোকদের আল্লাহর পথে আহবান জানালেন। তিনি তার কওমের সামনে যে দাওয়াত পেশ করলেন তাহলো:
১. এক আল্লাহর দাসত্ত্ব। অর্থাৎ অন্য সব কিছুর দাসত্ব ও পূজা-অর্চনা ছেড়ে আল্লাহকে উপাস্য মেনে নিয়ে কেবল তার হুকুম মেনে চলো।
২. তাকওয়া বা খোদাভীতির পথ গ্রহণ করো। অর্থাৎ যে সব কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এবং তার গযব অবধারিত হয়ে যায় তা পরিত্যাগ করো জীবনের এমন পথ গ্রহণ করো যা খোদাভীরু লোকদের করা উচিত।
৩. আমার আনুগত্য করো। অর্থাৎ আল্লাহর রসূল হিসেবে যে সব আদেশ আমি তোমাদের দিচ্ছি তা মেনে চলো।
হযরত নূহ (আ) দীর্ঘ নয়শত পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত তাঁর কওমের লোকদের এ সব কথা মেনে নিতে আহবান জানালেন। কিন্তু তারা হযরত নূহ (আ) এর সাথে অত্যন্ত নির্দয় ব্যবহার করলো। তারা তাঁর কথা শুনলো না। তাঁকে বিদ্রুপ করলো, গালি দিল, কষ্ট দিল এবং নানাভাবে অত্যাচার করলো। তিনি যতই তাদের বুঝাতেন তারা ততই বিগড়ে যেত।
পবিত্র কুরআনে নূহ (আ) এর কাহিনী এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে: নূহের কওম রসূলদের অস্বীকার করলো যখন তিনি তাদেরকে বললেন: তোমরা কি আল্লাহকে ভয় করোনা? আমি তোমাদের প্রতি প্রেরিত একজন আমানতদার রসূল। কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। একাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাইনা। আমাকে প্রতিদান দেয়ার দায়িত্ব বিশ্বজাহানের রবের। অতএব আল্লাহকে ভয় করো এবং দ্বিধাহীনচিত্তে আমার আনুগত্য করো। তারা জবাব দিলো, আমরা কি তোমাকে মেনে নেব, অথচ দেখছি নিকৃষ্ট লোকেরাই তোমাকে অনুসরণ করছে? নূহ বললেন, তাদের কাজকর্ম কেমন সে বিষয়ে আমার কোন জ্ঞান নেই। তাদের কাজকর্মের হিসেব গ্রহণ করা তো আমার প্রতিপালকের কাজ। হায়! তা যদি তোমরা বুঝতে। ঈমান গ্রহণকারীদের তাড়িয়ে দেয়া আমার কাজ নয়। আমিতো একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র। তারা বলল হে নূহ, যদি তুমি বিরত না হও তাহলে অবশ্যই বিপর্যস্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। নূহ বললেন: হে আমার রব আমার কওম আমাকে অস্বীকার করেছে। এখন আমার ও তাদের মাঝে চূড়ান্ত ফয়সালা করে দাও এবং আমাকে ও আমার সাথে যেসব ঈমানদার আছে তাদেরকে রক্ষা করো। শেষ পর্যন্ত আমি পূর্ণ বোঝাই একটি নৌযানে করে তাকে ও তার সাথীদের রক্ষা করলাম এবং অবশিষ্টদের ডুবিয়ে দিলাম। (সূরা আশ্-শুআরা, আয়াত- ১০৬-১১৯)
ওপরে উল্লেখিত আয়াতসমূহে সংক্ষেপে নূহ (আ) ও তার কওমের লোকদের ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। এ সব আয়াত ও ইতিহাস থেকে আমরা যা জানতে পারি তাহলো- নূহ (আ) এর কওম যখন আল্লাহ ও তার রসূলদের শিক্ষা ভুলে চরম গোমরাহীতে নিমজ্জিত, ঠিক সেই সময় আল্লাহ তা'আলা তাদের কাছে হযরত নূহ (আ) কে রসূল করে প্রেরণ করলেন।
আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী-রসূলদেরকে যে মূল দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলো পথভ্রষ্ট মানুষকে সঠিক পথে নিয়ে আসা। অর্থাৎ ভাল কাজ করতে বলা ও ভাল কাজের শিক্ষা দেয়া এবং মন্দ কাজে বারণ করা ও মন্দকাজের কুফল সম্পর্কে সতর্ক করা। কোন কাজ ভাল আর কোন কাজ মন্দ অর্থাৎ কোন কাজ মানুষের জন্য কল্যাণকর ও কোন কাজ অকল্যাণকর তা একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই জানেন। কারণ জ্ঞান ও কল্যাণের উৎস একমাত্র মহান আল্লাহ। নবী ও রসূলগণ মহান আল্লাহর নিকট থেকে সরাসরি জ্ঞান লাভ করে থাকেন এবং সে জ্ঞানের ভিত্তিতেই মানুষকে সৎ ও সুন্দর জীবন গড়ার জন্য আহবান জানান।
নবুওয়াত লাভ ও দাওয়াতের কাজ শুরু
নবুওয়াত প্রাপ্তির পর নূহ (আ) তার কওমের লোকদের বললেনঃ আমি আল্লাহর রসূল। আল্লাহ আমাকে তোমাদের জন্য রসূল করে পাঠিয়েছেন। অতএব তোমরা আমার আনুগত্য করো। আমি তোমাদেরকে যা বলছি তা মেনে নাও। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। কেবল তারই ইবাদত করো। সমাজের সবাই তার আইন ও হুকুম মেনে নাও। তার দেয়া শিক্ষা অনুসারে জীবন, পরিবার ও সমাজ পরিচালনা করো। অন্যথায় পরিনাম তোমাদের কারো জন্যই ভাল হবে না।'
নূহ (আ) এর কওম যে সব দেব দেবীর আরাধনা ও পূজা-অর্চনা করতো তা সংখ্যায় ছিল একাধিক। এদের পাঁচজন দেব-দেবীর নাম কুরআন মজীদের সূরা 'নূহ' এর ২৩ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। এরা হলো: ওয়াদ্দ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক, ও নাস্ত্র। জাহেলী যুগে আরবের বিভিন্ন গোত্র এসব দেব-দেবীর নামে প্রতিমা তৈরী করে পূজা করতে শুরু করে। সুতরাং কুদ্দা'আ গোত্রের 'বনী কালব' শাখার উপাস্য দেবতা ছিল 'ওয়াদ্দ'। দাওমাতুল জানদাল নামক স্থানে এর মন্দির ছিল। হুযাইল গোত্রের দেবী ছিল 'সুওয়া'। এর মন্দির ছিল ইয়াম্বু'র অদূরে 'রুহাত' নামক স্থানে। 'তায়' গোত্রের আন'উম শাখা এবং 'মাজহিজ' গোত্রের কোন কোন শাখার দেবতা ছিল 'ইয়াগুস'। এর আকৃতি ছিল সিংহের ন্যায়। ইয়ামান ও হিজাযের মধ্যবর্তী জুরাশ নামক স্থানে নির্মিত একটি মন্দিরে এর মূর্তি স্থাপিত ছিল। ইয়ামানের হামদান এলাকার হামদান গোত্রের খায়ওয়ান শাখার উপাস্য দেবতা ছিল ইয়া'উক। এর আকৃতি ছিল অশ্ব সদৃশ। নাসর ছিল হিমইয়ার এলাকার হিমইয়ার গোত্রের যুলকুলা উপগোত্রের দেবতা। এর আকৃতি ছিল শকুনের ন্যায়। বালখা নামক স্থানে নির্মিত মন্দিরে এর মূর্তি স্থাপিত ছিল। ধারণা করা হয়ে থাকে যে, মহাপ্লাবনে নূহ (আ) এর মূর্তিপূজক কওমের ধ্বংস হওয়ার পর এসব দেব-দেবীদের নাম কোনভাবে মূতি-পূজারী এসব আরব গোত্রের কাছে পৌঁচেছিল এবং তারা এসব মূর্তি বানিয়ে পূজা করতে শুরু করেছিলো।
তিনি কওমকে মূর্তি পূজা পরিত্যাগ করতে বললেন
আল্লাহর ইবাদত করা ও নিজের আনুগত্য করতে বলার সাথে সাথে নূহ (আ) তাদেরকে দেব-দেবী ও মূর্তিপূজা ছেড়ে দিতেও আহবান জানালেন। কিন্তু কওমের লোকজন তার এ কথার প্রতি কর্ণপাত করতে আদৌ রাজি হলো না। তারা কওমের লোকজনকে ডেকে বলে দিলো, নূহের কথায় তোমরা তোমাদের দেব-দেবী ওয়াদ্দ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়া'উক ও নাস্ত্র এর উপাসনা ছেড়ে দিওনা। কিন্তু নূহ (আ) তার দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতে থাকলেন। তিনি রাত দিন একাকার করে এক আল্লাহর উপাসনার যুক্তি ও উপকারিতা বুঝাতে থাকলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রত্যেক মানুষকে আহবান জানালেন। তার এ প্রচেষ্টার ফলে সমাজের মুষ্টিমেয় দরিদ্র ও প্রভাবহীন লোক তার ডাকে সাড়া দিয়ে ঈমান আনলো।
