📄 কৃপণের ধন
বনি ইসরাইল গোত্রে বাস করতো তিন ব্যক্তি। একজন কুষ্ঠরোগী, একজন টাকু আর অন্যজন অন্ধ। তাদের পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ এক ফেরেশতা পাঠালেন। মানুষের বেশে ফেরেশতা গেল কুষ্ঠরোগীর কাছে। বলল, 'তুমি আল্লাহর কাছে কী চাও?' সে বলল, 'আমি এই কুৎসিত রোগ থেকে মুক্তি চাই।' ফেরেশতা তার শরীরে হাত বুলিয়ে দোয়া করলো। সঙ্গে সঙ্গে সে ভালো হয়ে গেল। ফেরেশতা বলল, 'তুমি কি কোন সম্পদ চাও?' সে খুশি হয়ে বলল, 'হ্যাঁ, আমি উট পেলে খুশি হই।' ফেরেশতা তাকে একটি গর্ভবতী উট দিল। এরপর আল্লাহর দরবারে বরকতের জন্য দোয়া করে বিদায় নিল।
ফেরেশতা টাকমাথা লোকটির কাছে গিয়ে বলল, 'তুমি আল্লাহর কাছে কী চাও?' লোকটি বলল, 'টাকের কারণে মানুষ আমাকে অপছন্দ করে। আমি এর নিরাময় চাই।' ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই নতুন চুলে তার মাথা ভরে গেল। ফেরেশতা বলল, 'তুমি কি কোন সম্পদ চাও?' সে বলল, 'হ্যাঁ, আমি গরু পেলে খুশি হই।' ফেরেশতা তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দিল আর আল্লাহর দরবারে বরকতের জন্য দোয়া করে বিদায় নিল।
এবার ফেরেশতা গেল অন্ধ লোকটির কাছে। বলল, 'তুমি আল্লাহর কাছে কী চাও?' লোকটি বলল, 'অন্ধ বলে আমি আল্লাহর দুনিয়া দেখতে পারি না। আমি চাই চোখের আলো, যেন আল্লাহর সৃষ্টি আমি প্রাণভরে দেখতে পারি।' ফেরেশতা তার চোখে হাত বুলিয়ে দিলে তার চোখ ভালো হয়ে গেল। ফেরেশতা বলল, 'তুমি কি কোন সম্পদ চাও?' সে বলল, 'হ্যাঁ, আমি একটি ছাগল পেলে খুশি হই।' ফেরেশতা তাকে একটি গাভীন ছাগল দিল। এরপর আল্লাহর দরবারে বরকতের জন্য দোয়া করে বিদায় নিল।
ফেরেশতার দোয়া কবুল করলেন আল্লাহ। তাদের দিলেন অনেক উট, গরু ও ছাগল। অল্পদিনেই তারা ধনী হয়ে গেল। মানুষ তাদের এই অভাবিত উন্নতি দেখে হতবাক। কিছুদিন পর সেই ফেরেশতা আবার তাদের কাছে এলো। এলো অন্য মানুষের বেশে। প্রথমে গেল কুষ্ঠরোগীর কাছে। বলল, 'আমি এক মুসাফির। পথ খরচ ফুরিয়ে যাওয়ায় আমি এখন নিঃস্ব। আমার বাহন উটটি মরে গেছে। আল্লাহ আপনাকে দিয়েছেন চমৎকার চেহারা, অঢেল সম্পদ। যে আল্লাহ আপনাকে এতকিছু দিয়েছেন তার নামে আপনার কাছে একটি উট চাই।'
লোকটি বলল, 'হতভাগা কোথাকার! দূর হ এখান থেকে। সারাজীবন খেটে আমি তোর জন্য সম্পদ গড়েছি নাকি?'
