📄 মেহমানের খাতির
মসজিদে নববীতে একটি ছাউনিবিশিষ্ট ঘর ছিল। সেখানে আল্লাহর রসূল ﷺ-এর তত্ত্বাবধানে কিছু সাহাবা আশ্রয় গ্রহণ করতেন ও বসবাস করতেন। তাঁদেরকে 'আসহাবে সুফফাহ' বলা হতো। তাঁরা নিতান্ত গরিব মানুষ ছিলেন। একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, "যার কাছে দু'জনের আহার আছে সে যেন (তাদের মধ্য থেকে) তৃতীয় জনকে সাথে নিয়ে যায়। আর যার নিকট চারজনের আহারের অবস্থা আছে, সে যেন পঞ্চম অথবা ষষ্ঠজনকে সাথে নিয়ে যায়।"
আবু বাকর সিদ্দীক তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে এলেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ দশজনকে সাথে নিয়ে গেলেন। আবু বাকর নিজ পুত্র আব্দুর রহমানকে বললেন, 'তোমার মেহমান নাও। (তুমি তাদের খাতির কর) আমি নবী-এর নিকট যাচ্ছি। আমার ফিরে আসার আগে আগেই তুমি (খাইয়ে) তাঁদের খাতির সম্পন্ন করো।' আবু বাকর ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঘরেই রাতের আহার করলেন এবং এশার নামায পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করলেন। এশার নামাযের পর তিনি পুনরায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঘরে ফিরে এলেন এবং আল্লাহর ইচ্ছামত রাতের কিছু সময় সেখানে অতিবাহিত করলেন।
এদিকে আব্দুর রহমান বাড়িতে যে খাবার ছিল, তা নিয়ে তাঁদের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, 'আপনারা খান।' কিন্তু মেহমানরা বললেন, 'আমাদের বাড়ি-ওয়ালা কোথায়?' তিনি বললেন, 'আপনারা খান।' তাঁরা বললেন, 'আমাদের বাড়ি-ওয়ালা না আসা পর্যন্ত আমরা খাব না।' আব্দুর রহমান বললেন, 'আপনারা আমাদের তরফ থেকে মেহমান-নেওয়াযী গ্রহণ করুন। কারণ তিনি এসে যদি দেখেন যে, আপনারা খাননি, তাহলে অবশ্যই আমরা তাঁর নিকট থেকে (বড় ভর্ৎসনা) পাব।' কিন্তু তাঁরা কোনমতেই (খেতে) সম্মত হলেন না। (আব্দুর রহমান বলেন,) তখন আমি বুঝে নিলাম যে, আব্বা আমার উপর খাপ্পা হবেন।
ক্ষণকাল পর আবু বাকর বাড়ি ফিরলে তাঁর স্ত্রী তাঁকে বললেন, 'বাইরে কিসে আপনাকে আটকে রেখেছিল?' তিনি বললেন, 'তুমি এখনো মেহমানদেরকে খাবার দাওনি?'
স্ত্রী বললেন, 'আপনি না আসা পর্যন্ত তাঁরা খেতে রাজি হলেন না। তাঁদের সামনে খাবার দেওয়া হয়েছিল, তাঁরা তা খাননি।' আব্দুর রহমান ভয়ে বাড়ির কোন অংশে লুকিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, 'আরে কী করেছ তোমরা?' অতঃপর তিনি ডাক দিলেন, 'আব্দুর রহমান!' আব্দুর রহমান নিরুত্তর থাকলেন। তিনি আবার ডাক দিলেন, 'আব্দুর রহমান?'
