📄 হযরত আদম আলাইহিস সালাম
তোমরা জান মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি শুধু আমাদেরকেই সৃষ্টি করেননি সারা বিশ্ব-জাহানে যা কিছু আছে তা সবই তাঁর সৃষ্টি। তিনি গাছ-পালা, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর, আসমান-জমিন সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। এ সব সৃষ্টি করতে তাঁর মোটেই কোন কষ্ট হয়নি। তিনি এমন ক্ষমতার অধিকারী যে কোন কিছু সৃষ্টি করার ইচ্ছা করলে শুধু আদেশ করেন "হয়ে যাও” আর সংগে সংগে ঐ বস্তুটি হয়ে যায়। যে বিশাল পৃথিবীতে আমরা বাস করছি তাও তিনি এভাবেই সৃষ্টি করেছেন।
আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি আজ থেকে শত শত কোটি বছর পূর্বে আল্লাহ তা'আলা সেটি সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবী সৃষ্টি করার পেছনে আল্লাহ তা'আলার উদ্দেশ্য ছিল এখানে মানুষকে আবাদ করা। তাই বলে কিন্তু তিনি পৃথিবী সৃষ্টি করার পর পরই এখানে মানুষকে পাঠাননি বরং মানুষকে এই পৃথিবীতে পাঠালে তার জীবন ধারণ করার জন্য যা কিছু প্রয়োজন হবে সর্ব প্রথম এখানে সে সব জিনিস সৃষ্টি করেছেন। তাই সৃষ্টি করেছেন গাছ-পালা, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, বন-উপবন, সাগর-মহাসাগর নানা রকমের জীব-জন্তু, পশু-পাখী এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সব জিনিস। এসবও কিন্তু আবার একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এ জন্যও লেগেছে কোটি কোটি বছর।
মানুষ সৃষ্টিঃ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের লক্ষ কোটি সৃষ্টি এ পৃথিবীতে আছে। এ সবের মধ্যে মানুষ সবার সেরা। মানুষের দেহের গঠন যেমন অনুপম তেমনি তার জ্ঞান বুদ্ধি বিবেক-বিবেচনা, চিন্তা-চেতনা এবং সৌন্দর্য ও রুচিবোধও অতুলনীয়। এছাড়াও তারা আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয়তম সৃষ্টি। আর কোন সৃষ্টিই তার সমকক্ষ নয়। পৃথিবীর সব কিছু তাই মানুষের প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে।
সব কিছু সৃষ্টি করার পর মহান আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলেন মানুষ সৃষ্টি করার। একদিন ফেরেশতাদের ডেকে তিনি তাঁর এ ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, “হে ফেরেশতারা, আমি পৃথিবীতে মানুষ নামে এক নতুন মাখলুক সৃষ্টি করতে চাচ্ছি। তারা হবে আমার খলীফা বা প্রতিনিধি। আমি যে ভাবে চাই আমার পক্ষ থেকে তারা সেভাবে দুনিয়াটা চালাবে।" ফেরেশতারা আল্লাহর এ উদ্দেশ্য বুঝতে পারলো না। তারা বললোঃ হে আল্লাহ, তোমার গুণগান ও প্রশংসা করার জন্য তো আমরাই আছি। রাত দিন সব সময় তোমার পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করছি। তোমার হুকুম তা'মীল করছি। এ সবের জন্য তো আর কোন মাখলুকের প্রয়োজন নেই। তাছাড়া তোমার উদ্দেশ্য থেকে আমরা বুঝতে পারছি, এ নতুন সৃষ্টিকে তুমি অসংখ্য ক্ষমতা ও অধিকার প্রদান করবে। তাদের থাকবে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি। যে কোন ব্যাপারে তারা তাদের ইচ্ছাশক্তি ও কর্মক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। এরূপ স্বাধীনতা ও কর্মক্ষমতা কোন সৃষ্টিকে দেয়া হলে আমাদের ধারণায় তারা স্বেচ্ছাচারিতা চালাবে। পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ও খুনখারাবির মাধ্যমে এর পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলবে। অতএব এধরনের নতুন মাখলুক সৃষ্টির কি কোন প্রয়োজন আছে? জবাবে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ হে ফেরেশতারা, আমি যা জানি তোমরা তা জান না।
এরপর আল্লাহ তা'আলা মাটি দিয়ে হযরত আদম আলাইহিস সালামের দেহ সৃষ্টি করলেন এবং পরে সেই দেহে প্রাণ দান করলেন। এভাবে হযরত আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হলো। তিনি হলেন দুনিয়ার সর্বপ্রথম মানুষ।
আদম (আ)-কে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তা'আলা তাঁকে প্রয়োজনীয় সব রকমের জ্ঞান দান করলেন। অতি যত্নে সব কিছু তাঁকে শিখিয়ে দেয়া হলো। কারণ আল্লাহর এই বিশাল পৃথিবীতে তাকে খিলাফতের দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ দায়িত্ব পালন করতে হলে থাকতে হবে প্রয়োজনীয় ব্যাপক জ্ঞান। সকল জ্ঞানের উৎস হলেন মহান আল্লাহ। তাই তিনি নিজেই আদম (আ)কে এ জ্ঞান শিক্ষা দিলেন। পরে আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদের ডেকে ঐ সব বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু ফেরেশতারা সে সব বিষয়ে কিছুই বলতে পারলো না। তাঁরা বললো: হে আল্লাহ, সব জ্ঞানের মালিক তো তুমি। তুমি যাকে যতটুকু জ্ঞান দান করো সে ততটুকুই জানতে পারে। সুতরাং তুমি আমাদের যতটুকু জ্ঞান দান করেছো তার বেশী আমরা কিছুই জানি না। ফেরেশতাদের এই জবাব শুনে আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)-কে তাদের সামনে হাজির করলেন এবং ঐসব বিষয়ে বলতে আদেশ দিলেন। আদম (আ) একের পর এক সব প্রশ্নের সঠিক জবাব দিলেন। এবার ফেরেশতারা বুঝতে পারলো যে সিদ্ধান্তক্রমেই বিভিন্ন বিষয়ে আদম (আ)-কে তাদের চেয়ে বেশী জ্ঞান দান করা হয়েছে। তারা এ কথাও বুঝতে পারলো যে, একটি বড় রকমের উদ্দেশ্য নিয়েই আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা'আলা সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আদম (আ)-কে সিজদা করার জন্য ফেরেশতাদের আদেশ করলেন। সব ফেরেশতাই তৎক্ষণাৎ আল্লাহর হুকুম তা'মীল করে হযরত আদম (আ)-কে সিজদা করলো। কিন্তু আযাযীল তাঁকে সিজদা করতে অস্বীকার করলো।
আযাযীল কে?