ফেরেশতা বলল, 'সম্পদের মালিক আল্লাহ। সম্পদ নিয়ে বড়াই করবেন না। আল্লাহ যা দিয়েছেন তা থেকে আল্লাহর বান্দার জন্য ব্যয় করুন।'
লোকটি এবার রেগে গিয়ে বলল, 'কী, আমাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে? যা যা, কিছুই পাবি না। ভাগ এখান থেকে।'
ফেরেশতা বলল, 'আপনাকে মনে হয় আমি চিনতে পেরেছি। আপনার খুব খারাপ কুষ্ঠরোগ ছিল। আপনি ছিলেন গরীব। পরে আল্লাহ আপনাকে সুস্থ করে দেন। আপনাকে দান করেন অঢেল সম্পদ।'
'মিথ্যে কথা!' লোকটি চেঁচিয়ে বলল, 'এসব কাহিনী বানিয়ে তুমি আমার কাছ থেকে কিছুই আদায় করতে পারবে না।'
ফেরেশতা বলল, 'আমি মোটেও মিথ্যা বলিনি। মিথ্যা বলছেন আপনি। আল্লাহ মিথ্যাবাদীকে ভালোবাসেন না। আপনি তওবা করুন, নইলে আপনার ভাগ্য আবার আগের মত হয়ে যাবে।'
লোকটি ফেরেশতার কথায় কান না দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিল। পরদিন ঘুম থেকে জেগে লোকটি দেখতে পেলো, তার শরীর জুড়ে আবার কুষ্ঠরোগ থকথক করছে। সে শুয়ে আছে এক কুঁড়েঘরে। আর তার যে এত এত উট ছিল সেগুলোর কোন হদিস নেই।
ফেরেশতা এবার গেল টাকমাথা লোকটির কাছে। তাকেও বলল, 'আমি এক মুসাফির। আমাকে আল্লাহরওয়াস্তে একটি গরু দান করুন।' কিন্তু কুষ্ঠরোগীর মত সেও তাকে তাড়িয়ে দিল। বলল, 'আমার মাত্র অল্প কয়টা গরু, তোমাকে কোথা থেকে গরু দান করবো?'
ফেরেশতা বলল, 'আল্লাহর নাশোকর বান্দা হবেন না। তাহলে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবেন।'
'না, হবে না। আমি এখানে দানছত্র খুলে বসিনি। কী আবদার! অন্তত একটা গরু দান করুন!'
ফেরেশতা বলল, 'আপনাকে বোধহয় আমি চিনেছি। আপনার বিশাল টাক ছিল। লোকে সে জন্য আপনাকে ঘৃণা করতো। পরে আল্লাহ আপনাকে সুস্থ করে দেন এবং আপনাকে একটা গরু থেকে অনেক গরু দান করেন।'
লোকটি বলল, 'কি যা তা বলছো। যাও এখান থেকে।'
ফেরেশতা বলল, 'যাচ্ছি, তবে মনে রাখবেন, যিনি সম্পদ দিতে পারেন তিনি সম্পদ নিতেও পারেন। আপনি মিথ্যা বললে আবার আগের মত হয়ে যাবেন।' ফেরেশতা চলে গেল। দেখতে দেখতে লোকটি আবার আগের মত টাকমাথা ও গরীব হয়ে গেল।
এবার ফেরেশতা গেল অন্ধ লোকটির কাছে। বলল, 'আমি মুসাফির। আমাকে একটা ছাগল দিয়ে সাহায্য করুন।'
লোকটি বলল, 'আমি ছিলাম অন্ধ ও গরীব। আল্লাহ আমাকে ভালো করে দিয়েছেন। ধন-সম্পদ দিয়েছেন। আমার যত সম্পদ সব আল্লাহরই দান। আপনার যে কয়টি বকরী দরকার ইচ্ছামত নিয়ে যান।'
ফেরেশতা বলল, 'না, এসব আপনারই থাকবে। আল্লাহ আপনাদের তিনজনকে পরীক্ষা করার জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন। দু'জন পরীক্ষায় পাস করেনি। তারা অহংকারী হয়ে উঠেছিল। তাদের ওপর আল্লাহর গযব নাজিল হয়েছে। আপনি পাস করেছেন। আল্লাহ আপনার সম্পদ আরো বাড়িয়ে দেবেন।'
