📄 পাথর ক্ষয়
এক ছেলে মাদ্রাসায় পড়ত। যা পড়ত, তা মুখস্থ করতে পারত না। মুখস্থ করত আর ভুলে যেত। এতে সে মনে মনে খুব বিরক্ত হত। আফসোস করত আর দুঃখিত হত।
একদিন সে আক্ষেপে মাদ্রাসা ছেড়ে পালিয়ে গেল। কিন্তু লেখাপড়া না করলে জীবন যে বৃথা। কোথায় যাবে, কী করবে সে? মনের দুঃখে সে বাড়ি ফিরছিল। পথে পিপাসা লাগলে একটি কুয়ায় পানি খেতে গেল। সে কুয়াতলায় একটি পাথর দেখতে পেল। দেখল, পাথরটি ক্ষয় হয়ে খাল হয়ে গেছে। কারণ বিবেচনা করে জানতে পারল, মাটির কলসির ঘসা লেগে পাথরটি ক্ষয় হয়ে গেছে।
তার উদ্বিগ্ন মনে চিন্তা এল, মাটির কলসির ঘর্ষণে পাথর ক্ষয়ে যায়, তার মানে দুর্বল হয়েও বারবার চেষ্টার ফলে কঠিনকে সহজ করা যায়। তাহলে আমার ব্রেন কেন ক্ষয় হবে না?
সুতরাং সে মাদ্রাসায় ফিরে গেল এবং মেহনত সহকারে পড়াশোনা করতে লাগল। একদিন সে বড় আলেম হয়ে প্রসিদ্ধি লাভ করল।
জ্ঞানীর পরিশ্রমের কথা স্মরণ রাখতে হবে এবং তোমাকেও তার মত পরিশ্রম করতে হবে।
📄 বড় হয়ে কী হব?
খোকন মায়ের কোলে বসে ছোট মুখে বড় বড় প্রশ্ন করছিল। বড় হলে আমি কী হব? কী করব? তবে যা হব ভালো হব। তার পরিমণ্ডলে নানা মানুষের নানা কর্ম দেখে তার শিশু-মনেও শুরু হয়েছিল ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।
খোকন: মা! আমি বড় হলে ডাক্তার হব, মানুষের সেবা করব এবং বিনা পয়সায় গরিবদের চিকিৎসা করব।
মা: আমার মনে হয়, তা তুমি পারবে না বাবা! কারণ, বড় হয়ে তোমার মনেও অর্থের লোভ আসবে। আর তখন মানুষের সেবার কথা ভুলে যাবে। গরিবদের অসহায়তার কথা বিস্মৃত হবে। অধিক অর্থোপার্জনের জন্য ওষুধে ভেজাল দেবে।
খোকন: তাহলে আমি মাস্টার হব এবং ভালো মানুষ তৈরি করার জন্য ছেলে পড়াব।
মা: তাও হয়তো তুমি পারবে না সোনা! কারণ, মাস্টার হওয়ার পর তুমি তোমার দায়িত্বের কথা ভুলে যাবে। মানুষ গড়ার কথা বিস্মৃত হয়ে নিজের বিলাসী জীবন গড়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়বে।
খোকন: তাহলে আমি বড় ব্যবসায়ী হব। অনেক লাভ করে গরিবদেরকে অর্থদান করব।
মা: তাতেও তুমি অর্থলোলুপ অসাধু মানুষ হয়ে উঠবে। মানুষকে ঠকিয়ে, মিথ্যা বলে, পণ্যদ্রব্যে ভেজাল দিয়ে, অবৈধ জিনিসের ব্যবসা ক'রে কেবল অর্থ-চিন্তায় ব্যাকুল থাকবে। আর দুঃখী-দরিদ্রদের কথা ভুলেই যাবে।
খোকন: তাহলে আমি সরকারী অফিসার হব এবং দেশ ও দশের সেবা করব।
মা: খুব ভাল কথা। কিন্তু আমার ধারণা, তাও তুমি পারবে না বাবা! কারণ, তখন তুমি দেশ ও দশের সেবা ভুলে নিজের দশা দোরস্ত করতে অর্থের দাসত্ব করবে। লোকের কাছে ঘুস খাবে। কর্তব্যে ফাঁকি দেবে। নানা অজুহাতে অফিস কামাই করবে। আর আত্মসেবা করবে।
খোকন: তাহলে আমি পুলিশ হব। অন্যায়-অবিচার, অপরাধ ও দুর্নীতি দমন করব।
মা: তুমি পারবে বলে মনে হয় না। কারণ, পুলিশের ইউনিফর্ম গায়ে পরলে এবং কোমরে পিস্তল ঝুলালেই তোমার মাঝে অহংকার আসবে, অনেক সময় অন্ধভাবে নির্দোষের প্রতি অত্যাচার চালাবে, ঘুস খেয়ে অপরাধীকে বেকসুর খালাস ক'রে দেবে।
খোকন: তাহলে আমি উকিল হয়ে ন্যায় বিচারে সহযোগিতা করব।
মা: তখন তুমি তা ভুলে যাবে। তোমার উকালতির পেশা কেবল টাকার নেশাতে পরিবর্তিত হবে। ন্যায়-অন্যায় না দেখে তুমি কেবল নিজের মুয়াক্কেলের মামলা জিততে চাইবে।
খোকন: তাহলে আমি বড় জননেতা হব। দেশ ও জাতির সেবা করব। দেশে-বিদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করব।
মা: সে হওয়া তো আরো কঠিন বাবা! জননেতা হয়ে জনসেবা বাদ দিয়ে ধনসেবা করবে। নিজের পদ ও গদি টিকিয়ে রাখার জন্য কত শত জাল-জুচ্চোরি করবে, দুর্নীতি করবে, অত্যাচার করবে। অন্যায়ভাবে সাম-দান-ভেদ-দণ্ডের রাজনীতি প্রয়োগ করবে। ক্ষমতার অহংকার তোমাকে অন্ধ ক'রে ফেললে প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি অন্যায়াচরণ করবে।
খোকন: মা! তাহলে আমি হবটা কী? আমি কি কিছুই হতে পারব না?
