📄 হারানো মুদ্রা-কলস
এক ব্যক্তি লম্বা সফরে বিদেশে গিয়েছিল। তখনকার যুগে কোন ব্যাংক ছিল না। সুতরাং জমানো স্বর্ণ বা রৌপ্য-মুদ্রা কলসে ভরে মাটিতে পুঁতে গোপন রাখতে হতো। সে তাই করেছিল। তার বাড়ির বাগানের একটি জায়গায় মুদ্রার কলসটি পুঁতে রেখেছিল। কিন্তু বহু দিন পর ফিরে এসে সেই জায়গাটি আর মনে পড়ছিল না। তার উপার্জিত ধন হারিয়ে যাবে, তা কীভাবে হয়? তার চলবে কীভাবে? সুতরাং সে এক সময় ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর নিকট কোন ব্যবস্থা নিতে উপস্থিত হল। যদিও এটি কোন দ্বীনী মসলা ছিল না, তবুও জ্ঞানী ভক্তিভাজনের কাছে দুনিয়াবী সমস্যার কথাও জানানো হয়। সে বলল, 'জনাব! আমি আমার মুদ্রার কলসটি কোথায় পুঁতে রেখেছি, তা মনে পড়ছে না। এখন আমি কী করতে পারি?'
বিচক্ষণ ইমাম চট্ ক'রে বললেন, 'তুমি আজ সারা রাত নামায পড়ো।' লোকটি অবাক হয়ে বলল, 'জনাব! মুদ্রার কলসের সাথে নামাযের কী সম্পর্ক?' তিনি বললেন, 'আমি যা বললাম, তাই করো। তারপর সকালে এসে ফলাফল বলো।' লোকটি নিরাশ মনেও আশাবাদী হয়ে ফিরে গেল। এশার নামাযের পর শুরু করল নফল নামায পড়তে। কিন্তু কী আশ্চর্য! এক রাকআত শেষ হতে না হতেই তার সেই জায়গাটির কথা মনে পড়ে গেল, যেখানে সে কলসটি পুঁতে রেখেছিল। সুতরাং দু'রাকআত কোন রকমভাবে শেষ ক'রে কোদাল নিয়ে ছুটল সেই জায়গার দিকে। কিছু খুঁড়তেই বের হয়ে এল মুদ্রার সেই কলস! সে যে কী খুশি! তাকে আর নামায পড়তে হল না। লোকটা বড় অবাক হল, নামাযের এত বড় ক্ষমতা? ফজরের নামায পড়েই সে ইমাম সাহেবের সঙ্গে দেখা ক'রে বলল, 'দারুণ প্রেসক্রিপশন হুজুর! এক রাকআত শেষ না হতেই মনে পড়ে গেল!' ইমাম সাহেব বললেন, 'আমি জানতাম, শয়তান তোমাকে সারা রাত নামায পড়তে দেবে না।' তার মানে শয়তান জরুরি জিনিস ভুলিয়ে দেয়, যাতে মানুষের ক্ষতি হয়, আবার জরুরি জিনিস মনেও পড়িয়ে দেয়, যদি তার মাধ্যমে মানুষের অধিকতর বড় ক্ষতি হয়। সে অনেক সময় মানুষের উপকার করে, কিন্তু তা কেবল তার ক্ষতি করার জন্য। এই জন্য নামাযের মধ্যে অনেক বিস্মৃত কথা সে মনে পড়িয়ে দেয়।
📄 শয়তানের কাজ
এক ছাত্র তার উস্তাদকে জিজ্ঞাসা করল, 'হযরত! শয়তানের কাজ কেমন?' উস্তাদ বললেন, 'শয়তানের কাজ ছোট্ট কিছু লাগিয়ে দেওয়া।' ---জি! বুঝলাম না। ---সে সামান্য কিছু দিয়ে লাগিয়ে দেয়। অতঃপর তার থেকে শুরু হয় বিরাট হাঙ্গামা। যেমন ছোট্ট একটি অঙ্গার টুকরা একটি গ্রাম বা শহর বা বিরাট জঙ্গলকে ছারখার করতে পারে, তেমনি শয়তানের সামান্য চক্রান্তও বিরাট ধ্বংস-লীলা আনতে পারে। চল মিষ্টির দোকানে গিয়ে তোমাকে শয়তানের লীলা দেখাই।
উস্তাদ-ছাত্র মিলে একটি মিষ্টির দোকানে বসে মিষ্টি খেতে লাগল। খেতে খেতে উস্তাদ মিষ্টির একটু রস লাগিয়ে দিলেন দেওয়ালে। ক্ষণেক পর ঐ রসে কিছু মাছি এসে বসল। তা দেখে টিকটিকি এল মাছি ধরতে। ইত্যবসরে এক ক্রেতার পোষা কুকুর সেই টিকটিকিকে ধরতে লাফ মারল। কিন্তু ঘুরে পড়ে গেল মিষ্টির গামলায়। তা দেখে ময়রা চিৎকার করে কুকুরটিকে মারতে শুরু করল। তা দেখে কুকুর-ওয়ালা বাধা দিলে বাগবিতণ্ডা হতে হতে হাতাহাতি, লাঠালাঠি ও শেষে থানা-পুলিশ হয়ে গেল।
বলা বাহুল্য, দেওয়ালে মিষ্টির রস লাগানোর মত ছোট্ট কাজ ঐ শয়তানের। কিন্তু জ্ঞানীরা যদি ধৈর্যের সাথে শুরুতেই শয়তানের চক্রান্তকে প্রতিহত করে, তাহলে এত বাড়াবাড়ি আর হয় না।
📄 লোকের সমালোচনা
একদা লোকমান হাকীম তাঁর পুত্র সহ একটি গাধার পিঠে চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে কতক লোক বলতে লাগল, 'লোকটা কত নিষ্ঠুর! একটি গাধার পিঠে দু' দু'টো লোক!'