সমাজের নেতাদের বিরোধিতা
সমাজের প্রভাবশালী ও বিত্তবান লোকেরা দেখলো যে, নূহ (আ) যেভাবে মানুষকে আহবান জানাচ্ছেন তাতে হয়তো তার প্রচেষ্টা সফলতা লাভ করতে সক্ষম হবে। তাই তারা তাকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য নানা রকমের ষড়যন্ত্র ও ফন্দি-ফিকিরের মাধ্যমে এই বলে লোকজনকে বিভ্রান্ত করতে থাকলো যে, তোমরা নূহের কথায় বিশ্বাস করো না। কারণ, ফেরেশতা ছাড়া কেউ নবী-রসূল হতে পারে না। নূহ আমাদের মতই একজন মানুষ। আমাদের যেমন খাওয়ার ও পান করার দরকার হয় তারও তেমনি খাওয়ার ও পান করার দরকার হয়। অতএব সে নবী নয়। তারা আরো একটা যুক্তি দাঁড় করালো যে, যারা নূহ (আ)কে নবী বলে মেনে নিয়ে তার কথায় চলছে তারা আমাদের সমাজের দুর্বল, অর্থ-বিত্তহীন দরিদ্র, শ্রমিক, কৃষক ও ছোটখাটো পেশাজীবী মানুষ। সমাজের ধনাঢ্য-বিত্তশালী, মর্যাদাবান ও প্রভাবশালী জ্ঞানীগুণী লোকেরা কেউই তার সাথে নেই। আমরা মর্যাদাবান লোকেরা ঐসব গরীব ও নিচু পর্যায়ের লোকদের সাথে মিশতে পারি না। নূহ যদি তাদেরকে তার কাছ থেকে তাড়িয়ে দেয় তাহলে তার কথা মানা হবে কিনা ভেবে দেখা যেতে পারে। এ ছাড়াও তারা তাকে না মানার অজুহাত হিসেবে আরো একটা কথা বলতে থাকলো যে নূহ (আ) যা বলছে তা সত্য নয়। সে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়েছে।
নূহ (আ) দাওয়াতের কাজ থেকে বিরত হলেন না
শত বাধা সত্বেও নূহ (আ) তার কাজ বন্ধ করলেন না। বরং তিনি তার কাজের গতি বাড়িয়ে দিলেন। তিনি তাদের সামনে যুক্তি পেশ করে বললেন, আল্লাহ যদি আমাকে তার রহমতে নবুওয়াত দান করে থাকেন আর আমার কাছে যদি এর সপক্ষে যুক্তি থাকে তাহলে কি তোমরা আমার কথা মানবে না এবং আমাকে নবী বলে স্বীকার করবে না? এ কাজে তো আমার কোন পার্থিব স্বার্থ নেই। তা ছাড়া নবুওয়াত লাভের পূর্ব পর্যন্ত আমি তোমাদের কাছে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলাম। এখন হঠাৎ করে কিভাবে অবিশ্বাসী হয়ে গেলাম? তোমাদের অজ্ঞতা ধন-সম্পদের গর্ব ও আত্ম অহংকারই বরং এ পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি তোমাদেরকে বলছিনা যে, আমার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সব কিছুর ভান্ডার দেয়া হয়েছে যা আমি ইচ্ছামত ব্যয় করতে পারি। আমি বলছিনা যে, আমি গায়েবের খবরও জানি। আমি একথাও বলছিনা যে, আমি ফেরেশতা। আমি যা বলছি তাহলো, আমি আল্লাহর নবী। তোমাদের সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালনার জন্য আমার কাছে দিকনির্দেশনা আছে সেগুলো মেনে নাও। আর আমি যা বলছি তা যদি না মানো তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য আযাব নির্ধারিত হয়ে আছে। সে আযাব আসলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে।
কওমের লোকেরা হঠকারিতা দেখালো
প্রত্যেক নবী-রসূলই তার কওমের মানুষের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও স্নেহশীল হয়ে থাকেন। হযরত নূহ (আ)ও তার কওমের প্রতি অত্যন্ত দরদী ছিলেন। কওম ধ্বংস হয়ে যাক তা তিনি কল্পনাও করতে পারতেন না। তাই নানাভাবে যুক্তিতর্ক পেশ করে তিনি তাদেরকে বুঝাতে সচেষ্ট ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কথা শুনে তার কওমের মানুষ বিরক্ত ও রুষ্ট হয়ে উঠলো। তারা এবার হঠকারিতা করে বললো, হে নূহ, তুমি আমাদের সাথে অনেক তর্কবির্তক করেছো। বার বার একই কথা বলে আমাদের বিরক্ত করেছো। আমরা তোমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছি যে, আমরা তোমার কথা গ্রহণ করবো না। যে আযাবের ভয় তুমি দেখাচ্ছো পারলে তা নিয়ে আসো।
হতাশা নেমে এলো
নূহ (আ) এ দাওয়াতী কাজ চালিয়েছিলেন সুদীর্ঘ ৯৫০ বছর ব্যাপী। এত দীর্ঘকাল ধরে আদেশ, উপদেশ, অনুরোধ ও কাকুতি-মিনতি করেও যখন তিনি তার কওমের পক্ষ থেকে সাড়া পেলেন না বরং বিরোধিতা ও উগ্রতা ক্রমে ক্রমে বেড়ে শত্রুতায় পর্যবসিত হলো তখন তিনি তাদের ঈমান গ্রহণের ব্যাপারে চুড়ান্তভাবে হতাশ হয়ে গেলেন। তাঁর এই হতাশ হৃদয়ের একান্ত অভিব্যক্তি তিনি তাঁর রব মহান আল্লাহর দরবারে পেশ করলেন। কুরআন মজীদে তা এভাবে ব্যক্ত হয়েছেঃ
হে আমার রব, আমি রাত দিন একাকার করে আমার কওমকে আহবান জানিয়েছি। কিন্তু আমার আহবান তাদের দূরে সরে যাওয়াকে কেবল বাড়িয়েই দিয়েছে। তুমি যাতে তাদেরকে ক্ষমা করে দাও এ উদ্দেশ্যে আমি যখনই তাদেরকে আহবান করেছি তখনই তারা কানে আঙ্গুল দিয়েছে এবং কাপড়ে মুখ ঢেকে নিয়েছে, নিজের আচরণে অনড় থেকেছে এবং চরম ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছে। অতঃপর আমি তাদেরকে উচ্চকণ্ঠে আহবান জানিয়েছি। তারপর প্রকাশ্যে তাদেরকে আহবান জানিয়েছি এবং গোপনে চুপেচুপেও বুঝিয়েছি। বলেছি, তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও। নিসন্দেহে তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। (সূরা- নূহ, আয়াত- ৬-১০)
নূহ (আ) এর করুণ ফরিয়াদ শুনে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে জানিয়ে দিলেন: হে নূহ এ পর্যন্ত যারা তোমার প্রতি ঈমান এনেছে তারা ছাড়া তোমার কওমের আর কেউ ঈমান আনবে না। তাই তাদের এ আচরণে দুঃখ করোনা। (সূরা হুদ, আয়াত-৩৬)
মহাপ্লাবন
হযরত নূহ (আ) যখন দেখলেন যে, তাঁর জাতির ঈমান গ্রহণের আর কোন সম্ভাবনা নেই বরং তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতার কোন সুযোগই হাত ছাড়া করেনা, মূর্তিপূজাসহ সব রকম অন্যায় ও অনৈতিক কাজের পৃষ্ঠপোষকতা করতে অতিমাত্রায় তৎপর তখন তিনি চিন্তা করলেন যে, এ জাতির ধ্বংস হয়ে যাওয়া উচিত। কারণ তাদের দ্বারা এ পৃথিবীতে যখন আর কোন কল্যাণকর কাজ হবে না বরং ধ্বংস ও বিপর্যয় সৃষ্টি হবে তখন তাদের আল্লাহর এ পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকার কোন যুক্তি নেই। তাই তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেনঃ
