📄 দুই বন্ধুর ধন-জন
দুই বন্ধু ছিল। মহান আল্লাহ তাদের একজনকে দান করেছিলেন দু'টি আঙুর বাগান এবং সে দু'টিকে তিনি খেজুর বৃক্ষ দ্বারা পরিবেষ্টিত করেছিলেন। আর এই দুয়ের মধ্যবর্তী স্থানকে করেছিলেন শস্যক্ষেত্র।
উভয় বাগানই ফল দান করত এবং এতে কোন ত্রুটি করত না। আর উভয়ের ফাঁকে ফাঁকে প্রবাহিত ছিল নদী। যাতে বাগানের সেচের ব্যাপারে যেন কোন বাধা সৃষ্টি না হয় অথবা বৃষ্টির পানির উপর নির্ভরশীল অঞ্চলের মত যেন বৃষ্টির মুখাপেক্ষী না হয়।
সেই বাগানের ফল-ফসলের দরুন তার প্রচুর ধন-সম্পদ ছিল। অতঃপর একদিন কথা প্রসঙ্গে সে তার বন্ধুকে গর্বের সাথে বলল, 'ধন-সম্পদে তোমার তুলনায় আমি শ্রেষ্ঠ এবং জনবলে তোমার তুলনায় আমি বেশি শক্তিশালী। আমার অনেক মাল-সম্পদ। আমার অনেক সন্তান-সন্ততি ও ভৃত্য-চাকর।'
সে ব্যক্তি কেবল অহংকার ও দাম্ভিকতাতেই পতিত ছিল না, বরং তার উন্মত্ততা ও ভবিষ্যতের সৌন্দর্যময় ও সুদীর্ঘ আশা-আকাঙ্ক্ষা তাকে আল্লাহর পাকড়াও এবং কুকর্মের প্রতিফল পাওয়ার ব্যাপারে একেবারে উদাসীন ক'রে রেখেছিল। এমন কি সে কিয়ামতকেও অস্বীকার করল এবং বড়ই ধৃষ্টতা প্রদর্শন ক'রে বলল, 'আমি মনে করি না যে, আমার এ বাগান কখনও ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি মনে করি না যে, কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হবে। আর আমি যদি আমার প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবৃত্ত হই-ই, তাহলে আমি অবশ্যই এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্থান পাব।' তার মানে কিয়ামত যদি সংঘটিত হয়ও, তবে সেখানেও আমার ভাগ্যে জুটবে উত্তম পরিণাম।
আসলে যার কুফরী ও অবাধ্যতা সীমা অতিক্রম ক'রে যায়, সে মাতালের মত এই ধরনের অহংকারমূলক দাবী করে।
যাই হোক উত্তরে তাকে তার বন্ধু বলল, 'তুমি কি তাঁকে অস্বীকার করছ, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি হতে ও পরে বীর্য হতে এবং তারপর পূর্ণাঙ্গ করেছেন মনুষ্য আকৃতিতে? সৃষ্টিকর্তার প্রতি এমন অবিশ্বাস ও অস্বীকার কোনমতেই সঠিক নয়। কিন্তু আমি বলি, তিনি আল্লাহই আমার প্রতিপালক এবং আমি কাউকেও আমার প্রতিপালকের সাথে শরীক করি না।'
অতঃপর আল্লাহর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করার পদ্ধতি জানিয়ে দেওয়ার জন্য তাকে বলল যে, বাগানে প্রবেশ করার সময় অবাধ্যতা ও অহংকার প্রদর্শন না ক'রে আল্লাহর ইচ্ছাশক্তির কথা স্মরণ করলে ভালো হত। সুতরাং বলল, 'তুমি যখন ধনে ও সন্তানে তোমার তুলনায় আমাকে কম দেখলে, তখন তোমার বাগানে প্রবেশ ক'রে তুমি কেন বললে না, "আল্লাহ যা চেয়েছেন তা-ই হয়েছে; আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত