📄 দুনিয়ার মূল্য
সালামাহ আল-আহমার বলেন, একদা বাদশা হারুন রশীদের নিকট গমন করলাম। তাঁর বিভিন্ন বালাখানা ও রাজমহল দেখে আমি তাঁকে বললাম, 'আপনার মহলখানা বেশ প্রশস্ত। আপনার মৃত্যুর পর যদি আপনার কবরটাও প্রশস্ত হয়, তবেই উত্তম।' এ কথা শুনে বাদশা কাঁদতে লাগলেন। অতঃপর বললেন, 'হে সালামাহ! আপনি আমাকে সংক্ষেপে আরো কিছু উপদেশ দিন।'
আমি বললাম, 'হে আমীরুল মু'মেনীন! আপনি কোন মরুভূমিতে থেকে যদি পিপাসিত হন, তাহলে আপনার পিপাসা মিটাবার জন্য কী পরিমাণ অর্থ দিয়ে এক ঢোক পানি কিনবেন?' তিনি বললেন, 'আমার অর্ধেক রাজত্ব দিয়ে।' আমি বললাম, 'অতঃপর তা পান ক'রে তা যদি পেট থেকে বের হতে না চায়, তাহলে তা বের করার জন্য কী ব্যয় করবেন?' তিনি বললেন, 'বাকী অর্ধেক রাজত্ব ব্যয় ক'রে দেব।'
আমি বললাম, 'অতএব সে দুনিয়ার উপর আল্লাহর অভিশাপ, যে দুনিয়ার মূল্য হল এক ঢোক পানি ও এক ঢোক পেশাব!' এ কথায় বাদশা হারুন আরো জোরে কেঁদে উঠলেন।
📄 মোসাহেবি ও চাটুকতা
বাদশা আকবর খেতে খেতে একটি তরকারি বড় পছন্দ করলেন। পাচক বীরবলকে তরকারিটির নাম জিজ্ঞাসা করলে সে বলল, 'এটি বেগুন, হুজুর! এর বেহদ্দ গুণ। এ হল শতরোগের মহৌষধ। এ খেলে ব্রেন তাজা হয়, রাজনীতিতে মন বসে, যৌন-ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, পরকালে বেহেশতে বেহেশতীদের মাঝে এই তরকারি প্রথম পরিবেশন করা হবে।'
বেগুনের এত সব গুণ শুনে বাদশা খুব খেলেন। পরদিন সকালে বললেন, 'বীরবল! তোমার ঐ শতগুণের বেগুন খেয়ে আমার পেটে সারা রাত ব্যথা।' পাচক বলল, 'হুজুর! ওটা তো বেগুন, ওর কোন গুণ নেই। খেলে নানা রোগ হয়, যৌন-ক্ষমতা কমে যায়, পেটে ব্যথা হয়, দুশ্চিন্তা বাড়ে, পরকালে দোযখে দোযখীদের মাঝে সর্বপ্রথম ঐ তরকারি পরিবেশন করা হবে!' বাদশা বললেন, 'কাল তুমি এর এত প্রশংসা করলে, আর আজ এর এত নিন্দা কেন?'
পাচক বলল, 'কাল হুজুরকে ভালো লেগেছিল, তাই প্রশংসা করেছিলাম। আজ হুজুরকে খারাপ লেগেছে, তাই নিন্দা করছি। আমি তো হুজুরের চাকরি করি, বেগুনের নয়।' বলা বাহুল্য, এমন ব্যক্তিপূজারী বহু মানুষ আছে, যারা স্বার্থের তরে রায় ও দল বদলে নেয়।
📄 পেট বড় বালাই
একদা এক কুকুর পশুরাজ সিংহকে বলল, 'হে পশুরাজ! আমার নামটা বড় খারাপ ও অসুন্দর। আমার নাম পাল্টে দিন।' সিংহ বলল, 'তুমি তো বড় লোভী, এ নাম তোমার জন্য যথার্থ ও উপযুক্ত।' কুকুর বলল, 'তাহলে আমাকে পরীক্ষা ক'রে দেখে নিন, ভাল নামের কাজ করতে পারি কি না?'
