📄 এক পরহেযগার যুবক
পথ চলতে একটি যুবক বড় ক্ষুধার্ত ছিল। নদীতে নেমে উযূ করতে গিয়ে দেখতে পেল, একটি আপেল পানিতে ভেসে আসছে। সেটিকে তুলে সে খেয়ে ফেলল। কিন্তু পরক্ষণে তার বিবেক তাকে কামড় দিতে লাগল। ভাবল, এ আপেল তো কোন বাগান মালিকের। তার অনুমতি ছাড়া কেন সে খেয়ে ফেলল। কোন মুসলিমের মাল তার অনুমতি ছাড়া ভক্ষণ করা তো বৈধ নয়। সুতরাং সে নদীর উজান পথে চলতে শুরু করল। নিশ্চয় নদীর ধারে অবস্থিত কোন বাগান থেকে ঐ আপেলটি ভেসে এসেছে।
চলতে চলতে একটি বাগান দৃষ্ট হল। সেখানে প্রবেশ ক'রে মালিকের কাছে ওযর পেশ ক'রে বলল, 'জি! আমি আপনার বিনা অনুমতিতে আপনার বাগানের একটি আপেল খেয়ে ফেলেছি। তার জন্য আমি আপনার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী!'
বাগানের মালিকও পরহেযগার মানুষ। কিন্তু যুবকের এ পরহেযগারি দেখে সে বড় অবাক হল। প্রকৃতিগতভাবে সে যুবককে ভালোবেসে ফেলল। ক্ষণকাল নীরব থেকে মালিক বলল, 'তুমি আমার বিনা অনুমতিতে আমার বাগানের আপেল খেয়েছ, আর আমি তোমাকে ক্ষমা করব? কক্ষনো না। আমি কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করব!'
যুবক আরো ভয় পেয়ে গেল। সে বারবার ক্ষমা চাইতে লাগল। কিন্তু মালিক ক্ষমা না ক'রে নিজ বাসায় প্রবেশ করল। অতঃপর নামাযের জন্য বের হয়ে দেখল, সে তখনও বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আছে!
দেখা হতেই যুবক বলল, 'চাচাজি! আপনি আমার কাছে আপেলের দাম নিতে পারেন। কিন্তু আমার কাছে তো কোন দীনার-দিরহাম নেই। তার পরিবর্তে আমি আপনার বাগানে কাজ ক'রে দিতে পারি।
মালিক তার আচরণে মুগ্ধ হয়ে বলল, 'আমি শর্তসাপেক্ষে তোমাকে ক্ষমা করতে পারি।'
---বলুন কী শর্ত। ক্ষমা পাওয়ার জন্য আমি আপনার যে কোন শর্ত মেনে নিতে রাজি আছি।
---আমার একটা মেয়ে আছে, যে চোখে দেখে না, কানে শোনে না, মুখে বলে না এবং পায়ে হাঁটে না। তাকে তোমাকে বিয়ে করতে হবে।
যুবক মনে মনে ভাবল, এমন মেয়ে বিয়ে ক'রে তার লাভ কী? যাকে বিছানায় বসে খাওয়াতে হবে। তবুও শর্ত মানতে রাজি যখন হয়েছে, তখন তা করতেই হবে। সে বলল, 'আমি রাজি আছি।'
বিয়ের দিন হয়ে গেল। যুবক উপস্থিত হল, কিন্তু তার মনে কোন খুশির ঝিলিক ছিল না। বিয়ে হয়েও গেল।
বাসর রাতে কক্ষে প্রবেশ করতেই সে ঝিলিক তার মনের আকাশকে উজ্জ্বল ক'রে তুলল। তার স্ত্রী দরজার কাছে উঠে এসে তাকে সালাম দিল। কোন ত্রুটি নেই তার দেহাঙ্গে। সে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করল, 'তোমার কোন ত্রুটি নেই। তাহলে তোমার আব্বা আমাকে মিথ্যা বললেন কেন?' স্ত্রী বলল, 'আপনাকে অবাক করার জন্য। আর উনি মিথ্যা তো বলেননি। বাস্তবেই আমি কোন হারাম জিনিস চোখে দেখি না, কোন হারাম জিনিস কানে শুনি না, কোন হারাম কথা মুখে বলি না এবং কোন হারাম পথে পায়ে হাঁটি না। আমার আব্বা আমার উপযুক্ত বর খুঁজছিলেন। অতঃপর আপনি যখন একটি আপেল খেয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে এলেন, তখন তিনি ভাবলেন, যে যুবক অনুমতি ছাড়া পরের একটা আপেল খেয়ে আল্লাহকে এত ভয় করতে পারে, সে যুবক নিশ্চয় আমার মেয়ের ব্যাপারে অধিক ভয় করবে। তাই তিনি প্রস্তাব দিয়ে এই বিয়ে ঠিক করেছিলেন।'
বড় ভাগ্যবান সে যুবক, বড় ভাগ্যবতী সে যুবতী। কিছু দিন পর তাদের একটি সন্তান হল। তোমরা জানো কি, সে সন্তানের নাম কী? নু'মান, আবু হানীফা (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)।
📄 বিনয়ের নমুনা