কোন শক্তি নেই।" তুমি আমাকে তুচ্ছ করছ? সম্ভবতঃ আমার প্রতিপালক আমাকে তোমার বাগান অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর কিছু দেবেন এবং তোমার বাগানে আকাশ হতে আগুন বর্ষণ করবেন; যার ফলে তা মসৃণ ময়দানে পরিণত হবে। অথবা ওর পানি ভূ-গর্ভে অন্তর্হিত হবে এবং তুমি কখনো ওকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।'
হলও তাই। তার অবিশ্বাস, অস্বীকার ও অহংকারের প্রতিফল দুনিয়াতেই পেয়ে গেল। সুতরাং তার বাগানের ফল-সম্পদ বিপর্যয় দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে গেল এবং সে তাতে যা ব্যয় করেছিল, তার জন্য হাত কচলিয়ে আক্ষেপ করতে লাগল; যখন তা মাচান সহ পড়ে গেল। সে বলতে লাগল, 'হায়! আমি যদি কাউকেও আমার প্রতিপালকের শরীক না করতাম।'
তখন আল্লাহ ব্যতীত তাকে সাহায্য করার কোন লোকজন ছিল না এবং সে নিজেও প্রতিকারে সমর্থ হল না।
আর এই ক্ষেত্রে সাহায্য করবার অধিকার সত্য আল্লাহরই। পুরস্কারদানে ও পরিণাম নির্ধারণে তিনিই শ্রেষ্ঠ।
📄 অকৃতজ্ঞতার প্রতিফল
বনী ইস্রাঈলের মধ্যে তিন ব্যক্তি; একজন ধবলকুষ্ঠ রোগী, একজন মাথায় টাক পড়া ব্যক্তি এবং অপর আর একজন অন্ধ ব্যক্তি; এদেরকে আল্লাহর পরীক্ষা করতে ইচ্ছা করলেন এবং এক ফিরিশতাকে তাদের নিকট পাঠালেন। ফিরিশা প্রথমে কুষ্ঠীরোগীর নিকট এসে বললেন, 'তোমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় বস্তু কী?'
সে বলল, 'উত্তম রং ও উত্তম চর্ম এবং লোকে আমাকে যার কারণে ঘৃণা করে, আমার নিকট হতে তা দূর হয়ে যাওয়া।'
ফিরিশা তার গায়ে হাত বুলালেন, ফলে তার ঘৃণার জিনিস দূর হয়ে গেল এবং তাকে ভাল রং ও ভাল চর্ম দেওয়া হল। অতঃপর ফিরিশা জিজ্ঞাসা করলেন, 'কোন্ মাল তোমার নিকট অধিক প্রিয়?'
সে বলল, 'উট।'
সুতরাং তাকে একটি দশ মাসের গর্ভবর্তী উটনী দেওয়া হল এবং ফিরিশতা দুআ ক'রে বললেন, 'আল্লাহ যেন তোমার এতে বর্কত দান করেন।'
অতঃপর ফিরিশা টাকওয়ালার নিকট এসে বললেন, 'তোমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় বস্তু কী?'
সে বলল, 'উত্তম চুল এবং যার কারণে মানুষ আমাকে ঘৃণা করে, তা আমার নিকট হতে দূর হয়ে যাওয়া।'
ফিরিশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, যাতে তার টাক দূর হয়ে গেল এবং তাতে চুল দান করা হল। অতঃপর ফিরিশা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার নিকট কোন্ মাল অধিক প্রিয়?'
সে বলল, 'গরু।' সুতরাং তাকে একটা গর্ভবতী গাভী দান করা হল এবং ফিরিশতা দুআ ক'রে বললেন, 'আল্লাহ যেন তোমার মালে বর্কত দান করেন।'
অতঃপর ফিরিশা অন্ধ ব্যক্তির নিকট এসে বললেন, 'তোমার নিকট অধিক প্রিয় বস্তু কী?'