এ কাহিনী আমাদের শেখায়, কৃপণতা মহাপাপ। অহংকার করা ঠিক নয়। যারা আল্লাহর শোকর আদায় করে না তাদের ওপর গযব নাজিল হয়। মানুষের বিপদে সাহায্য করলে আল্লাহ খুশি হন এবং তার সম্পদ বাড়িয়ে দেন।
📄 সত্যের জয়
হযরত আবদুল কাদের জিলানী। সবাই তাকে ডাকতো বড়পীর বলে। বড়পীর আবদুল কাদের জিলানীর শৈশবের একটি ঘটনা। ঘটনাটি এতই চমকপ্রদ যে, আজো মানুষ শ্রদ্ধাভরে সে কথা স্মরণ করে।
তোমাদের মতই বয়স তখন তাঁর। লেখাপড়ার প্রতি দারুণ আগ্রহ। গ্রামের বাড়ির পড়া শেষ করেছেন। এখন তাঁর ইচ্ছা, বড় কোন শহরে গিয়ে নামকরা কোন মাদ্রাসায় পড়বে। কিন্তু তার বাপ নেই। বিধবা মায়ের অভাবের সংসার। কোথায় পাবেন তিনি ছেলের পড়ার খরচ? মা ভাবেন, এমন সোনার ছেলের আশা কি পূরণ হবে না? মানুষের কত রকম শখ থাকে। অথচ ছেলের একটাই শখ। সে অনেক পড়বে, অনেক জ্ঞানী হবে, মানুষের মত মানুষ হবে। মা দিনরাত ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন আর একটু একটু করে টাকা জমান ছেলের জন্য।
একদিন আবদুল কাদের জিলানী ছাদে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির শোভা দেখছিলেন। তিনি দেখলেন, একটি কাফেলা বাগদাদের দিকে যাচ্ছে। তাঁর অনেক দিনের শখ বাগদাদ যাওয়ার। সেখানে গিয়ে পড়ালেখা করার। তিনি নিচে নেমে মাকে আবারও তার মনের কথা বললেন। মায়ের বুক হাহাকার করে উঠল। যেখানে অন্যের ছেলেরা পড়তে চায় না সেখানে নিজের ছেলে পড়ার জন্য উতলা, এটা কি কম সৌভাগ্যের কথা! তিনি জমানো টাকাগুলো গুনে দেখলেন সেখানে আশিটি স্বর্ণমুদ্রা আছে। টাকাটা দুই ভাগ করে এক ভাগ রাখলেন সংসার খরচের জন্য আরেক ভাগ তুলে দিলেন ছেলের হাতে। ছোট মানুষ, পথে যদি টাকাগুলো হারিয়ে ফেলে এই ভয়ে মা বগলের নিচে পকেট বানিয়ে সেখানে মুদ্রাগুলো সেলাই করে দিলেন।
মায়ের দেয়া চল্লিশটি স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে পথে নামলেন আবদুল কাদের জিলানী। বিদায়ের সময় ছেলেকে বুকে জড়িয়ে মা বললেন, 'বাবা, আমার সময় আর বেশি বাকি নেই। হয়তো কেয়ামতের আগে আর আমাদের দেখা হবে না। আমার অন্তিম উপদেশ, কখনো মিথ্যা কথা বলো না।'
Mায়ের এ উপদেশ বুকে নিয়ে ছেলে গিয়ে শামিল হলো কাফেলার সাথে। কাফেলা এগিয়ে চললো বাগদাদের দিকে। যেতে যেতে তারা গিয়ে পৌঁছলো হামদান নামক এক জায়গায়। এলাকাটি জনমানবহীন। চারদিকে গাছপালার গভীর জঙ্গল। হঠাৎ একদল ডাকাত ঝাঁপিয়ে পড়লো তাদের ওপর। কেড়ে নিল তাদের টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত। লোকেরা জীবন বাঁচাতে মালসামান রেখেই পালিয়ে গেল। বালক আবদুল কাদের কি করবেন বুঝতে না পেরে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। ডাকাতরা ভাবলো, ও ছোট মানুষ, ওর কাছে আর কি থাকবে? সবাই ওকে রেখে লুটপাটে মন দিল। এক ডাকাত তাকে বলল, 'এই ছেলে, তোমার কাছে টাকা-পয়সা কিছু আছে?'
