📘 ছোটদের ছোট গল্প > 📄 কিশোরের পাকা ঈমান

📄 কিশোরের পাকা ঈমান


অতীতকালে এক বাদশার একটি যাদুকর ও গণক ছিল। যখন সে গণক বৃদ্ধ অবস্থায় উপনীত হল, তখন সে বাদশাহকে বলল, 'আমাকে একটি বুদ্ধিমান বালক দিন, যাকে আমি এই বিদ্যা শিক্ষা দেব।' সুতরাং বাদশাহ সেই রকম বুদ্ধিমান বালক খোঁজ ক'রে তাকে তার কাছে সমর্পণ করলেন। ঐ বালকের পথে এক পাদরিরও ঘর ছিল। বালকটি পথে আসা-যাওয়ার সময় সেই পাদরির নিকট গিয়ে বসত এবং তার কথা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করত, যা তাকে ভালও লাগত। এ ভাবেই তার আসা যাওয়া অব্যাহত থাকল। একদা এই বালকটির যাওয়ার পথে এক বৃহদাকার জন্তু (বাঘ অথবা সাপ) বসেছিল; যে মানুষের আসা-যাওয়ার রাস্তা বন্ধ ক'রে রেখেছিল। বালকটি চিন্তা করল, আজকে আমি পরীক্ষা করব যে, যাদুকর সত্য, না পাদরি। সে একটি পাথরের টুকরা কুড়িয়ে বলল, 'হে আল্লাহ! যদি পাদরির আমল তোমার নিকট যাদুকরের আমল থেকে উত্তম এবং পছন্দনীয় হয়, তাহলে এই জন্তুকে মেরে ফেল; যাতে মানুষের আসা-যাওয়ার পথ চালু হয়ে যায়।'

এই বলে বালকটি পাথর ছুড়লে জন্তুটি মারা গেল। এবার বালকটি পাদরির নিকট গিয়ে সব কথা বিস্তারিত বলল। পাদরি বললেন, 'হে বৎস! এবার দেখছি তুমি পূর্ণ দক্ষতায় পৌঁছে গেছ। এবার তোমার পরীক্ষা শুরু হতে চলেছে। কিন্তু এই পরীক্ষা অবস্থায় আমার নাম তুমি প্রকাশ করবে না।'

এই বালকটি জন্মান্ধত্ব, ধবল প্রভৃতি রোগের চিকিৎসাও করত; তবে তা আল্লাহর উপর বিশ্বাসের উপর শর্ত রেখেই করত। এই শর্তানুযায়ী বাদশার এক সহচরের অন্ধ চক্ষুকে আল্লাহর কাছে দুআ ক'রে ভাল ক'রে দিল। বালকটি বলত যে, 'যদি আপনি আল্লাহর উপর ঈমান আনেন, তাহলে আমি তাঁর নিকট দুআ করব; তিনি আরোগ্য দান করবেন।'

সুতরাং সে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানালে তিনি রোগীকে আরোগ্য দান করতেন। এই খবর বাদশাহর নিকট পৌঁছলে, তিনি বড় উদ্বিগ্ন হলেন। কিছু সংখ্যক ঈমানদারকে তিনি হত্যা ক'রে ফেললেন। আর এই বালকটির ব্যাপারে তিনি কয়েকটি লোককে ডেকে বললেন যে, 'এই বালকটিকে উঁচু পাহাড়ের উপর নিয়ে গিয়ে নিচে ফেলে দাও।' বালকটি আল্লাহর কাছে দুআ করলে পাহাড় কাঁপতে লাগল; যার কারণে সে ছাড়া সকলেই পড়ে মারা গেল। বাদশাহ তখন বালকটিকে অন্য কিছু লোকের কাছে সমর্পণ করে বললেন, 'একে একটি নৌকায় চড়িয়ে সমুদ্রের মধ্যস্থলে নিয়ে গিয়ে তাতে নিক্ষেপ কর।' সেখানেও বালকটির দুআর কারণে নৌকাটি উল্টে গেল। যার ফলে সকলে পানিতে ডুবে মারা গেল। কিন্তু বালকটি বেঁচে গেল। এবার বালকটি বাদশাকে বলল, 'যদি আপনি আমাকে হত্যাই করতে চান, তাহলে এর সঠিক পদ্ধতি হল এই যে, একটি খোলা ময়দানে লোকদেরকে জমায়েত করুন, আর "বিসমিল্লাহি রাব্বিল গুলাম" (অর্থাৎ, বালকের প্রভুর নামে আরম্ভ করছি) বলে আমার প্রতি তীর নিক্ষেপ করুন; দেখবেন আমি মৃত্যু বরণ করব।'