হে প্রভু, তুমি কাফেরদের কাউকেই আর এ পৃথিবীতে অবশিষ্ট রেখোনা। তুমি যদি তাদেরকে এভাবেই ছেড়ে দাও তাহলে তারা তোমার বান্দাদেরকে গোমরাহ করে ফেলবে এবং তাদের বংশধর যারা জন্ম লাভ করবে তারাও তাদের মত পাপাচারি ও কাফের হবে। (সূরা নূহ, আয়াত- ১৬, ১৭)
নূহ (আ)-কে আযাবের সিদ্ধান্ত জানানো হলো
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নূহ আলাইহিস সালামের দো'য়া কবুল করলেন এবং অহীর মাধ্যমে তাকে জানিয়ে দিলেন যে, অতি সত্বর তার কওমের পাপাচারি ও খোদ্রোহীদেরকে প্লাবন দিয়ে ডুবিয়ে ধ্বংস করবেন। মুক্তি পাবেন শুধু তিনি নিজে এবং যারা তার প্রতি ঈমান এনে সৎ জীবন যযাপন করছে তারা। যেহেতু প্লাবনের মাধ্যমে পাপিষ্ঠদের ধ্বংস করা হবে তাই হযরত নূহ (আ) ও তার সংগী ঈমানদারদের রক্ষা করার জন্য আল্লাহ তাআলা হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে পূর্বাহ্ণেই একটি বৃহৎ জাহাজ তৈরির জন্য নির্দেশ দিলেন। আল্লাহর নির্দেশ মত নূহ (আ) প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করে জাহাজ নির্মাণ শুরু করলেন। কাফেররা জানতে পারলো তার জাহাজ তৈরির উদ্দেশ্য। কিন্তু তারা আদৌ বিশ্বাস করতে পারলো না যে, তাদের এলাকায় এমন কোন প্লাবন আসতে পারে যা থেকে আত্মরক্ষার জন্য জাহাজ নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে। তাই তারা নূহ আলাইহিস সালামের এ কাজে বিস্ময় প্রকাশ করলো এবং তাকে বিদ্রূপ ও হাসি- ঠাট্টার লক্ষ্যে পরিণত করলো। যখনই তাদের হযরত নূহ (আ) এর সাথে স্বাক্ষাত হতো তখনই তারা তাকে বিদ্রূপাত্মক ও তির্যক কিছু কথা শুনিয়ে দিতো। জবাবে হযরত নূহ (আ) তাদেরকে বলতেনঃ আজ তোমরা যেমন আমাদেরকে বিদ্রূপ করছো আমরা ঠিক তেমনি একদিন তোমাদেরকে বিদ্রূপ করবো এবং সে সময় অনতিবিলম্বেই আসবে।'
মহাপ্লাবনের সূচনা
হযরত নূহ আলাইহিস সালামের জাহাজ নির্মাণ শেষ হওয়ার অল্প দিন পরেই মাটি থেকে পানির ফোয়ারা ফুটে বের হতে শুরু হলো। অবশ্য আল্লাহ তাআলা আগেই হযরত নূহ (আ)-কে প্লাবন শুরু হওয়ার কিছু পূর্ব লক্ষণ জানিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে প্লাবন শুরু হলে ঈমানদার সকল নারী-পুরুষকে এবং প্রতিটি জীব-জন্তুর একটি করে জোড়া জাহাজে উঠিয়ে নিতে হবে, আল্লাহ তাকে আরো নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, প্লাবন শুরু হলে কাফেরদের মাগফিরাতের জন্য কোন দোয়া করা যাবে না এবং অবাধ্য স্ত্রী ও সন্তানকে জাহাজে উঠিয়ে নেয়া যাবে না। এবার প্লাবন শুরু হতে দেখে হযরত নূহ (আ) আল্লাহর নির্দেশ মত তার পরিবারের লোকজন এবং যে নগন্য সংখ্যক মানুষ ঈমান এনেছিলেন তাদেরকে সহ কিছু গৃহপালিত জীবজন্তুও জাহাজে উঠিয়ে নিলেন। কিন্তু তার এক স্ত্রী ও এক পুত্রকে আল্লাহর নির্দেশ মত জাহাজে উঠতে আহবান জানালেন না। জাহাজে আরোহনের পর তারা আল্লাহর নাম নিয়ে জাহাজ ভাসিয়ে দিলেন। ঐ এলাকার সমস্ত ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ হয়ে ফোয়ারার মত অসংখ্য ঝর্ণাধারা ফুটে বের হয়ে পানি উপচে পড়তে শুরু হলো। একই সময়ে আকাশ থেকেও মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ হতে থাকলো এবং একাধারে চল্লিশ দিন পর্যন্ত অব্যাহত রইলো। সমকালীন মানব বসতির পুরোটাই অথৈ পানির নিচে তলিয়ে গেল। সব মানুষ এবং জীব-জন্তু ডুবে মৃত্যুমুখে পতিত হলো। কেবল নূহ আলাইহিস সালামের আরোহী মানুষ এবং জীবকুল রক্ষা পেল। চল্লিশ দিন পর্যন্ত জাহাজ পানির ওপরে ভেসে বেড়াতে থাকলো।
জাহাজ জুদী পাহাড় শীর্ষে থামলো
এ মহাপ্লাবন চল্লিশ দিন ব্যাপী স্থায়ী হওয়ার কারণে জাহাজের আরোহীরা ছাড়া সবাই ডুবে মারা গেল। এবার আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ ক্রমশ স্তিমিত হয়ে থেমে গেল এবং ভুঅভ্যন্তর থেকেও পানি উপচে ওঠা বন্ধ হলো মাটি ধীরে ধীরে পানি শুষে নিল এবং জাহাজ এক পর্যায়ে গিয়ে জুদী পাহাড় শীর্ষে থেমে গেল। ভূপৃষ্ঠ চলাচলের উপযোগী হলে হযরত নূহ (আ) তার ঈমানদার সংগী-সাথীদের নিয়ে জাহাজ থেকে বেরিয়ে সমতল ভূমিতে নেমে এলেন। পৃথিবীতে পুনরায় নতুন করে মানুষের জীবনযাত্রা শুরু হলো। নতুন করে জনপদ, শহর ও নগর গড়ে উঠলো। মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো।
নূহ (আ) এর পুত্রও ডুবে মারা গেল
হযরত নূহ আলাইহিস সালামের জীবনেতিহাসের একটি বিষয় অত্যন্ত শিক্ষণীয় যে, এই প্লাবনে তার এক সন্তানও ডুবে মারা যায়। ইতিহাসে তাঁর ঐ সন্তানের নাম কিনআন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সে ছিল কাফের। সেও নবী হিসেবে হযরত নূহকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে প্লাবনে ডুবে মারা যায়।
প্লাবন শুরু হলে নূহ (আ) তার পরিবারের লোকজন ও অন্যান্য ঈমানদারগণ জাহাজে আরোহন করলেও তার সেই পুত্র ঈমান গ্রহণ করে জাহাজে আরোহন করতে অস্বীকার করে। সে বলে, আমি কোন একটি পাহাড় চূড়ায় উঠে আশ্রয় নেব তাহলে প্লাবনে আমার কোন ক্ষতি হবে না। নূহ (আ) তাকে বললেন আজকে আল্লাহর এ গযব থেকে কেউ রক্ষা পাবে না। পিতাপুত্রের এভাবে কথাবার্তা চলাকালে একটি বড় তরঙ্গ এসে পিতাপুত্রকে পরস্পর বিছিন্ন করে ফেলে এবং সে ডুবে মারা যায়। হযরত নূহ (আ) সেই সময় আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলেন: হে আল্লাহ, আমার পুত্রতো আমার পরিবারভূক্ত। তোমার প্রতিশ্রুতি তো সত্য। তুমি বলেছো আমার পরিবারের লোকেরা রক্ষা পাবে। জবাবে আল্লাহ তাকে জানিয়ে দিলেন সে তোমার পরিবারের কেউ নয়। কারণ তার আমল বা জীবনাচার ঈমানদারের জীবনাচার নয়। অতএব তার জন্য আমার কাছে কোন প্রার্থনা জানাবে না। অন্যথায় তুমিও জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এ ঘটনা থেকে আমরা যে শিক্ষা পাই তা হচ্ছে, আল্লাহর নিকট কেবল ঈমান এবং সৎকাজই গ্রহণযোগ্য। ঈমান না থাকলে পিতা নবী হয়েও কোন লাভ নেই। ঈমানের সম্পর্কই প্রকৃত এবং দৃঢ় সম্পর্ক।
মহাপ্লাবনের পরবর্তী অবস্থা
ইতিহাস থেকে জানা যায় মহাপ্লাবনের পর নূহ আলাইহিস সালাম আরো ৩৫০ বছর জীবিত ছিলেন। এ সময়েরও পুরোটাই তিনি নবুওয়াত ও রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন। আল্লাহর এই মহান নবীর জীবন থেকে আমরা বহু কিছু শিখতে পারি।
অনুশীলনী
১। হযরত নূহ (আ) যে সময় রসূল হয়ে আসেন তখনকার লোকেরা কেমন ছিল?
