📄 রূপ নয়, গুণ চাই
বাগদাদের বাদশা হারুন রশীদের অনেক ক্রীতদাসী ছিল। দাস-প্রথা হিসাবে দাসী-বৃত্তির কর্ম-ব্যস্ততার পর তারা স্ত্রীর মত মালিকের শয়ন-শয্যায় স্থান পেত। তাঁর সুন্দর সুন্দর দাসীদের মধ্যে অন্য একটি দাসী ছিল কৃষ্ণকায় কুশ্রী। কিন্তু তিনি সেই কালুনীকেই বেশি ভালবাসতেন। হাসিতে-খুশিতে, হর্ষে-বিষাদে সেই কালুনীই তাঁর পাশে পাশে থাকত। তা দেখে সুন্দরীদের হিংসা হল। বাদশার কাছে সে অস্বাভাবিক ভালবাসার কারণ জানার ইচ্ছা করল তারা। একদা অভিমান-ভরা হৃদয় নিয়ে রূপের ঝলক ও সুমধুর হাসির বেদনা-ভরা ভাষা দিয়ে সে কথার ভূমিকা শুরু করল। বলল, 'হুজুর! আমরা এত সুস্বাস্থ্যবতী রূপসী থাকা সত্ত্বেও আপনি ঐ কুৎসিত কালুনীকে কেন বেশি ভালবাসেন?'
নিঃসন্দেহে বাদশার চোখের কোন দোষ ছিল না। তা জেনেই তারা প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের আশায় এই আর্জি পেশ করল। বাদশা বললেন, 'সে কথা জানার যদি তোমাদের একান্তই আগ্রহ থাকে, তাহলে আজ নয়, পরে জানাব।' দাসীরা সে প্রস্তাব মেনে নিয়ে অধীর অপেক্ষায় কালাতিপাত করতে লাগল।
হঠাৎ একদিন কোন উপলক্ষ্যে সকল বিবিকে উপহার দেওয়ার মানসে একটি বৃহৎ কক্ষ সুসজ্জিত করালেন। কক্ষের শেষের দিকে এক-একটি বাক্সতে নানা গয়না ও উপহার-সামগ্রী রাখা করালেন।
অতঃপর স্ত্রীদের সকলকে ডেকে বললেন, 'কক্ষের শেষ প্রান্তে তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি ক'রে বাক্স রাখা আছে, তাতে নানা রকম উপহার ও গয়না আছে। তোমাদের মধ্যে ছুটে গিয়ে যে যেটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেবে, সেটা হবে তারই।'
যথাসময়ে প্রতিযোগিতার দৌড় শুরু হল। রাজার আদেশ মত ছুট দিয়ে প্রত্যেকে এক একটি বাক্সে হাত দিয়ে বলল, 'এটা আমার, এটা আমার।'
কিন্তু কালুনী ছুটে গিয়ে বাক্সে হাত না দিয়ে রাজার কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তা দেখে সবাই তাকে ধিক্কার দিয়ে বলতে লাগল, 'এখানে ঠাকুরের মত দাঁড়িয়ে রইলি, অলংকার ও উপহার তো পেলি না।'
মৃদু হাস্য ক'রে সে বলল, 'তোরা ছুটে গিয়ে এক একটি বাক্সে হাত দিয়ে কিছু অলংকার ও উপহার পেয়েছিস। আর আমি যে বাক্সে হাত দিয়ে আছি, সে বাক্স লাভ ক'রে তোরা-সহ গোটা বাগদাদ লাভ করেছি।'
এ জবাবে তারা সবাই অবাক হল। তারা নিজেরাই অনুমান করল যে, এই কারণেই বাদশা ওকে বেশি ভালবাসেন।
বাদশা বললেন, 'এখন তোমরা তোমাদের সেই প্রশ্নের উত্তর পেলে, যা ঈর্ষাবশতঃ কয়েকদিন আগে আমাকে করেছিলে।'
লজ্জায় সকলের মাথা হেঁট হয়ে গেল। তারা কালুনীকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারল না।
কালুনীর রূপ ছিল না, কিন্তু গুণ ছিল। আর তার জন্যই সে বাদশার নিকট আদরিণী ছিল। আসল সৌন্দর্য রূপে নয়, আসল সৌন্দর্য থাকে গুণে। আর জ্ঞানীরা তা জ্ঞানচক্ষুতে অবলোকন ক'রে থাকেন।
'গুণবান হইলে মান সব ঠাঁই, গুণহীনের সমাদর কোনখানে নাই।'
📄 রূপ না থাকলে গুণ থাক
আফলাতুন হাকীম একদা দেখলেন, একটি কুশ্রী বালক একজন সুশ্রী বালককে গালিমন্দ করছে। তিনি তাকে এমন ব্যবহার প্রদর্শন করতে নিষেধ করলেন। কুশ্রী বালকটি বলল, 'কেন? আদব ও ক্ষমাশীলতা কি কিছু লোকের জন্যই খাস?'