সে উত্তরে বলল, 'আল্লাহ যেন আমার চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি লোকদেরকে দেখতে পাই।'
ফিরিশা তার চোখের উপর হাত ফিরিয়ে দিলেন, আর আল্লাহ তাআলা তার জ্যোতি ফিরিয়ে দিলেন। অতঃপর ফিরিশা জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার নিকট কোন্ মাল অধিক প্রিয়?' সে বলল, 'ছাগল-ভেড়া।'
সুতরাং তাকে একটি আসন্ন-প্রসবা ছাগল দেওয়া হল। অতঃপর (সে দুই ব্যক্তির) উট ও গরু বাচ্চা জন্ম দিল এবং এর ছাগল ছানা প্রসব করল। ধীরে ধীরে কুষ্ঠরোগীর এক উপত্যকা ভর্তি উট, টাকওয়ালার এক উপত্যকা ভর্তি গরু এবং অন্ধের এক উপত্যকা ভর্তি ছাগল-ভেড়া হয়ে গেল।
অতঃপর (পরীক্ষার জন্য) সেই ফিরিশতা আপন পূর্ব অবয়ব ও পূর্ব বেশ ধরে সেই ধবলকুষ্ঠ রোগীর নিকট এসে বললেন, 'আমি একজন দরিদ্র মিসকীন ব্যক্তি। সফরে আমার সমস্ত সামর্থ্য নিঃশেষ হয়ে গেছে। এখন আল্লাহর মেহেরবানী অতঃপর আপনার সাহায্য ছাড়া ঘরে পৌঁছবার আমার কোন উপায় নেই। আমি আপনার নিকট সেই আল্লাহর নামে যিনি আপনাকে এই সুন্দর রং, এই সুন্দর চর্ম এবং এত সকল উট দান করেছেন একটি উট ভিক্ষা চাচ্ছি, যার দ্বারা আমি আমার সফর হতে ঘরে পৌঁছতে পারি। (অথবা যাকে আমি আমার সফরে পাথেয় করতে পারি।)'
সে উত্তর করল, 'আমার অনেক দেয় রয়েছে (দেওয়ার মত আমার অনেক লোক আছে)।'
ফিরিশতা বললেন, 'মনে হয় যেন আমি তোমাকে চিনি। তুমি কি দরিদ্র কুষ্ঠরোগী ছিলে না, যাতে লোকে তোমাকে ঘৃণা করত? অতঃপর আল্লাহ তোমাকে ধন-সম্পদ দান করেছেন?'
তখন সে বলল, '(বল কী?) এ সকল মাল তো আমি বংশানুক্রমে উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছি।'
তখন ফিরিশা বললেন, 'যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও, তবে আল্লাহ তোমাকে সেই অবস্থায় ফিরিয়ে দেন, যে অবস্থায় তুমি পূর্বে ছিলে।'
অতঃপর ফিরিশা আপন পূর্ব আকৃতিতে টাকওয়ালার নিকট এলেন এবং তার নিকট জ্ঞাপন করলেন, যা কুষ্ঠরোগীর নিকট জ্ঞাপন করলেন। সে তার অনুরূপই উত্তর করল। ফিরিশা বললেন, 'যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও, তবে আল্লাহ তোমাকে তোমার সেই অবস্থায় ফিরিয়ে দেন, যে অবস্থায় তুমি পূর্বে ছিলে!'
অবশেষে ফিরিশা আপন পূর্ব বেশে অন্ধ ব্যক্তির নিকট এসে বললেন, 'আমি একজন দরিদ্র ও মুসাফির। সফরে আমার সম্বল ফুরিয়ে গেছে, এখন আল্লাহ অতঃপর আপনার সাহায্য ব্যতীত ঘরে পৌঁছবার আমার কোন উপায় নেই। আমি সেই আল্লাহর নামে যিনি আপনাকে আপনার চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দিয়েছেন আপনার একটি ছাগল ভিক্ষা চাচ্ছি, যার দ্বারা আমি আমার সফর হতে ঘরে পৌঁছতে পারি (অথবা সফরে পাথেয় করতে পারি।)'
সে বলল, 'সত্যই আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ আমাকে চক্ষু দান করেছেন। (এবং এই সকল মালও তাঁরই দান।) সুতরাং তুমি যা ইচ্ছা গ্রহণ কর, আর যা ইচ্ছা রেখে যাও! আল্লাহর কসম! আজ আমি তোমার (বর্জনে) প্রশংসা করব না অথবা (ফেরৎ নিয়ে) তোমাকে কষ্টে নিক্ষেপ করব না।'