আবদুল কাদের জিলানী জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, আমার কাছে চল্লিশটি স্বর্ণমুদ্রা আছে।'
বিশ্বাস হলো না ডাকাতের। বলল, 'কোথায় তোমার স্বর্ণমুদ্রা?'
তিনি বললেন, 'বগলের নিচে আমার জামার সাথে সেলাই করা।'
এ কথা শুনে ডাকাত তাকে নিয়ে এলো সর্দারের কাছে। ডাকাত সর্দার তখন লুটের মাল ভাগ-বাটোয়ারায় ব্যস্ত। সব শুনে সর্দার বললেন, 'জামা কেটে বগলের নিচ থেকে টাকাগুলো বের করো দেখি।'
জামা কাটা হলো। বের করে আনা হলো টাকাগুলো। গুনে দেখা গেল সত্যি সেখানে চল্লিশটি স্বর্ণমুদ্রা। ডাকাতরা ভাবলো, ছেলেটি কী বোকা! ডাকাত সর্দার বলল, 'তুমি আমাদের বললে কেন তোমার কাছে টাকা আছে? তুমি না বললে তো আমরা এ স্বর্ণমুদ্রার কথা জানতেও পারতাম না।'
সত্যবাদী জিলানী দৃঢ়তার সাথে বললেন, 'কেন বলবো না? আমার মা আমাকে মিথ্যা বলতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহর নবী বলেছেন, মিথ্যা হল সকল পাপের মা। আল্লাহ মিথ্যাবাদীকে ভালোবাসেন না। আল্লাহ যে কাজ অপছন্দ করেন আমি সে কাজ করতে যাবো কেন?'
'কিন্তু তুমি না বললে তো এ টাকাগুলো হারাতে হতো না।'
তিনি বললেন, 'তাতে আমার দুঃখ নেই। আমি আমার মায়ের আদেশ পালন করতে পেরেছি, আল্লাহর হুকুম পালন করতে পেরেছি, এতেই আমি খুশি।' তিনি আরো বললেন, 'কাল হাশরের মাঠে আমাকে লজ্জিত হতে হবে না, অপমান সইতে হবে না, এরচেয়ে আনন্দের আর কী আছে?'
সত্যবাদী বালকের দৃঢ়তায় চমকে উঠলেন ডাকাত সর্দার। তার মনে হল সে আত্মমর্যাদাহীন ও নির্বোধ একজন মানুষ। এই বালকের সমান বুদ্ধিও তার নেই। যদি থাকতো তাহলে আল্লাহর হুকুম অমান্য করে সে মানুষের সহায়-সম্পদ লুট করতে পারতো না।
হঠাৎ হায় হায় করে উঠলো ডাকাত সর্দার। বলল, 'কে না জানে, সবাইকে একদিন মরতে হবে। মরার পর আল্লাহ যখন জানতে চাইবেন, তোমাকে কি লুটপাট করার জন্য দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলাম, তখন কী জবাব দেবো আমি?'
ডাকাত সর্দারের মনে তোলপাড় শুরু হল। অনুশোচনায় দগ্ধ হতে লাগলো মন। তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন, 'এই ছেলে মায়ের কথার অবাধ্য হচ্ছে না, আর আমরা মহান আল্লাহর অবাধ্য হয়ে ডাকাতি করছি? কী হবে আমাদের পরিণতি?'
