📄 আমানতদারীর পুরস্কার
মুবারক আবু আব্দুল্লাহ তাঁর প্রভু (মুনীব) এর বাগানে কাজ করতেন। তাঁর প্রভু বাগান-মালিক হামাযানের বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। একদিন বাগানে এসে দাসকে বললেন, 'মুবারক! একটি মিষ্টি বেদানা আনো তো।'
মুবারক গাছ হতে খুঁজে খুঁজে একটি বেদানা প্রভুর হাতে দিলেন। প্রভু তো ভেঙে খেতেই চটে উঠলেন। বললেন, 'তোমাকে মিষ্টি বেদানা আনতে বললাম, অথচ টক বেদানা নিয়ে এলে? মিষ্টি বেদানা নিয়ে এসো।'
মুবারক অন্য একটি গাছ থেকে আর একটি বেদানা এনে দিলে তিনি খেয়ে দেখলেন সেটাও টক। রেগে তৃতীয়বার পাঠালে একই অবস্থা। প্রভু বললেন, 'আরে তুমি টক আর মিষ্টি বেদানা কাকে বলে চেন না?' বললেন, 'জি না। (আমি তো আর কোন গাছের বেদানা খেয়ে দেখিনি।) আপনার বিনা অনুমতিতে খাই কী করে?'
দাসের এই আমানতদারী ও সততা দেখে প্রভু অবাক হলেন। তাঁর চোখে তাঁর কদর ও মর্যাদা বৃদ্ধি পেল। তিনি তাকে পুরস্কৃত করতে চাইলেন।
মালিকের ছিল এক সুন্দরী কন্যা। বহু বড় বড় পরিবার থেকেই তার বিয়ের সম্বন্ধ আসছিল। একদা প্রভু মুবারককে ডেকে বললেন, 'আমার মেয়ের সাথে কেমন লোকের বিয়ে হওয়া উচিত বল তো?' মুবারক বললেন, 'জাহেলিয়াত যুগের লোকেরা বংশ ও কুলমান দেখে বিয়ে দিত, ইয়াহুদীরা দেয় ধন দেখে, খ্রিস্টানরা দেয় রূপ-সৌন্দর্য দেখে। কিন্তু এই উম্মত কেবল দ্বীন দেখেই বিয়ে দিয়ে থাকে।'
এ ধরনের জ্ঞানগর্ভ কথা প্রভুর বড় পছন্দ হল। মুবারকের কথা প্রভু তাঁর স্ত্রীর নিকট উল্লেখ ক'রে বললেন, 'আমি তো মেয়ের জন্য মুবারকের চেয়ে অধিক উপযুক্ত পাত্র আর কাউকে মনে করি না।'
হয়েও গেল বিবাহ। পিতা উভয়কে প্রচুর অর্থ দিয়ে তাঁদের দাম্পত্যে সাহায্য করলেন। এই সেই দম্পতি যাঁদের ঔরসে জন্ম নিয়েছিলেন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস, যাহেদ, বীর মুজাহিদ আব্দুল্লাহ বিন মুবারক।
📄 আমানতদার রাখাল
আব্দুল্লাহ ইবনে উমার মদীনার কোন এক প্রান্তের দিকে বের হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর কয়েকজন সঙ্গীও ছিলেন। সঙ্গীগণ তাঁর খাবারের জন্য দস্তরখান বিছালেন। সেই সময়ে একজন রাখাল পেরিয়ে যাচ্ছিল। ইবনে উমার তাকে ডাকলেন, 'ওহে রাখাল! এসো-এসো, তুমি কিছু আমাদের সঙ্গে পানাহার ক'রে নাও।'
রাখাল বলল, 'আমি রোযা অবস্থায় আছি।'
ইবনে উমার বললেন, 'এই প্রচণ্ড গরমের দিনে রোযা অবস্থায় আছ? এখন তো প্রখর লু-হাওয়া বইছে। আর তুমি পাহাড়ে ছাগল চরাচ্ছ। (এই অবস্থায় রোযা রাখা তো নিজেকে কষ্টে নিক্ষেপ করা।)'
রাখাল বলল, 'জি-হ্যাঁ, আমি ঐ দিনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, যেদিন কোন নেক আমল করার সুযোগ থাকবে না। এই জন্য পার্থিব জীবনে কিছু আমল ক'রে নিচ্ছি।'
ইবনে উমার রাখালকে তার তাকওয়া ও আল্লাহ-ভীতির উপর পরীক্ষা নেওয়ার জন্যে বললেন, 'তুমি কি ছাগলের পাল থেকে একটি ছাগল বিক্রয় করতে পারবে? আমরা তোমাকে ওর নগদ মূল্য প্রদান করে দেব। উপরন্তু তোমার ইফতারের জন্য গোশতও দেব।'
রাখাল উত্তরে বলল, 'ছাগলগুলি তো আমার নয় যে, বিক্রয় করব; বরং এগুলি আমার মালিকের (আর আমি একজন ক্রীতদাস)। এই জন্য এতে আমি কোন রকম হস্তক্ষেপ করতে পারি না।'
ইবনে উমার বললেন, 'তোমার মালিক যদি একটা ছাগল কম পায়, আর তুমি যদি বলো, একটা ছাগল হারিয়ে গেছে (অথবা বাঘে খেয়ে ফেলেছে), তাহলে সে কিছু বলবে না। কারণ পাল থেকে তো দু-একটা ছাগল পাহাড়ে হারিয়েই থাকে।'
রাখাল এই কথাগুলি শুনে ইবনে উমার এর নিকট থেকে চলে গেল। যেতে যেতে সে তার আঙুল আসমানের দিকে তুলে বলল, 'আল্লাহ কোথায় আছেন?' (অর্থাৎ, মালিক তো দেখবে ও জানবে না, কিন্তু আল্লাহ তো দেখছেন ও জানছেন।)
রাখাল যখন চলে গেল, তখন ইবনে উমার ওর কথাটা বারংবার উচ্চারণ করতে লাগলেন। 'আল্লাহ কোথায় আছেন? আল্লাহ কোথায় আছেন?'