বাদশাহ তাই করলেন। যার কারণে বালকটি মৃত্যু বরণ করল। সেই ঘটনাস্থলেই লোকেরা সোচ্চার হয়ে বলে উঠল যে, 'আমরা এই বালকটির রবের (প্রভুর) উপর ঈমান আনলাম।'

বাদশাহ আরো অধিক উদ্বিগ্ন হলেন। অতএব তিনি তাদের জন্য একটি গর্ত খনন করিয়ে তাতে আগুন জ্বালাতে আদেশ করলেন। অতঃপর হুকুম দিলেন যে, 'যে ব্যক্তি ঈমান হতে ফিরে না আসবে, তাকে এই অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ কর।' এইভাবে ঈমানদার ব্যক্তিরা আসতে থাকল এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে থাকল। পরিশেষে একটি মহিলার পালা এল, যার সঙ্গে তার বাচ্চাও ছিল। সে একটু পশ্চাৎপদ হল। কিন্তু বাচ্চাটি বলে উঠল, 'আম্মাজান! ধৈর্য ধরুন। আপনি সত্যের উপরে আছেন।' (সুতরাং সেও আগুনে শহীদ হয়ে গেল।)

📘 ছোটদের ছোট গল্প > 📄 আমানতদারীর পুরস্কার

📄 আমানতদারীর পুরস্কার


মুবারক আবু আব্দুল্লাহ তাঁর প্রভু (মুনীব) এর বাগানে কাজ করতেন। তাঁর প্রভু বাগান-মালিক হামাযানের বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। একদিন বাগানে এসে দাসকে বললেন, 'মুবারক! একটি মিষ্টি বেদানা আনো তো।'

মুবারক গাছ হতে খুঁজে খুঁজে একটি বেদানা প্রভুর হাতে দিলেন। প্রভু তো ভেঙে খেতেই চটে উঠলেন। বললেন, 'তোমাকে মিষ্টি বেদানা আনতে বললাম, অথচ টক বেদানা নিয়ে এলে? মিষ্টি বেদানা নিয়ে এসো।'

মুবারক অন্য একটি গাছ থেকে আর একটি বেদানা এনে দিলে তিনি খেয়ে দেখলেন সেটাও টক। রেগে তৃতীয়বার পাঠালে একই অবস্থা। প্রভু বললেন, 'আরে তুমি টক আর মিষ্টি বেদানা কাকে বলে চেন না?' বললেন, 'জি না। (আমি তো আর কোন গাছের বেদানা খেয়ে দেখিনি।) আপনার বিনা অনুমতিতে খাই কী করে?'

দাসের এই আমানতদারী ও সততা দেখে প্রভু অবাক হলেন। তাঁর চোখে তাঁর কদর ও মর্যাদা বৃদ্ধি পেল। তিনি তাকে পুরস্কৃত করতে চাইলেন।

মালিকের ছিল এক সুন্দরী কন্যা। বহু বড় বড় পরিবার থেকেই তার বিয়ের সম্বন্ধ আসছিল। একদা প্রভু মুবারককে ডেকে বললেন, 'আমার মেয়ের সাথে কেমন লোকের বিয়ে হওয়া উচিত বল তো?' মুবারক বললেন, 'জাহেলিয়াত যুগের লোকেরা বংশ ও কুলমান দেখে বিয়ে দিত, ইয়াহুদীরা দেয় ধন দেখে, খ্রিস্টানরা দেয় রূপ-সৌন্দর্য দেখে। কিন্তু এই উম্মত কেবল দ্বীন দেখেই বিয়ে দিয়ে থাকে।'

এ ধরনের জ্ঞানগর্ভ কথা প্রভুর বড় পছন্দ হল। মুবারকের কথা প্রভু তাঁর স্ত্রীর নিকট উল্লেখ ক'রে বললেন, 'আমি তো মেয়ের জন্য মুবারকের চেয়ে অধিক উপযুক্ত পাত্র আর কাউকে মনে করি না।'

হয়েও গেল বিবাহ। পিতা উভয়কে প্রচুর অর্থ দিয়ে তাঁদের দাম্পত্যে সাহায্য করলেন। এই সেই দম্পতি যাঁদের ঔরসে জন্ম নিয়েছিলেন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস, যাহেদ, বীর মুজাহিদ আব্দুল্লাহ বিন মুবারক।

