📘 ছোটদের মজার গল্প > 📄 ঈমানের জোর

📄 ঈমানের জোর


আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগের কথা। তখন মানুষ আল্লাহর নবীদের কথা মেনে চলতো। মানুষ সত্য কথা বলতো। ওয়াদা পালন করতো।

বনি ইসরাইলে এমনি এক লোক বাস করতো। নাম রুবায়া। সে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াতো আর বন্দরে বন্দরে ব্যবসা করতো। একবার বাণিজ্যে যাবার আগে কিছু স্বর্ণমুদ্রার টান পড়লো। ভেবে দেখলো, কারো কাছ থেকে ধার নেয়া ছাড়া গতি নেই। তখনি তার মনে পড়লো উদার হৃদয় সোলায়মানের কথা।

পরদিন সকালে সে সোলায়মানের বাড়ি গিয়ে হাজির হলো। সালাম বিনিময়ের পর সোলায়মান তার আগমনের কারণ জানতে চাইলেন। রুবায়া বলল, 'বাণিজ্যে যাচ্ছি, মালামাল কেনার জন্য আরো কিছু স্বর্ণমুদ্রা দরকার। আপনি যদি একহাজার স্বর্ণমুদ্রা ধার দেন তবে এক বছর পর তা শোধ করে দেবো।'

সোলায়মান বললেন, 'ধার দিতে সমস্যা নেই, তবে জামিনদার দরকার।'

রুবায়া বলল, 'আমার জামিনের জন্য একমাত্র আল্লাহই যথেষ্ট।' রুবায়া যেমন পাক্কা ঈমানদার, সোলায়মানও তাই। রুবায়ার কথা শুনে বললেন, 'আপনি ঠিকই বলেছেন, আল্লাহই জামিনের জন্য যথেষ্ট।'

এ কথা বলে রুবায়াকে সোলায়মান এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা ধার দিল। যথাসময়ে জাহাজে চড়ে বিদেশে পাড়ি জমালো রুবায়া। বন্দরে বন্দরে ব্যবসা করে প্রচুর লাভ করলো। ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কেটে গেল প্রায় পুরোটা বছর। স্বর্ণমুদ্রা ফেরত দেয়ার দিন ঘনিয়ে এলো। বাড়ি ফেরার জন্য বন্দরে এলো রুবায়া। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে বাড়ি ফেরার মত কোন জাহাজ পেলো না। জলপথ ছেড়ে স্থলপথে বাড়ি ফিরতে চাইল, কিন্তু কোন যানবাহন জোগাড় করতে পারল না। অনেক চেষ্টা করেও সে যখন দেখলো সময় মত বাড়ি ফেরার কোন উপায় নেই তখন ওয়াদাভঙ্গের আশংকায় সে অস্থির হয়ে পড়লো। কি করা যায় ভাবতে গিয়ে তার মাথায় এক অভিনব বুদ্ধি এলো। রুবায়া একটুকরো কাঠ ছিদ্র করে তাতে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা ও একটি চিঠি ভরলো। এরপর শক্ত করে ছিদ্রমুখ বন্ধ করে সে গেল সাগর পাড়ে।

তীরে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো, 'হে আল্লাহ, তুমি জানো আমি সোলায়মানের কাছ থেকে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা ধার নিয়েছি। সে জামিন চাইলে আমি তোমাকেই জামিন মেনেছিলাম। নির্দিষ্ট দিনে বাড়ি যাওয়ার জন্য আমি কোন যানবাহন পাচ্ছি না। তাই তোমার ওপর ভরসা করে স্বর্ণমুদ্রা ভরা এই কাঠের টুকরাটি সমুদ্রে ফেলে দিচ্ছি। তুমি সময়মত এটি তার হাতে পৌঁছে দিও।'

রুবায়া এ কথা বলে কাঠের খন্ডটি সমুদ্রে ফেলে দিল। এরপর সে আবার বাড়ি ফেরার যানবাহন খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

