📘 ছোটদের ছোট গল্প > 📄 আমানতদার রাখাল

📄 আমানতদার রাখাল


আব্দুল্লাহ ইবনে উমার মদীনার কোন এক প্রান্তের দিকে বের হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর কয়েকজন সঙ্গীও ছিলেন। সঙ্গীগণ তাঁর খাবারের জন্য দস্তরখান বিছালেন। সেই সময়ে একজন রাখাল পেরিয়ে যাচ্ছিল। ইবনে উমার তাকে ডাকলেন, 'ওহে রাখাল! এসো-এসো, তুমি কিছু আমাদের সঙ্গে পানাহার ক'রে নাও।'

রাখাল বলল, 'আমি রোযা অবস্থায় আছি।'

ইবনে উমার বললেন, 'এই প্রচণ্ড গরমের দিনে রোযা অবস্থায় আছ? এখন তো প্রখর লু-হাওয়া বইছে। আর তুমি পাহাড়ে ছাগল চরাচ্ছ। (এই অবস্থায় রোযা রাখা তো নিজেকে কষ্টে নিক্ষেপ করা।)'

রাখাল বলল, 'জি-হ্যাঁ, আমি ঐ দিনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, যেদিন কোন নেক আমল করার সুযোগ থাকবে না। এই জন্য পার্থিব জীবনে কিছু আমল ক'রে নিচ্ছি।'

ইবনে উমার রাখালকে তার তাকওয়া ও আল্লাহ-ভীতির উপর পরীক্ষা নেওয়ার জন্যে বললেন, 'তুমি কি ছাগলের পাল থেকে একটি ছাগল বিক্রয় করতে পারবে? আমরা তোমাকে ওর নগদ মূল্য প্রদান করে দেব। উপরন্তু তোমার ইফতারের জন্য গোশতও দেব।'

রাখাল উত্তরে বলল, 'ছাগলগুলি তো আমার নয় যে, বিক্রয় করব; বরং এগুলি আমার মালিকের (আর আমি একজন ক্রীতদাস)। এই জন্য এতে আমি কোন রকম হস্তক্ষেপ করতে পারি না।'

ইবনে উমার বললেন, 'তোমার মালিক যদি একটা ছাগল কম পায়, আর তুমি যদি বলো, একটা ছাগল হারিয়ে গেছে (অথবা বাঘে খেয়ে ফেলেছে), তাহলে সে কিছু বলবে না। কারণ পাল থেকে তো দু-একটা ছাগল পাহাড়ে হারিয়েই থাকে।'

রাখাল এই কথাগুলি শুনে ইবনে উমার এর নিকট থেকে চলে গেল। যেতে যেতে সে তার আঙুল আসমানের দিকে তুলে বলল, 'আল্লাহ কোথায় আছেন?' (অর্থাৎ, মালিক তো দেখবে ও জানবে না, কিন্তু আল্লাহ তো দেখছেন ও জানছেন।)

রাখাল যখন চলে গেল, তখন ইবনে উমার ওর কথাটা বারংবার উচ্চারণ করতে লাগলেন। 'আল্লাহ কোথায় আছেন? আল্লাহ কোথায় আছেন?'

অতঃপর তিনি যখন মদীনায় ফিরে এলেন, তখন ঐ রাখালের মালিকের কাছে নিজের একটা লোক পাঠালেন। তার কাছ থেকে ওর ছাগলগুলি এবং রাখালকে খরিদ ক'রে নিলেন। আর ঐ রাখালকে দাসত্ব থেকে মুক্ত ক'রে দিলেন। সেই সঙ্গে ছাগলগুলিকে তাকে হেবা ক'রে দিলেন।

📘 ছোটদের ছোট গল্প > 📄 আমানতদার মেয়ে

📄 আমানতদার মেয়ে


একদা উমার রাত্রিবেলায় ছদ্মবেশে শহরে ঘুরছিলেন। এক দুধ-ব্যবসায়ীর ঘর থেকে মা-বেটির আওয়াজ তাঁর কানে এল; মা মেয়েকে বলছে, 'দুধে পানি দিয়ে দে, বেশি হবে।'

মেয়ে বলছে, 'আমীরুল মু'মিনীন এক ঘোষক দ্বারা ঘোষণা করিয়েছেন যে, দুধে পানি মিশানো যাবে না।'

মা বলছে, 'এখানে না তোকে উমার দেখতে পাবে, আর না তাঁর ঘোষক।'

মেয়ে বলছে, 'না মা! লোকালয়ে যার বাধ্য, নির্জনে তার অবাধ্যতা করতে পারি না! তাঁরা দেখেননি, তাঁদের রব তো দেখছেন!'

