📄 শহীদ হতে প্রতিযোগিতা (২)
বদর যুদ্ধের পূর্বে নবী ﷺ যখন যোদ্ধা নির্বাচন করছিলেন, তখন উমাইর বিন আবী অক্কাস লুকিয়ে লুকিয়ে থাকছিলেন। তাঁর ভাই সা'দ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কি ব্যাপার তোমার?' তিনি বললেন, 'আমার ভয় হচ্ছে যে, আমি ছোট বলে রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে ফিরিয়ে দেবেন। অথচ আমি আল্লাহর রাস্তায় বের হয়ে শহীদ হতে চাই।' অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর দৈর্ঘ্য দেখলেন, তখন তিনি পায়ের গোড়ালি তুলে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে লম্বা প্রমাণ করতে চাইলেন। অবশেষে তিনি যখন তাঁকে ফিরে যেতে বললেন, তখন তিনি কাঁদতে লাগলেন। অতঃপর নবী ﷺ তাঁর কাঁদা দেখে তাঁকে বদর যেতে অনুমতি দিলেন। আর সেখানে গিয়ে যুদ্ধে তিনি শহীদ হয়ে গেলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ষোল বছর।
📄 জিহাদে যেতে প্রতিযোগিতা
উহুদ যুদ্ধের দিন ঐভাবে সৈন্য নির্বাচনের সময় ছোট-বড় দেখা হচ্ছিল। অনেককেই ছোট বলে ফিরিয়ে দেওয়া হল। তাঁদের মধ্যে রাফে' বিন খাদীজ ও সামুরাহ বিন জুন্দুব ছিলেন। পরবর্তীতে রাফে'কে অনুমতি দেওয়া হল; কারণ তিনি তীরন্দাজ ছিলেন। তা দেখে সামুরাহ কাঁদতে লাগলেন। (হ্যাঁ, মরণের জন্য কাঁদতে লাগলেন!) অতঃপর তিনি তাঁর সৎবাপের কাছে অভিযোগ ক'রে বললেন, 'আল্লাহর রসূল ﷺ রাফে'কে অনুমতি দিলেন, আর আমাকে দিলেন না। অথচ আমি ওকে কুস্তি লড়াইয়ে হারিয়ে দিতে পারব।' এ খবর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে পৌঁছলে তিনি উভয়কে কুস্তি লড়তে আদেশ দিলেন। অতঃপর সত্যিসত্যিই সামুরাহ তাতে বিজয়ী হলেন এবং তিনি তাঁকেও যুদ্ধে অনুমতি দিয়ে দিলেন।
📄 যে কাজে আল্লাহ বিস্মিত
একদা এক ব্যক্তি মহানবী ﷺ-এর নিকট এসে বলল, 'আমি ক্ষুধায় কাতর হয়ে গেছি।' (আমার খাবারের ব্যবস্থা করুন।)
সুতরাং আল্লাহর রসূল তাঁর কোন স্ত্রীর নিকট এক মেহমানের মেহমানির সংবাদ পাঠালেন। তিনি বললেন, 'সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যের সঙ্গে পাঠিয়েছেন! আমার কাছে পানি ছাড়া অন্য কিছুই নেই।'
অতঃপর অন্য স্ত্রীর নিকট পাঠালেন। তিনিও অনুরূপ কথা বললেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত সকল (স্ত্রী)ই ঐ একই কথা বললেন, 'সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যের সাথে পাঠিয়েছেন! আমার কাছে পানি ছাড়া কোন কিছুই নেই।'
সুতরাং নবী ﷺ সাহাবাগণকে বললেন, "আজকের রাতে কে একে মেহমান হিসাবে গ্রহণ করবে?"
সাহাবী আবু তালহা আনসারী বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমি একে মেহমান হিসাবে গ্রহণ করব।'
সুতরাং তিনি তাকে সাথে ক'রে নিজ গৃহে নিয়ে গেলেন এবং তাঁর স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললেন, 'রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মেহমানের খাতির কর। তোমার নিকট কোন খাবার আছে কি?'