এদিকে নির্দিষ্ট দিনে সোলায়মান বন্দরে এসে রুবায়াকে তালাশ করলো। তাকে না পেয়ে মন খারাপ করে বাড়ি ফেরার পথে সমুদ্র তীরে একখন্ড কাঠ দেখতে পেলো। কাঠটি রান্নার কাজে লাগবে ভেবে সে ওটা নিয়ে বাড়ি ফিরল। কুড়াল দিয়ে কাঠটি কাটতে গেলে বেরিয়ে এলো এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা ও চিঠি। সোলায়মান চিঠিটা পড়লো। জানতে পারলো রুবায়া তার জন্যই এ স্বর্ণমুদ্রাগুলো পাঠিয়েছে।

কিছুদিন পরের কথা। রুবায়া দেশে ফিরে এলো। বাড়ি ফিরেই সে গেল সোলায়মানের বাসায়। সোলায়মান তাকে সমাদর করে শরবত না নাস্তা খেতে দিল। খেতে খেতে রুবায়া বলল, 'বিশ্বাস করুন, নির্দিষ্ট দিনে আপনার পাওনা ফিরিয়ে দিতে আমি অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোন জাহাজ না পাওয়ায় সময়মত ফিরে আসতে পারিনি। এই নিন আপনার স্বর্ণমুদ্রা। আমাকে দেনার দায় থেকে মুক্তি দিন।' রুবায়া স্বর্ণমুদ্রার থলে সোলায়মানের দিকে বাড়িয়ে ধরলো। সোলায়মান বলল, 'এক পাওনা আমি কয়বার নেবো? নির্দিষ্ট দিনেই আমি আপনার পাঠানো স্বর্ণমুদ্রা ও চিঠি পেয়েছি। আমি আল্লাহর শোকর করছি এ জন্য যে, প্রকৃত ঈমানদারকে আল্লাহ এভাবেই সহায়তা করেন।' রুবায়াও আল্লাহর শোকর আদায় করে খুশি মনে বাড়ির পথ ধরলো।

এই গল্প থেকে আমরা জানতে পারলাম, আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস থাকলে আল্লাহ কাউকে নিরাশ করেন না। মুমিন কখনো ওয়াদা খেলাফ করেন না।

📘 ছোটদের মজার গল্প > 📄 ইয়াতিমের হাসি

📄 ইয়াতিমের হাসি


মুসলমানের সবচেয়ে আনন্দের দিন হলো ঈদের দিন। বছরে দুই দিন ঈদ হয়। এক মাস রোযার শেষে আসে ঈদুল ফিতর। যারা আল্লাহর হুকুমে এক মাস রোযা রাখে, এদিনটি তাদের জন্য সবচেয়ে আনন্দের। আর হচ্ছে ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদ। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে আল্লাহ বললেন, 'তোমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কোরবানি করো।' ইবরাহীম (আঃ) ভেবে দেখলেন, পুত্রের চেয়ে প্রিয় আর কিছু নেই তাঁর কাছে। তিনি পুত্রকে শোনালেন আল্লাহর হুকুম। পুত্র ইসমাঈল (আঃ) পিতাকে তাগাদা দিয়ে বললেন, 'তবে আর দেরি করছেন কেন? জলদি আমাকে কোরবানি করার ব্যবস্থা করুন।' আল্লাহর হুকুম মানার ব্যাপারে পিতা-পুত্রের এই যে আকুলতা সেই কথা স্মরণ করে পালন করা হয় ঈদুল আযহা বা কোরবানীর ঈদ। যিনি যত বেশি আল্লাহর হুকুম পালন করেন তার কাছে এই ঈদ তত বেশি আনন্দময়।