কিন্তু তখনও তিনি নীরব থাকলেন। তারপর আবার বললেন, 'এ বেওকুফ! আমি তোমাকে কসম দিচ্ছি, যদি তুমি আমার ডাক শুনতে পাচ্ছ, তাহলে এসে যাও।' অতঃপর 'নাককাটা' ইত্যাদি বলে গালাগালি করলেন। (আব্দুর রহমান বলেন,) তখন আমি (বাধ্য হয়ে) বের হয়ে এলাম। বললাম, 'আপনি আপনার মেহমানদেরকে জিজ্ঞাসা ক'রে দেখুন, (আমি তাঁদেরকে খেতে দিয়েছিলাম কি না?)' তাঁরা বললেন, 'ও সত্যই বলেছে। ও আমাদের কাছে খাবার নিয়ে এসেছিল। (আমরাই আপনার অপেক্ষায় খাইনি।)'
আবু বাকর বললেন, 'তোমরা আমার অপেক্ষা ক'রে বসে আছ। কিন্তু আল্লাহর কসম! আজ রাতে আমি আহার করব না।' তা দেখে তাঁর স্ত্রীও 'খাবেন না' বলে কসম করলেন। মেহমানরা বললেন, 'আল্লাহর কসম! আপনি না খাওয়া পর্যন্ত আমরাও খাব না।' তিনি বললেন, 'ধিক্কার তোমাদের প্রতি! তোমাদের কী হয়েছে যে, আমাদের পক্ষ থেকে মেহমান-নেওয়াযী গ্রহণ করবে না?' (অতঃপর ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন,) 'নিয়ে এস তোমার খাবার।'
সুতরাং তিনি খাবার নিয়ে এলে আবু বাকর তাতে হাত রেখে বললেন, 'বিসমিল্লাহ। রাগের অবস্থায় কসম ছিল শয়তানের পক্ষ থেকে।'
অতঃপর তিনি খেতে লাগলেন এবং মেহমানরাও আহার করতে শুরু করলেন।
আব্দুর রহমান বলেন, 'আল্লাহর কসম! আমরা লুকমা (খাদ্যগ্রাস) উঠিয়ে নিতেই নীচ থেকে তা অধিক পরিমাণে বেড়ে যাচ্ছিল। সকলেই পেট ভরে খেলেন। অথচ পূর্বের চেয়ে বেশি খাবার রয়ে গেল।'
পরিশেষে অতিরিক্ত খাবার নবী ﷺ-এর দরবারে পাঠিয়ে দিলেন। তিনিও তা হতে খেলেন।
তিনি বলেন, 'এদিকে আমাদের এবং অন্য একটি গোত্রের মাঝে যে চুক্তি ছিল তার সময়সীমা পূর্ণ হয়ে যায়। (এবং তারা মদীনায় আসে।) অতঃপর আমরা তাদেরকে তাদের বারো জনের নেতৃত্বে ভাগ ক'রে দিই। প্রত্যেকের সাথেই কিছু কিছু লোক ছিল। তবে প্রত্যেকের সাথে কতজন ছিল তা আল্লাহই বেশি জানেন। তারা সকলেই সেই খাদ্য আহার করল।'
📄 এক পরহেযগার যুবক
পথ চলতে একটি যুবক বড় ক্ষুধার্ত ছিল। নদীতে নেমে উযূ করতে গিয়ে দেখতে পেল, একটি আপেল পানিতে ভেসে আসছে। সেটিকে তুলে সে খেয়ে ফেলল। কিন্তু পরক্ষণে তার বিবেক তাকে কামড় দিতে লাগল। ভাবল, এ আপেল তো কোন বাগান মালিকের। তার অনুমতি ছাড়া কেন সে খেয়ে ফেলল। কোন মুসলিমের মাল তার অনুমতি ছাড়া ভক্ষণ করা তো বৈধ নয়। সুতরাং সে নদীর উজান পথে চলতে শুরু করল। নিশ্চয় নদীর ধারে অবস্থিত কোন বাগান থেকে ঐ আপেলটি ভেসে এসেছে।
চলতে চলতে একটি বাগান দৃষ্ট হল। সেখানে প্রবেশ ক'রে মালিকের কাছে ওযর পেশ ক'রে বলল, 'জি! আমি আপনার বিনা অনুমতিতে আপনার বাগানের একটি আপেল খেয়ে ফেলেছি। তার জন্য আমি আপনার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী!'
বাগানের মালিকও পরহেযগার মানুষ। কিন্তু যুবকের এ পরহেযগারি দেখে সে বড় অবাক হল। প্রকৃতিগতভাবে সে যুবককে ভালোবেসে ফেলল। ক্ষণকাল নীরব থেকে মালিক বলল, 'তুমি আমার বিনা অনুমতিতে আমার বাগানের আপেল খেয়েছ, আর আমি তোমাকে ক্ষমা করব? কক্ষনো না। আমি কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করব!'
যুবক আরো ভয় পেয়ে গেল। সে বারবার ক্ষমা চাইতে লাগল। কিন্তু মালিক ক্ষমা না ক'রে নিজ বাসায় প্রবেশ করল। অতঃপর নামাযের জন্য বের হয়ে দেখল, সে তখনও বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আছে!