২। নূহ (আ) তাঁর কওমের লোকদের কি বললেন? লোকেরা তখন কি করলো?
৩। লোকেরা নূহ (আ)-কে কিভাবে কষ্ট দিয়েছিল।
৪। মহাপ্লাবন কিভাবে হয়েছিল? কারা এই প্লাবন থেকে রক্ষা পেয়েছিল?
৫। প্লাবনের পর নূহ (আ) কত দিন বেঁচে ছিলেন?
৬। নূহ (আ)-এর কয়টি সন্তান ছিল? তাদের নাম বল। কিন'আন ডুবে মরলো কেন?
৭। নূহ (আ) কত দিন বেঁচে ছিলেন?
📄 হযরত হূদ আলাইহিস সালাম
আরবের প্রাচীন অধিবাসীদেরকে ঐতিহাসিকগণ (ক) আরব বায়েদা, (খ) আরব আরেবা ও (গ) আরব মুসতা'রিবা এই তিন শ্রেণীতে ভাগ করেছেন। আরব বায়েদার অন্তর্ভুক্ত আরবদের সংখ্যা ছিল অনেক এবং এরা আবার বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। আদ ও সামুদ জাতি এদেরই অংশ। আদ জাতির বংশধারা উপর দিকে গিয়ে এরাম এর সাথে মিলিত হয়েছে। সামুদ এর বংশধারাও একইভাবে 'এরাম' পর্যন্ত গিয়ে পৌঁচেছে। এরাম হচ্ছে নূহ (আ) এর পুত্র সামের সন্তান। বায়েদা শব্দের অর্থ হচ্ছে ধ্বংসপ্রাপ্ত। যেহেতু এ শ্রেণীর আরবরা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে তাই এদেরকে 'বায়েদা' বলা হয়।
ঐতিহাসিকগণ আদ জাতিকে দু' ভাগে ভাগ করেছেন। তারা হলো: 'আদ আল 'উলা' বা প্রথম আদ এবং 'আদ আস সানিয়া' বা দ্বিতীয় আদ। আদ আল 'উলা ছিল শক্তিমত্তা ও ক্ষমতার দিক থেকে পৃথিবীর বৃহৎ জাতিগুলোর একটি। তাদের অধস্তন উপগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল এক হাজারেরও অধিক। কুরআন মজীদের সূরা আন নাজমের ৫০ ও ৫১ আয়াতে এদের ধ্বংস করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে যে, আল্লাহ তাআলা আদ-আল 'উলা ও সামুদকে ধ্বংস করেছেন। তাদের কেউ আর এখন অবশিষ্ট নেই।
আদ জাতির আবাসভূমি
আবাসভূমি আরবের সর্বদক্ষিণে হাদরামাওত এলাকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে আছে এক বিশাল মরুভূমি। এখানে মানব বসতির চিহ্ন পর্যন্ত নেই। কোন গাছপালা বা লতাগুল্ম জন্মেনা। শত শত মাইলব্যাপী শুধু ধু ধু মিহি বালুকণা দ্বারা গঠিত বালিয়াড়ি। বর্তমান সময়েও সেখানে কোন মানুষ যেতে ভয় পায়। কারণ এ এলাকায় গেলে কেউ আর ফিরে আসতে পারে না। শুভ্র মিহি বালুর সমুদ্রে তলিয়ে অবশেষে প্রাণ হারায়। ভৌগলিক ও আবহাওয়াবিদদের ধারণা হাজার হাজার বছর আগে এলাকাটা উর্বর ও জনবসতিপূর্ণ ছিল। পরবর্তীকালে আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এটিই হচ্ছে পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত "আহকাফ” এলাকা এবং এ এলাকাই ছিল 'আদ' জাতির আবাসভূমি।
আদ জাতির দৈহিক কাঠামো ও শক্তিমত্তা
নূহ আলাইহিস সালামের কওমকে মহাপ্লাবন দিয়ে ধ্বংস করার পর আল্লাহ তা'আলা আদ জাতিকে পৃথিবীতে প্রতিপত্তি দান করলেন। তাদের দৈহিক গঠন ছিল অত্যন্ত মজবুত। তারা ছিল সুস্বাস্থ্য ও অতুলনীয় দৈহিক শক্তির অধিকারী। যদিও "আহক্বাফ" এলাকা ছিল তাদের আদি বাসস্থান তবুও উন্নতির যুগে শক্তির দাপটে তারা ইয়ামানের পশ্চিমের সমুদ্র তীরবর্তী ওমান ও হাদরামাওত থেকে ইরাক পর্যন্ত তাদের প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাদের যে দৈহিক শক্তি ও বলবীর্য ছিল তাতে সে সময়ে তাদের সাথে পাল্লা দেয়ার মত আর কোন জাতি ছিল না। তাই তারা গর্ব করে বলতো, আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে? তাদের এ গর্বিত উক্তির কথা কুরআন মজীদেও উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের সম্পর্কে কুরআন মজীদে আরো বলা হয়েছে 'আদ' জাতি ন্যায় ও সত্যের পথ থেকে সরে গিয়ে এ পৃথিবীতে বড় অহংকারী হয়ে উঠলো। তারা আল্লাহ ও রসূলদের অস্বীকার করে বসলো এবং অত্যাচারী ও সীমা লঙ্ঘনকারীদের অনুসরণ করলো।
সভ্যতা ও তমুদ্দুন
তৎকালীন সভ্যতা ও তমুদ্দুনের দিক দিয়েও তারা ছিল তখনকার জাতিসমূহের মধ্যে সেরা। তাদের জীবন যাপনের মান ছিল খুব উন্নত। স্থাপত্য শিল্প তথা ঘরবাড়ি ও দালান কোঠা নির্মাণের বেলায় তাদের চেয়ে দক্ষ ও পারদর্শী আর কোন জাতি ছিল না। তারা বড় বড় দালান কোঠা তৈরী করতে পারতো। বড় বড় স্তম্ভের ওপর তারা এসব দালান-কোঠা তৈরী করতো। এ জন্য সে সময় তারা খুব নামকরা জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল।
শাসক গোষ্ঠী
তাদের শাসনের দায়িত্ব বা রাষ্ট্র পরিচালনার ভার ছিল কিছু সংখ্যক জালেম ও অত্যাচারী লোকের হাতে। তারা যা করতো তা ন্যায় হোক বা অন্যায় হোক সবাইকে মেনে নিতে হতো। আপত্তি করা তো দূরের কথা কেউ টু-শব্দটি পর্যন্ত করতে পারতো না। এ সম্পর্কেও কুরআন শরীফে বলা হয়েছে: 'আর আদ জাতি জালেম, অত্যাচারী এবং ন্যায় ও সত্যের দুশমনদের কথা মেনে চলতো।'
এ 'আদ' জাতি কিন্তু আল্লাহকে অস্বীকার করতো না। তবে আল্লাহকে অস্বীকার না করলেও তারা ছিল মুশরিক। তারা তিনটি দেবমূর্তির পূজা করতো। এসব মূর্তির নাম ছিল ছাফা, সামুদ ও হাবা। এ ছাড়া অনেক জিনিসকেই তারা আল্লাহর সাথে শরীক করতো। যে সব জিনিসকে তারা আল্লাহর শরীক মনে করতো তারা তার মূর্তি তৈরী করতো। এ সব মূর্তির আবার পূজাও তারা করতো। নূহের (আ)- কওমের মত তারা মূর্তি নির্মাণে খুব পারদর্শী ছিল। আশেপাশের অনেক এলাকা দখল করে তারা ওই সব এলাকার লোকদের এ সব মূর্তি পূজা করতে বাধ্য করতো। তারা সবল ও প্রভাবশালী লোকদের কিছু বলতো না কিন্তু দুর্বলদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতো।
হযরত হুদ আলাইহিস সালাম নবী হয়ে আসলেন
এ ভাবে ক্ষমতা, প্রচুর অর্থ-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভ করে জুলুম-উৎপীড়নে যখন তারা সীমা ছাড়িয়ে গেলো তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের সৎ পথে আনার জন্য হুদ আলাইহিস সালামকে নবী করে তাদের কাছে পাঠালেন। নবুওয়াত লাভ করে হযরত হুদ (আ) তাদের বললেনঃ "আল্লাহ তা'আলা আমাকে নবী করে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। আমার কাজ হলো আল্লাহর হুকুম-আহকাম তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়া। আল্লাহর হুকুম মত চললে সব দিক দিয়ে তোমাদের ভাল হবে। তোমরা একমাত্র আল্লাহকে প্রভু বলে স্বীকার করো। তাঁর সব হুকুম মেনে নাও। আর কোন কিছুকে তাঁর সাথে শরীক করো না। আর আমাকে তাঁর নবী হিসেবে মেনে নাও। এ সব কাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। আমি একমাত্র আল্লাহর কাছে পুরস্কার চাই।"
কিন্তু 'আদ' জাতির কাছে ছিল অঢেল সম্পদ। তাদের কোন কিছুর অভাব ছিল না। তাদের ছিল সুউচ্চ প্রাসাদ, শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মজবুত দুর্গ, বিরাট বিরাট ফলের বাগান, ফসলের খামার এবং পাহাড়ী ঝর্ণার সুপেয় পানি। তারা এ সবের মধ্যে ডুবে ছিল। তাই তারা নবীর কথা শুনলো না। তারা আল্লাহর নবী হুদ (আ)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো। আদ কওমের নেতারা বললো: তুমি মিথ্যা কথা বলছো। আর আমরা দেখতে পাচ্ছি তুমি একজন নিরেট বোকা ছাড়া আর কিছুই নও। কারণ তুমি দুনিয়ার এ সব ভোগ বিলাসের জিনিস চাও না। অথচ এগুলো কে না চায়?
