📄 আশার নেশা
এক আশাবাদী ব্যক্তি বাসনার বড় স্বপ্ন দেখতে দেখতে হাটে যাচ্ছিল। মাথায় ছিল মাটির কলসি ভরা মধু। বড় সুখের বাসনায় সে মনে মনে পরিকল্পনা শুরু করল; বলল, 'মধুর কলসিটিকে ১০ দিরহামে বিক্রি ক'রে ৫টি ছাগল কিনব। সেগুলি বছরে ২বার বিয়বে। ২ বছরে ২০টি ছাগল হবে। তখন প্রত্যেক ৪টির বিনিময়ে ১টি করে (মোট ৫টি) গরু কিনব। সেখান হতে আমার অর্থ বৃদ্ধি পাবে। কিছু জমি কিনে চাষ শুরু করব। তারপর সুন্দর একটি ঘর বানাব। ঘরে দাস-দাসী রাখব। সুন্দরী দেখে একটি বিয়ে করব। আমার ছেলে হবে, তার নাম রাখব 'রাজা'। তাকে উত্তম আদব শিক্ষা দেব। সে আমার কথা না মানলে লাঠি ক'রে মেরে শিক্ষা দেব।'
লোকটির হাতে ১টি লাঠি ছিল। কীভাবে ছেলেকে মারবে, তা দেখতে গিয়ে মনের আবেগে লাঠি তুলল উপরে। আঘাত লাগল মাথার উপরে মাটির কলসিতে। ভেঙে গেল কলসি। মাথায় বয়ে গেল মধু। মনের আশা থেকে গেল মনের গহীন কোণেই। আসলে কোন কিছুর আশা করলেও তার নেশা হওয়াটা বড় ক্ষতিকর।
📄 গোপনীয় কথা
বড় মানুষের সাথে গোপন কথা আর কী হবে? একদা এক ব্যক্তি আব্দুল মালেক বিন মারওয়ানের নিকট এসে গোপনে কিছু বলতে চাইল। তিনি বললেন,
'তুমি আমার প্রশংসা করবে না। কারণ আমি নিজের ব্যাপারে খুব ভালো জানি। মিথ্যা বলবে না। কারণ মিথ্যুকের কোন রায় নেই। আর আমার কাছে কারো গীবত করবে না।'
লোকটি বলল, তাহলে আমাকে চলে যেতে অনুমতি দিন, হে আমীরুল মুমিনীন!
📄 মানুষ চেনার উপায়
এক ব্যক্তি হযরত উমার-কে বলল, 'অমুক লোকটা বড় খাঁটি লোক।' তিনি বললেন, 'তা তুমি কীরূপে জানলে? ওর সাথে কোন সময় সফর করেছ?' লোকটি বলল, 'জি, না।' তিনি বললেন, 'তোমার ও ওর মাঝে কোনদিন তর্ক বা মতবিরোধ হয়েছিল?' সে বলল, 'জি, না।'
তিনি বললেন, 'ওর কাছে কোনদিন কিছু আমানত রেখেছিলে?' সে বলল, 'জি, না।'
তিনি বললেন, 'তাহলে ওর সম্পর্কে তুমি কিছুই জান না। আমার মনে হয়, তুমি ওকে মসজিদে মাথা হিলাতে দেখেছ!'
