📘 ছোটদের মজার গল্প > 📄 মায়ের দোয়া

📄 মায়ের দোয়া


ক.
দরবেশ বায়জীদ বোস্তামীর শৈশবের একটি ঘটনা। মাকে প্রচণ্ড রকম ভালোবাসতেন তিনি। কখনো মায়ের অবাধ্য হতেন না। মনপ্রাণ ঢেলে মায়ের সেবা করতেন। সবসময় ভাবতেন, কিভাবে মাকে আরো খুশি করা যায়।

এক শীতের রাতের ঘটনা। মায়ের শরীরটা ক'দিন ধরেই ভালো নেই। সারাক্ষণ অসুস্থ মায়ের আশেপাশেই থাকেন বায়জীদ। মন দিয়ে মায়ের সেবা করেন। এক রাতে মায়ের পানির পিপাসা পেল। চোখ মেলে দেখলেন আদরের ছেলে পাশেই বসে আছে। বললেন, 'বাবা, একটু পানি খাবো।'

মায়ের জন্য পানি আনতে গেল বায়জীদ। দেখলো কলসিতে কোন পানি নেই। বায়জীদ তাড়াতাড়ি কলসি নিয়ে গেল কুয়োর পাড়ে। কলসিতে পানি ভরে ঘরে ফিরে দেখে মা ঘুমিয়ে পড়েছে। সে গ্লাসে পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মায়ের পাশে। অসুস্থ মাকে ডাকার সাহস হলো না তার, যদি মায়ের কষ্ট হয়? আবার শুতেও যেতে পারছিল না, যদি সে ঘুমিয়ে পড়ে আর মা তখন পানি খেতে চান? সারা রাত ওভাবেই মায়ের পাশে বসে রইলো বায়জীদ। ভোর রাতে ঘুম ভাঙলো মায়ের। দেখলো, ছেলে তার পানি নিয়ে বসে আছে।

ছেলের মাতৃভক্তি দেখে মায়ের মন আনন্দে ভরে গেল। তিনি প্রাণ ভরে দোয়া করলেন ছেলের জন্য। বললেন, 'হে আল্লাহ, তুমি বায়জীদকে অনেক বড় আলেম ও বুজুর্গ বানিয়ে দাও।' আল্লাহপাক মায়ের দোয়া কবুল করলেন। বায়জীদকে আল্লাহ অনেক জ্ঞান দিলেন। তাকে বানিয়ে দিলেন বিশ্ববিখ্যাত দরবেশ। আজো মানুষ তার কথা স্মরণ করে।

খ.
মহানবীর হাদিস সংগ্রহে যারা আজীবন পরিশ্রম করেছেন ইমাম বুখারী ছিলেন তাঁদের অগ্রণী। তাঁর পুরো নাম 'ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল বুখারী'। তাঁর বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থের নাম 'সহীহ আল বুখারী'। সংক্ষেপে আমরা একে বলি 'বোখারী শরীফ'। শৈশবে তিনি কঠিন অসুখে পড়েন। অসুখ ভালো হলেও তাঁর চোখ আর ভালো হয় না, তিনি অন্ধ হয়ে পড়েন।

ছেলে চোখে দেখতে পায় না এই দুঃখে অস্থির হয়ে পড়েন বুখারীর মা। অনেক চিকিৎসা করান, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। মা দুর্ভাবনায় ছটফট করেন। সারাজীবন কি ছেলে দৃষ্টিহীন থাকবে? ছেলের চিন্তায় রাতে তাঁর ঘুম হয় না।