মানুষ সৃষ্টির আগে আল্লাহ তা'আলা জিন জাতিকে সৃষ্টি করে এ পৃথিবীতে বসবাসের জন্য দিয়েছিলেন। কিন্তু কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতা পাওয়ার পর তারা পৃথিবীতে মারামারি খুনখারাবি ও ফিতনা-ফাসাদ করে এর পরিবেশ বিষাক্ত ও কলুষিত করে তোলে। এ অবস্থা চরম পর্যায়ে পৌঁছলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে কর্তৃত্ব থেকে বঞ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেন এবং এ উদ্দেশ্যে একদল ফেরেশতা প্রেরণ করেন। ফেরেশতারা তাদের অনেককে হত্যা করেন এবং অনেককে বনবাদাড়, মরুভূমি, পাহাড়-পর্বত ও বিজন এলাকায় ভাগিয়ে দেন। এ কর্মকান্ডের এক পর্যায়ে তারা একটি সুন্দর জিন শিশুর সামনাসামনি হন। তার নাম আযাযীল। শিশুটির চেহারা গতিবিধি তাদের বেশ আকৃষ্ট করে। তারা তাদের সাথে শিশুটিকে রাখার অনুমতি চেয়ে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ তাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করে জিন-শিশুটিকে তাদের সাথে রাখার অনুমতি দিলেন। ফেরেশতাদের সাথে থেকে সে আল্লাহর বন্দেগী ও আনুগত্যের চরম পরাকাষ্ঠা দেখায়। কিন্তু আদম (আ)-কে সিজদা করার ক্ষেত্রে সে চরম ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে। এভাবে আল্লাহর হুকুম অমান্য করে সে আদম (আ)-কে সিজদা করা থেকে বিরত থেকে আল্লাহর নাফরমানী করে বসলো।
তাই আল্লাহ তা'আলার কাছে সে লা'নতের যোগ্য হয়ে গেল। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি আদমকে সিজদা করলে না কেন? সে জবাব দিল হে আল্লাহ তুমি আগুন থেকে আমাকে সৃষ্টি করেছো। আর আদমকে সৃষ্টি করেছো মাটি থেকে। তাই আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। একারণে আমি তাকে সিজদা করতে পারি না। তার এ জবাবে আল্লাহ তা'আলা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন। কারণ একমাত্র আল্লাহই শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান। তাঁর হুকুম কেউ অমান্য করতে পারে না। তিনি আযাযীলকে ইবলিস ও শয়তান নামে আখ্যায়িত করে লা'নত দিয়ে তার দরবার থেকে বিতাড়িত করে দিলেন। তাকে জানিয়ে দিলেন ভয়ংকর শাস্তির স্থান জাহান্নাম তার জন্য অবধারিত। সেখানে তাকে কল্পনাতীত শাস্তি অনন্তকাল ধরে ভোগ করতে হবে। আমার এ সিদ্ধান্তের কোন ব্যতিক্রম হবে না। আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হয়ে শয়তান চরমভাবে হতাশ হয়ে গেল।
এবার সে চিন্তা করে দেখলো আদমের কারণেই সে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হলো। সুতরাং যে করেই হোক আদম এবং তার বংশধরদের ক্ষতি করতে হবে। সে অত্যন্ত কাকুতি-মিনতি করে আল্লাহর কাছে কিয়ামত পর্যন্ত সময় প্রার্থনা করলো। সে বললো: হে আল্লাহ তুমি আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত সময় দাও। আল্লাহ বললেন, তোমাকে কিয়ামত পর্যন্ত সময় দেয়া হলো। আল্লাহর পক্ষ থেকে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ লাভের ঘোষণা শুনে সে বললো: আমি কিয়ামত পর্যন্ত জীবিত থাকার যে সুযোগ পেলাম তা পুরোপুরি কাজে লাগাবো। আমি তোমার সকল বান্দাকে পথভ্রষ্ট করবো। তাদেরকে গোমরাহ করার কোন সুযোগই আমি ছাড়বো না। আল্লাহ তা'আলাও শয়তানকে বললেন: যারা সত্য সত্যই আমার আদেশ নিষেধ মেনে চলবে তাদেরকে তুমি গোমরাহ করতে পারবে না।
আল্লাহ তা'আলা এরপর আদম (আ)-কে বেহেশতের মধ্যে রেখে দিলেন। কিছুদিন পর হযরত হাওয়া আলাইহাস সালামকে সৃষ্টি করে আদম (আ)-এর স্ত্রী হিসেবে বেহেশতে রেখে দিলেন। আল্লাহ আদম ও হাওয়া (আ) উভয়কে বললেন, তোমরা যেভাবে ইচ্ছা বেহেশতে বসবাস করো। তবে একটি গাছ দেখিয়ে বললেন: এ গাছটির কাছে যেওনা। আমার এ আদেশ না মেনে এ গাছের কাছে গেলে তোমরা আমার হুকুম অমান্যকারী জালেম বলে গণ্য হবে। আদম ও হাওয়া আল্লাহর হুকুম মেনে নিলেন এবং মহাসুখে জান্নাতে বাস করতে থাকলেন।
এ দিকে শয়তান আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর থেকেই আদম ও হাওয়ার (আ) ক্ষতি সাধন করার সুযোগ খুঁজতে লাগলো। সে চেষ্টা চালাতে থাকলো তাদের আস্থা ও সান্নিধ্য লাভের। অবশেষে একদিন সে তাঁদের সুপরামর্শ দাতা হিসেবে আস্থা লাভ করতে সক্ষম হলো।
আদম ও হাওয়া (আ) কিন্তু শয়তানের মনোভাব মোটেও বুঝতে পারলেন না। এ সুযোগে শয়তান তাঁদেরকে বললো: আমি তোমাদের কল্যাণ কামনা করি। তোমাদের যে গাছের নিকট যেতে নিষেধ করা হয়েছে সে গাছের ফল খেলে তোমরা কখনোই মৃত্যুবরণ করবে না এবং এ বেহেশতেই চিরদিন থাকতে পারবে। শয়তানের এ ধোঁকায় পড়ে তাঁরা আল্লাহর নিষেধ ভুলে গেলেন এবং ঐ গাছের ফল খেলেন।
ফল খাওয়ার সাথে সাথে হযরত আদম ও হযরত হাওয়ার (আ) শরীর থেকে বেহেশতের পোশাক খসে পড়লো। তাদের লজ্জাস্থানসমূহ উন্মুক্ত হয়ে পড়লো। তারা গাছের পাতা ছিঁড়ে শরীর ঢাকতে শুরু করলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা তাঁদেরকে ডেকে বললেন, তোমরা আমার হুকুম অমান্য করেছো। আমি তোমাদেরকে যা বলেছিলাম তা তোমরা মেনে চলেনি। একথা বুঝার সাথে সাথে আদম ও হাওয়া (আ) আল্লাহর কাছে ভুলের জন্য মাফ চাইলেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁদের দো'আ কবুল করলেন এবং তাঁদেরকে মাফ করে দিলেন। আল্লাহ তা'আলা আদম ও হাওয়া (আ)-কে ডেকে বললেনঃ তোমরা দুনিয়াতে চলে যাও। পৃথিবী তোমাদের অবস্থান স্থল। মনে রেখো, শয়তান তোমাদের চিরশত্রু। সে বেহেশতে যেভাবে তোমাদের ধোঁকা দিয়ে আমার আদেশ অমান্য করালো দুনিয়াতেও তাই করার চেষ্টা করবে। পৃথিবীতে তোমরা কিভাবে জীবন যাপন করবে তা জানিয়ে তোমাদের কাছে আমার হুকুম পাঠানো হবে। আমার হুকুম মত চললে শয়তান তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
এরপর হযরত আদম ও হযরত হাওয়া (আ)-কে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। দুনিয়ায় পাঠানোর সময় হযরত আদম ও হাওয়াকে (আ) একই জায়গায় না পাঠিয়ে দু'জনকে দু' জায়গায় পাঠানো হলো। দীর্ঘদিন পরে আরবের আরাফাত নামক স্থানে তাঁরা উভয়ে পরস্পরের সাক্ষাত লাভ করেন। দীর্ঘ দিন পর তারা একে অপরের সাক্ষাত পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং একত্রে বসবাস করতে আরম্ভ করলেন। এভাবে শুরু হলো এ পৃথিবীতে মানুষের পদচারণা এবং সভ্যতার ঊষাকাল।
সৃষ্টির পর আল্লাহ তা'আলা আদম (আ)কে যে সব বিষয়ে জ্ঞান দান করেন তা ছিল মূলতঃ বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান। এক কথায় যাকে আমরা বস্তুবিজ্ঞান বলতে পারি। এ জ্ঞানের ভিত্তিতেই হযরত আদম এবং হযরত হাওয়া (আ) দুনিয়ায় জীবন যাপন শুরু করলেন। হযরত আদম (আ) ছিলেন এ পৃথিবীতে প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী। হযরত হাওয়া (আ)-এর গর্ভে হযরত আদমের (আ) বিশ বারে বিশ জোড়া অর্থাৎ মোট চল্লিশ জন ছেলে মেয়ে জন্মলাভ করলো। প্রত্যেকবারে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করতো। তাঁদের গর্ভের সন্তান-সন্ততি দ্বারা পরবর্তীকালে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমান অবস্থায় উপনীত হয়েছে।
হযরত আদম (আ) ছিলেন পৃথিবীতে প্রথম নবী। তাঁর কাছে আল্লাহর অহী আসতো। অহী হচ্ছে আল্লাহর বাণী বা আল্লাহর হুকুম। ফেরেশতা আল্লাহর হুকুম বহন করে এনে হযরত আদম (আ)-এর কাছে পৌঁছে দিয়ে যেতেন। অথবা কখনো আল্লাহ সরাসরি হযরত আদম (আ)-এর মনের মধ্যে তাঁর অহী পৌঁছে দিতেন। তিনি এই অহীর নির্দেশ মত নিজের জীবন যাপন করতেন। স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদেরকেও সেভাবে জীবন যাপন করতে আদেশ করতেন। তাঁর ছেলেমেয়ে ও নাতী-নাতনীরা যাতে আল্লাহকে ভুলে না যায় এবং সবাই আল্লাহর হুকুম মত চলে তিনি সেদিকে খেয়াল রাখতেন। তাদেরকে আল্লাহর হুকুম বুঝাতেন এবং তিনি সে অনুযায়ী জীবন যাপন করতে সাহায্য করতেন।
কুরআন ও হাদীস থেকে জানা যায় হযরত আদম আলাইহিস সালাম নয়শত ষাট বছর পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন। এ সময়ের মধ্যে তার অধঃস্তন সন্তান-সন্ততিদের সংখ্যা বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল।
অনুশীলনী
১। সারা বিশ্ব-জাহানে যা কিছু আছে তা কে সৃষ্টি করেছেন?
২। আল্লাহ কত বছর পূর্বে পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন? তিনি কিভাবে সৃষ্টি করেন?
৩। আল্লাহ ফেরেশতাদের ডেকে কি বললেন?
৪। সর্ব প্রথম মানুষ কে?
৫। আল্লাহ ফেরেশতাদের কি আদেশ করলেন?
৬। কে আল্লাহর আদেশ মানলো না?
৭। আযাযীল কি বললো? সে বিতাড়িত হলো কেন?
৮। কিয়ামত পর্যন্ত আয়ু লাভ করার পর শয়তান কি ঘোষণা করলো?
৯। বেহেশতের মধ্যে আদম ও হাওয়া (আ) আল্লাহর নাফরমানী করলেন কেন?
১০। দুনিয়ায় আসার সময় আল্লাহ আদম ও হাওয়া (আ)-কে কি বললেন?
১১। আদম ও হাওয়া (আ) এর মোট কত জন ছেলে মেয়ে ছিল?
১২। অহী কি? অহী কিভাবে হযরত আদমের (আ) কাছে আসতো?
১৩। আজকের পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে যদি ভাই ভাই বলা হয় তাহলে কি ভুল হবে? কেন?