তেমনি এক ঈদের দিন। মদিনার ঘরে ঘরে খুশির জোয়ার বইছে। মহানবী (সা:) নির্দেশ দিয়েছেন, সবাইকে ফিতরা দিতে হবে। ফিতরা মানে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ অন্যকে দান করা। এর ফলে অর্থ শুধুমাত্র ধনীদের হাতেই জমা রইলো না, গরীবরাও প্রচুর অর্থ পেল। তারাও সুযোগ পেল পছন্দমত কেনাকাটার। ফলে সবাই আনন্দিত। ঈদের নামায শেষে মহানবী (সা:) সবার সাথে কোলাকুলি করলেন। কোলাকুলি শেষে সবাই বাড়ির পথ ধরলো। মহানবীও চললেন বাড়ির পানে। হঠাৎ কারো কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো তাঁর কানে। থমকে দাঁড়ালেন তিনি। যেখান থেকে কান্নার আওয়াজ আসছিল সেদিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। দেখলেন মলিন পোশাকের এক কিশোর বসে বসে কাঁদছে। দয়াল নবীর দয়া হলো। ছেলেটির কাছে এগিয়ে গেলেন তিনি। মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। আদর পেয়ে ছেলেটির কান্না আরো বেড়ে গেল। তিনি ছেলেটির কাছে জানতে চাইলেন তার কান্নার কারণ।

ছেলেটি বলল, 'আজ ঈদের দিন। মানুষের মনে কত আনন্দ। সবাই নতুন জামা কাপড় পরেছে। মা-বাবা আদর করছেন সন্তানদের। কিন্তু আমাকে আদর করার কেউ নেই। আমার একটু খোঁজ নেয়ারও কেউ নেই দুনিয়ায়। আমার বাপ নেই, মা নেই। আমি যে ইয়াতিম।

কিশোরের কথা শুনে নবীর চোখে পানি চলে এলো। আহা! এই ছেলেটির মত আরো না জানি কত মায়ের সন্তান ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত। যদি তাদের খবর পেতাম! যদি তাদের মুখেও ফোটাতে পারতাম হাসি!

তিনি কিশোরকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। মা আয়েশার (রা:) হাতে ছেলেটিকে তুলে দিয়ে বললেন, 'এ এক শহীদের সন্তান। ওর মা-বাপ কেউ নেই। আজ থেকে তুমিই ওর মা।'

মা আয়েশা (রাঃ) ছিলেন নবীর সহধর্মিনী। তিনি ছেলেটিকে বুকে টেনে নিলেন। নিজ হাতে গোসল করালেন। নতুন জামা এনে পরতে দিলেন। ভালবাসা পেয়ে কিশোরের মনটা ভালো হয়ে গেল। তার মুখে ফুটে উঠলো মধুর হাসি। সে ভুলে গেল তার দুঃখের কথা। ভুলে গেল সে এক অনাথ শিশু।

এ দুনিয়ায় এখন তাকেও ভালোবাসার মত মানুষ আছে। আদর করার লোক আছে- এ কথা মনে হতেই তার মুখে ছড়িয়ে পড়লো হাসি। সে আনন্দে বলে উঠলো- ঈদ মোবারক।

📘 ছোটদের মজার গল্প > 📄 কৃপণের ধন

📄 কৃপণের ধন


বনি ইসরাইল গোত্রে বাস করতো তিন ব্যক্তি। একজন কুষ্ঠরোগী, একজন টাকু আর অন্যজন অন্ধ। তাদের পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ এক ফেরেশতা পাঠালেন। মানুষের বেশে ফেরেশতা গেল কুষ্ঠরোগীর কাছে। বলল, 'তুমি আল্লাহর কাছে কী চাও?' সে বলল, 'আমি এই কুৎসিত রোগ থেকে মুক্তি চাই।' ফেরেশতা তার শরীরে হাত বুলিয়ে দোয়া করলো। সঙ্গে সঙ্গে সে ভালো হয়ে গেল। ফেরেশতা বলল, 'তুমি কি কোন সম্পদ চাও?' সে খুশি হয়ে বলল, 'হ্যাঁ, আমি উট পেলে খুশি হই।' ফেরেশতা তাকে একটি গর্ভবতী উট দিল। এরপর আল্লাহর দরবারে বরকতের জন্য দোয়া করে বিদায় নিল।