একদিন গভীর রাতে মা সিজদায় গিয়ে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর দরবারে কাতরভাবে মুনাজাত শুরু করলেন। বললেন, 'হে পরোয়ারদিগার, তুমি আমাকে একটি সুন্দর ছেলে দিয়েছিলে। সোনার টুকরো ছেলের মুখ দেখে কত যে খুশি হয়েছিলাম আমি! আজ সেই ছেলে অন্ধ। ছেলের মুখের দিকে তাকালে কলিজা ফেটে যায় আমার। হে আল্লাহ, তুমি আমার ছেলেকে ভালো করে দাও। তার চোখে আলো দাও। তার অন্ধত্ব দূর করে দাও।' কাঁদতে কাঁদতে রাত প্রায় শেষ হয়ে এলো। এক সময় জায়নামাজেই ঘুমিয়ে পড়লেন মা।

ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখলেন তিনি। দেখলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। বলছেন, 'হে পূণ্যময়ী মা, আল্লাহ আপনার দোয়া কবুল করেছেন। আপনার ছেলে ভালো হয়ে গেছে।' জেগে উঠলেন তিনি। দেখলেন ফজরের সময় হয়ে এসেছে। অজু করে নামাজে দাঁড়াবার আগে তিনি ছেলেকে ডাকলেন। বললেন, 'এসো বাবা, অজু করবে, নামাজ পড়বে।'

মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙলো শিশু বুখারীর। চোখ মেলে তাকিয়েই সে চিৎকার করে উঠলো, 'মা, আমি দেখতে পাচ্ছি! সব দেখতে পাচ্ছি! আমি ভালো হয়ে গেছি মা!' আনন্দে, খুশিতে, আবেগে মা আবার সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। চোখের পানিতে শোকর আদায় করলেন আল্লাহর।

কী অমোঘ শক্তি মায়ের দোয়ার। এক রাতের প্রার্থনায় দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছে তাঁর আদরের দুলাল। যে মায়ের দোয়ার এত মূল্য আল্লাহর দরবারে, আমাদের উচিত সেই মায়ের সেবা করা, তাঁর মনে কোনো কষ্ট না দেয়া। এই গল্প থেকে আমরা শিখলাম, সন্তানের জন্য মায়ের দোয়া বৃথা যায় না। তাই আমাদের উচিত মায়ের সেবায় মনপ্রাণ ঢেলে দেয়া। আমাদের ভুললে চলবে না, 'মায়ের পায়ের তলে সন্তানের বেহেশত'।

📘 ছোটদের মজার গল্প > 📄 আল্লাহর ওয়াদা

📄 আল্লাহর ওয়াদা


তাপসী রাবেয়ার নাম কে না জানে? তাঁর মত ঈমানদার মহিলা পৃথিবীতে কমই জন্মেছেন। আল্লাহর ওপর তাঁর ছিল গভীর আস্থা ও বিশ্বাস। তিনি আল্লাহর প্রতিটি কথা মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করতেন এবং আল্লাহর হুকুম মেনে চলতেন। তার কিছু দরকার হলে তিনি আল্লাহর কাছে চাইতেন এবং আল্লাহ যা দিতেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকতেন।

একদিন তিনি খেতে বসবেন এমন সময় দু'জন মেহমান এলো। ঘরে দুটো মাত্র রুটি আছে। ভাবলেন, দুটো রুটিই তিনজনে ভাগ করে খেয়ে নেবেন। তাঁরা তখনো খাওয়া শুরু করেননি, একজন ভিখিরি এসে দরজার কড়া নেড়ে বলল, 'মাগো, কিছু খেতে দেবেন?'

ভিখিরিকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে নেই। তাপসী রাবেয়া দুটো রুটিই ভিখিরিকে দিয়ে দিলেন। মেহমান দু'জনতো অবাক! উপোস থাকবে নাকি তারা? কিন্তু রাবেয়া নির্বিকার। তিনি দরজার দিকে মুখ করে বসে রইলেন।

একটু পর পাশের বাড়ির এক দাসী এসে হাজির। ওর হাতে কাপড় দিয়ে ঢাকা তশতরি। তাতে আছে গরম গরম রুটি। দাসী বলল, 'আমাদের বাড়িতে ভালো রান্না হয়েছে। গিন্নিমা এগুলো আপনার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন।'