এমন আমানতদারীর কথোপকথন শুনে খলীফা উমার ঐ মেয়েকে নিজের পুত্রবধূ ক'রে নিলেন। আর সেই মহিলার বংশসূত্রে জন্ম নিয়েছিলেন পঞ্চম খলীফা উমার বিন আব্দুল আযীয।

📘 ছোটদের ছোট গল্প > 📄 আল্লাহ তো দেখছেন

📄 আল্লাহ তো দেখছেন


একদিন শিক্ষক সকল ছাত্রদের মাঝে আপেল বিতরণ ক'রে বললেন, 'তোমরা স্কুল থেকে ফিরে গিয়ে আপেলটি এমন জায়গায় খাবে, যেখানে খাওয়া কেউ দেখতে পাবে না।'

পরদিন স্কুলে এলে শিক্ষক তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কোথায় কীভাবে আপেল খেয়েছ?'

কেউ বলল, 'আমি নির্জন বনের ভিতরে খেয়েছি।'
কেউ বলল, 'আমি জন-প্রাণীহীন ময়দানে খেয়েছি।'
কেউ বলল, 'আমি নির্জন কক্ষে দরজা বন্ধ ক'রে খেয়েছি।
কেউ বলল, 'আমি রাতের অন্ধকারে বাড়ির ছাদে গিয়ে একাকী খেয়েছি।'

কিন্তু তাদের মধ্যে একজন বলল, 'স্যার! আমি আপেল খেতে পারিনি।'

স্যার বললেন, 'তা কেন?'

সে বলল, 'যেখানে গেলাম, যে জায়গাকেই ভাবলাম, সেখানে কেউ আমার আপেল খাওয়া দেখতে পাবে না। কিন্তু সেখানেই ভাবলাম, কেউ না দেখুক, আল্লাহ তো দেখছেন। তাই আপনার নির্দেশ পালন ক'রে তা খেতে পারলাম না।'

শিক্ষক ঐ জ্ঞানী ছাত্রকে অসংখ্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন এবং অনুরূপ সর্বদা সর্বস্থানে আল্লাহ-ভীতি রাখার ব্যাপারে তাকে উৎসাহিত করলেন।

📘 ছোটদের ছোট গল্প > 📄 কৃপণদের পরিণতি

📄 কৃপণদের পরিণতি


মহান আল্লাহ দুনিয়াতে কোন কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে পরীক্ষা ক'রে থাকেন। যেমন তিনি পূর্ব যুগের একই পরিবারের বাগানের মালিক কয়েক ভাইকে পরীক্ষা করেছেন। তাদের ছিল সুন্দর বাগান, ফলে-শস্যে পরিপূর্ণ বাগান। এই বাগানটি (ইয়ামানের) সানআ' থেকে ৬ মাইল দূরত্বে অবস্থিত ছিল। তাদের পিতা সেই বাগানের উৎপন্ন ফল-মূল থেকে গরিব মিসকীনদেরকে দান করত। কিন্তু তার মৃত্যুর পর যখন তার সন্তানরা তার উত্তরাধিকারী হল, তখন তারা বলল যে, এ থেকে আমাদের সংসারের খরচই তো কোন রকম বের হয়। তাই আমরা বাগানের উপার্জিত ফসল হতে গরিব ও অভাবীদেরকে কিরূপে দান করব? সুতরাং তারা বাগানের ফল দেখে ভুলে গেল তাদের সৃষ্টিকর্তাকে। বাগানের ফল আনতে যাওয়ার সময় ভুলে গেল আল্লাহর স্মরণ। ভুলে গেল সেই বাগানের ফসলের হকদারদের হকের কথা। ফল-ফসল কাটার সময় মিসকীনরা এসে চেয়ে-মেগে বিরক্ত করে। তাই ভাবল, তাদেরকে ফাঁকি দেবে। সুতরাং তারা শপথ করল যে, তারা ভোর-সকালে তুলে আনবে বাগানের ফল। আর তারা 'ইন শাআল্লাহ'ও বলল না! যদিও তাদের মধ্যম অথবা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি আল্লাহর স্মরণ নিতে বলল।