📘 ছোটদের ছোট গল্প > 📄 আমানতদার রাখাল

📄 আমানতদার রাখাল


আব্দুল্লাহ ইবনে উমার মদীনার কোন এক প্রান্তের দিকে বের হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর কয়েকজন সঙ্গীও ছিলেন। সঙ্গীগণ তাঁর খাবারের জন্য দস্তরখান বিছালেন। সেই সময়ে একজন রাখাল পেরিয়ে যাচ্ছিল। ইবনে উমার তাকে ডাকলেন, 'ওহে রাখাল! এসো-এসো, তুমি কিছু আমাদের সঙ্গে পানাহার ক'রে নাও।'

রাখাল বলল, 'আমি রোযা অবস্থায় আছি।'

ইবনে উমার বললেন, 'এই প্রচণ্ড গরমের দিনে রোযা অবস্থায় আছ? এখন তো প্রখর লু-হাওয়া বইছে। আর তুমি পাহাড়ে ছাগল চরাচ্ছ। (এই অবস্থায় রোযা রাখা তো নিজেকে কষ্টে নিক্ষেপ করা।)'

রাখাল বলল, 'জি-হ্যাঁ, আমি ঐ দিনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, যেদিন কোন নেক আমল করার সুযোগ থাকবে না। এই জন্য পার্থিব জীবনে কিছু আমল ক'রে নিচ্ছি।'

ইবনে উমার রাখালকে তার তাকওয়া ও আল্লাহ-ভীতির উপর পরীক্ষা নেওয়ার জন্যে বললেন, 'তুমি কি ছাগলের পাল থেকে একটি ছাগল বিক্রয় করতে পারবে? আমরা তোমাকে ওর নগদ মূল্য প্রদান করে দেব। উপরন্তু তোমার ইফতারের জন্য গোশতও দেব।'

রাখাল উত্তরে বলল, 'ছাগলগুলি তো আমার নয় যে, বিক্রয় করব; বরং এগুলি আমার মালিকের (আর আমি একজন ক্রীতদাস)। এই জন্য এতে আমি কোন রকম হস্তক্ষেপ করতে পারি না।'

ইবনে উমার বললেন, 'তোমার মালিক যদি একটা ছাগল কম পায়, আর তুমি যদি বলো, একটা ছাগল হারিয়ে গেছে (অথবা বাঘে খেয়ে ফেলেছে), তাহলে সে কিছু বলবে না। কারণ পাল থেকে তো দু-একটা ছাগল পাহাড়ে হারিয়েই থাকে।'

রাখাল এই কথাগুলি শুনে ইবনে উমার এর নিকট থেকে চলে গেল। যেতে যেতে সে তার আঙুল আসমানের দিকে তুলে বলল, 'আল্লাহ কোথায় আছেন?' (অর্থাৎ, মালিক তো দেখবে ও জানবে না, কিন্তু আল্লাহ তো দেখছেন ও জানছেন।)

রাখাল যখন চলে গেল, তখন ইবনে উমার ওর কথাটা বারংবার উচ্চারণ করতে লাগলেন। 'আল্লাহ কোথায় আছেন? আল্লাহ কোথায় আছেন?'

অতঃপর তিনি যখন মদীনায় ফিরে এলেন, তখন ঐ রাখালের মালিকের কাছে নিজের একটা লোক পাঠালেন। তার কাছ থেকে ওর ছাগলগুলি এবং রাখালকে খরিদ ক'রে নিলেন। আর ঐ রাখালকে দাসত্ব থেকে মুক্ত ক'রে দিলেন। সেই সঙ্গে ছাগলগুলিকে তাকে হেবা ক'রে দিলেন।

📘 ছোটদের ছোট গল্প > 📄 আমানতদার মেয়ে

📄 আমানতদার মেয়ে


একদা উমার রাত্রিবেলায় ছদ্মবেশে শহরে ঘুরছিলেন। এক দুধ-ব্যবসায়ীর ঘর থেকে মা-বেটির আওয়াজ তাঁর কানে এল; মা মেয়েকে বলছে, 'দুধে পানি দিয়ে দে, বেশি হবে।'

মেয়ে বলছে, 'আমীরুল মু'মিনীন এক ঘোষক দ্বারা ঘোষণা করিয়েছেন যে, দুধে পানি মিশানো যাবে না।'

মা বলছে, 'এখানে না তোকে উমার দেখতে পাবে, আর না তাঁর ঘোষক।'

মেয়ে বলছে, 'না মা! লোকালয়ে যার বাধ্য, নির্জনে তার অবাধ্যতা করতে পারি না! তাঁরা দেখেননি, তাঁদের রব তো দেখছেন!'

এমন আমানতদারীর কথোপকথন শুনে খলীফা উমার ঐ মেয়েকে নিজের পুত্রবধূ ক'রে নিলেন। আর সেই মহিলার বংশসূত্রে জন্ম নিয়েছিলেন পঞ্চম খলীফা উমার বিন আব্দুল আযীয।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00