রাবেয়া ঢাকনা সরিয়ে রুটি গুনে দেখলেন ওখানে আঠারোটি রুটি আছে। হিসাব মিললো না তাঁর। দাসীর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তুমি বোধহয় ভুল করেছো। এ রুটি আমার নয়।' তিনি রুটিগুলো ফিরিয়ে দিলেন।

ব্যাপার দেখে মেহমানরা তাজ্জব হয়ে গেলেন। ক্ষুধায় ওদের পেট জ্বলছে, অথচ রাবেয়া এতগুলো রুটি পেয়েও ফিরিয়ে দিলেন! তারা বলল, 'এ আপনি কী করলেন?'

রাবেয়া বললেন, 'আমি যা করেছি ঠিকই করেছি।'

একটু পরই দাসী এসে আবার কড়া নাড়ল। রাবেয়া এগিয়ে দরজা খুলে দিলেন। দাসী তশতরি এগিয়ে ধরে বলল, 'এই নিন আপনার রুটি। আপনি ঠিকই বলেছিলেন। গিন্নিমা আপনাকে বিশটি রুটি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গুনতে গিয়ে ভুল করে আঠারোটি রুটি পাঠিয়েছিলেন।'

রাবেয়া তশতরি হাতে নিয়ে রুটিগুলো গুনে দেখলেন। তশতরিতে পুরো বিশটি রুটি পেয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, এবার ঠিক আছে।'

দাসী বিদায় হলে এবার মেহমানদের নিয়ে খেতে বসলেন তিনি। রুটিগুলো দারুণ সুস্বাদু আর টাটকা গরম। দুই অতিথি তৃপ্তি করে খেলেন। তিনজনে পেটপুরে খাওয়ার পরও রয়ে গেল বেশকিছু রুটি। মেহমানদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল একটি প্রশ্ন। কৌতূহল ঘিরে ধরেছে তাদের। একজন তো বলেই ফেলল, 'আচ্ছা রাবেয়া বসরী, আপনি কী করে জানলেন যে, ভুল সংখ্যক রুটি এসেছিল প্রথমে। পরে ঠিক ঠিক এসেছে?'

'ও, এই কথা! কেন, আপনারা শোনেননি, আল্লাহপাক বলেছেন, কেউ আমার নামে এক গুণ দান করলে আমি তাকে দশ গুণ ফিরিয়ে দিই? আল্লাহর কথা তো মিথ্যা বা ভুল হতে পারে না। আমি ভিখিরিকে দুটি রুটি দিয়ে তার দশ গুণ পাবার আশায় বসেছিলাম। এক রুটির বদলে দশ হলে দুই রুটির বদলে বিশটি রুটি পাবার কথা। কিন্তু দাসী আঠারোটি রুটি নিয়ে এলে বুঝলাম কোথাও সে ভুল করেছে।'

মেহমানদের বিস্ময় আরো বাড়লো। বলল, 'আপনি ঠিক ঠিক জানতেন বিশটি রুটি আসবে?'

'অবশ্যই। কেন, আল্লাহর ওয়াদায় আপনাদের বিশ্বাস নেই?'

মেহমানরা তাকালো একে অন্যের দিকে, কিন্তু কেউ কোন জবাব দিল না। রাবেয়া বসরী বললেন, 'বুঝেছি। আপনার নিজের বিশ্বাসের ওপর যদি আপনারই আস্থা না থাকে তবে আল্লাহর কী দোষ। আপনি তো পাবেন আপনার বিশ্বাসের আলোকে।'

মেহমানরা মাথা নিচু করে বলল, 'আপনি ঠিকই বলেছেন।'

রাবেয়া বসরী বললেন, 'আপনি পরিপূর্ণ একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সাথে সবদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে যদি একমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে পারেন তবে আল্লাহ অবশ্যই তার ওয়াদা পূরণ করবেন।'

এই গল্প থেকে আমরা শিখলাম, যারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে আল্লাহ কখনো তাদের নিরাশ করেন না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00