ফেরেশতা টাকমাথা লোকটির কাছে গিয়ে বলল, 'তুমি আল্লাহর কাছে কী চাও?' লোকটি বলল, 'টাকের কারণে মানুষ আমাকে অপছন্দ করে। আমি এর নিরাময় চাই।' ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই নতুন চুলে তার মাথা ভরে গেল। ফেরেশতা বলল, 'তুমি কি কোন সম্পদ চাও?' সে বলল, 'হ্যাঁ, আমি গরু পেলে খুশি হই।' ফেরেশতা তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দিল আর আল্লাহর দরবারে বরকতের জন্য দোয়া করে বিদায় নিল।

এবার ফেরেশতা গেল অন্ধ লোকটির কাছে। বলল, 'তুমি আল্লাহর কাছে কী চাও?' লোকটি বলল, 'অন্ধ বলে আমি আল্লাহর দুনিয়া দেখতে পারি না। আমি চাই চোখের আলো, যেন আল্লাহর সৃষ্টি আমি প্রাণভরে দেখতে পারি।' ফেরেশতা তার চোখে হাত বুলিয়ে দিলে তার চোখ ভালো হয়ে গেল। ফেরেশতা বলল, 'তুমি কি কোন সম্পদ চাও?' সে বলল, 'হ্যাঁ, আমি একটি ছাগল পেলে খুশি হই।' ফেরেশতা তাকে একটি গাভীন ছাগল দিল। এরপর আল্লাহর দরবারে বরকতের জন্য দোয়া করে বিদায় নিল।

ফেরেশতার দোয়া কবুল করলেন আল্লাহ। তাদের দিলেন অনেক উট, গরু ও ছাগল। অল্পদিনেই তারা ধনী হয়ে গেল। মানুষ তাদের এই অভাবিত উন্নতি দেখে হতবাক। কিছুদিন পর সেই ফেরেশতা আবার তাদের কাছে এলো। এলো অন্য মানুষের বেশে। প্রথমে গেল কুষ্ঠরোগীর কাছে। বলল, 'আমি এক মুসাফির। পথ খরচ ফুরিয়ে যাওয়ায় আমি এখন নিঃস্ব। আমার বাহন উটটি মরে গেছে। আল্লাহ আপনাকে দিয়েছেন চমৎকার চেহারা, অঢেল সম্পদ। যে আল্লাহ আপনাকে এতকিছু দিয়েছেন তার নামে আপনার কাছে একটি উট চাই।'

লোকটি বলল, 'হতভাগা কোথাকার! দূর হ এখান থেকে। সারাজীবন খেটে আমি তোর জন্য সম্পদ গড়েছি নাকি?'

ফেরেশতা বলল, 'সম্পদের মালিক আল্লাহ। সম্পদ নিয়ে বড়াই করবেন না। আল্লাহ যা দিয়েছেন তা থেকে আল্লাহর বান্দার জন্য ব্যয় করুন।'

লোকটি এবার রেগে গিয়ে বলল, 'কী, আমাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে? যা যা, কিছুই পাবি না। ভাগ এখান থেকে।'

ফেরেশতা বলল, 'আপনাকে মনে হয় আমি চিনতে পেরেছি। আপনার খুব খারাপ কুষ্ঠরোগ ছিল। আপনি ছিলেন গরীব। পরে আল্লাহ আপনাকে সুস্থ করে দেন। আপনাকে দান করেন অঢেল সম্পদ।'

'মিথ্যে কথা!' লোকটি চেঁচিয়ে বলল, 'এসব কাহিনী বানিয়ে তুমি আমার কাছ থেকে কিছুই আদায় করতে পারবে না।'