এ কথা শুনে হযরত হূদ (আ) তাদের বললেনঃ হে আমার কওমের ভাইয়েরা, আমি কোন বোকা মানুষ নই। বরং আমি আল্লাহর একজন রসূল। আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর নির্দেশ পৌঁছিয়ে দিচ্ছি মাত্র। তোমরা আমাকে তোমাদের জন্য একজন বিশ্বস্ত উপদেশ দাতা বলতে পারো। তোমরা হয়তো এই ভেবে আশ্চর্য হচ্ছো যে, তোমাদের কওমের একজন লোক আল্লাহর রসূল হয়েছেন। আর তিনিই আজ তোমাদের আল্লাহর কথা শুনাচ্ছেন। কিন্তু আশ্চর্য হওয়ার কিছুই এতে নেই। আমি যা বলছি তা একটু চিন্তা-ভাবনা করে দেখলেই তোমরা বুঝতে পারবে। সুতরাং আমি আবারো বলছিঃ আল্লাহ তোমাদের যে সব নিয়ামত দান করেছেন সে জন্য আল্লাহর শোকর গোজারী করো।
এ কথার জবাবে আদ কওমের নেতারা বললোঃ তুমি আমাদের কাছে কি শুধু এ উদ্দেশ্যে এসেছো যে, একমাত্র আল্লাহকে আমরা মেনে চলি? আর আমাদের বাপ-দাদা ও পূর্ব পূরুষেরা যে সব মূর্তির পূজা করেছে তার পূজা করা ছেড়ে দেই? আমরা তা কখনো করতে পারবো না। তুমি আমাদের যে আযাবের ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো। তাহলেই প্রমাণ হবে তুমি সত্যবাদী কিনা।
হযরত হুদ (আ) দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাঁর কওমকে আল্লাহর পথে আসার জন্য বুঝালেন। তিনি তাদেরকে আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। তিনি আরো বললেনঃ আজ তোমরা আল্লাহকে অস্বীকার করে যা করছো তার কারণে তোমাদের জন্য পরিণতি অপেক্ষা করছে। কিন্তু তারা হযরত হূদের (আ) কথায় মোটেই কর্ণপাত করলো না। অবশেষে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদের জন্য আযাব নির্ধারিত হয়ে গেলো। প্রথমে পর পর কয়েক বছর তাদের এলাকায় অনাবৃষ্টি ও খরা চললো। ফলে তাদের মাঠের ফসলের খুব ক্ষতি হলো। হযরত হুদ (আ) এবারও তাদের বুঝিয়ে সাবধান হতে বললেন। কিন্তু এতেও তারা কর্ণপাত করলো না। তাই আল্লাহ তা'আলা চূড়ান্ত আযাব দিয়ে তাদের ধ্বংস করার ফয়সালা হযরত হূদ (আ)-কে জানিয়ে দিলেন।
একদিন তারা দেখল আকাশে বৃষ্টির মেঘ করেছে। একটু পরেই যেন তাদের এলাকার ওপর প্রবল বৃষ্টিপাত হবে। পরপর ক'বছর বৃষ্টি ছিল না। তাই বৃষ্টির এ মেঘ দেখে তারা খুব খুশী হলো। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এটা ছিল আল্লাহর আযাব। এ মেঘ থেকে এমন ঝড়-বৃষ্টি ও তুফান এসে তাদের ওপর আপতিত হলো যে তারা একজনও আর জীবিত থাকলো না। একাধারে আট দিন এবং সাত রাত পর্যন্ত প্রচন্ড বাতাস তাদের এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে গেল। বাতাসের বেগ এত প্রচন্ড ছিল যে, ঘর-বাড়ি দালান-কোঠা সব ধূলিসাৎ হয়ে গেলো। প্রতিটি মানুষকে বাতাস যেন আছড়ে আছড়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে দিল। একমাত্র হযরত হূদ (আ) ও তাঁর প্রতি যারা ঈমান এনেছিল তারাই বেঁচে গেল। তাঁরা ছাড়া আর একটি লোকও বাঁচলো না।
আযাবে পতিত হয়ে কওম ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর হযরত হূদ (আ) ঈমানদারদের সাথে করে হাদরামাওত এলাকায় চলে গেলেন। জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো তিনি সেখানেই কাটালেন। এখানেও তিনি লোকদের আল্লাহর পথে ডাকলেন। হাদরামাওতেই তিনি ইনতিকাল করেন। পূর্ব হাদরামাওতের 'তায়ীম' নামক স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। হযরত হূদ (আ) সারা জীবন মানুষকে আল্লাহর পথে ডেকেছেন। আর এ কাজ করতে করতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। না-ফরমানীর কারণে আল্লাহ তা'আলা 'আদ জাতিকে এমন ভাবে ধ্বংস করেছেন যে, যে আহকাফ এলাকায় তারা বাস করতো সে এলাকায় আজ পর্যন্তও কোন মানুষের বসতি গড়ে ওঠেনি। এমনকি সেখানে একটি গাছ বা তৃণ-লতা পর্যন্ত জন্মায় না। কোন মানুষও সেখানে যেতে সাহস পায় না। এখন সেখানে আছে শুধু মিহি বালুকা রাশি। 'আদ' জাতির এ পরিণাম থেকে সকলের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।
অনুশীলনী
১। আল-আহকাফ এলাকা কোথায় অবস্থিত?
২। 'আদ' জাতি কোথায় বাস করতো? তাদের দৈহিক গঠন কেমন ছিল?
৩। 'আদ' জাতি কিভাবে জীবন যাপন করতো? তাদের সভ্যতা ও তমদ্দুন কেমন ছিল?
৪। 'আদ' জাতি অহংকারী হয়ে উঠলো কেন? তাদের রাষ্ট্র বা শাসন ব্যবস্থা কারা পরিচালনা করতো? তারা কিরূপ ছিল?
৫। 'আদ' জাতি কিসের পূজা করতো? তাদের কাছে নবী হিসেবে কাকে পাঠানো হয়েছিল? কখন তিনি তাদের কাছে এসেছিলেন?
৬। হযরত হূদের (আ) সাথে 'আদ' জাতির নেতাদের কি কি কথাবার্তা বা বিতর্ক হয়েছিল?
৭। হযরত হূদ (আ) তাদেরকে কি বললেন? তিনি কি তাদেরকে কোন অন্যায় কথা বলেছিলেন?
৮। 'আদ জাতির ওপর আল্লাহর আযাব কিভাবে এসেছিল?
৯। কয়দিন পর্যন্ত আযাব চলেছিল? 'আদ' জাতি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর হযরত হুদ (আ) কি করলেন?
১০। 'আদ' জাতির পরিণাম থেকে আমাদের কি শিক্ষা নেয়া উচিত?