আল্লাহর ইচ্ছায় ফল-ফসল হয়, সব কিছু ঘটে। তিনি না চাইলে ফল-ফসল হয় না, হলেও নষ্ট হয়ে যায়। পাকা ফসল ধ্বংস হয়ে যায়। তিনি না চাইলে অনেকে বাড়া ভাতও খেতে পায় না। তাদের এই আচরণ দেখে তিনি অসন্তুষ্ট হলেন। ফলে তাঁর নিকট হতে তাদের বাগানে রাত্রিকালে এক বিপর্যয় হানা দিল, যখন তারা ঘুমিয়ে ছিল। সুতরাং তাদের বাগান ফসল-কাটা ক্ষেতের মত হয়ে গেল। এদিকে ওরা ভোর-সকালে এক অপরকে ডাকাডাকি ক'রে বলল, 'তোমরা যদি ফল তুলতে চাও, তাহলে ভোর ভোর বাগানে চল।' অতঃপর তারা চুপিসারে কথা বলতে বলতে (পথ) চলতে শুরু করল, 'আজ যেন সেখানে তোমাদের নিকটে কোন অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি প্রবেশ করতে না পারে। বাগানে এসে কেউ যেন কিছু চাইতে না পারে। যেমন, আমাদের বাপের যামানায় লোকেরা এসে নিজেদের অংশ নিয়ে যেত।' সুতরাং তারা (অভাবীদেরকে) নিবৃত্ত করতে সক্ষম --এই বিশ্বাস নিয়ে প্রভাতকালে বাগানে গেল। কিন্তু তারা যখন বাগানের অবস্থা প্রত্যক্ষ করল, তখন তারা ভাবল, এটা তাদের বাগান নয়। তারা বলল, 'আমরা তো পথ হারিয়ে ফেলেছি।' অবশ্য পরক্ষণে যখন তারা চিন্তা-ভাবনা করল, তখন জানতে পারল যে, বিপদগ্রস্ত এবং বিনাশিত এই বাগানই হল আমাদের বাগান। যাকে মহান আল্লাহ আমাদের কর্মদোষে এ রকম ক'রে দিয়েছেন। তখন তারা বলল, 'বরং আমরা তো বঞ্চিত!' সেখানে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে তাদের মধ্যম বা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বলল, 'আমি কি তোমাদেরকে বলিনি? তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছ না কেন?' অথবা 'ইন শাআল্লাহ' বলছ না কেন?

সুতরাং তারা বলল, 'আমরা আমাদের প্রতিপালকের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি, নিশ্চয় আমরা আমাদের আচরণে সীমালংঘনকারী ছিলাম।'

তবুও এ দুর্ঘটনার জন্য তারা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করতে লাগল। তারা আফসোস ক'রে বলল, 'হায় দুর্ভোগ আমাদের! নিশ্চয় আমরা সীমালংঘনকারী ছিলাম। আমরা আশা রাখি যে, আমাদের প্রতিপালক এর পরিবর্তে আমাদেরকে উৎকৃষ্ট বাগান দেবেন; আমরা আমাদের প্রতিপালকের অভিমুখী হলাম।'

সবশেষে তারা আপোসে অঙ্গীকারবদ্ধ হল যে, আল্লাহ যদি পুনরায় আমাদেরকে মাল-ধন দান করেন, তাহলে আমরা পিতার মতোই তা হতে গরিবদের অধিকার আদায় করব। আর এই জন্যই তারা লজ্জিত হয়ে তওবা ক'রে প্রতিপালকের নিকট আশার কথাও ব্যক্ত করল। কেউ আল্লাহর ধন পেয়ে কার্পণ্য করলে শাস্তি এরূপই হয়ে থাকে। আর পরকালের শাস্তি অবশ্যই কঠিনতর।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00