📄 হযরত ইদরীস আলাইহিস সালাম
হযরত ইদরীস (আ) ছিলেন মহান আল্লাহর একজন নবী। তিনি ছিলেন পৃথিবীতে তৃতীয় নবী। অর্থাৎ হযরত আদম ও হযরত শীসের (আ) পরে তিনি নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। বাইবেলে তাঁর নাম হানুক বলা হয়েছে। কিন্তু কোরআনে তাঁর নাম বলা হয়েছে ইদরীস।
হযরত ইদরীস (আ) বর্তমান ইরাকের বাবেল (ব্যাবিলন) নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি হযরত আদমের (আ) পুত্র হযরত শীসের (আ) কাছে শিক্ষা লাভ করেন। এরপর বয়োপ্রাপ্ত হলে মহান আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াত দান করেন। তাঁর সম্পর্কে কথিত আছে যে, নবুওয়াত লাভের পূর্বে তিনি মানব সমাজ থেকে দূরে দূরে থাকতেন। আর একা একা আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী করে কাটাতেন। কিন্তু মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে তাঁর দেখানো পথে চলা ছেড়ে দিল তখন আল্লাহ তাঁকে নবুওয়াত দান করলেন। অহীর দ্বারা আল্লাহ তাঁকে আদেশ করলেন: “হে ইদরীস, ওঠো। নির্জন ও নিরিবিলি জীবন ছেড়ে দাও। মানুষের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তাদের কাছে আমার বাণী প্রচার কর। তাদেরকে বলো, তারা যেন অন্যায় ও অসত্যের পথ ছেড়ে আমার সত্য পথ গ্রহণ করে।"
আল্লাহর এই নির্দেশ পেয়ে হযরত ইদরীস (আ) পথভ্রষ্ট লোকদেরকে আল্লাহর পথে ডাকতে শুরু করলেন। তিনি পূর্ববর্তী নবী হযরত আদম ও হযরত শীসের (আ) শরীয়ত মেনে চলার জন্য লোকদের আদেশ করলেন। কিন্তু কিছু লোক ছাড়া কেউ-ই তাঁর কথা মানলো না। এ অবস্থা দেখে তিনি দেশ ছেড়ে হিজরত করতে মনস্থ করলেন। তাঁর প্রতি যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকেও হিজরত করতে বললেন। দাজলা ও ফোরাতের মত দু' দু'টি নদীর তীরে অবস্থিত ছিল এই বাবেল শহর। বড়ই সুখে সেখানে তাদের দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। এ দেশ ও শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা তারা কোন দিন কল্পনাও করতে পারতো না। তাই হযরত ইদরীস কর্তৃক হিজরতের নির্দেশ পালন করা তাদের জন্য খুব কঠিন বলে মনে হলো। তারা বললো: ঠিক আছে আমরা যাবো, কিন্তু এই বাবেলের মত এত সুন্দর শহর আমরা কোথায় পাবো? হযরত ইদরীস (আ) তাদের বললেনঃ তোমরা যদি আল্লাহর পথে এতটুকু কষ্ট সহ্য করো তাহলে তিনি তোমাদের অবশ্যই বাবেলের মত সুন্দর জায়গা দিতে পারেন। একথা শুনে সবাই হিজরত করতে রাজি হয়ে গেলো। হযরত ইদরীস (আ) তাদের নিয়ে মিসরে হিজরত করলেন। আর এভাবে দুনিয়ার বুকে আল্লাহর দীনের খাতিরে প্রিয় জন্মভূমি, পরিচিত পরিবেশ, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব সবাইকে ছেড়ে হিজরত করার সর্ব প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো।
হযরত ইদরীস (আ) তার ঈমানদার সাথীদের নিয়ে মিসরে গিয়ে পৌঁছলেন। সংগীরা নীল নদের প্রবাহ এবং এর উভয় তীরের সুন্দর দৃশ্য ও উর্বর মাঠ ঘাট প্রান্তর দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হলো। তিনি তাদেরকে বললেন: তোমাদের বাবেলের মত একটি মনোরম ও উর্বর জায়গা মনোনীত করে বসতি গড়ে তোল। তারা নীল নদের তীরে একটি সুন্দর জায়গায় বসতি স্থাপন করলো। এ জায়গাও ছিল বাবেলের মত সুন্দর। এত সুন্দর জায়গা পেয়ে তারা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলো।
হযরত ইদরীস (আ) এখানে এসে আবার মানুষকে আল্লাহর দীনের দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। তিনি সুন্দর আচার-আচরণ ও মধুর ব্যবহার দ্বারা মানুষকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হলেন। তিনি সবাইকে ডেকে বললেনঃ তোমরা সবাই একমাত্র আল্লাহর ইবাদত ও দাসত্ব করো। তিনি তাদের নামায পড়তে, রোযা রাখতে, যাকাত দিতে এবং পাক-পবিত্র থাকতে বললেন। তিনি মানুষকে বুঝালেন যে, আখেরাতের আযাব থেকে বাঁচতে হলে দুনিয়াতে সৎ কাজ করতে হবে। এসব কথা প্রচার করার জন্য তিনি বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। যেখানেই যেতেন সেখানেই মানুষকে জড়ো করে এ সব কথা বলতেন। রাত দিন অনেক পরিশ্রম ও কষ্ট করে তিনি দীর্ঘদিন পর্যন্ত এ কাজ করতে থাকলেন। তিনি বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে ঘুরে ঘুরে তাদেরকে উন্নত জীবনযাত্রা এবং সভ্য জীবন যাপনের বিভিন্ন নিয়ম কানুন বুঝাতে থাকলেন। তিনি বিভিন্ন গোত্র-উপগোত্র থেকে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করে তাদের এসব নিয়ম শিক্ষা দিলেন। শিক্ষা শেষে যারা নিজ গোত্রে ফিরে গিয়ে উন্নত জনপদ গড়ে তুললো। তিনি তার ছাত্রদেরকে আরো অনেক জ্ঞানের বিষয়ও শিক্ষা দিয়েছেন যার মধ্যে বিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানও ছিলো। তাঁর এই কঠোর সাধনার ফল হলো এই যে, সব লোক তাঁর কথা মেনে নিল। তিনি হলেন এসব লোকের শাসক।
দীর্ঘ তিনশ' তিপ্পান্ন বছর পর্যন্ত তিনি ন্যায় ও ইনসাফের সাথে তাদেরকে শাসন করলেন। তাঁর শাসন যুগ ছিল খুবই শান্তিময়। তাঁর রাষ্ট্রে জনগণ পরম সুখে-শান্তিতে বসবাস করতো। সেখানে বর্ষিত হতো মহান আল্লাহর রহমত। তাই তাঁর রাষ্ট্রে মানুষের কোন রকম অভাব ছিল না। তাঁর সু-শাসনে জনগণ ছিল খুশী। তারা তাঁকে খুব সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখতো। কোরআন মজীদেও এ কথার উল্লেখ করে আল্লাহ বলেছেন: আমি তাঁকে অতি উচ্চ মর্যাদা দান করেছিলাম।
হযরত ইদরীসের (আ) কীর্তিসমূহ
জানা যায় ইদরীস (আ)-ই সর্ব প্রথম লেখার পদ্ধতি প্রচলন করেন। তাঁর আমলেই সর্ব প্রথম নগর সভ্যতা গড়ে ওঠে। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সংস্পর্শে রেখে বেশ কিছু সংখ্যক লোককে সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলেন। তারাই বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এক একটি শহর নির্মাণ করেন। এভাবে তিনি বেঁচে থাকতেই একশ আটাশিটি শহর বা সভ্য জনপদ গড়ে উঠেছিল। তিনিই সর্ব প্রথম সংখ্যা গণনা পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তিনি গ্রহ-উপগ্রহের চলাফেরা বা গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য বহু সংখ্যক মান-মন্দির নির্মাণ করেছিলেন বলেও জানা যায়। হযরত ইদরীসের (আ) আরো বহু কীর্তি রয়েছে যা তোমরা বড় হয়ে জানতে পারবে।
হযরত ইদরীসের (আ) শিক্ষার সার কথা
প্রত্যেক নবীই দুনিয়ায় একমাত্র আল্লাহর প্রভুত্ব কায়েম করার জন্য প্রেরিত হন। তাই যা সত্য ও ন্যায় তাই প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁরা আজীবন সাধনা করেন। হযরত ইদরীস (আ)-ও সারা জীবন মানুষকে আল্লাহর পথে ডেকেছেন এবং ভাল শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে যে সব শিক্ষা দিতেন তা হলোঃ
• আল্লাহ আছেন এ কথা বিশ্বাস করতে হবে।
• তিনি একা ও লা-শরীক এ কথা বিশ্বাস করতে হবে।
• একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে হবে।
• আখেরাতের আযাব থেকে বাঁচতে হলে দুনিয়ায় সৎ কাজ করতে হবে।
• দুনিয়ার প্রতি মোহ বর্জন করতে হবে।
• সব কাজ কর্মে ইনসাফ ও ন্যায় বিচার করতে হবে।
• নির্দিষ্ট নিয়মে আল্লাহর ইবাদত করতে হবে।
• ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে সর্বদা জিহাদ করতে হবে।
• পাক-পবিত্র ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।
• কুকুর ও শূকর থেকে দূরে থাকতে হবে এবং
• সব রকমের নেশা সৃষ্টিকারী জিনিস পরিত্যাগ করতে হবে।
এভাবে সারা জীবন ধরে আল্লাহর দীনের জন্য কাজ করে হযরত ইদরীস (আ) দুনিয়া থেকে চলে গিয়েছেন। আমাদেরও উচিত সারা জীবন আল্লাহর দীনের জন্য কাজ করা। তাহলে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জায়গাতেই আমরা সুখী হতে পারবো।
অনুশীলনী
১। হযরত ইদরীস (আ) কে ছিলেন? তিনি কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
২। বাল্যকালে তিনি কার কাছে শিক্ষা লাভ করেছিলেন?