📄 হযরত সালেহ আলাইহিস সালাম
আরবের উত্তর-পশ্চিমে আল-হিজর নামক একটি জায়গা আছে। এর আরেক নাম মাদায়েনে সালেহ। এখানে একটি প্রাচীন জাতি বাস করতো। এই জাতির নাম ছিল সামূদ। মদীনা এবং তাবুকের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত সামূদ জাতির এই আবাস স্থানকেই প্রাচীন কালে আল-হিজর বলে উল্লেখ করা হতো। পবিত্র কুরআন মজীদে মাদায়েন ও আল-হিজর এ উভয় নামেরই উল্লেখ আছে।
পাপ ও গোনাহের কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে 'আদ' জাতিকে ধ্বংস করার পর আল্লাহ তা'আলা এই সামূদ জাতিকে প্রভাব প্রতিপত্তি দান করলেন। তারা বিভিন্ন দিক দিয়ে খুব উন্নতি লাভ করলো। তারা প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারী হয়ে অত্যন্ত বিলাসী জীবন যাপন করতে লাগলো। তারা পাহাড় কেটে কেটে যে বাসস্থান নির্মাণ করতো তা যেমন ছিল মজবুত তেমনি ছিল জাঁকজমক ও শান শওকতে ভরা। কিন্তু হলে কি হবে? অর্থ সম্পদ ও জাঁকজমক তাদের যতই বেড়ে চললো ততই তাদের মনুষ্যত্ব অর্থাৎ ভাল গুণাবলীর অভাব হতে লাগলো। তাদের এলাকার অতীতের যে সব চিহ্ন আজো টিকে আছে সেগুলো দেখলে তাদের যে কত ধন-সম্পদ ছিল এবং দুনিয়ায় তারা যে কত উন্নতি লাভ করেছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়।
তারা যতই উন্নতি লাভ করতে লাগলো ততই আল্লাহকে ভুলে যেতে থাকলো। এক আল্লাহর হুকুম-আহকাম পালন না করে তারা মূর্তি তৈরী করে তার পূজা করতে লাগলো। কিছু সংখ্যক জালেম-অত্যাচারী লোক ছিলো তাদের নেতা। তাদের হুকুম মত এরা চলতো। তাদের সমাজে কোন প্রকার ন্যায় বিচার ছিল না। ধনী ও প্রভাবশালীদের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হতো। আর গরীব ও দুর্বলদের প্রতি জুলুম করা হতো।
হযরত সালেহ (আ) তাদের কাছে নবী হয়ে এলেন
সামূদ জাতি যখন এ ধরনের জুলুম অত্যাচার ও অন্যায়ের মধ্যে ডুবে ছিল তখন আল্লাহ তা'আলা হযরত সালেহ (আ)-কে নবী বানিয়ে তাদের কাছে পাঠালেন। নবুওয়াত লাভ করে হযরত সালেহ (আ) তাদের ভুল-ত্রুটি ও অন্যায় সম্পর্কে সতর্ক করে দিতে থাকলেন। তিনি দেখলেন তারা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে অস্বীকার করে নিজেদের হাতে তৈরী মূর্তির পূজা করে। হযরত সালেহ (আ) তাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের কথা। তিনি তাদের বললেনঃ একমাত্র আল্লাহর ইবাদত ও দাসত্ব করেই সৌভাগ্য লাভ এবং পরকালে নাজাত পাওয়া যাবে। তিনি তাদের একথা বুঝালেন যে, 'আদ' জাতিকে ধ্বংস করার পর মহান আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষার জন্য ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি দান করেছেন। তিনি তাকওয়া বা পরহেজগারীর পথ গ্রহণ করতে বললেন। মূর্তি পূজা করতে নিষেধ করলেন। তিনি বললেনঃ তোমারা গরীব ও দুর্বলের প্রতি দয়া কর এবং অন্যায় কাজ ছেড়ে দাও। তোমরা তো চিরদিন এ দুনিয়াতে বাস করবে না। একদিন তোমাদের মরতে হবে। আবার আখেরাতে পুনরায় জীবিত হয়ে আল্লাহর কাছে এ দুনিয়ার সব কাজ-কর্মের হিসেব দিতে হবে। সুতরাং সেদিকেই বেশী করে মনোযোগ দাও। আর সে জন্যই চেষ্টা সাধনা করো। এসব কথা বলে হযরত সালেহ (আ) তদের এক আল্লাহর দাসত্ব করার আহবান জানালেন। আর অন্য সব কিছু পরিত্যাগ করতে বললেন।
সমাজের লোকেরা তাকে প্রত্যাখান করলো
হযরত সালেহ (আ)-এর এই কথা কওমের নেতাদের পছন্দ হলো না। তারা মনে করলো একথা মানলে তারা আর নেতা থাকতে পারবে না। কওমের লোকদের ওপর এখন যেভাবে হুকুম চালাচ্ছে সেভাবে হুকুম চালাতে পারবে না। তাদের ওপর জুলুম করা যাবে না। সস্তায় তাদের নিকট থেকে কোন কাজ আদায় করা যাবে না। কারণ তখন সবাইকে আল্লাহর কথা মত চলতে হবে। আর আল্লাহর কথা তো ন্যায় বিচারে ভরা। সে কথা মানলে জুলুম বা অন্যায় করা যাবে না। তাই সমাজের নেতারা তাঁর কথা মানলো না। তবে কিছু দুর্বল ও অসহায় লোক তাঁর কথা মেনে নিল। তাঁরা আল্লাহকে বিশ্বাস করলো এবং হযরত সালেহ (আ)-কেও নবী বলে স্বীকার করলো। কিন্তু নেতারা বললোঃ তোমরা যা বিশ্বাস করেছো আমরা তা মানি না।'
কিন্তু আল্লাহর নবীগণ কখনো কোন কিছুতে দমে যান না বা হতাশ হন না। হযরত সালেহ (আ) ও কওমের নেতাদের কথায় দমলেন না। তিনি রাতদিন এক করে আল্লাহর দীনের কথা প্রচার করে চললেন। এতে ফলও ফলতে লাগলো। অল্প সংখ্যক হলেও কিছু কিছু লোক তাঁর কথা মেনে নিতে লাগলো। তবে তারা সমাজের প্রভাবশালী কোন লোক নয়। বরং যারা দুর্বল ও অত্যাচারিত তারাই বেশী সংখ্যায় তাঁর কথা মানতে থাকলো। এ অবস্থা দেখে নেতারা মনে করলো এ ভাবে আর চলতে দেয়া ঠিক নয়। একটা ফন্দি করে সালেহ (আ) এর কাজ বন্ধ করতে হবে। তাই তারা এসে হযরত সালেহ (আ)-কে বললো, তুমি যে আল্লাহর নবী তার প্রমাণ কি? আমাদের সামনে যদি তেমন কোন প্রমাণ পেশ করতে পার তাহলে তোমার কথা বিশ্বাস করা যায় কিনা ভেবে-চিন্তে দেখা যাবে।
হযরত সালেহ (আ) এর মু'জিযা
কওমের নেতাদের এসব কথা শুনে হযরত সালেহ (আ) আল্লাহর কাছে একটা মু'জিযা অর্থাৎ প্রমাণের জন্য দোয়া করলেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করলেন। সবাই দেখতে পেল পাহাড় থেকে একটি উটনী নেমে আসছে। উটনীটা কাছে এলে হযরত সালেহ (আ) সেটি দেখিয়ে বললেনঃ দেখো, এই উটনীটাই আমার নবুওয়াতের প্রামাণ। এখন থেকে এ উটনীটা সর্বত্র চরে বেড়াবে। আর তোমাদের এলাকায় যত পানি আছে তার সবটুকু একদিন এ উটনীটা পান করবে। আর অন্যদিন পান করতে পারবে তোমরা ও তোমাদের যত গবাদি পশু আছে সবাই মিলে। এখন থেকে পালা করে এ নিয়ম চলতে থাকবে। এতে তোমাদের কিছু অসুবিধা নিশ্চয়ই হবে। কিন্তু সাবধান! এ উটনীর কোন ক্ষতি করার চিন্তা করো না। যদি তা করো তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব এসে তোমাদের ধ্বংস করে দেবে।
উটনীটাকে হত্যা করা হলো
প্রথম প্রথম কওমের লোকেরা উটনীটাকে কিছু বললো না। কিন্তু পরে তারা খুবই বিরক্ত হয়ে উঠলো। কারণ উটনীটা যেখানে ইচ্ছা চরে বেড়াতে থাকলো। আর এক দিন পর পর এলাকার সব পানি পান করে ফেলতে লাগলো। এতে সবাই বেশ একটু অসুবিধায় পড়ে গেল। তাদের মধ্যে নয়জন খুব প্রভাবশালী নেতা ছিল। তারা সলা-পরামর্শ করে উটনীটাকে হত্যা করতে মনস্থ করলো। সুতরাং একজন লোক ঠিক করে তার উপর এ দায়িত্ব দেয়া হলো। অবশেষে যা হবার তাই হলো। সেই দুষ্ট লোকটি একদিন উটনীটাকে হত্যা করে ফেললো। উটনীটাকে হত্যা করার পরে হযরত সালেহ (আ) তাদেরকে জানিয়ে দিলেন যে আর রক্ষা নেই। মাত্র তিনদিনের মধ্যে তোমাদের ওপর আল্লাহর আযাব নেমে আসবে। এর মধ্যে একদিন তারা সালেহ (আ)-কেও রাতের বেলা গোপনে হত্যা করতে মনস্থ করলো। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদের সে সুযোগ দিলেন না।
আযাব
আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাব অবধারিত জেনে হযরত সালেহ (আ) আল্লাহর নির্দেশে সেখান থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে যাওয়ার আগেও তিনি বললেনঃ হে আমার জাতির লোকেরা, আমি আল্লাহর হুকুম তোমাদের শুনিয়েছি। আমি তোমাদের মঙ্গল কামনা করেছি। তোমাদের যাতে কোন ক্ষতি না হয় সে জন্য আমি তোমাদেরকে অনেক বুঝিয়েছি। কিন্তু তোমরা আমার কথা শোননি। প্রকৃত কথা হলো তোমরা তোমাদের মঙ্গলকামীকে পছন্দ করো না। এ কথা বলে হযরত সালেহ (আ) এলাকা ছেড়ে চলে গেলেন। নির্দিষ্ট দিনে বিকট এক আওয়াজ হলো। এত জোরে আওয়াজ হলো যে, এরূপ আওয়াজ আর কোন দিন কেউ শোনেনি। প্রচন্ড আওয়াজে সবাই মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। অনেকে মারা গেল। এরপর তাদের ওপর পাথর বর্ষিত হলো। সব শেষে ভূমিকম্প দিয়ে গোটা এলাকা ওলট পালট করে দেয়া হলো। এভাবে সবাই করুণ অবস্থায় মারা গেল।
এ আযাব থেকে হযরত সালেহ (আ) ও তাঁর প্রতি যে একশ বিশজন লোক ঈমান এনেছিলেন তাঁরা বেঁচে গেলেন। পরে তিনি এসব লোকদের নিয়ে ফিলিস্তিনের 'রামলা' নামক স্থানে বসতি স্থাপন করেছিলেন বলে জানা যায়। এখানে তিনি আল্লাহর দীনের কাজ করতে করতে ইনতিকাল করেন। জীবনের একটি মুহুর্তের জন্যও তিনি মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতে ভুলে যাননি।
অনুশীলনী
১। আল-হিজর বা মাদায়েনে সালেহ কোথায় অবস্থিত?