এ কথা শুনে হাকীম নেমে হাঁটতে লাগলেন। কিছু দূর পরে আরো কিছু লোক তাঁদেরকে দেখে বলে উঠল, 'ছেলেটি কত বড় বেআদব! বুড়োটাকে হাঁটিয়ে নিজে সওয়ার হয়ে যাচ্ছে!'
এ কথা শুনে ছেলেটি নেমে এল এবং হাকীম সওয়ার হলেন। আরো কিছু দূর পর কিছু লোক বলতে লাগল, 'বুড়োটির কী আক্কেল! নিজে গাধার পিঠে চড়ে বাচ্চাটিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে!'
এ কথা শুনে তিনিও গাধার পিঠ থেকে নেমে হাঁটতে লাগলেন। কিছু পরে আরো কিছু লোক সমালোচনার সুরে বলল, 'লোক দু'টো কী বোকা! সঙ্গে সওয়ার থাকতে পায়ে হেঁটে পথ চলছে!'
এবারে হাকীম তাঁর ছেলেকে বললেন, 'দেখলে বাবা! তুমি চাপলেও দোষ, আমি চাপলেও দোষ, দু'জনে চড়লেও দোষ, কেউ না চড়লেও দোষ। সুতরাং দুনিয়ার কাজে তুমি কারো সমালোচনায় কর্ণপাত করো না।' কারণ, লোকের খোঁটা থেকে বাঁচা কঠিন। নিজের বিবেকে কাজ ক'রে যাওয়া উচিত। হাথী চলতা রহেগা, কুত্তা ভুক্তা রহেগা।
📄 কুয়াতে বিড়াল মরা
এক ব্যক্তির বাড়ির কুয়াতে বিড়াল পড়ে মারা গেছে। তা কেউ খেয়াল করেনি। দু-তিন দিনের ভিতরে পানিতে গন্ধ সৃষ্টি হল। লোকটি ফতোয়া নিতে ছুটল ইমাম সাহেবের কাছে। বলল, 'হুজুর! আমার বাড়ির কুয়াতে বিড়াল পড়ে মারা গেছে, পানিতে দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এখন তাতে উযু-গোসল হবে কি?' হুজুর বললেন, 'না। ও পানি নাপাক হয়ে গেছে।' ---তাহলে উপায়? ---উপায়, চল্লিশ বালতি পানি তুলে ফেলতে হবে। ---তাহলে কুয়ার পানি পাক হয়ে যাবে? ---তাই তো হওয়ার কথা।
লোকটি বাড়ি ফিরে চল্লিশ বালতি পানি তুলে ফেলল। কিন্তু পানির দুর্গন্ধ দূর হল না। হুজুর কি ফতোয়া ভুল দিলেন নাকি? পরদিন সে আবার হুজুরের কাছে গেল এবং অবস্থা খুলে বলল। হুজুর বললেন, 'আবার চল্লিশ বালতি পানি তুলে ফেলতে হবে, তাহলে পাক হয়ে যাবে।'
লোকটি বাড়ি ফিরে তাই করল। কিন্তু যথা পূর্বং, তথা পরম্। সেই একই দুর্গন্ধ; বরং তার থেকেও বেশি। পরদিন আবার গেল হুজুরের কাছে। বলল, 'কেমন ফতোয়া হুজুর? পানির দুর্গন্ধ বেড়ে যায় বৈ কমে না!' হুজুর বললেন, 'আপনার বালতি ছোট না বড়?' ---বড় বালতি। ---গুনতে ভুল হয় না তো? ---মোটেই না। আমি তুলি, আমার স্ত্রী গনে। ---ঠিক আছে, আরও চল্লিশ বালতি পানি তুলে ফেলে দিন। এবার আশা করি পানি পাক হয়ে যাবে।
লোকটি তাই করল। কিন্তু কোন ফায়দা দেখল না। হুজুরের কাছে এসে বিরক্তি-সুরে বলল, 'কোন লাভ নেই হুজুর! আপনার ফতোয়ায় মনে হয় গলদ আছে!'
হুজুর রেগে গেলেন এবং লোকটির কুয়ো দেখতে চাইলেন। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, সাদা মতো পানির উপরে কী যেন ভাসছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, 'সাদা মতো ওটা কী?' ---কী জানি, মনে হয় বিড়ালটা হবে। ---আরে সে কী? আপনি বিড়াল আগে তুলে না ফেলেই বালতি-বালতি পানি তুলে ফেলে যাচ্ছেন? ---বিড়াল তুলে ফেলতে তো বলেননি হুজুর! ---বড় বোকা আপনি! সেটাও কি বলতে হতো? ---ভেঙে না বললে আমরা মূর্খ মানুষ বুঝব কীভাবে?
বলা বাহুল্য, ডাক্তার, মুফতী ও বিচারকের উচিত, অবস্থা ভালোভাবে বুঝে, ভেঙে বলে ব্যবস্থা দেওয়া। অন্যথা ব্যবস্থা নিষ্ফল হয় অথবা হিতে বিপরীত হয়। দ্বিতীয়তঃ যে পাপী তওবা করে, তার উচিত, আগে পাপ বর্জন করা। অবৈধ উপায়ে নেওয়া জিনিস তার মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া। অন্যথা তওবা কবুল হবে না। অন্তরে কপটতা গোপন রেখে কোন ঈমান গ্রহণযোগ্য নয়। হৃদয়ে ঘৃণা লুকিয়ে রেখে হাতে হাত মিলানো উপকারী নয়।