তিনি বললেন, 'অবশ্যই না। আসলে প্রত্যেক মানুষের উচিত, তার নিজের চেহারা আয়নায় দেখা। অতঃপর তা সুন্দর দেখলে ঐ সৌন্দর্যে কোন নোংরামির আবিলতা মিশ্রিত না করা। আর কুশ্রী দেখলে তার উচিত, দুই প্রকার শ্রীহীনতাকে একত্রিত না করা।'
📄 উত্থান-পতন
এক দম্পতি মাংস দিয়ে খানা খাচ্ছিল। এমন সময় দরজায় এক ভিক্ষুক এল। স্বামীর হুকুমে স্ত্রী উঠে গিয়ে ভিক্ষুককে তাড়িয়ে এল। কিছু দিন পর মনোমালিন্য হয়ে এই স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটল। অতঃপর ঐ মহিলার পুনর্বিবাহ হল। একদিন সে তার স্বামীর সঙ্গে মাংস নিয়ে খানা খেতে বসেছে, এমন সময় দরজায় ভিখারীর আকুল আবেদন এল, 'কে আছ মাগো! এক মুঠো খেতে পাওয়া যাবে?'
স্বামী হুকুম করল, এই মাংস সহ খানা ভিক্ষুককে দিয়ে এসো। স্ত্রী তা দিয়ে এসে স্বামীর সামনে কান্না আর রোধ করতে পারল না।
স্বামী বলল, 'কী ব্যাপার, তুমি কাঁদছ কেন? আমরা তো আল্লাহর দেওয়া রুযী থেকে আল্লাহরই পথে ব্যয় করলাম।'
স্ত্রী বলল, 'তা তো ঠিক। কিন্তু ভিক্ষুকটা কে জানো? আমার প্রথমকার স্বামী! ঐ একদিন এক ভিক্ষুককে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দিতে বলেছিল। কিন্তু আজ সে নিজেই ভিখারী!'
স্বামী বলল, 'ওহো! তাই বুঝি? আর তোমাদের ঐ বিতাড়িত ভিক্ষুক কে ছিল তা জানো? তোমার বর্তমান স্বামী, আমিই! আল্লাহ যাকে যখন ইচ্ছা ধনী-গরিব করে থাকেন।'
📄 বুদ্ধি থাকলে উপায় হয়
একদিন একটি কাককে খুব পিপাসা লাগল। সে পানির খোঁজে বের হয়ে কোথাও পানি পেল না। অবশেষে দেখল একটি কলসির ভিতরে পানি আছে। কিন্তু কলসির মুখ সরু হওয়ার কারণে সে নিজের দেহ গলিয়ে পানির নাগাল পেল না। পিপাসার তাড়নায় সে ছটফট করছিল। ঐ পানি সে কীভাবে পেতে পারে তাই চিন্তা করতে লাগল। হঠাৎ তার মাথায় একটি বুদ্ধি খেলল। অনতি দূরে কিছু পাথর পড়ে ছিল। পাথরের ছোট ছোট টুকরা সে নিজের ঠোঁটে করে বয়ে এনে কলসির মধ্যে ফেলতে লাগল। আর তার ফলে কলসির পানি উপরে উঠে এল এবং সে তা পান করে প্রাণ বাঁচাল। কথায় বলে, বুদ্ধি থাকলে উপায় হয়।