৩। নবুওয়াত লাভের পূর্বে তিনি কিভাবে জীবন যাপন করতেন?
৪। নবুওয়াত দান করার পর আল্লাহ তাঁকে কি আদেশ করলেন? তিনি তখন কি করলেন?
৫। তিনি হিজরত করলেন কেন? হিজরত করে কোথায় গেলেন?
৬। মিসরে গিয়ে তিনি লোকজনকে কি বুঝালেন? ফলাফল কিরূপ হয়েছিল?
৭। হযরত ইদরীস (আ) এর শিক্ষা গ্রহণ করার পর লোকদের জীবনে কি পরিবর্তন এসেছিল?
৮। হযরত ইদরীস (আ) এর কীর্তিগুলো সংক্ষেপে বর্ণনা করো।
৯। তাঁর শিক্ষার সার- কথাগুলো কি?
১০। তুমি কি হযরত ইদরীসকে (আ) পছন্দ করো? কেন?
📄 হযরত নূহ আলাইহিস সালাম
জন্মস্থান প্রাচীন ধর্মগ্রন্থসমূহ, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ইতিহাস ও পবিত্র কুরআন মজীদের ইংগিত থেকে যা জানা যায় তাতে একথা সুস্পষ্ট ভাবে বলা যায় যে, আধুনিক কালের ইরাকই ছিল হযরত নূহ আলাইহিস সালামের কওমের আবাসভূমি এবং ইরাকের মুসেল ও কুর্দিস্তান এবং আর্মেনিয়ার মধ্যবর্তী কোন একটি স্থান ছিল তার জন্মস্থান।
হযরত আদম (আ) এর ইনতিকালের পর অনেক দিন কেটে গেল। তাঁর ছেলেমেয়েদের বংশবৃদ্ধি হল। পৃথিবীতে এখন অনেক লোক। আদম (আ) ছিলেন আল্লাহর নবী। আল্লাহর পক্ষ থেকে অহীর মাধ্যমে পৃথিবীতে জীবন যাপনের সব নিয়ম-কানুন তিনি জানতে পারতেন এবং সে ভাবে জীবন যাপন করতেন। তাঁর ইনতিকালের পর তার বংশধররা বহুদিন পর্যন্ত ঐ সব নিয়ম- মেনে পৃথিবীতে বসবাস করতে থাকলো। কিন্তু দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার কারণে আল্লাহ তা'আয়ালার হুকুম আহকাম মানার ব্যাপারে শিথিলতা দেখা দিল। ধীরে ধীরে তারা নিজেদের মনগড়া নিয়ম কানুনের প্রতি ঝুঁকে পড়লো। আল্লাহর দেয়া আইন কানুনের চর্চা ও অনুশীলন না থাকায় তা তাদের মধ্য থেকে হারিয়ে গেল। এভাবে সমাজে এক আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্যের প্রতি বিদ্রোহের অবস্থা সৃষ্টি হলো এবং তারা নিজেদের ইচ্ছামত চলতে শুরু করলো।
তাই আল্লাহ তা'আলা তাদের কাছে হযরত নূহ (আ)-কে রসূল করে পাঠালেন। তিনি যখন রসূল হয়ে এলেন তখন লোকেরা ভুলে গিয়েছিল যে, শুধু আল্লাহকেই ইলাহ বা রব বলে মানতে হবে, তাঁর ছাড়া আর কারো আইন মানা যাবে না। একমাত্র তাঁরই ইবাদত করতে হবে। নবী ও রসূলদের কাজ হলো মানুষকে হিদায়াতের পথের দিকে ডাকা। হযরত নূহ (আ) তাঁর কওমের লোকদের আল্লাহর পথে আহবান জানালেন। তিনি তার কওমের সামনে যে দাওয়াত পেশ করলেন তাহলো:
১. এক আল্লাহর দাসত্ত্ব। অর্থাৎ অন্য সব কিছুর দাসত্ব ও পূজা-অর্চনা ছেড়ে আল্লাহকে উপাস্য মেনে নিয়ে কেবল তার হুকুম মেনে চলো।
২. তাকওয়া বা খোদাভীতির পথ গ্রহণ করো। অর্থাৎ যে সব কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এবং তার গযব অবধারিত হয়ে যায় তা পরিত্যাগ করো জীবনের এমন পথ গ্রহণ করো যা খোদাভীরু লোকদের করা উচিত।
৩. আমার আনুগত্য করো। অর্থাৎ আল্লাহর রসূল হিসেবে যে সব আদেশ আমি তোমাদের দিচ্ছি তা মেনে চলো।
হযরত নূহ (আ) দীর্ঘ নয়শত পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত তাঁর কওমের লোকদের এ সব কথা মেনে নিতে আহবান জানালেন। কিন্তু তারা হযরত নূহ (আ) এর সাথে অত্যন্ত নির্দয় ব্যবহার করলো। তারা তাঁর কথা শুনলো না। তাঁকে বিদ্রুপ করলো, গালি দিল, কষ্ট দিল এবং নানাভাবে অত্যাচার করলো। তিনি যতই তাদের বুঝাতেন তারা ততই বিগড়ে যেত।
পবিত্র কুরআনে নূহ (আ) এর কাহিনী এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে: নূহের কওম রসূলদের অস্বীকার করলো যখন তিনি তাদেরকে বললেন: তোমরা কি আল্লাহকে ভয় করোনা? আমি তোমাদের প্রতি প্রেরিত একজন আমানতদার রসূল। কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো। একাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাইনা। আমাকে প্রতিদান দেয়ার দায়িত্ব বিশ্বজাহানের রবের। অতএব আল্লাহকে ভয় করো এবং দ্বিধাহীনচিত্তে আমার আনুগত্য করো। তারা জবাব দিলো, আমরা কি তোমাকে মেনে নেব, অথচ দেখছি নিকৃষ্ট লোকেরাই তোমাকে অনুসরণ করছে? নূহ বললেন, তাদের কাজকর্ম কেমন সে বিষয়ে আমার কোন জ্ঞান নেই। তাদের কাজকর্মের হিসেব গ্রহণ করা তো আমার প্রতিপালকের কাজ। হায়! তা যদি তোমরা বুঝতে। ঈমান গ্রহণকারীদের তাড়িয়ে দেয়া আমার কাজ নয়। আমিতো একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী মাত্র। তারা বলল হে নূহ, যদি তুমি বিরত না হও তাহলে অবশ্যই বিপর্যস্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। নূহ বললেন: হে আমার রব আমার কওম আমাকে অস্বীকার করেছে। এখন আমার ও তাদের মাঝে চূড়ান্ত ফয়সালা করে দাও এবং আমাকে ও আমার সাথে যেসব ঈমানদার আছে তাদেরকে রক্ষা করো। শেষ পর্যন্ত আমি পূর্ণ বোঝাই একটি নৌযানে করে তাকে ও তার সাথীদের রক্ষা করলাম এবং অবশিষ্টদের ডুবিয়ে দিলাম। (সূরা আশ্-শুআরা, আয়াত- ১০৬-১১৯)
ওপরে উল্লেখিত আয়াতসমূহে সংক্ষেপে নূহ (আ) ও তার কওমের লোকদের ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। এ সব আয়াত ও ইতিহাস থেকে আমরা যা জানতে পারি তাহলো- নূহ (আ) এর কওম যখন আল্লাহ ও তার রসূলদের শিক্ষা ভুলে চরম গোমরাহীতে নিমজ্জিত, ঠিক সেই সময় আল্লাহ তা'আলা তাদের কাছে হযরত নূহ (আ) কে রসূল করে প্রেরণ করলেন।
আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী-রসূলদেরকে যে মূল দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলো পথভ্রষ্ট মানুষকে সঠিক পথে নিয়ে আসা। অর্থাৎ ভাল কাজ করতে বলা ও ভাল কাজের শিক্ষা দেয়া এবং মন্দ কাজে বারণ করা ও মন্দকাজের কুফল সম্পর্কে সতর্ক করা। কোন কাজ ভাল আর কোন কাজ মন্দ অর্থাৎ কোন কাজ মানুষের জন্য কল্যাণকর ও কোন কাজ অকল্যাণকর তা একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই জানেন। কারণ জ্ঞান ও কল্যাণের উৎস একমাত্র মহান আল্লাহ। নবী ও রসূলগণ মহান আল্লাহর নিকট থেকে সরাসরি জ্ঞান লাভ করে থাকেন এবং সে জ্ঞানের ভিত্তিতেই মানুষকে সৎ ও সুন্দর জীবন গড়ার জন্য আহবান জানান।
নবুওয়াত লাভ ও দাওয়াতের কাজ শুরু
নবুওয়াত প্রাপ্তির পর নূহ (আ) তার কওমের লোকদের বললেনঃ আমি আল্লাহর রসূল। আল্লাহ আমাকে তোমাদের জন্য রসূল করে পাঠিয়েছেন। অতএব তোমরা আমার আনুগত্য করো। আমি তোমাদেরকে যা বলছি তা মেনে নাও। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। কেবল তারই ইবাদত করো। সমাজের সবাই তার আইন ও হুকুম মেনে নাও। তার দেয়া শিক্ষা অনুসারে জীবন, পরিবার ও সমাজ পরিচালনা করো। অন্যথায় পরিনাম তোমাদের কারো জন্যই ভাল হবে না।'