📄 রূপ নয়, গুণ চাই
বাগদাদের বাদশা হারুন রশীদের অনেক ক্রীতদাসী ছিল। দাস-প্রথা হিসাবে দাসী-বৃত্তির কর্ম-ব্যস্ততার পর তারা স্ত্রীর মত মালিকের শয়ন-শয্যায় স্থান পেত। তাঁর সুন্দর সুন্দর দাসীদের মধ্যে অন্য একটি দাসী ছিল কৃষ্ণকায় কুশ্রী। কিন্তু তিনি সেই কালুনীকেই বেশি ভালবাসতেন। হাসিতে-খুশিতে, হর্ষে-বিষাদে সেই কালুনীই তাঁর পাশে পাশে থাকত। তা দেখে সুন্দরীদের হিংসা হল। বাদশার কাছে সে অস্বাভাবিক ভালবাসার কারণ জানার ইচ্ছা করল তারা। একদা অভিমান-ভরা হৃদয় নিয়ে রূপের ঝলক ও সুমধুর হাসির বেদনা-ভরা ভাষা দিয়ে সে কথার ভূমিকা শুরু করল। বলল, 'হুজুর! আমরা এত সুস্বাস্থ্যবতী রূপসী থাকা সত্ত্বেও আপনি ঐ কুৎসিত কালুনীকে কেন বেশি ভালবাসেন?'
নিঃসন্দেহে বাদশার চোখের কোন দোষ ছিল না। তা জেনেই তারা প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের আশায় এই আর্জি পেশ করল। বাদশা বললেন, 'সে কথা জানার যদি তোমাদের একান্তই আগ্রহ থাকে, তাহলে আজ নয়, পরে জানাব।' দাসীরা সে প্রস্তাব মেনে নিয়ে অধীর অপেক্ষায় কালাতিপাত করতে লাগল।
হঠাৎ একদিন কোন উপলক্ষ্যে সকল বিবিকে উপহার দেওয়ার মানসে একটি বৃহৎ কক্ষ সুসজ্জিত করালেন। কক্ষের শেষের দিকে এক-একটি বাক্সতে নানা গয়না ও উপহার-সামগ্রী রাখা করালেন।
অতঃপর স্ত্রীদের সকলকে ডেকে বললেন, 'কক্ষের শেষ প্রান্তে তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি ক'রে বাক্স রাখা আছে, তাতে নানা রকম উপহার ও গয়না আছে। তোমাদের মধ্যে ছুটে গিয়ে যে যেটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেবে, সেটা হবে তারই।'
যথাসময়ে প্রতিযোগিতার দৌড় শুরু হল। রাজার আদেশ মত ছুট দিয়ে প্রত্যেকে এক একটি বাক্সে হাত দিয়ে বলল, 'এটা আমার, এটা আমার।'
কিন্তু কালুনী ছুটে গিয়ে বাক্সে হাত না দিয়ে রাজার কাঁধে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তা দেখে সবাই তাকে ধিক্কার দিয়ে বলতে লাগল, 'এখানে ঠাকুরের মত দাঁড়িয়ে রইলি, অলংকার ও উপহার তো পেলি না।'
মৃদু হাস্য ক'রে সে বলল, 'তোরা ছুটে গিয়ে এক একটি বাক্সে হাত দিয়ে কিছু অলংকার ও উপহার পেয়েছিস। আর আমি যে বাক্সে হাত দিয়ে আছি, সে বাক্স লাভ ক'রে তোরা-সহ গোটা বাগদাদ লাভ করেছি।'
এ জবাবে তারা সবাই অবাক হল। তারা নিজেরাই অনুমান করল যে, এই কারণেই বাদশা ওকে বেশি ভালবাসেন।
বাদশা বললেন, 'এখন তোমরা তোমাদের সেই প্রশ্নের উত্তর পেলে, যা ঈর্ষাবশতঃ কয়েকদিন আগে আমাকে করেছিলে।'
লজ্জায় সকলের মাথা হেঁট হয়ে গেল। তারা কালুনীকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারল না।
কালুনীর রূপ ছিল না, কিন্তু গুণ ছিল। আর তার জন্যই সে বাদশার নিকট আদরিণী ছিল। আসল সৌন্দর্য রূপে নয়, আসল সৌন্দর্য থাকে গুণে। আর জ্ঞানীরা তা জ্ঞানচক্ষুতে অবলোকন ক'রে থাকেন।
'গুণবান হইলে মান সব ঠাঁই, গুণহীনের সমাদর কোনখানে নাই।'