২। সামুদ জাতি কারা? তারা কিভাবে ঘর-বাড়ি তৈরী করতো?
৩। সামূদ জাতি কিসের পূজা করত? তাদের কাছে নবী বানিয়ে কাকে পাঠানো হয়েছিল?
৪। হযরত সালেহ (আ) নবুওয়াত লাভ করে কি দেখতে পেলেন? তিনি তাদের কি করতে বললেন?
৫। সামূদ কওমের নেতারা হযরত সালেহ (আ)-এর কথা পছন্দ করলো না কেন?
৬। কি ধরনের লোকজন হযরত সালেহ (আ)-কে নবী বলে মানলো?
৭। উটনীটা কিসের প্রমাণ ছিল? সেটিকে তারা হত্যা করলো কেন?
৮। উটনীটাকে হত্যা করার কয়দিন পর আযাব এসেছিল?
৯। কি কি আযাব দিয়ে সামূদ জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল?
১০। কারা এই আযাব থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন? তারা পরে কোথায় গেলেন?
📄 হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল আলাইহিম সালাম
হযরত নূহের (আ) ইনতিকালের বহুদিন পর আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আ)-কে নবী করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন। তিনি ইরাকের 'উর' নামক এক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল আযর। সে ছিল একজন প্রভাবশালী রাজ পুরোহিত। হযরত ইবরাহীম (আ) যে দেশে জন্মলাভ করেন সে দেশের শাসকের নাম ছিল নমরূদ। সে ছিল খুব অত্যাচারী। সে নিজের ইচ্ছা মত রাজ্য শাসন করতো। তার রাজ্যও ছিল অনেক বড়। রাজ্যের লোকেরা ছিল মুশরিক। তারা নমরূদকে পূজা করতো।
হযরত ইবরাহীম (আ) যখন বড় হলেন তখন দেখলেন লোকেরা মূর্তি পূজা করে। মূর্তির সামনে নত হয়। মূর্তিদের ভয় করে, ভক্তি করে। নমরূদেরও ভাল-মন্দ আদেশ সব তারা মেনে নেয়। এসব দেখে হযরত ইবরাহীম (আ) মনে বড় দুঃখ পেলেন। তিনি চিন্তা করতে লাগলেন কেমন করে এসব অজ্ঞ লোকদের তিনি বুঝাবেন।
এ অবস্থার মধ্যে হযরত ইবরাহীম (আ) বড় হয়ে উঠলে আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াত দান করলেন। তখন তিনি নিজ জাতিকে সংশোধনের পথ পেলেন। তিনি তাঁর পিতাকে বললেনঃ হে আমার সম্মানিত পিতা, আপনি এসব মূর্তি তৈরী করে পূজা করছেন কেন? এসব মূর্তি তো শুনতেও পায় না, দেখতেও পায় না। এদের কোন শক্তি নেই। এরা মানুষের ভাল-মন্দ কিছুই করতে পারে না। হে আমার পিতা, মহান আল্লাহ আমাকে এমন জ্ঞান দান করেছেন যা মানলে আপনি হিদায়াতের পথ পাবেন।' কিন্তু হযরত ইবরাহীমের (আ) পিতা তাঁর কথা তো শুনলোই না, বরং উল্টা তাঁকে কঠোরভাবে এ বলে শাসালোঃ ইবরাহীম, তুমি যদি এসব কথা বলা না ছাড় তাহলে আমরা তোমাকে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করবো। সুতরাং যদি বাঁচতে চাও তাহলে এসব কথা ছাড়। তা না হলে আমার কাছ থেকে দূর হয়ে যাও।
হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁর কওমের লোকদের আল্লাহর পথের দিকে ডাকলেন। তিনি তাদের বুঝালেন, সবকিছু ছেড়ে একমাত্র আল্লাহকে রব ও ইলাহ বলে স্বীকার করো। মূর্তি পূজা ছেড়ে দাও। মূর্তির কোন ক্ষমতা নেই। কিন্তু কওমের লোকেরাও তাঁর কথা শুনলো না। তাদের বিশ্বাস মূর্তিগুলোর অনেক ক্ষমতা আছে। হযরত ইবরাহীম (আ) তাদের এ ভুল ভেঙে দেয়ার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকলেন। একদিন তিনি সুযোগ পেয়েও গেলেন। কোন এক উৎসব উপলক্ষে সব লোক শহরের বাইরে চলে গেল। যাওয়ার সময় তারা হযরত ইবরাহীম (আ)-কেও ডাকলো। কিন্তু তিনি তাদের সাথে না গিয়ে শহরেই থাকলেন। সব লোক চলে যাওয়ার পর তিনি মন্দিরে প্রবেশ করলেন। সেখানে ছোট, বড় ও মাঝারি সব রকমের মূর্তি সারি সারি রাখা ছিল। তিনি একখানা কুঠারের আঘাতে সবগুলো মূর্তি ভেঙে ফেললেন। শুধু বড় মূর্তিটা না ভেঙে তার গলায় কুঠার ঝুলিয়ে রেখে মন্দির থেকে বের হয়ে এলেন।
উৎসব শেষে লোকজন শহরে ফিরে এসে মন্দিরে প্রবেশ করে তাদের সব মূর্তি ভাঙা দেখে হৈ চৈ শুরু করে দিল। তাদের একটিই প্রশ্ন, কে এ কাজ করলো? কেউ কেউ বললো, ইবরাহীম নামে এক যুবক আছে। সে মূর্তি এবং তাদের পূজা করা পছন্দ করে না। সে হয়তো এ কাজ করেছে। সবাই হযরত ইবরাহীম (আ)-কে ডেকে এনে মূর্তি ভাঙার কথা জিজ্ঞেস করলো। তিনি বললেনঃ বড় মূর্তিটাকে জিজ্ঞেস করে দেখ না। ঐ তো কুড়াল ঘাড়ে করে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই বললোঃ তুমি তো জানো মূর্তি কথা বলতে পারে না। সে কি করে বলবে? হযরত ইবরাহীম (আ) বললেনঃ যারা কথা বলতে পারে না, নিজেকে বাঁচাতে পারে না, তোমরা তদের পূজা কর কেন? এবার সবাই লা-জওয়াব হয়ে গেল। কিন্তু সবাই বুঝে ফেললো যে, এ কাজ ইবরাহীমই করেছে।
আস্তে আস্তে কথাটি রাজ দরবার পর্যন্ত পৌঁছলো। বিচারে ইবরাহীমকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার সিদ্ধান্ত হলো। অনেক কাঠ-খড় যোগাড় করে বিরাট আগুনের কুন্ড জ্বালানো হলো এবং হযরত ইবরাহীম (আ)-কে তার মধ্যে ফেলে দেয়া হলো। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি আগুনে পুড়লেন না। আল্লাহ তাঁর অসীম কুদরতে তাঁকে রক্ষা করলেন। সবাই অবাক হয়ে গেলো।