আবদুল কাদের বললেন, 'আল্লাহর কাছে তওবা করুন। আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল।'
তক্ষুণি বড়পীরের হাত ধরে তওবা করলেন ডাকাত সর্দার। দলের অন্যরাও তওবা করলো। তারা ওয়াদা করলো, 'জীবনে আর ডাকাতি করবো না, লুটপাট করবো না। আল্লাহর অবাধ্য হবো না, পাপ কাজ করবো না।'
ডাকাতরা কাফেলার লোকজনকে ডেকে তাদের সব মালামাল ফিরিয়ে দিল। কাফেলা খুশি মনে বাগদাদের পথ ধরলো।
এই গল্প আমাদের শেখায়:
মিথ্যা কথা বলতে নেই
পাপের পথে চলতে নেই।
থাকলে মনে খোদার ভয়
জীবনটা হয় পুণ্যময়।
📄 কাজীর বিচার
হযরত আলী (রা:) তখন মুসলিম বিশ্বের খলিফা। তাঁর সাহস ও বীরত্বের জন্য তিনি সারা আরবে মশহুর। তাঁর ছিল একটি দু'ধারী তলোয়ার- জুলফিকার। এই তলোয়ার নিয়ে জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন তিনি। ছিনিয়ে আনতেন বিজয়। তাঁকে বলা হতো শেরে খাদা বা আল্লাহর বাঘ। বীরত্বের জন্য তিনি উপাধি পেয়েছিলেন 'আসাদুল্লাহ', মানে আল্লাহর সিংহ।
তিনি যখন খলিফা তখনকার ঘটনা। তাঁর সেই বিখ্যাত তলোয়ারটি চুরি হয়ে যায়। অধিকাংশ সাহাবীই তাঁর তলোয়ারটি চিনতেন। জীবনে বহুবার জিহাদের ময়দানে তাঁরা দেখেছে এই তলোয়ার।
তলোয়ারটির সন্ধানে বেরিয়ে পড়লো সৈনিকরা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তলোয়ারটি পাওয়া গেল এক ইহুদীর ঘরে। কিন্তু ইহুদী কিছুতেই স্বীকার করলো না, এটি আলীর (রা:) তলোয়ার। বলল, 'বরাবরই এটি আমার তলোয়ার ছিল এবং এখনো আছে।'
ইহুদীর কথায় ক্ষেপে গেল মুসলমানরা। একে তো চুরি করেছে, তার ওপর মিথ্যা বলছে। ক্ষিপ্ত মুসলমানরা তাকে মারতে গেল। হযরত আলী (রা:) বললেন, 'তোমরা আইন নিজের হাতে তুলে নিও না। আমি খলিফা হতে পারি, কিন্তু আল্লাহর বিধানে খলিফা ও প্রজাতে কোন তফাৎ নেই। আইনের চোখে সবাই সমান।'
খলিফা আলী (রা:) কাজীর দরবারে বিচার দিলেন। নির্দিষ্ট দিনে ডাক পড়ল ইহুদী ও খলিফার। দরবার লোকে লোকারণ্য। বিচারকের আসনে বসলেন কাজী। খলিফা বসলেন বাদীর আসনে আর ইহুদী আসামীর কাঠগড়ায়।
বিচার শুরু হল। কাজী সাহেব বললেন, 'তুমি কি খলিফার তলোয়ার চুরি করেছো?'
ইহুদী বলল, 'আমি চুরি করতে যাবো কেন? এটা তো আমারই তরবারি।'
কাজী তাকালেন খলিফার দিকে। বললেন, 'এটা যে আপনার তলোয়ার তার কোন সাক্ষী আছে আপনার কাছে?'
আলী (রা:) বললেন, 'আছে। আমার ছেলে হাসান এবং আমার খাদেম আমার সাক্ষী। তারা চেনে আমার তলোয়ার।'
কাজী বললেন, 'কিন্তু এ সাক্ষ্য আমি গ্রহণ করতে পারবো না।'
'কেন, আপনি কি মনে করেন ওরা মিথ্যা কথা বলবে?'