নূহ (আ) এর কওম যে সব দেব দেবীর আরাধনা ও পূজা-অর্চনা করতো তা সংখ্যায় ছিল একাধিক। এদের পাঁচজন দেব-দেবীর নাম কুরআন মজীদের সূরা 'নূহ' এর ২৩ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। এরা হলো: ওয়াদ্দ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক, ও নাস্ত্র। জাহেলী যুগে আরবের বিভিন্ন গোত্র এসব দেব-দেবীর নামে প্রতিমা তৈরী করে পূজা করতে শুরু করে। সুতরাং কুদ্দা'আ গোত্রের 'বনী কালব' শাখার উপাস্য দেবতা ছিল 'ওয়াদ্দ'। দাওমাতুল জানদাল নামক স্থানে এর মন্দির ছিল। হুযাইল গোত্রের দেবী ছিল 'সুওয়া'। এর মন্দির ছিল ইয়াম্বু'র অদূরে 'রুহাত' নামক স্থানে। 'তায়' গোত্রের আন'উম শাখা এবং 'মাজহিজ' গোত্রের কোন কোন শাখার দেবতা ছিল 'ইয়াগুস'। এর আকৃতি ছিল সিংহের ন্যায়। ইয়ামান ও হিজাযের মধ্যবর্তী জুরাশ নামক স্থানে নির্মিত একটি মন্দিরে এর মূর্তি স্থাপিত ছিল। ইয়ামানের হামদান এলাকার হামদান গোত্রের খায়ওয়ান শাখার উপাস্য দেবতা ছিল ইয়া'উক। এর আকৃতি ছিল অশ্ব সদৃশ। নাসর ছিল হিমইয়ার এলাকার হিমইয়ার গোত্রের যুলকুলা উপগোত্রের দেবতা। এর আকৃতি ছিল শকুনের ন্যায়। বালখা নামক স্থানে নির্মিত মন্দিরে এর মূর্তি স্থাপিত ছিল। ধারণা করা হয়ে থাকে যে, মহাপ্লাবনে নূহ (আ) এর মূর্তিপূজক কওমের ধ্বংস হওয়ার পর এসব দেব-দেবীদের নাম কোনভাবে মূতি-পূজারী এসব আরব গোত্রের কাছে পৌঁচেছিল এবং তারা এসব মূর্তি বানিয়ে পূজা করতে শুরু করেছিলো।
তিনি কওমকে মূর্তি পূজা পরিত্যাগ করতে বললেন
আল্লাহর ইবাদত করা ও নিজের আনুগত্য করতে বলার সাথে সাথে নূহ (আ) তাদেরকে দেব-দেবী ও মূর্তিপূজা ছেড়ে দিতেও আহবান জানালেন। কিন্তু কওমের লোকজন তার এ কথার প্রতি কর্ণপাত করতে আদৌ রাজি হলো না। তারা কওমের লোকজনকে ডেকে বলে দিলো, নূহের কথায় তোমরা তোমাদের দেব-দেবী ওয়াদ্দ, সুওয়া, ইয়াগুস, ইয়া'উক ও নাস্ত্র এর উপাসনা ছেড়ে দিওনা। কিন্তু নূহ (আ) তার দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতে থাকলেন। তিনি রাত দিন একাকার করে এক আল্লাহর উপাসনার যুক্তি ও উপকারিতা বুঝাতে থাকলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রত্যেক মানুষকে আহবান জানালেন। তার এ প্রচেষ্টার ফলে সমাজের মুষ্টিমেয় দরিদ্র ও প্রভাবহীন লোক তার ডাকে সাড়া দিয়ে ঈমান আনলো।
সমাজের নেতাদের বিরোধিতা
সমাজের প্রভাবশালী ও বিত্তবান লোকেরা দেখলো যে, নূহ (আ) যেভাবে মানুষকে আহবান জানাচ্ছেন তাতে হয়তো তার প্রচেষ্টা সফলতা লাভ করতে সক্ষম হবে। তাই তারা তাকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য নানা রকমের ষড়যন্ত্র ও ফন্দি-ফিকিরের মাধ্যমে এই বলে লোকজনকে বিভ্রান্ত করতে থাকলো যে, তোমরা নূহের কথায় বিশ্বাস করো না। কারণ, ফেরেশতা ছাড়া কেউ নবী-রসূল হতে পারে না। নূহ আমাদের মতই একজন মানুষ। আমাদের যেমন খাওয়ার ও পান করার দরকার হয় তারও তেমনি খাওয়ার ও পান করার দরকার হয়। অতএব সে নবী নয়। তারা আরো একটা যুক্তি দাঁড় করালো যে, যারা নূহ (আ)কে নবী বলে মেনে নিয়ে তার কথায় চলছে তারা আমাদের সমাজের দুর্বল, অর্থ-বিত্তহীন দরিদ্র, শ্রমিক, কৃষক ও ছোটখাটো পেশাজীবী মানুষ। সমাজের ধনাঢ্য-বিত্তশালী, মর্যাদাবান ও প্রভাবশালী জ্ঞানীগুণী লোকেরা কেউই তার সাথে নেই। আমরা মর্যাদাবান লোকেরা ঐসব গরীব ও নিচু পর্যায়ের লোকদের সাথে মিশতে পারি না। নূহ যদি তাদেরকে তার কাছ থেকে তাড়িয়ে দেয় তাহলে তার কথা মানা হবে কিনা ভেবে দেখা যেতে পারে। এ ছাড়াও তারা তাকে না মানার অজুহাত হিসেবে আরো একটা কথা বলতে থাকলো যে নূহ (আ) যা বলছে তা সত্য নয়। সে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট হয়েছে।
নূহ (আ) দাওয়াতের কাজ থেকে বিরত হলেন না
শত বাধা সত্বেও নূহ (আ) তার কাজ বন্ধ করলেন না। বরং তিনি তার কাজের গতি বাড়িয়ে দিলেন। তিনি তাদের সামনে যুক্তি পেশ করে বললেন, আল্লাহ যদি আমাকে তার রহমতে নবুওয়াত দান করে থাকেন আর আমার কাছে যদি এর সপক্ষে যুক্তি থাকে তাহলে কি তোমরা আমার কথা মানবে না এবং আমাকে নবী বলে স্বীকার করবে না? এ কাজে তো আমার কোন পার্থিব স্বার্থ নেই। তা ছাড়া নবুওয়াত লাভের পূর্ব পর্যন্ত আমি তোমাদের কাছে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছিলাম। এখন হঠাৎ করে কিভাবে অবিশ্বাসী হয়ে গেলাম? তোমাদের অজ্ঞতা ধন-সম্পদের গর্ব ও আত্ম অহংকারই বরং এ পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি তোমাদেরকে বলছিনা যে, আমার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সব কিছুর ভান্ডার দেয়া হয়েছে যা আমি ইচ্ছামত ব্যয় করতে পারি। আমি বলছিনা যে, আমি গায়েবের খবরও জানি। আমি একথাও বলছিনা যে, আমি ফেরেশতা। আমি যা বলছি তাহলো, আমি আল্লাহর নবী। তোমাদের সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালনার জন্য আমার কাছে দিকনির্দেশনা আছে সেগুলো মেনে নাও। আর আমি যা বলছি তা যদি না মানো তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য আযাব নির্ধারিত হয়ে আছে। সে আযাব আসলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে।
কওমের লোকেরা হঠকারিতা দেখালো
প্রত্যেক নবী-রসূলই তার কওমের মানুষের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও স্নেহশীল হয়ে থাকেন। হযরত নূহ (আ)ও তার কওমের প্রতি অত্যন্ত দরদী ছিলেন। কওম ধ্বংস হয়ে যাক তা তিনি কল্পনাও করতে পারতেন না। তাই নানাভাবে যুক্তিতর্ক পেশ করে তিনি তাদেরকে বুঝাতে সচেষ্ট ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কথা শুনে তার কওমের মানুষ বিরক্ত ও রুষ্ট হয়ে উঠলো। তারা এবার হঠকারিতা করে বললো, হে নূহ, তুমি আমাদের সাথে অনেক তর্কবির্তক করেছো। বার বার একই কথা বলে আমাদের বিরক্ত করেছো। আমরা তোমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছি যে, আমরা তোমার কথা গ্রহণ করবো না। যে আযাবের ভয় তুমি দেখাচ্ছো পারলে তা নিয়ে আসো।
হতাশা নেমে এলো
নূহ (আ) এ দাওয়াতী কাজ চালিয়েছিলেন সুদীর্ঘ ৯৫০ বছর ব্যাপী। এত দীর্ঘকাল ধরে আদেশ, উপদেশ, অনুরোধ ও কাকুতি-মিনতি করেও যখন তিনি তার কওমের পক্ষ থেকে সাড়া পেলেন না বরং বিরোধিতা ও উগ্রতা ক্রমে ক্রমে বেড়ে শত্রুতায় পর্যবসিত হলো তখন তিনি তাদের ঈমান গ্রহণের ব্যাপারে চুড়ান্তভাবে হতাশ হয়ে গেলেন। তাঁর এই হতাশ হৃদয়ের একান্ত অভিব্যক্তি তিনি তাঁর রব মহান আল্লাহর দরবারে পেশ করলেন। কুরআন মজীদে তা এভাবে ব্যক্ত হয়েছেঃ
হে আমার রব, আমি রাত দিন একাকার করে আমার কওমকে আহবান জানিয়েছি। কিন্তু আমার আহবান তাদের দূরে সরে যাওয়াকে কেবল বাড়িয়েই দিয়েছে। তুমি যাতে তাদেরকে ক্ষমা করে দাও এ উদ্দেশ্যে আমি যখনই তাদেরকে আহবান করেছি তখনই তারা কানে আঙ্গুল দিয়েছে এবং কাপড়ে মুখ ঢেকে নিয়েছে, নিজের আচরণে অনড় থেকেছে এবং চরম ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছে। অতঃপর আমি তাদেরকে উচ্চকণ্ঠে আহবান জানিয়েছি। তারপর প্রকাশ্যে তাদেরকে আহবান জানিয়েছি এবং গোপনে চুপেচুপেও বুঝিয়েছি। বলেছি, তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও। নিসন্দেহে তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। (সূরা- নূহ, আয়াত- ৬-১০)
নূহ (আ) এর করুণ ফরিয়াদ শুনে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে জানিয়ে দিলেন: হে নূহ এ পর্যন্ত যারা তোমার প্রতি ঈমান এনেছে তারা ছাড়া তোমার কওমের আর কেউ ঈমান আনবে না। তাই তাদের এ আচরণে দুঃখ করোনা। (সূরা হুদ, আয়াত-৩৬)