ফেরেশতা বলল, 'আমি মোটেও মিথ্যা বলিনি। মিথ্যা বলছেন আপনি। আল্লাহ মিথ্যাবাদীকে ভালোবাসেন না। আপনি তওবা করুন, নইলে আপনার ভাগ্য আবার আগের মত হয়ে যাবে।'

লোকটি ফেরেশতার কথায় কান না দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিল। পরদিন ঘুম থেকে জেগে লোকটি দেখতে পেলো, তার শরীর জুড়ে আবার কুষ্ঠরোগ থকথক করছে। সে শুয়ে আছে এক কুঁড়েঘরে। আর তার যে এত এত উট ছিল সেগুলোর কোন হদিস নেই।

ফেরেশতা এবার গেল টাকমাথা লোকটির কাছে। তাকেও বলল, 'আমি এক মুসাফির। আমাকে আল্লাহরওয়াস্তে একটি গরু দান করুন।' কিন্তু কুষ্ঠরোগীর মত সেও তাকে তাড়িয়ে দিল। বলল, 'আমার মাত্র অল্প কয়টা গরু, তোমাকে কোথা থেকে গরু দান করবো?'

ফেরেশতা বলল, 'আল্লাহর নাশোকর বান্দা হবেন না। তাহলে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হবেন।'

'না, হবে না। আমি এখানে দানছত্র খুলে বসিনি। কী আবদার! অন্তত একটা গরু দান করুন!'

ফেরেশতা বলল, 'আপনাকে বোধহয় আমি চিনেছি। আপনার বিশাল টাক ছিল। লোকে সে জন্য আপনাকে ঘৃণা করতো। পরে আল্লাহ আপনাকে সুস্থ করে দেন এবং আপনাকে একটা গরু থেকে অনেক গরু দান করেন।'

লোকটি বলল, 'কি যা তা বলছো। যাও এখান থেকে।'

ফেরেশতা বলল, 'যাচ্ছি, তবে মনে রাখবেন, যিনি সম্পদ দিতে পারেন তিনি সম্পদ নিতেও পারেন। আপনি মিথ্যা বললে আবার আগের মত হয়ে যাবেন।' ফেরেশতা চলে গেল। দেখতে দেখতে লোকটি আবার আগের মত টাকমাথা ও গরীব হয়ে গেল।

এবার ফেরেশতা গেল অন্ধ লোকটির কাছে। বলল, 'আমি মুসাফির। আমাকে একটা ছাগল দিয়ে সাহায্য করুন।'

লোকটি বলল, 'আমি ছিলাম অন্ধ ও গরীব। আল্লাহ আমাকে ভালো করে দিয়েছেন। ধন-সম্পদ দিয়েছেন। আমার যত সম্পদ সব আল্লাহরই দান। আপনার যে কয়টি বকরী দরকার ইচ্ছামত নিয়ে যান।'

ফেরেশতা বলল, 'না, এসব আপনারই থাকবে। আল্লাহ আপনাদের তিনজনকে পরীক্ষা করার জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন। দু'জন পরীক্ষায় পাস করেনি। তারা অহংকারী হয়ে উঠেছিল। তাদের ওপর আল্লাহর গযব নাজিল হয়েছে। আপনি পাস করেছেন। আল্লাহ আপনার সম্পদ আরো বাড়িয়ে দেবেন।'

এ কাহিনী আমাদের শেখায়, কৃপণতা মহাপাপ। অহংকার করা ঠিক নয়। যারা আল্লাহর শোকর আদায় করে না তাদের ওপর গযব নাজিল হয়। মানুষের বিপদে সাহায্য করলে আল্লাহ খুশি হন এবং তার সম্পদ বাড়িয়ে দেন।

📘 ছোটদের মজার গল্প > 📄 সত্যের জয়

📄 সত্যের জয়


হযরত আবদুল কাদের জিলানী। সবাই তাকে ডাকতো বড়পীর বলে। বড়পীর আবদুল কাদের জিলানীর শৈশবের একটি ঘটনা। ঘটনাটি এতই চমকপ্রদ যে, আজো মানুষ শ্রদ্ধাভরে সে কথা স্মরণ করে।