তখন ফিরিশতা বললেন, 'তুমি তোমার মাল রেখে নাও! (আল্লাহর পক্ষ হতে) তোমাদেরকে পরীক্ষা করা হল এবং তিনি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, আর তোমার সাথীদ্বয়ের প্রতি অসন্তুষ্ট।'
📄 হারানো উট ফিরে পাওয়ার খুশি
এক মুসাফির তার উট সহ সফরে এক মারাত্মক মরুভূমিতে গিয়ে পড়লে বিশ্রামের জন্য এক গাছের নীচে ছায়ায় মাথা রেখে শোওয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়ল। এরই মধ্যে তার উটটি গায়েব হয়ে গেল। উটের উপর ছিল তার খাবার ও পানীয় সব কিছু। কিছুক্ষণ পরে জেগে উঠে দেখল তার উট গায়েব। সে এদিক-সেদিক খোঁজাখুঁজি শুরু করল; কিন্তু বৃথায় হয়রান হল। ক্ষুধা ও পিপাসায় যখন খুব বেশি কাতর হয়ে পড়ল, তখন ফিরে সেই গাছের নিকটে এসে আবার শোওয়া মাত্র তার চোখ লেগে গেল। কিছু পরে চোখ খুলতেই দেখতে পেল, তার সেই উট তার খাদ্য ও পানীয় সহ দাঁড়িয়ে আছে। তা দেখে সে এত খুশি হল যে, উটের লাগাম ধরে খুশির উচ্ছ্বাসে ভুল বকে বলে উঠল, 'আল্লাহ! তুই আমার বান্দা। আর আমি তোর রব!'
হারিয়ে যাওয়া বা পালিয়ে যাওয়া বান্দা ফিরে এলে অর্থাৎ, তওবা করলে আল্লাহ ঐ হারিয়ে যাওয়া উট-ওয়ালা অপেক্ষা অধিক খুশি হন!
হারিয়ে যাওয়া বা পালিয়ে যাওয়া দাস যদি ফিরে আসে, তাহলে খুশির কথাই বটে। মহান আল্লাহর তাতে যদিও কোন লাভ বা উপকার নেই, তবুও তিনি তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যে খুশি হন। তওবার ফলে তিনি এত খুশি হন, এত খুশি হন যে, তার উদাহরণ এটাই।
📄 সৎকাজে প্রতিযোগিতা
একদা মুহাজেরীনদের একটি গরিবের দল আল্লাহর নবী ﷺ-এর কাছে নিবেদন ক'রে বলল, 'ধনীরা (বেহেশতের) সমস্ত উঁচু উঁচু মর্যাদা ও স্থায়ী সম্পদের মালিক হয়ে গেল। কারণ, তারা নামায পড়ে যেমন আমরা পড়ি, রোযা রাখে যেমন আমরা রাখি, কিন্তু তারা দান করে আমরা করতে পারি না, দাস মুক্ত করে আমরা করতে পারি না। (এখন তাদের সমান সওয়াব লাভের কৌশল আমাদেরকে বলে দিন।)' আল্লাহর রসূল ﷺ বললেন, "আমি কি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলে দেব না, যাতে তোমরা প্রতিযোগিতায় অগ্রণী লোকদের সমান হতে পার, তোমাদের পশ্চাদ্বর্তী লোকদের আগে আগে থাকতে পার এবং অনুরূপ আমল যে করে সে ছাড়া তোমাদের থেকে শ্রেষ্ঠ আর কেউ হতে না পারে?" সকলে বলল, 'অবশ্যই বলে দিন, হে আল্লাহর রসূল!' তিনি বললেন, " তোমরা প্রত্যেক নামাযের পর ৩৩ বার ক'রে তাসবীহ, তাহমীদ ও তাকবীর পাঠ করবে।" (মুহাজেরীনরা খোশ হয়ে ফিরে গেলেন। ওদিকে ধনীরা এ খবর জানতে পেরে তারাও এ আমল শুরু ক'রে দিল।) মুহাজেরীনরা ফিরে এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রসূল! আমাদের ধনী ভায়েরা এ খবর শুনে তারাও আমাদের মত আমল করতে শুরু ক'রে দিয়েছে। (অতএব আমরা আবার পিছে থেকে যাব।) মহানবী বললেন, " এ হল আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা অনুগ্রহ ক'রে থাকেন। (এতে তোমাদের করার কিছু নেই।)