মা: অবশ্যই পারবে। তবে অন্য কিছু হওয়ার আগে তোমাকে 'মুসলিম' হতে হবে।
খোকন: কিন্তু আমরা তো মুসলিম!
মা: নামের 'মুসলিম' নয় বাবা, কামের 'মুসলিম'। 'মুসলিম' যাকে বলে, সেই মুসলিম। বড় হয়ে যদি প্রকৃত মুসলিম হও, তাহলে তোমার সকল আশা পূর্ণ হবে। কারণ, 'মুসলিম' হল প্রত্যেক ব্যক্তিত্বের আদর্শ।
খোকন: তাহলে আমি আগে তাই হব মা!
মা: হ্যাঁ বাবা! তাই হও। আল্লাহ তোমাকে তওফীক দিন।
📄 সর্বাধিক সম্মানীয় কে?
খলীফা হারুনুর রশীদের দুই পুত্র; আমীন এবং মামুন। দুজনই ইমাম কাসায়ী (রহ.)-এর ছাত্র ছিল। একবার তাদের ওস্তাদ মজলিস থেকে উঠলেন। দেখেই দুই ভাই ওস্তাদের জুতা সোজা করার জন্য উদ্যত হলো। দু'জনের মধ্যে তর্ক হয়ে গেল, কে জুতা সোজা করবে বলে। শেষে দু'জনে এই সিদ্ধান্তে একমত হলো যে, প্রত্যেকে একটি করে জুতা সোজা ক'রে দেবে!
এই ঘটনা যখন হারুনুর রশীদের কানে গেল, তখন তিনি ইমাম কাসায়ী (রহ.)-কে ডেকে পাঠালেন। উনি যখন এলেন, তখন খলীফা বললেন, 'মানুষের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানীয় ব্যক্তি কে?' ইমাম কাসায়ী (রহ.) উত্তরে বললেন, 'আমার মতে আমীরুল মুমেনীন অপেক্ষা আর কে বেশি সম্মানীয় ব্যক্তি হতে পারে?'
খলীফা বললেন, সম্মানীয় ব্যক্তি তো তিনিই, যিনি মজলিস থেকে উঠলে, খলীফার দুই পুত্র তাঁর জুতা সোজা করার জন্য পরস্পরের মাঝে তর্ক করে, কে জুতা সোজা করে দেবে বলে।
ইমাম কাসায়ী (রহ.) ভেবেছিলেন, হয়তো খলীফা ঐ ঘটনায় অসন্তুষ্ট হয়েছেন। সেই জন্য তিনি নিজের দোষ-মুক্তির কথা বলেছিলেন।
কিন্তু খলীফা বললেন, 'শুনুন! আপনি যদি আমার পুত্রদ্বয়কে ঐ রকম আদব ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে নিষেধ করতেন, তাহলে আমি আপনার প্রতি খুব বেশি অসন্তুষ্ট হতাম। আগামীতে এই শিক্ষা অব্যাহত রাখবেন, নইলে আপনি আমার অসন্তুষ্টি ও ক্ষোভের শিকার হবেন!'
এমন অপ্রত্যাশিত শ্রদ্ধাবাক্যে ইমাম কাসায়ী মনে মনে আনন্দিত ও বিস্মিত হলেন। তিনি কিছু বলতে যাওয়ার আগেই খলীফা আরো বললেন, 'শুনুন! কোন ব্যক্তি বয়সে যতই বড় হোক, কিংবা বিদ্যা ও মর্যাদায় যতই বড় হোক, তিন জনের সম্মুখে তারা কেউ বড় হতে পারে না। এক: বিচারক, দুই: ওস্তাদ, আর তিন: নিজের পিতা-মাতার সম্মুখে।
📄 দুঃখ ছাড়া কি সুখলাভ হয়?
কাজলা দিঘির পানিতে পদ্মফুল ফুটে থাকতে দেখে নাবীল তার বন্ধু অসীমকে বলল, 'ঐ সুন্দর ফুলটি আমি পেতে চাই।'
নাবীল বলল, 'নেমে পড় পানিতে। আর মনে রেখো, পদ্ম কাঁটা আছে।'
অসীম বলল, 'থাক তাহলে দরকার নেই।'
নাবীল বলল, 'কিছু পেতে হলে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।' "কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে, দুখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহিতে?"