মহাপ্লাবন
হযরত নূহ (আ) যখন দেখলেন যে, তাঁর জাতির ঈমান গ্রহণের আর কোন সম্ভাবনা নেই বরং তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতার কোন সুযোগই হাত ছাড়া করেনা, মূর্তিপূজাসহ সব রকম অন্যায় ও অনৈতিক কাজের পৃষ্ঠপোষকতা করতে অতিমাত্রায় তৎপর তখন তিনি চিন্তা করলেন যে, এ জাতির ধ্বংস হয়ে যাওয়া উচিত। কারণ তাদের দ্বারা এ পৃথিবীতে যখন আর কোন কল্যাণকর কাজ হবে না বরং ধ্বংস ও বিপর্যয় সৃষ্টি হবে তখন তাদের আল্লাহর এ পৃথিবীতে অবশিষ্ট থাকার কোন যুক্তি নেই। তাই তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেনঃ
হে প্রভু, তুমি কাফেরদের কাউকেই আর এ পৃথিবীতে অবশিষ্ট রেখোনা। তুমি যদি তাদেরকে এভাবেই ছেড়ে দাও তাহলে তারা তোমার বান্দাদেরকে গোমরাহ করে ফেলবে এবং তাদের বংশধর যারা জন্ম লাভ করবে তারাও তাদের মত পাপাচারি ও কাফের হবে। (সূরা নূহ, আয়াত- ১৬, ১৭)
নূহ (আ)-কে আযাবের সিদ্ধান্ত জানানো হলো
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নূহ আলাইহিস সালামের দো'য়া কবুল করলেন এবং অহীর মাধ্যমে তাকে জানিয়ে দিলেন যে, অতি সত্বর তার কওমের পাপাচারি ও খোদ্রোহীদেরকে প্লাবন দিয়ে ডুবিয়ে ধ্বংস করবেন। মুক্তি পাবেন শুধু তিনি নিজে এবং যারা তার প্রতি ঈমান এনে সৎ জীবন যযাপন করছে তারা। যেহেতু প্লাবনের মাধ্যমে পাপিষ্ঠদের ধ্বংস করা হবে তাই হযরত নূহ (আ) ও তার সংগী ঈমানদারদের রক্ষা করার জন্য আল্লাহ তাআলা হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে পূর্বাহ্ণেই একটি বৃহৎ জাহাজ তৈরির জন্য নির্দেশ দিলেন। আল্লাহর নির্দেশ মত নূহ (আ) প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করে জাহাজ নির্মাণ শুরু করলেন। কাফেররা জানতে পারলো তার জাহাজ তৈরির উদ্দেশ্য। কিন্তু তারা আদৌ বিশ্বাস করতে পারলো না যে, তাদের এলাকায় এমন কোন প্লাবন আসতে পারে যা থেকে আত্মরক্ষার জন্য জাহাজ নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে। তাই তারা নূহ আলাইহিস সালামের এ কাজে বিস্ময় প্রকাশ করলো এবং তাকে বিদ্রূপ ও হাসি- ঠাট্টার লক্ষ্যে পরিণত করলো। যখনই তাদের হযরত নূহ (আ) এর সাথে স্বাক্ষাত হতো তখনই তারা তাকে বিদ্রূপাত্মক ও তির্যক কিছু কথা শুনিয়ে দিতো। জবাবে হযরত নূহ (আ) তাদেরকে বলতেনঃ আজ তোমরা যেমন আমাদেরকে বিদ্রূপ করছো আমরা ঠিক তেমনি একদিন তোমাদেরকে বিদ্রূপ করবো এবং সে সময় অনতিবিলম্বেই আসবে।'
মহাপ্লাবনের সূচনা
হযরত নূহ আলাইহিস সালামের জাহাজ নির্মাণ শেষ হওয়ার অল্প দিন পরেই মাটি থেকে পানির ফোয়ারা ফুটে বের হতে শুরু হলো। অবশ্য আল্লাহ তাআলা আগেই হযরত নূহ (আ)-কে প্লাবন শুরু হওয়ার কিছু পূর্ব লক্ষণ জানিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে প্লাবন শুরু হলে ঈমানদার সকল নারী-পুরুষকে এবং প্রতিটি জীব-জন্তুর একটি করে জোড়া জাহাজে উঠিয়ে নিতে হবে, আল্লাহ তাকে আরো নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, প্লাবন শুরু হলে কাফেরদের মাগফিরাতের জন্য কোন দোয়া করা যাবে না এবং অবাধ্য স্ত্রী ও সন্তানকে জাহাজে উঠিয়ে নেয়া যাবে না। এবার প্লাবন শুরু হতে দেখে হযরত নূহ (আ) আল্লাহর নির্দেশ মত তার পরিবারের লোকজন এবং যে নগন্য সংখ্যক মানুষ ঈমান এনেছিলেন তাদেরকে সহ কিছু গৃহপালিত জীবজন্তুও জাহাজে উঠিয়ে নিলেন। কিন্তু তার এক স্ত্রী ও এক পুত্রকে আল্লাহর নির্দেশ মত জাহাজে উঠতে আহবান জানালেন না। জাহাজে আরোহনের পর তারা আল্লাহর নাম নিয়ে জাহাজ ভাসিয়ে দিলেন। ঐ এলাকার সমস্ত ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ হয়ে ফোয়ারার মত অসংখ্য ঝর্ণাধারা ফুটে বের হয়ে পানি উপচে পড়তে শুরু হলো। একই সময়ে আকাশ থেকেও মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ হতে থাকলো এবং একাধারে চল্লিশ দিন পর্যন্ত অব্যাহত রইলো। সমকালীন মানব বসতির পুরোটাই অথৈ পানির নিচে তলিয়ে গেল। সব মানুষ এবং জীব-জন্তু ডুবে মৃত্যুমুখে পতিত হলো। কেবল নূহ আলাইহিস সালামের আরোহী মানুষ এবং জীবকুল রক্ষা পেল। চল্লিশ দিন পর্যন্ত জাহাজ পানির ওপরে ভেসে বেড়াতে থাকলো।
জাহাজ জুদী পাহাড় শীর্ষে থামলো
এ মহাপ্লাবন চল্লিশ দিন ব্যাপী স্থায়ী হওয়ার কারণে জাহাজের আরোহীরা ছাড়া সবাই ডুবে মারা গেল। এবার আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ ক্রমশ স্তিমিত হয়ে থেমে গেল এবং ভুঅভ্যন্তর থেকেও পানি উপচে ওঠা বন্ধ হলো মাটি ধীরে ধীরে পানি শুষে নিল এবং জাহাজ এক পর্যায়ে গিয়ে জুদী পাহাড় শীর্ষে থেমে গেল। ভূপৃষ্ঠ চলাচলের উপযোগী হলে হযরত নূহ (আ) তার ঈমানদার সংগী-সাথীদের নিয়ে জাহাজ থেকে বেরিয়ে সমতল ভূমিতে নেমে এলেন। পৃথিবীতে পুনরায় নতুন করে মানুষের জীবনযাত্রা শুরু হলো। নতুন করে জনপদ, শহর ও নগর গড়ে উঠলো। মানুষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লো।
নূহ (আ) এর পুত্রও ডুবে মারা গেল
হযরত নূহ আলাইহিস সালামের জীবনেতিহাসের একটি বিষয় অত্যন্ত শিক্ষণীয় যে, এই প্লাবনে তার এক সন্তানও ডুবে মারা যায়। ইতিহাসে তাঁর ঐ সন্তানের নাম কিনআন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সে ছিল কাফের। সেও নবী হিসেবে হযরত নূহকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে প্লাবনে ডুবে মারা যায়।
প্লাবন শুরু হলে নূহ (আ) তার পরিবারের লোকজন ও অন্যান্য ঈমানদারগণ জাহাজে আরোহন করলেও তার সেই পুত্র ঈমান গ্রহণ করে জাহাজে আরোহন করতে অস্বীকার করে। সে বলে, আমি কোন একটি পাহাড় চূড়ায় উঠে আশ্রয় নেব তাহলে প্লাবনে আমার কোন ক্ষতি হবে না। নূহ (আ) তাকে বললেন আজকে আল্লাহর এ গযব থেকে কেউ রক্ষা পাবে না। পিতাপুত্রের এভাবে কথাবার্তা চলাকালে একটি বড় তরঙ্গ এসে পিতাপুত্রকে পরস্পর বিছিন্ন করে ফেলে এবং সে ডুবে মারা যায়। হযরত নূহ (আ) সেই সময় আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলেন: হে আল্লাহ, আমার পুত্রতো আমার পরিবারভূক্ত। তোমার প্রতিশ্রুতি তো সত্য। তুমি বলেছো আমার পরিবারের লোকেরা রক্ষা পাবে। জবাবে আল্লাহ তাকে জানিয়ে দিলেন সে তোমার পরিবারের কেউ নয়। কারণ তার আমল বা জীবনাচার ঈমানদারের জীবনাচার নয়। অতএব তার জন্য আমার কাছে কোন প্রার্থনা জানাবে না। অন্যথায় তুমিও জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। এ ঘটনা থেকে আমরা যে শিক্ষা পাই তা হচ্ছে, আল্লাহর নিকট কেবল ঈমান এবং সৎকাজই গ্রহণযোগ্য। ঈমান না থাকলে পিতা নবী হয়েও কোন লাভ নেই। ঈমানের সম্পর্কই প্রকৃত এবং দৃঢ় সম্পর্ক।
মহাপ্লাবনের পরবর্তী অবস্থা
ইতিহাস থেকে জানা যায় মহাপ্লাবনের পর নূহ আলাইহিস সালাম আরো ৩৫০ বছর জীবিত ছিলেন। এ সময়েরও পুরোটাই তিনি নবুওয়াত ও রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন। আল্লাহর এই মহান নবীর জীবন থেকে আমরা বহু কিছু শিখতে পারি।
অনুশীলনী
১। হযরত নূহ (আ) যে সময় রসূল হয়ে আসেন তখনকার লোকেরা কেমন ছিল?