তোমাদের মতই বয়স তখন তাঁর। লেখাপড়ার প্রতি দারুণ আগ্রহ। গ্রামের বাড়ির পড়া শেষ করেছেন। এখন তাঁর ইচ্ছা, বড় কোন শহরে গিয়ে নামকরা কোন মাদ্রাসায় পড়বে। কিন্তু তার বাপ নেই। বিধবা মায়ের অভাবের সংসার। কোথায় পাবেন তিনি ছেলের পড়ার খরচ? মা ভাবেন, এমন সোনার ছেলের আশা কি পূরণ হবে না? মানুষের কত রকম শখ থাকে। অথচ ছেলের একটাই শখ। সে অনেক পড়বে, অনেক জ্ঞানী হবে, মানুষের মত মানুষ হবে। মা দিনরাত ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন আর একটু একটু করে টাকা জমান ছেলের জন্য।

একদিন আবদুল কাদের জিলানী ছাদে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির শোভা দেখছিলেন। তিনি দেখলেন, একটি কাফেলা বাগদাদের দিকে যাচ্ছে। তাঁর অনেক দিনের শখ বাগদাদ যাওয়ার। সেখানে গিয়ে পড়ালেখা করার। তিনি নিচে নেমে মাকে আবারও তার মনের কথা বললেন। মায়ের বুক হাহাকার করে উঠল। যেখানে অন্যের ছেলেরা পড়তে চায় না সেখানে নিজের ছেলে পড়ার জন্য উতলা, এটা কি কম সৌভাগ্যের কথা! তিনি জমানো টাকাগুলো গুনে দেখলেন সেখানে আশিটি স্বর্ণমুদ্রা আছে। টাকাটা দুই ভাগ করে এক ভাগ রাখলেন সংসার খরচের জন্য আরেক ভাগ তুলে দিলেন ছেলের হাতে। ছোট মানুষ, পথে যদি টাকাগুলো হারিয়ে ফেলে এই ভয়ে মা বগলের নিচে পকেট বানিয়ে সেখানে মুদ্রাগুলো সেলাই করে দিলেন।

মায়ের দেয়া চল্লিশটি স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে পথে নামলেন আবদুল কাদের জিলানী। বিদায়ের সময় ছেলেকে বুকে জড়িয়ে মা বললেন, 'বাবা, আমার সময় আর বেশি বাকি নেই। হয়তো কেয়ামতের আগে আর আমাদের দেখা হবে না। আমার অন্তিম উপদেশ, কখনো মিথ্যা কথা বলো না।'

Mায়ের এ উপদেশ বুকে নিয়ে ছেলে গিয়ে শামিল হলো কাফেলার সাথে। কাফেলা এগিয়ে চললো বাগদাদের দিকে। যেতে যেতে তারা গিয়ে পৌঁছলো হামদান নামক এক জায়গায়। এলাকাটি জনমানবহীন। চারদিকে গাছপালার গভীর জঙ্গল। হঠাৎ একদল ডাকাত ঝাঁপিয়ে পড়লো তাদের ওপর। কেড়ে নিল তাদের টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত। লোকেরা জীবন বাঁচাতে মালসামান রেখেই পালিয়ে গেল। বালক আবদুল কাদের কি করবেন বুঝতে না পেরে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। ডাকাতরা ভাবলো, ও ছোট মানুষ, ওর কাছে আর কি থাকবে? সবাই ওকে রেখে লুটপাটে মন দিল। এক ডাকাত তাকে বলল, 'এই ছেলে, তোমার কাছে টাকা-পয়সা কিছু আছে?'

আবদুল কাদের জিলানী জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, আমার কাছে চল্লিশটি স্বর্ণমুদ্রা আছে।'

বিশ্বাস হলো না ডাকাতের। বলল, 'কোথায় তোমার স্বর্ণমুদ্রা?'