একদা রাত্রে উমার বিন আব্দুল আযীযের নিকট এক মেহমান ছিল। তিনি কিছু লিখছিলেন। এমন সময় তেলের বাতি নিভুনিভু হল। মেহমানটি বলল, 'বাতিটা ঠিক ক'রে দিই।' তিনি বললেন, 'মেহমানকে কাজে লাগানো বা মেহমানের নিকট থেকে খিদমত নেওয়া আতিথেয়তা-বিরোধী।' মেহমান বলল, 'তাহলে চাকরকে জাগিয়ে দিই।' তিনি বললেন, 'ও এই মাত্র প্রথম ঘুমিয়েছে, ওকে জাগাও না।' অতঃপর তিনি নিজে উঠে গিয়ে বাতিতে তেল ভরে তা ঠিক ক'রে আনলেন।
মেহমানটি বলল, 'আপনি নিজে কষ্ট করলেন, হে আমীরুল মু'মেনীন!' তিনি উত্তরে বললেন, '(তেল ভরতে) গেলাম, তখন আমি উমার ছিলাম, আর এলাম তখনও উমার। আমার মধ্যে কিছুই কমে যায়নি। পরন্তু শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সেই, যে আল্লাহর কাছে বিনয়ী।'
📄 রাষ্ট্রনেতা হলে এমন
একদা উমার বিন আব্দুল আযীযকে দেখা গেল, তিনি রোদে বসে আছেন। জিজ্ঞাসা করা হল, 'আপনি কি অসুস্থ?' তিনি বললেন, 'না, আমি আমার (পরিহিত) কাপড় শুকাচ্ছি!' প্রশ্নকারী অবাক হয়ে বলল, 'আপনার পোশাক কী, হে আমীরুল মু'মিনীন!' তিনি বললেন, 'লুঙ্গি, কামীস ও চাদর।'
প্রশ্নকারী বলল, 'আর একটি ক'রে লুঙ্গি, কামীস ও চাদর গ্রহণ করেন না কেন?' তিনি বললেন, 'ছিল, পুরনো হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।' প্রশ্নকারী বলল, 'অন্যও তো গ্রহণ করতে পারেন?' এ কথা শুনে তিনি মাথা নিচু ক'রে কেঁদে ফেললেন এবং কুরআনের একটি আয়াত পাঠ করলেন---যার অর্থ, এ পরলোকের আবাস; যা আমি নির্ধারিত করি তাদেরই জন্য যারা এ পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। আর সাবধানীদের জন্য শুভ পরিণাম। (ক্বাস্বাস্বঃ ৮৩)
📄 হারানো মুদ্রা-কলস
এক ব্যক্তি লম্বা সফরে বিদেশে গিয়েছিল। তখনকার যুগে কোন ব্যাংক ছিল না। সুতরাং জমানো স্বর্ণ বা রৌপ্য-মুদ্রা কলসে ভরে মাটিতে পুঁতে গোপন রাখতে হতো। সে তাই করেছিল। তার বাড়ির বাগানের একটি জায়গায় মুদ্রার কলসটি পুঁতে রেখেছিল। কিন্তু বহু দিন পর ফিরে এসে সেই জায়গাটি আর মনে পড়ছিল না। তার উপার্জিত ধন হারিয়ে যাবে, তা কীভাবে হয়? তার চলবে কীভাবে? সুতরাং সে এক সময় ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর নিকট কোন ব্যবস্থা নিতে উপস্থিত হল। যদিও এটি কোন দ্বীনী মসলা ছিল না, তবুও জ্ঞানী ভক্তিভাজনের কাছে দুনিয়াবী সমস্যার কথাও জানানো হয়। সে বলল, 'জনাব! আমি আমার মুদ্রার কলসটি কোথায় পুঁতে রেখেছি, তা মনে পড়ছে না। এখন আমি কী করতে পারি?'
বিচক্ষণ ইমাম চট্ ক'রে বললেন, 'তুমি আজ সারা রাত নামায পড়ো।' লোকটি অবাক হয়ে বলল, 'জনাব! মুদ্রার কলসের সাথে নামাযের কী সম্পর্ক?' তিনি বললেন, 'আমি যা বললাম, তাই করো। তারপর সকালে এসে ফলাফল বলো।' লোকটি নিরাশ মনেও আশাবাদী হয়ে ফিরে গেল। এশার নামাযের পর শুরু করল নফল নামায পড়তে। কিন্তু কী আশ্চর্য! এক রাকআত শেষ হতে না হতেই তার সেই জায়গাটির কথা মনে পড়ে গেল, যেখানে সে কলসটি পুঁতে রেখেছিল। সুতরাং দু'রাকআত কোন রকমভাবে শেষ ক'রে কোদাল নিয়ে ছুটল সেই জায়গার দিকে। কিছু খুঁড়তেই বের হয়ে এল মুদ্রার সেই কলস! সে যে কী খুশি! তাকে আর নামায পড়তে হল না। লোকটা বড় অবাক হল, নামাযের এত বড় ক্ষমতা? ফজরের নামায পড়েই সে ইমাম সাহেবের সঙ্গে দেখা ক'রে বলল, 'দারুণ প্রেসক্রিপশন হুজুর! এক রাকআত শেষ না হতেই মনে পড়ে গেল!' ইমাম সাহেব বললেন, 'আমি জানতাম, শয়তান তোমাকে সারা রাত নামায পড়তে দেবে না।' তার মানে শয়তান জরুরি জিনিস ভুলিয়ে দেয়, যাতে মানুষের ক্ষতি হয়, আবার জরুরি জিনিস মনেও পড়িয়ে দেয়, যদি তার মাধ্যমে মানুষের অধিকতর বড় ক্ষতি হয়। সে অনেক সময় মানুষের উপকার করে, কিন্তু তা কেবল তার ক্ষতি করার জন্য। এই জন্য নামাযের মধ্যে অনেক বিস্মৃত কথা সে মনে পড়িয়ে দেয়।