২। নূহ (আ) তাঁর কওমের লোকদের কি বললেন? লোকেরা তখন কি করলো?
৩। লোকেরা নূহ (আ)-কে কিভাবে কষ্ট দিয়েছিল।
৪। মহাপ্লাবন কিভাবে হয়েছিল? কারা এই প্লাবন থেকে রক্ষা পেয়েছিল?
৫। প্লাবনের পর নূহ (আ) কত দিন বেঁচে ছিলেন?
৬। নূহ (আ)-এর কয়টি সন্তান ছিল? তাদের নাম বল। কিন'আন ডুবে মরলো কেন?
৭। নূহ (আ) কত দিন বেঁচে ছিলেন?
📄 হযরত হূদ আলাইহিস সালাম
আরবের প্রাচীন অধিবাসীদেরকে ঐতিহাসিকগণ (ক) আরব বায়েদা, (খ) আরব আরেবা ও (গ) আরব মুসতা'রিবা এই তিন শ্রেণীতে ভাগ করেছেন। আরব বায়েদার অন্তর্ভুক্ত আরবদের সংখ্যা ছিল অনেক এবং এরা আবার বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। আদ ও সামুদ জাতি এদেরই অংশ। আদ জাতির বংশধারা উপর দিকে গিয়ে এরাম এর সাথে মিলিত হয়েছে। সামুদ এর বংশধারাও একইভাবে 'এরাম' পর্যন্ত গিয়ে পৌঁচেছে। এরাম হচ্ছে নূহ (আ) এর পুত্র সামের সন্তান। বায়েদা শব্দের অর্থ হচ্ছে ধ্বংসপ্রাপ্ত। যেহেতু এ শ্রেণীর আরবরা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে তাই এদেরকে 'বায়েদা' বলা হয়।
ঐতিহাসিকগণ আদ জাতিকে দু' ভাগে ভাগ করেছেন। তারা হলো: 'আদ আল 'উলা' বা প্রথম আদ এবং 'আদ আস সানিয়া' বা দ্বিতীয় আদ। আদ আল 'উলা ছিল শক্তিমত্তা ও ক্ষমতার দিক থেকে পৃথিবীর বৃহৎ জাতিগুলোর একটি। তাদের অধস্তন উপগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল এক হাজারেরও অধিক। কুরআন মজীদের সূরা আন নাজমের ৫০ ও ৫১ আয়াতে এদের ধ্বংস করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে যে, আল্লাহ তাআলা আদ-আল 'উলা ও সামুদকে ধ্বংস করেছেন। তাদের কেউ আর এখন অবশিষ্ট নেই।
আদ জাতির আবাসভূমি
আবাসভূমি আরবের সর্বদক্ষিণে হাদরামাওত এলাকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে আছে এক বিশাল মরুভূমি। এখানে মানব বসতির চিহ্ন পর্যন্ত নেই। কোন গাছপালা বা লতাগুল্ম জন্মেনা। শত শত মাইলব্যাপী শুধু ধু ধু মিহি বালুকণা দ্বারা গঠিত বালিয়াড়ি। বর্তমান সময়েও সেখানে কোন মানুষ যেতে ভয় পায়। কারণ এ এলাকায় গেলে কেউ আর ফিরে আসতে পারে না। শুভ্র মিহি বালুর সমুদ্রে তলিয়ে অবশেষে প্রাণ হারায়। ভৌগলিক ও আবহাওয়াবিদদের ধারণা হাজার হাজার বছর আগে এলাকাটা উর্বর ও জনবসতিপূর্ণ ছিল। পরবর্তীকালে আবহাওয়ার ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এটিই হচ্ছে পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত "আহকাফ” এলাকা এবং এ এলাকাই ছিল 'আদ' জাতির আবাসভূমি।
আদ জাতির দৈহিক কাঠামো ও শক্তিমত্তা
নূহ আলাইহিস সালামের কওমকে মহাপ্লাবন দিয়ে ধ্বংস করার পর আল্লাহ তা'আলা আদ জাতিকে পৃথিবীতে প্রতিপত্তি দান করলেন। তাদের দৈহিক গঠন ছিল অত্যন্ত মজবুত। তারা ছিল সুস্বাস্থ্য ও অতুলনীয় দৈহিক শক্তির অধিকারী। যদিও "আহক্বাফ" এলাকা ছিল তাদের আদি বাসস্থান তবুও উন্নতির যুগে শক্তির দাপটে তারা ইয়ামানের পশ্চিমের সমুদ্র তীরবর্তী ওমান ও হাদরামাওত থেকে ইরাক পর্যন্ত তাদের প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাদের যে দৈহিক শক্তি ও বলবীর্য ছিল তাতে সে সময়ে তাদের সাথে পাল্লা দেয়ার মত আর কোন জাতি ছিল না। তাই তারা গর্ব করে বলতো, আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী আর কে আছে? তাদের এ গর্বিত উক্তির কথা কুরআন মজীদেও উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের সম্পর্কে কুরআন মজীদে আরো বলা হয়েছে 'আদ' জাতি ন্যায় ও সত্যের পথ থেকে সরে গিয়ে এ পৃথিবীতে বড় অহংকারী হয়ে উঠলো। তারা আল্লাহ ও রসূলদের অস্বীকার করে বসলো এবং অত্যাচারী ও সীমা লঙ্ঘনকারীদের অনুসরণ করলো।
সভ্যতা ও তমুদ্দুন
তৎকালীন সভ্যতা ও তমুদ্দুনের দিক দিয়েও তারা ছিল তখনকার জাতিসমূহের মধ্যে সেরা। তাদের জীবন যাপনের মান ছিল খুব উন্নত। স্থাপত্য শিল্প তথা ঘরবাড়ি ও দালান কোঠা নির্মাণের বেলায় তাদের চেয়ে দক্ষ ও পারদর্শী আর কোন জাতি ছিল না। তারা বড় বড় দালান কোঠা তৈরী করতে পারতো। বড় বড় স্তম্ভের ওপর তারা এসব দালান-কোঠা তৈরী করতো। এ জন্য সে সময় তারা খুব নামকরা জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল।
শাসক গোষ্ঠী
তাদের শাসনের দায়িত্ব বা রাষ্ট্র পরিচালনার ভার ছিল কিছু সংখ্যক জালেম ও অত্যাচারী লোকের হাতে। তারা যা করতো তা ন্যায় হোক বা অন্যায় হোক সবাইকে মেনে নিতে হতো। আপত্তি করা তো দূরের কথা কেউ টু-শব্দটি পর্যন্ত করতে পারতো না। এ সম্পর্কেও কুরআন শরীফে বলা হয়েছে: 'আর আদ জাতি জালেম, অত্যাচারী এবং ন্যায় ও সত্যের দুশমনদের কথা মেনে চলতো।'
এ 'আদ' জাতি কিন্তু আল্লাহকে অস্বীকার করতো না। তবে আল্লাহকে অস্বীকার না করলেও তারা ছিল মুশরিক। তারা তিনটি দেবমূর্তির পূজা করতো। এসব মূর্তির নাম ছিল ছাফা, সামুদ ও হাবা। এ ছাড়া অনেক জিনিসকেই তারা আল্লাহর সাথে শরীক করতো। যে সব জিনিসকে তারা আল্লাহর শরীক মনে করতো তারা তার মূর্তি তৈরী করতো। এ সব মূর্তির আবার পূজাও তারা করতো। নূহের (আ)- কওমের মত তারা মূর্তি নির্মাণে খুব পারদর্শী ছিল। আশেপাশের অনেক এলাকা দখল করে তারা ওই সব এলাকার লোকদের এ সব মূর্তি পূজা করতে বাধ্য করতো। তারা সবল ও প্রভাবশালী লোকদের কিছু বলতো না কিন্তু দুর্বলদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতো।
হযরত হুদ আলাইহিস সালাম নবী হয়ে আসলেন
এ ভাবে ক্ষমতা, প্রচুর অর্থ-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভ করে জুলুম-উৎপীড়নে যখন তারা সীমা ছাড়িয়ে গেলো তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের সৎ পথে আনার জন্য হুদ আলাইহিস সালামকে নবী করে তাদের কাছে পাঠালেন। নবুওয়াত লাভ করে হযরত হুদ (আ) তাদের বললেনঃ "আল্লাহ তা'আলা আমাকে নবী করে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। আমার কাজ হলো আল্লাহর হুকুম-আহকাম তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দেয়া। আল্লাহর হুকুম মত চললে সব দিক দিয়ে তোমাদের ভাল হবে। তোমরা একমাত্র আল্লাহকে প্রভু বলে স্বীকার করো। তাঁর সব হুকুম মেনে নাও। আর কোন কিছুকে তাঁর সাথে শরীক করো না। আর আমাকে তাঁর নবী হিসেবে মেনে নাও। এ সব কাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। আমি একমাত্র আল্লাহর কাছে পুরস্কার চাই।"
কিন্তু 'আদ' জাতির কাছে ছিল অঢেল সম্পদ। তাদের কোন কিছুর অভাব ছিল না। তাদের ছিল সুউচ্চ প্রাসাদ, শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মজবুত দুর্গ, বিরাট বিরাট ফলের বাগান, ফসলের খামার এবং পাহাড়ী ঝর্ণার সুপেয় পানি। তারা এ সবের মধ্যে ডুবে ছিল। তাই তারা নবীর কথা শুনলো না। তারা আল্লাহর নবী হুদ (আ)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো। আদ কওমের নেতারা বললো: তুমি মিথ্যা কথা বলছো। আর আমরা দেখতে পাচ্ছি তুমি একজন নিরেট বোকা ছাড়া আর কিছুই নও। কারণ তুমি দুনিয়ার এ সব ভোগ বিলাসের জিনিস চাও না। অথচ এগুলো কে না চায়?