'না, আমি জানি আপনি নবীর আত্মীয়। আপনি বা আপনার সাক্ষীরা কেউ মিথ্যা বলবে না। কিন্তু ইসলামে পিতার পক্ষে পুত্র এবং মনিবের পক্ষে চাকরের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আপনার নালিশ খারিজ করে দিলাম।'
এ রায় শুনে সবাই হতবাক হয়ে গেল। কিন্তু খলিফা নীরবে কাজীর বিচার মেনে নিলেন। এ সময় ঘটল সেই অভাবিত দৃশ্য। ইহুদী এগিয়ে গেল হযরত আলীর (রা:) সামনে। চিৎকার করে বলল, 'কী অকল্পনীয় বিচার! কী অনন্য আইন! খলিফার দাবীও গ্রহণযোগ্য হয় না সঠিক সাক্ষ্য প্রমাণ না থাকলে! আইনের প্রতি এতটা শ্রদ্ধাশীল যে ধর্ম তা কখনো মিথ্যা হতে পারে না।'
ইহুদী তলোয়ারটি হযরত আলীর (রা:) হাতে তুলে দিতে দিতে বললেন, 'আমিরুল মোমিনীন, এটি আপনারই তলোয়ার। সত্যি আমি এটি চুরি করেছিলাম। আপনি আপনার জিনিস গ্রহণ করুন, আরো একটি জিনিস গ্রহণ করুন, যেটি আপনার নয়।'
আলী (রা:), কাজী এবং উপস্থিত সবাই বিস্মিত চোখে তাকালো তার দিকে। কাজী বললেন, 'কী সেই জিনিস?'
ইহুদী বলল, 'আমার দেহ, আমার আত্মা, আমার ঈমান। আজ থেকে আমি নিজেকে মুসলিম বলে ঘোষণা করছি।' এই বলে ইহুদী জোরে জোরে উচ্চারণ করলো, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ'।
এই গল্প আমাদের শেখায়, আইন সবার জন্য সমান। ক্ষমতার জোরে আইনকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা অন্যায়। উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণ না থাকলে কাউকে শাস্তি দেয়া যায় না।
📄 মায়ের দোয়া
ক.
দরবেশ বায়জীদ বোস্তামীর শৈশবের একটি ঘটনা। মাকে প্রচণ্ড রকম ভালোবাসতেন তিনি। কখনো মায়ের অবাধ্য হতেন না। মনপ্রাণ ঢেলে মায়ের সেবা করতেন। সবসময় ভাবতেন, কিভাবে মাকে আরো খুশি করা যায়।
এক শীতের রাতের ঘটনা। মায়ের শরীরটা ক'দিন ধরেই ভালো নেই। সারাক্ষণ অসুস্থ মায়ের আশেপাশেই থাকেন বায়জীদ। মন দিয়ে মায়ের সেবা করেন। এক রাতে মায়ের পানির পিপাসা পেল। চোখ মেলে দেখলেন আদরের ছেলে পাশেই বসে আছে। বললেন, 'বাবা, একটু পানি খাবো।'
মায়ের জন্য পানি আনতে গেল বায়জীদ। দেখলো কলসিতে কোন পানি নেই। বায়জীদ তাড়াতাড়ি কলসি নিয়ে গেল কুয়োর পাড়ে। কলসিতে পানি ভরে ঘরে ফিরে দেখে মা ঘুমিয়ে পড়েছে। সে গ্লাসে পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মায়ের পাশে। অসুস্থ মাকে ডাকার সাহস হলো না তার, যদি মায়ের কষ্ট হয়? আবার শুতেও যেতে পারছিল না, যদি সে ঘুমিয়ে পড়ে আর মা তখন পানি খেতে চান? সারা রাত ওভাবেই মায়ের পাশে বসে রইলো বায়জীদ। ভোর রাতে ঘুম ভাঙলো মায়ের। দেখলো, ছেলে তার পানি নিয়ে বসে আছে।
ছেলের মাতৃভক্তি দেখে মায়ের মন আনন্দে ভরে গেল। তিনি প্রাণ ভরে দোয়া করলেন ছেলের জন্য। বললেন, 'হে আল্লাহ, তুমি বায়জীদকে অনেক বড় আলেম ও বুজুর্গ বানিয়ে দাও।' আল্লাহপাক মায়ের দোয়া কবুল করলেন। বায়জীদকে আল্লাহ অনেক জ্ঞান দিলেন। তাকে বানিয়ে দিলেন বিশ্ববিখ্যাত দরবেশ। আজো মানুষ তার কথা স্মরণ করে।
খ.