এরপর একদিন তাঁকে নমরূদের রাজ দরবারে ডাকা হলো। তিনি রাজ দরবারে উপস্থিত হলে নমরূদ তাঁকে জিজ্ঞেস করলোঃ তুমি কাকে রব বা প্রভু বলে স্বীকার করো? হযরত ইবরাহীম (আ) নমরূদের রাজ দরবারে উপস্থিত হয়েও নমরূদকে দেখে ভয় করলেন না। তিনি নমরূদের মুখের ওপর বলে দিলেনঃ আমার প্রভু তিনি যিনি বাঁচাতে ও মারতে পারেন। নমরূদ তখন জেলখানা থেকে দু'জন কয়েদীকে ডেকে এনে একজনকে মেরে ফেললো এবং এজনকে ছেড়ে দিল। সে এবার হযরত ইবরাহীমের দিকে তাকিয়ে বললোঃ দেখলে, আমি মারতেও পারি, বাঁচাতেও পারি? হযরত ইবরাহীম (আ) বললেনঃ ঠিক আছে, আমার প্রভু আল্লাহ সূর্য পূর্বদিক থেকে উদিত করেন। তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে উঠাও। এবার নমরূদ বোকা বনে গেল। কোন জবাব দিতে পারলো না। হযরত ইবরাহীম (আ) নমরূদের রাজ দরবার থেকে চলে এলেন।
এরপরও তারা হযরত ইবরাহীমের (আ) ওপর নানা ভাবে অত্যাচার করতে থাকলো। তাই তিনি নিজের জন্মস্থান ইরাকের 'উর' শহর ছেড়ে প্রথমে শামদেশে (বর্তমান সিরিয়া) এবং পরে ফিলিস্তিনে হিজরত করলেন। সাথে গেলেন তাঁর স্ত্রী সারা ও ভাতিজা হযরত লূত আলাইহিস সালাম। সেখানে কিছুকাল থাকার পর তিনি স্ত্রী সারাকে নিয়ে মিসর সফরে গেলেন। সেখানকার বাদশাহ তাঁর চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে হাজেরা নাম্নী নিজের বংশের একজন মেয়েকে তাঁর সাথে বিয়ে দিলেন। হযরত ইবরাহীম (আ) আবার ফিলিস্তিনে ফিরে এসে সেখানেই বসবাস করতে শুরু করলেন। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বয়স তখন নব্বই বছরেরও বেশী। তখনও তাঁর কোন সন্তানাদি হয়নি। কারণ তাঁর প্রথমা স্ত্রী সারা ছিলেন সন্তানহীনা।
এ সময়ে দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরার গর্ভে হযরত ইবরাহীম (আ) এর একটি পুত্র সন্তান জন্মলাভ করে। তিনি তার নাম রাখলেন ইসমাঈল। এ সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার কিছুদিন পরেই আল্লাহ তা'আলা এ পুত্র ও তাঁর মা হাজেরাকে মক্কায় রেখে আসার আদেশ করলেন। তখন পর্যন্ত মক্কা ছিল জন-মানবহীন। সেখানে কেউ বসবাস করতো না। খাদ্য দ্রব্য বা পানিও সেখানে পাওয়া যেত না। কিন্তু হযরত ইবরাহীম (আ) এসব কোন কিছুই চিন্তা করলেন না। তিনি তার স্ত্রী ও পুত্রকে মক্কায় রেখে এলেন। আল্লাহর অশেষ করুনায় সেখানে যমযম নামক কুপের উদ্ভব হলো। এ কূপের পানি পাওয়ার পরে লোকজন সেখানে এসে বসবাস করতে আরম্ভ করলো। এভাবে মক্কায় মানুষের বসতি গড়ে উঠলো।
হযরত ইবরাহীম (আ) বাস করতেন শত শত মাইল দূরে ফিলিস্তিনে। তিনি মাঝে মাঝে স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাঈলকে দেখতে মক্কায় আসতেন। পুত্র ইসমাঈল কিছু বড় হলে একদিন তিনি স্বপ্নে দেখলেন আল্লাহ তা'আলা তাঁর পুত্রকে কুরবানী করতে আদেশ করছেন। নবীদের স্বপ্ন কখনো মিথ্যা হয় না। তাই তিনি পুত্র ইসমাঈলকে সব কিছু খুলে বললেন। পুত্রও খুশী মনে কুরবানী হতে রাজী হয়ে গেলেন। হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁকে নিয়ে মক্কার অদূরে মিনা উপত্যকায় উপস্থিত হলেন। বৃদ্ধ পিতার আদরের ধন একমাত্র পুত্র ইসমাঈলকে কোরবানীর উদ্দেশ্যে শুইয়ে দিয়ে আল্লাহকে খুশী করার জন্য পিতা হযরত ইবরাহীম (আ) চোখ বন্ধ করে তাঁর গলায় ছুরি চালালেন। পরীক্ষায় তিনি পাশ করলেন। তাই আল্লাহ তা'আলা তাঁর ছুরির নিচে থেকে ইসমাঈলকে সরিয়ে দিলেন এবং তাঁর পরিবর্তে একটি দুম্বা ছুরির নিচে দিয়ে ইবরাহীমকে ডেকে বললেনঃ হে ইবরাহীম, তুমি স্বপ্নের মাধ্যমে দেয়া আমার আদেশ সত্যই পালন করে দেখালে। তাই আমি তোমার জন্য এ ব্যবস্থা করলাম।
পিতা পুত্র বাড়িতে ফিরে এলেন। কিছু দিন পরে আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আ)-কে বায়তুল্লাহর স্থান দেখিয়ে তা নির্মাণ করতে আদেশ করলেন। তাই পিতা-পুত্র উভয়ে মিলে এবার কা'বা ঘর বা বায়তুল্লাহ তৈরী করতে থাকলেন। পাথর বহন করে এনে তা ঠিকঠাক মত ছেঁটে কেটে একটার পর একটা রেখে নির্মাণ কাজ চললো। হযরত ইসমাঈল (আ) পাথর ও অন্যান্য জিনিস যোগান দিচ্ছিলেন আর হযরত ইবরাহীম (আ) ঘরের দেয়াল গেঁথে উঠাচ্ছিলেন। এ সময় বাপ-বেটা উভয়ে অত্যন্ত আকুলভাবে দো'আ করেছিলেনঃ 'হে আল্লাহ, আমাদের এ কাজ কবুল কর।'
এভাবে সারাজীবন একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহর দীনের কাজ করে মানুষকে আল্লাহর পথে ডেকে একশত পঁচাত্তর বছর বয়সে হযরত ইবরাহীম (আ) ইনতিকাল করেন। ফিলিস্তিনের আল-খলীল নামক স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। প্রথমা স্ত্রী সারার গর্ভেও হযরত ইবরাহীম (আ)-এর এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তিনিও নবী ছিলেন। তার নাম হযরত ইসহাক (আ)। হযরত ইসমাঈল (আ) একশ' সাইত্রিশ বছর বয়সে মক্কায় ইন্তিকাল করেন। তাঁকে বায়তুল্লাহর নিকটে তাঁর মায়ের কবরের পাশেই দাফন করা হয়। আল্লাহর নবীগণ এভাবেই সারা জীবন আল্লাহর নির্দেশ পালন করেছেন এবং মানুষকে সত্যের পথে ডেকেছেন।
অনুশীলনী
১। হযরত ইবরাহীম (আ) কোথায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন? তাঁর পিতার নাম কি ছিল?
২। হযরত ইবরাহীম (আ) বড় হয়ে কি দেখলেন?
৩। হযরত ইবরাহীম (আ) মূর্তিদের সম্বন্ধে পিতার কাছে কি বললেন?
৪। উৎসবের দিন সব লোক শহরের বাইরে চলে গেলে হযরত ইবরাহীম (আ) কি করলেন?
৫। 'উৎসব শেষে লোকেরা ফিরে এসে কি দেখলো?
৬। মূর্তি ভাঙার কথা জিজ্ঞেস করলে হযরত ইবরাহীম (আ) কি বললেন?
৭। হযরত ইবরাহীম (আ)-কে আগুনে ফেলার পর কি হলো?
৮। নমরূদের প্রশ্নের জবাবে হযরত ইবরাহীম (আ) কি বলেছিলেন?
৯। তিনি জন্মস্থান ছাড়লেন কেন? জন্মস্থান ছেড়ে তিনি কোথায় গেলেন?
১০। ইসমাঈল কার গর্ভে জন্মগ্রহণ করলেন?
১১। কে কে কা'বা ঘর নির্মাণ করলেন?