সিংহ কুকুরকে একটুকরা মাংস দিয়ে বলল, 'এটি কাল পর্যন্ত তোমার কাছে আমানত রাখো। আগামী কাল তোমার কাছ থেকে এটি ফিরে নেব এবং তোমার সুন্দর দেখে একটি নাম রেখে দেব।' কুকুর মাংস নিয়ে ফিরে গেল। অতঃপর যখন সে ক্ষুধা অনুভব করল, তখন মাংস খণ্ডটির দিকে তাকিয়ে জিভে জল ফেলতে লাগল। খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও নাম পাল্টাবার কথা স্মরণ ক'রে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু এক পর্যায়ে যখনই তার প্রকৃতিতে লালসার উদ্রেক হল, তখনই তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল ও মনে মনে বলল, 'ভাল নাম নিয়েই বা আর কী হবে? কুকুরও তো ভাল নাম!' এই পরেই সে মাংস খণ্ডটি খেয়ে ফেলল। যারা স্বার্থের খাতিরে নিজেদের হীন চরিত্র বদলাতে পারে না, এমন অসচ্চরিত্র, লোভী ও নীচমনাদের উদাহরণ এটাই।
📄 সরব না হলে মার খেতে হয়
সদ্য বিবাহিত কালুর ইচ্ছা হল শ্বশুরবাড়ি যাবে। বউ ছিল সেখানেই। দূর পথে বাসে-ট্রেনে যেতে যেতে রাত হয়ে গেল। লাস্ট-বাস ফেল হয়ে গেলে পায়ে হেঁটে যেতে যেতে রাত্রি গভীর হয়ে গেল। গ্রামে যখন পৌঁছল, তখন কেউ কোত্থাও জেগে নেই। শ্বশুরবাড়ির দরজার কাছে পৌঁছে ভাবল, এত রাত্রে সে আর ডাকাহাঁকি করবে না। ঘুম থেকে জাগিয়ে বাড়ির লোককে আর কষ্ট দেবে না। স্থির করল, কোন রকম বাড়ির ভিতরে প্রবেশ ক'রে সরাসরি স্ত্রীর রুমে গিয়ে খেয়ে-না খেয়ে শুয়ে পড়বে।
কিন্তু ভিতর থেকে সদর দরজা বন্ধ ছিল। ভিতরে যাবে কীভাবে? বাড়ির ভিতরে একটি আমড়ার গাছ ছিল। গাছটি বেশ বড়। তারই একটি ডাল পাঁচিলের বাইরে ঝুলছিল। ভাবল, এই ডাল ধরে উঠে ভিতরে যাবে। রাতের ভয় ও স্ত্রীর ভালোবাসা তাকে আকর্ষণ করছিল ভিতরের দিকে। অন্য কিছু না ভেবেই ডাল ধরে পাঁচিল টপকে ধুপ্ ক'রে ভিতরে পড়ল।
ঘরের দাওয়ায় শাশুড়ী শুয়ে ছিল। শব্দ শুনে জেগে উঠে অন্ধকারে পাঁচিলের গায়ে মানুষ দেখে চিৎকার শুরু ক'রে দিল, 'চোর-চোর-চোর! ওরে আলোয়ান! ওরে হালোয়ান! ওরে পালোয়ান! তোরা ছুটে আয় রে! ঘরে চোর ঢুকেছে।' তিন তিনটি জোয়ান বেটা তড়িঘড়ি আঙিনায় নেমে এসে বলল, 'কই মা কই?' ---ঐ দ্যাখ, পাঁচিলের ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছে। 'মার শালাকে' বলে তিনজনে ঝাঁপিয়ে পড়ে অন্ধকারে শুরু ক'রে দিল কিল-ঘুসি। কালু লজ্জায় মুখ খুলল না। আর অন্ধকারে তারা তাদের জামাইকে চিনতেও পারল না।
ইতিমধ্যে তার স্ত্রী বাইরে এসে বলে উঠল, 'কোন্ মুখপোড়া চোর দাদা! মেরে ওর মুখটা থেঁতলে দাও।' কালু মনে মনে বলল, 'ও বাব্বা! আমার বউও আমার মুখ থেঁতলে দিতে বলছে?!' ইতিমধ্যে শাশুড়ীর মনে দয়ার উদ্রেক হল। সে একটি হ্যারিকেন নিয়ে তাদের কাছে এসে বলল, 'আর মারিস না বাবা! এবার ওকে ছেড়ে দে।' আবার বউ বলে উঠল, 'ছেড়ে দেবে কেন? ওকে বেঁধে রেখে পুলিশের হাওয়ালা ক'রে দাও।' কিন্তু শাশুড়ীর হাতের আলো যখন তার মুখে পড়ল, তখন দূর থেকে দেখে তার বউয়ের সন্দেহ হল, সে হয়তো তার বর। কাছে এসে দেখে চিনতে পেরে কেঁদে উঠল। তা দেখে সবাই অবাক। এ কী হয়ে গেল? কেন এতো মার খেলে তুমি? কেন বললে না, 'ওগো আমি চোর নই, আমি তোমাদেরই আপনজন।' সবাই ক্ষমা চাইল। শাশুড়ী বলল, 'মুখে কথা বললে তো মারটা খেতে হতো না বাবা!' বলা বাহুল্য, যেখানে পরিচয়হীনতার জন্য মানুষ অত্যাচারিত হয়, সেখানে তাকে সরব হতে হয়, নচেৎ মুখ বুজে কেবল মারই খেতে হয়।