তিনি বললেন, 'বগলের নিচে আমার জামার সাথে সেলাই করা।'

এ কথা শুনে ডাকাত তাকে নিয়ে এলো সর্দারের কাছে। ডাকাত সর্দার তখন লুটের মাল ভাগ-বাটোয়ারায় ব্যস্ত। সব শুনে সর্দার বললেন, 'জামা কেটে বগলের নিচ থেকে টাকাগুলো বের করো দেখি।'

জামা কাটা হলো। বের করে আনা হলো টাকাগুলো। গুনে দেখা গেল সত্যি সেখানে চল্লিশটি স্বর্ণমুদ্রা। ডাকাতরা ভাবলো, ছেলেটি কী বোকা! ডাকাত সর্দার বলল, 'তুমি আমাদের বললে কেন তোমার কাছে টাকা আছে? তুমি না বললে তো আমরা এ স্বর্ণমুদ্রার কথা জানতেও পারতাম না।'

সত্যবাদী জিলানী দৃঢ়তার সাথে বললেন, 'কেন বলবো না? আমার মা আমাকে মিথ্যা বলতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহর নবী বলেছেন, মিথ্যা হল সকল পাপের মা। আল্লাহ মিথ্যাবাদীকে ভালোবাসেন না। আল্লাহ যে কাজ অপছন্দ করেন আমি সে কাজ করতে যাবো কেন?'

'কিন্তু তুমি না বললে তো এ টাকাগুলো হারাতে হতো না।'

তিনি বললেন, 'তাতে আমার দুঃখ নেই। আমি আমার মায়ের আদেশ পালন করতে পেরেছি, আল্লাহর হুকুম পালন করতে পেরেছি, এতেই আমি খুশি।' তিনি আরো বললেন, 'কাল হাশরের মাঠে আমাকে লজ্জিত হতে হবে না, অপমান সইতে হবে না, এরচেয়ে আনন্দের আর কী আছে?'

সত্যবাদী বালকের দৃঢ়তায় চমকে উঠলেন ডাকাত সর্দার। তার মনে হল সে আত্মমর্যাদাহীন ও নির্বোধ একজন মানুষ। এই বালকের সমান বুদ্ধিও তার নেই। যদি থাকতো তাহলে আল্লাহর হুকুম অমান্য করে সে মানুষের সহায়-সম্পদ লুট করতে পারতো না।

হঠাৎ হায় হায় করে উঠলো ডাকাত সর্দার। বলল, 'কে না জানে, সবাইকে একদিন মরতে হবে। মরার পর আল্লাহ যখন জানতে চাইবেন, তোমাকে কি লুটপাট করার জন্য দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলাম, তখন কী জবাব দেবো আমি?'

ডাকাত সর্দারের মনে তোলপাড় শুরু হল। অনুশোচনায় দগ্ধ হতে লাগলো মন। তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন, 'এই ছেলে মায়ের কথার অবাধ্য হচ্ছে না, আর আমরা মহান আল্লাহর অবাধ্য হয়ে ডাকাতি করছি? কী হবে আমাদের পরিণতি?'

আবদুল কাদের বললেন, 'আল্লাহর কাছে তওবা করুন। আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল।'

তক্ষুণি বড়পীরের হাত ধরে তওবা করলেন ডাকাত সর্দার। দলের অন্যরাও তওবা করলো। তারা ওয়াদা করলো, 'জীবনে আর ডাকাতি করবো না, লুটপাট করবো না। আল্লাহর অবাধ্য হবো না, পাপ কাজ করবো না।'

ডাকাতরা কাফেলার লোকজনকে ডেকে তাদের সব মালামাল ফিরিয়ে দিল। কাফেলা খুশি মনে বাগদাদের পথ ধরলো।

এই গল্প আমাদের শেখায়:
মিথ্যা কথা বলতে নেই
পাপের পথে চলতে নেই।
থাকলে মনে খোদার ভয়
জীবনটা হয় পুণ্যময়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00