এ কথা শুনে হযরত হূদ (আ) তাদের বললেনঃ হে আমার কওমের ভাইয়েরা, আমি কোন বোকা মানুষ নই। বরং আমি আল্লাহর একজন রসূল। আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর নির্দেশ পৌঁছিয়ে দিচ্ছি মাত্র। তোমরা আমাকে তোমাদের জন্য একজন বিশ্বস্ত উপদেশ দাতা বলতে পারো। তোমরা হয়তো এই ভেবে আশ্চর্য হচ্ছো যে, তোমাদের কওমের একজন লোক আল্লাহর রসূল হয়েছেন। আর তিনিই আজ তোমাদের আল্লাহর কথা শুনাচ্ছেন। কিন্তু আশ্চর্য হওয়ার কিছুই এতে নেই। আমি যা বলছি তা একটু চিন্তা-ভাবনা করে দেখলেই তোমরা বুঝতে পারবে। সুতরাং আমি আবারো বলছিঃ আল্লাহ তোমাদের যে সব নিয়ামত দান করেছেন সে জন্য আল্লাহর শোকর গোজারী করো।
এ কথার জবাবে আদ কওমের নেতারা বললোঃ তুমি আমাদের কাছে কি শুধু এ উদ্দেশ্যে এসেছো যে, একমাত্র আল্লাহকে আমরা মেনে চলি? আর আমাদের বাপ-দাদা ও পূর্ব পূরুষেরা যে সব মূর্তির পূজা করেছে তার পূজা করা ছেড়ে দেই? আমরা তা কখনো করতে পারবো না। তুমি আমাদের যে আযাবের ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো। তাহলেই প্রমাণ হবে তুমি সত্যবাদী কিনা।
হযরত হুদ (আ) দীর্ঘদিন পর্যন্ত তাঁর কওমকে আল্লাহর পথে আসার জন্য বুঝালেন। তিনি তাদেরকে আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। তিনি আরো বললেনঃ আজ তোমরা আল্লাহকে অস্বীকার করে যা করছো তার কারণে তোমাদের জন্য পরিণতি অপেক্ষা করছে। কিন্তু তারা হযরত হূদের (আ) কথায় মোটেই কর্ণপাত করলো না। অবশেষে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তাদের জন্য আযাব নির্ধারিত হয়ে গেলো। প্রথমে পর পর কয়েক বছর তাদের এলাকায় অনাবৃষ্টি ও খরা চললো। ফলে তাদের মাঠের ফসলের খুব ক্ষতি হলো। হযরত হুদ (আ) এবারও তাদের বুঝিয়ে সাবধান হতে বললেন। কিন্তু এতেও তারা কর্ণপাত করলো না। তাই আল্লাহ তা'আলা চূড়ান্ত আযাব দিয়ে তাদের ধ্বংস করার ফয়সালা হযরত হূদ (আ)-কে জানিয়ে দিলেন।
একদিন তারা দেখল আকাশে বৃষ্টির মেঘ করেছে। একটু পরেই যেন তাদের এলাকার ওপর প্রবল বৃষ্টিপাত হবে। পরপর ক'বছর বৃষ্টি ছিল না। তাই বৃষ্টির এ মেঘ দেখে তারা খুব খুশী হলো। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এটা ছিল আল্লাহর আযাব। এ মেঘ থেকে এমন ঝড়-বৃষ্টি ও তুফান এসে তাদের ওপর আপতিত হলো যে তারা একজনও আর জীবিত থাকলো না। একাধারে আট দিন এবং সাত রাত পর্যন্ত প্রচন্ড বাতাস তাদের এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে গেল। বাতাসের বেগ এত প্রচন্ড ছিল যে, ঘর-বাড়ি দালান-কোঠা সব ধূলিসাৎ হয়ে গেলো। প্রতিটি মানুষকে বাতাস যেন আছড়ে আছড়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে দিল। একমাত্র হযরত হূদ (আ) ও তাঁর প্রতি যারা ঈমান এনেছিল তারাই বেঁচে গেল। তাঁরা ছাড়া আর একটি লোকও বাঁচলো না।
আযাবে পতিত হয়ে কওম ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর হযরত হূদ (আ) ঈমানদারদের সাথে করে হাদরামাওত এলাকায় চলে গেলেন। জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো তিনি সেখানেই কাটালেন। এখানেও তিনি লোকদের আল্লাহর পথে ডাকলেন। হাদরামাওতেই তিনি ইনতিকাল করেন। পূর্ব হাদরামাওতের 'তায়ীম' নামক স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। হযরত হূদ (আ) সারা জীবন মানুষকে আল্লাহর পথে ডেকেছেন। আর এ কাজ করতে করতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। না-ফরমানীর কারণে আল্লাহ তা'আলা 'আদ জাতিকে এমন ভাবে ধ্বংস করেছেন যে, যে আহকাফ এলাকায় তারা বাস করতো সে এলাকায় আজ পর্যন্তও কোন মানুষের বসতি গড়ে ওঠেনি। এমনকি সেখানে একটি গাছ বা তৃণ-লতা পর্যন্ত জন্মায় না। কোন মানুষও সেখানে যেতে সাহস পায় না। এখন সেখানে আছে শুধু মিহি বালুকা রাশি। 'আদ' জাতির এ পরিণাম থেকে সকলের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।
অনুশীলনী
১। আল-আহকাফ এলাকা কোথায় অবস্থিত?
২। 'আদ' জাতি কোথায় বাস করতো? তাদের দৈহিক গঠন কেমন ছিল?
৩। 'আদ' জাতি কিভাবে জীবন যাপন করতো? তাদের সভ্যতা ও তমদ্দুন কেমন ছিল?
৪। 'আদ' জাতি অহংকারী হয়ে উঠলো কেন? তাদের রাষ্ট্র বা শাসন ব্যবস্থা কারা পরিচালনা করতো? তারা কিরূপ ছিল?
৫। 'আদ' জাতি কিসের পূজা করতো? তাদের কাছে নবী হিসেবে কাকে পাঠানো হয়েছিল? কখন তিনি তাদের কাছে এসেছিলেন?
৬। হযরত হূদের (আ) সাথে 'আদ' জাতির নেতাদের কি কি কথাবার্তা বা বিতর্ক হয়েছিল?
৭। হযরত হূদ (আ) তাদেরকে কি বললেন? তিনি কি তাদেরকে কোন অন্যায় কথা বলেছিলেন?
৮। 'আদ জাতির ওপর আল্লাহর আযাব কিভাবে এসেছিল?
৯। কয়দিন পর্যন্ত আযাব চলেছিল? 'আদ' জাতি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর হযরত হুদ (আ) কি করলেন?
১০। 'আদ' জাতির পরিণাম থেকে আমাদের কি শিক্ষা নেয়া উচিত?