স্ত্রী বললেন, 'না, কেবলমাত্র বাচ্চাদের খাবার আছে।'
তিনি বললেন, 'কোন জিনিস দ্বারা তাদেরকে ভুলিয়ে রাখবে এবং তারা যখন রাত্রে খাবার চাইবে, তখন তাদেরকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে। অতঃপর যখন আমাদের মেহমান (ঘরে) প্রবেশ করবে, তখন বাতি নিভিয়ে দেবে এবং তাকে বুঝাবে যে, আমরাও খাচ্ছি!'
সুতরাং তাঁরা পরিকল্পনা মোতাবেক সকলেই খাওয়ার জন্য বসে গেলেন; মেহমান খাবার খেল এবং তাঁরা দু'জনে উপবাসে রাত কাটিয়ে দিলেন। অতঃপর যখন তিনি সকালে নবী ﷺ-এর নিকট গেলেন, তখন তিনি বললেন, "তোমাদের দু'জনের আজকের রাতে নিজ মেহমানের সাথে তোমাদের ব্যবহারে আল্লাহ বিস্মিত হয়েছেন!"
📄 মেহমানের খাতির
মসজিদে নববীতে একটি ছাউনিবিশিষ্ট ঘর ছিল। সেখানে আল্লাহর রসূল ﷺ-এর তত্ত্বাবধানে কিছু সাহাবা আশ্রয় গ্রহণ করতেন ও বসবাস করতেন। তাঁদেরকে 'আসহাবে সুফফাহ' বলা হতো। তাঁরা নিতান্ত গরিব মানুষ ছিলেন। একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, "যার কাছে দু'জনের আহার আছে সে যেন (তাদের মধ্য থেকে) তৃতীয় জনকে সাথে নিয়ে যায়। আর যার নিকট চারজনের আহারের অবস্থা আছে, সে যেন পঞ্চম অথবা ষষ্ঠজনকে সাথে নিয়ে যায়।"
আবু বাকর সিদ্দীক তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে এলেন এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ দশজনকে সাথে নিয়ে গেলেন। আবু বাকর নিজ পুত্র আব্দুর রহমানকে বললেন, 'তোমার মেহমান নাও। (তুমি তাদের খাতির কর) আমি নবী-এর নিকট যাচ্ছি। আমার ফিরে আসার আগে আগেই তুমি (খাইয়ে) তাঁদের খাতির সম্পন্ন করো।' আবু বাকর ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঘরেই রাতের আহার করলেন এবং এশার নামায পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করলেন। এশার নামাযের পর তিনি পুনরায় রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ঘরে ফিরে এলেন এবং আল্লাহর ইচ্ছামত রাতের কিছু সময় সেখানে অতিবাহিত করলেন।
এদিকে আব্দুর রহমান বাড়িতে যে খাবার ছিল, তা নিয়ে তাঁদের নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, 'আপনারা খান।' কিন্তু মেহমানরা বললেন, 'আমাদের বাড়ি-ওয়ালা কোথায়?' তিনি বললেন, 'আপনারা খান।' তাঁরা বললেন, 'আমাদের বাড়ি-ওয়ালা না আসা পর্যন্ত আমরা খাব না।' আব্দুর রহমান বললেন, 'আপনারা আমাদের তরফ থেকে মেহমান-নেওয়াযী গ্রহণ করুন। কারণ তিনি এসে যদি দেখেন যে, আপনারা খাননি, তাহলে অবশ্যই আমরা তাঁর নিকট থেকে (বড় ভর্ৎসনা) পাব।' কিন্তু তাঁরা কোনমতেই (খেতে) সম্মত হলেন না। (আব্দুর রহমান বলেন,) তখন আমি বুঝে নিলাম যে, আব্বা আমার উপর খাপ্পা হবেন।
ক্ষণকাল পর আবু বাকর বাড়ি ফিরলে তাঁর স্ত্রী তাঁকে বললেন, 'বাইরে কিসে আপনাকে আটকে রেখেছিল?' তিনি বললেন, 'তুমি এখনো মেহমানদেরকে খাবার দাওনি?'