মহানবীর হাদিস সংগ্রহে যারা আজীবন পরিশ্রম করেছেন ইমাম বুখারী ছিলেন তাঁদের অগ্রণী। তাঁর পুরো নাম 'ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল বুখারী'। তাঁর বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থের নাম 'সহীহ আল বুখারী'। সংক্ষেপে আমরা একে বলি 'বোখারী শরীফ'। শৈশবে তিনি কঠিন অসুখে পড়েন। অসুখ ভালো হলেও তাঁর চোখ আর ভালো হয় না, তিনি অন্ধ হয়ে পড়েন।
ছেলে চোখে দেখতে পায় না এই দুঃখে অস্থির হয়ে পড়েন বুখারীর মা। অনেক চিকিৎসা করান, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। মা দুর্ভাবনায় ছটফট করেন। সারাজীবন কি ছেলে দৃষ্টিহীন থাকবে? ছেলের চিন্তায় রাতে তাঁর ঘুম হয় না।
একদিন গভীর রাতে মা সিজদায় গিয়ে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর দরবারে কাতরভাবে মুনাজাত শুরু করলেন। বললেন, 'হে পরোয়ারদিগার, তুমি আমাকে একটি সুন্দর ছেলে দিয়েছিলে। সোনার টুকরো ছেলের মুখ দেখে কত যে খুশি হয়েছিলাম আমি! আজ সেই ছেলে অন্ধ। ছেলের মুখের দিকে তাকালে কলিজা ফেটে যায় আমার। হে আল্লাহ, তুমি আমার ছেলেকে ভালো করে দাও। তার চোখে আলো দাও। তার অন্ধত্ব দূর করে দাও।' কাঁদতে কাঁদতে রাত প্রায় শেষ হয়ে এলো। এক সময় জায়নামাজেই ঘুমিয়ে পড়লেন মা।
ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখলেন তিনি। দেখলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। বলছেন, 'হে পূণ্যময়ী মা, আল্লাহ আপনার দোয়া কবুল করেছেন। আপনার ছেলে ভালো হয়ে গেছে।' জেগে উঠলেন তিনি। দেখলেন ফজরের সময় হয়ে এসেছে। অজু করে নামাজে দাঁড়াবার আগে তিনি ছেলেকে ডাকলেন। বললেন, 'এসো বাবা, অজু করবে, নামাজ পড়বে।'
মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙলো শিশু বুখারীর। চোখ মেলে তাকিয়েই সে চিৎকার করে উঠলো, 'মা, আমি দেখতে পাচ্ছি! সব দেখতে পাচ্ছি! আমি ভালো হয়ে গেছি মা!' আনন্দে, খুশিতে, আবেগে মা আবার সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। চোখের পানিতে শোকর আদায় করলেন আল্লাহর।
কী অমোঘ শক্তি মায়ের দোয়ার। এক রাতের প্রার্থনায় দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছে তাঁর আদরের দুলাল। যে মায়ের দোয়ার এত মূল্য আল্লাহর দরবারে, আমাদের উচিত সেই মায়ের সেবা করা, তাঁর মনে কোনো কষ্ট না দেয়া। এই গল্প থেকে আমরা শিখলাম, সন্তানের জন্য মায়ের দোয়া বৃথা যায় না। তাই আমাদের উচিত মায়ের সেবায় মনপ্রাণ ঢেলে দেয়া। আমাদের ভুললে চলবে না, 'মায়ের পায়ের তলে সন্তানের বেহেশত'।