অতঃপর তিনি যখন মদীনায় ফিরে এলেন, তখন ঐ রাখালের মালিকের কাছে নিজের একটা লোক পাঠালেন। তার কাছ থেকে ওর ছাগলগুলি এবং রাখালকে খরিদ ক'রে নিলেন। আর ঐ রাখালকে দাসত্ব থেকে মুক্ত ক'রে দিলেন। সেই সঙ্গে ছাগলগুলিকে তাকে হেবা ক'রে দিলেন।
📄 আমানতদার মেয়ে
একদা উমার রাত্রিবেলায় ছদ্মবেশে শহরে ঘুরছিলেন। এক দুধ-ব্যবসায়ীর ঘর থেকে মা-বেটির আওয়াজ তাঁর কানে এল; মা মেয়েকে বলছে, 'দুধে পানি দিয়ে দে, বেশি হবে।'
মেয়ে বলছে, 'আমীরুল মু'মিনীন এক ঘোষক দ্বারা ঘোষণা করিয়েছেন যে, দুধে পানি মিশানো যাবে না।'
মা বলছে, 'এখানে না তোকে উমার দেখতে পাবে, আর না তাঁর ঘোষক।'
মেয়ে বলছে, 'না মা! লোকালয়ে যার বাধ্য, নির্জনে তার অবাধ্যতা করতে পারি না! তাঁরা দেখেননি, তাঁদের রব তো দেখছেন!'
এমন আমানতদারীর কথোপকথন শুনে খলীফা উমার ঐ মেয়েকে নিজের পুত্রবধূ ক'রে নিলেন। আর সেই মহিলার বংশসূত্রে জন্ম নিয়েছিলেন পঞ্চম খলীফা উমার বিন আব্দুল আযীয।
📄 আল্লাহ তো দেখছেন
একদিন শিক্ষক সকল ছাত্রদের মাঝে আপেল বিতরণ ক'রে বললেন, 'তোমরা স্কুল থেকে ফিরে গিয়ে আপেলটি এমন জায়গায় খাবে, যেখানে খাওয়া কেউ দেখতে পাবে না।'
পরদিন স্কুলে এলে শিক্ষক তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমরা কোথায় কীভাবে আপেল খেয়েছ?'
কেউ বলল, 'আমি নির্জন বনের ভিতরে খেয়েছি।'
কেউ বলল, 'আমি জন-প্রাণীহীন ময়দানে খেয়েছি।'
কেউ বলল, 'আমি নির্জন কক্ষে দরজা বন্ধ ক'রে খেয়েছি।
কেউ বলল, 'আমি রাতের অন্ধকারে বাড়ির ছাদে গিয়ে একাকী খেয়েছি।'
কিন্তু তাদের মধ্যে একজন বলল, 'স্যার! আমি আপেল খেতে পারিনি।'
স্যার বললেন, 'তা কেন?'
সে বলল, 'যেখানে গেলাম, যে জায়গাকেই ভাবলাম, সেখানে কেউ আমার আপেল খাওয়া দেখতে পাবে না। কিন্তু সেখানেই ভাবলাম, কেউ না দেখুক, আল্লাহ তো দেখছেন। তাই আপনার নির্দেশ পালন ক'রে তা খেতে পারলাম না।'
শিক্ষক ঐ জ্ঞানী ছাত্রকে অসংখ্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন এবং অনুরূপ সর্বদা সর্বস্থানে আল্লাহ-ভীতি রাখার ব্যাপারে তাকে উৎসাহিত করলেন।