স্ত্রী বললেন, 'আপনি না আসা পর্যন্ত তাঁরা খেতে রাজি হলেন না। তাঁদের সামনে খাবার দেওয়া হয়েছিল, তাঁরা তা খাননি।' আব্দুর রহমান ভয়ে বাড়ির কোন অংশে লুকিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, 'আরে কী করেছ তোমরা?' অতঃপর তিনি ডাক দিলেন, 'আব্দুর রহমান!' আব্দুর রহমান নিরুত্তর থাকলেন। তিনি আবার ডাক দিলেন, 'আব্দুর রহমান?'
কিন্তু তখনও তিনি নীরব থাকলেন। তারপর আবার বললেন, 'এ বেওকুফ! আমি তোমাকে কসম দিচ্ছি, যদি তুমি আমার ডাক শুনতে পাচ্ছ, তাহলে এসে যাও।' অতঃপর 'নাককাটা' ইত্যাদি বলে গালাগালি করলেন। (আব্দুর রহমান বলেন,) তখন আমি (বাধ্য হয়ে) বের হয়ে এলাম। বললাম, 'আপনি আপনার মেহমানদেরকে জিজ্ঞাসা ক'রে দেখুন, (আমি তাঁদেরকে খেতে দিয়েছিলাম কি না?)' তাঁরা বললেন, 'ও সত্যই বলেছে। ও আমাদের কাছে খাবার নিয়ে এসেছিল। (আমরাই আপনার অপেক্ষায় খাইনি।)'
আবু বাকর বললেন, 'তোমরা আমার অপেক্ষা ক'রে বসে আছ। কিন্তু আল্লাহর কসম! আজ রাতে আমি আহার করব না।' তা দেখে তাঁর স্ত্রীও 'খাবেন না' বলে কসম করলেন। মেহমানরা বললেন, 'আল্লাহর কসম! আপনি না খাওয়া পর্যন্ত আমরাও খাব না।' তিনি বললেন, 'ধিক্কার তোমাদের প্রতি! তোমাদের কী হয়েছে যে, আমাদের পক্ষ থেকে মেহমান-নেওয়াযী গ্রহণ করবে না?' (অতঃপর ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন,) 'নিয়ে এস তোমার খাবার।'
সুতরাং তিনি খাবার নিয়ে এলে আবু বাকর তাতে হাত রেখে বললেন, 'বিসমিল্লাহ। রাগের অবস্থায় কসম ছিল শয়তানের পক্ষ থেকে।'
অতঃপর তিনি খেতে লাগলেন এবং মেহমানরাও আহার করতে শুরু করলেন।
আব্দুর রহমান বলেন, 'আল্লাহর কসম! আমরা লুকমা (খাদ্যগ্রাস) উঠিয়ে নিতেই নীচ থেকে তা অধিক পরিমাণে বেড়ে যাচ্ছিল। সকলেই পেট ভরে খেলেন। অথচ পূর্বের চেয়ে বেশি খাবার রয়ে গেল।'
পরিশেষে অতিরিক্ত খাবার নবী ﷺ-এর দরবারে পাঠিয়ে দিলেন। তিনিও তা হতে খেলেন।
তিনি বলেন, 'এদিকে আমাদের এবং অন্য একটি গোত্রের মাঝে যে চুক্তি ছিল তার সময়সীমা পূর্ণ হয়ে যায়। (এবং তারা মদীনায় আসে।) অতঃপর আমরা তাদেরকে তাদের বারো জনের নেতৃত্বে ভাগ ক'রে দিই। প্রত্যেকের সাথেই কিছু কিছু লোক ছিল। তবে প্রত্যেকের সাথে কতজন ছিল তা আল্লাহই বেশি জানেন। তারা সকলেই সেই খাদ্য আহার করল।'