দেখা হতেই যুবক বলল, 'চাচাজি! আপনি আমার কাছে আপেলের দাম নিতে পারেন। কিন্তু আমার কাছে তো কোন দীনার-দিরহাম নেই। তার পরিবর্তে আমি আপনার বাগানে কাজ ক'রে দিতে পারি।
মালিক তার আচরণে মুগ্ধ হয়ে বলল, 'আমি শর্তসাপেক্ষে তোমাকে ক্ষমা করতে পারি।'
---বলুন কী শর্ত। ক্ষমা পাওয়ার জন্য আমি আপনার যে কোন শর্ত মেনে নিতে রাজি আছি।
---আমার একটা মেয়ে আছে, যে চোখে দেখে না, কানে শোনে না, মুখে বলে না এবং পায়ে হাঁটে না। তাকে তোমাকে বিয়ে করতে হবে।
যুবক মনে মনে ভাবল, এমন মেয়ে বিয়ে ক'রে তার লাভ কী? যাকে বিছানায় বসে খাওয়াতে হবে। তবুও শর্ত মানতে রাজি যখন হয়েছে, তখন তা করতেই হবে। সে বলল, 'আমি রাজি আছি।'
বিয়ের দিন হয়ে গেল। যুবক উপস্থিত হল, কিন্তু তার মনে কোন খুশির ঝিলিক ছিল না। বিয়ে হয়েও গেল।
বাসর রাতে কক্ষে প্রবেশ করতেই সে ঝিলিক তার মনের আকাশকে উজ্জ্বল ক'রে তুলল। তার স্ত্রী দরজার কাছে উঠে এসে তাকে সালাম দিল। কোন ত্রুটি নেই তার দেহাঙ্গে। সে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করল, 'তোমার কোন ত্রুটি নেই। তাহলে তোমার আব্বা আমাকে মিথ্যা বললেন কেন?' স্ত্রী বলল, 'আপনাকে অবাক করার জন্য। আর উনি মিথ্যা তো বলেননি। বাস্তবেই আমি কোন হারাম জিনিস চোখে দেখি না, কোন হারাম জিনিস কানে শুনি না, কোন হারাম কথা মুখে বলি না এবং কোন হারাম পথে পায়ে হাঁটি না। আমার আব্বা আমার উপযুক্ত বর খুঁজছিলেন। অতঃপর আপনি যখন একটি আপেল খেয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে এলেন, তখন তিনি ভাবলেন, যে যুবক অনুমতি ছাড়া পরের একটা আপেল খেয়ে আল্লাহকে এত ভয় করতে পারে, সে যুবক নিশ্চয় আমার মেয়ের ব্যাপারে অধিক ভয় করবে। তাই তিনি প্রস্তাব দিয়ে এই বিয়ে ঠিক করেছিলেন।'
বড় ভাগ্যবান সে যুবক, বড় ভাগ্যবতী সে যুবতী। কিছু দিন পর তাদের একটি সন্তান হল। তোমরা জানো কি, সে সন্তানের নাম কী? নু'মান, আবু হানীফা (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)।
📄 বিনয়ের নমুনা
একদা রাত্রে উমার বিন আব্দুল আযীযের নিকট এক মেহমান ছিল। তিনি কিছু লিখছিলেন। এমন সময় তেলের বাতি নিভুনিভু হল। মেহমানটি বলল, 'বাতিটা ঠিক ক'রে দিই।' তিনি বললেন, 'মেহমানকে কাজে লাগানো বা মেহমানের নিকট থেকে খিদমত নেওয়া আতিথেয়তা-বিরোধী।' মেহমান বলল, 'তাহলে চাকরকে জাগিয়ে দিই।' তিনি বললেন, 'ও এই মাত্র প্রথম ঘুমিয়েছে, ওকে জাগাও না।' অতঃপর তিনি নিজে উঠে গিয়ে বাতিতে তেল ভরে তা ঠিক ক'রে আনলেন।
মেহমানটি বলল, 'আপনি নিজে কষ্ট করলেন, হে আমীরুল মু'মেনীন!' তিনি উত্তরে বললেন, '(তেল ভরতে) গেলাম, তখন আমি উমার ছিলাম, আর এলাম তখনও উমার। আমার মধ্যে কিছুই কমে যায়নি। পরন্তু শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সেই, যে আল্লাহর কাছে বিনয়ী।'
📄 রাষ্ট্রনেতা হলে এমন
একদা উমার বিন আব্দুল আযীযকে দেখা গেল, তিনি রোদে বসে আছেন। জিজ্ঞাসা করা হল, 'আপনি কি অসুস্থ?' তিনি বললেন, 'না, আমি আমার (পরিহিত) কাপড় শুকাচ্ছি!' প্রশ্নকারী অবাক হয়ে বলল, 'আপনার পোশাক কী, হে আমীরুল মু'মিনীন!' তিনি বললেন, 'লুঙ্গি, কামীস ও চাদর।'
প্রশ্নকারী বলল, 'আর একটি ক'রে লুঙ্গি, কামীস ও চাদর গ্রহণ করেন না কেন?' তিনি বললেন, 'ছিল, পুরনো হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।' প্রশ্নকারী বলল, 'অন্যও তো গ্রহণ করতে পারেন?' এ কথা শুনে তিনি মাথা নিচু ক'রে কেঁদে ফেললেন এবং কুরআনের একটি আয়াত পাঠ করলেন---যার অর্থ, এ পরলোকের আবাস; যা আমি নির্ধারিত করি তাদেরই জন্য যারা এ পৃথিবীতে উদ্ধত হতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। আর সাবধানীদের জন্য শুভ পরিণাম। (ক্বাস্বাস্বঃ ৮৩)