📄 এক ঢিলে তিন শিকার
এক বস্তুবাদী নাস্তিক এক ইমাম সাহেবের নিকট নিজের সন্দেহ পেশ করল। সে বলল,
(ক) যা দেখা যায় না, তা বিশ্বাস করি কীভাবে? সুতরাং আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি না।
(খ) আপনারা বলেন, 'শয়তান জাহান্নামে যাবে।' আবার বলেন, 'শয়তান আগুন থেকে সৃষ্টি।' তাহলে আগুনে আগুন শাস্তি বা কষ্ট পাবে কীভাবে?
(গ) আপনারা বলেন, 'দুনিয়ার যা কিছু ঘটে, তা আল্লাহর লিখিত তকদীর অনুযায়ী ঘটে। সুতরাং পাপ করলে মানুষ দায়ী বা দোষী হবে কেন?
বিচক্ষণ ইমাম সাহেব মুখে কিছু উত্তর না দিয়ে মাটির একটা ঢিল তুলে নিয়ে তার কপালে ছুড়ে মারলেন। লোকটি রাগে উত্তেজিত হয়ে উঠে বলল, 'আমি আপনার কাছে প্রশ্নের জবাব চাইলাম। আর আপনি জবাব না পেয়ে আমাকে ঢিল ছুড়ে মারলেন? আমি আপনার বিরুদ্ধে কাযীর কাছে নালিশ করব!'
ইমাম সাহেব গম্ভীরভাবে বললেন, 'ঢিল মেরেই তো আমি তোমার জবাব দিয়ে দিয়েছি। তুমি রাগলে কেন? তুমি কি ব্যথা পেয়েছ?'
---অবশ্যই।
---আমি বিশ্বাস করি না যে, তুমি ব্যথা পেয়েছ। কারণ যা দেখা যায় না, তা অবিশ্বাস্য।---এ কথা তোমারই। তাই না?
তাছাড়া তোমার ব্যথা পাওয়ারও তো কথা নয়। কারণ, তুমি মাটির সৃষ্টি। আর তোমাকে মাটি ছুড়ে মেরেছি। সুতরাং মাটির আঘাতে মাটির তো কষ্ট পাওয়ার কথা নয়। যেমন তুমি বলেছ, 'আগুনের সৃষ্টি শয়তান আগুন দ্বারা কষ্ট পাবে না।'
আর আমি তোমাকে মেরেছি বলে কাযীর কাছে নালিশ করবে কেন? আমার তো কোন দোষ নেই। যেহেতু যেটা ঘটেছে, সেটা তো আল্লাহর লিখিত তকদীর অনুযায়ীই ঘটেছে।
নাস্তিকটি ইমাম সাহেবের নিকট থেকে উচিত জবাব পেয়ে কপালে হাত রেখে বিদায় নিল।
📄 আল্লাহ রক্ষা করবেন
একদা এক মরুভূমিতে মরু-বাবলা গাছের উপর নিজের তরবারি লটকে রেখে তার ছায়ার নিচে বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছলেন আমাদের মহানবী। ইতিমধ্যে এক বেদুঈন দুশমন এসে তাঁর ঐ তলোয়ারটি হাতে নিয়ে তাঁর উপর তুলে ধরে বলল, 'ওহে মুহাম্মাদ! তুমি কি আমাকে ভয় পাও না?'
মহানবী নির্ভয়ে বললেন, 'না।'
বেদুঈন বলল, ' তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ।'
বেদুঈন আবার বলল, 'তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?'
তিনি পূর্বেকার মতই বললেন, 'আল্লাহ।'
বেদুঈন পুনরায় বলল, 'তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?'
তিনি পুনরায় বললেন, 'আল্লাহ।'
এরপর বেদুঈনের দেহ-মন কেঁপে উঠল। সহসা তার হাত থেকে তলোয়ারটি পড়ে গেল। মহানবী তা তুলে নিয়ে তার প্রতি তুলে ধরে বললেন, 'এবার তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?' বেদুঈন বলল, 'কেউ নয়।'
কিন্তু মহানবী তাকে ক্ষমা করে দিলেন।
📄 হস্তিবাহিনীর কাহিনী
হাবশার বাদশাহর তরফ থেকে ইয়ামান দেশে আবরাহা গভর্নর ছিল। সে 'সানআ'তে একটি খুব বড় গির্জা নির্মাণ করাল। আর চেষ্টা করল, যাতে লোকেরা মক্কার কাবাগৃহ ত্যাগ ক'রে ইবাদত ও হজ্জ-উমরাহর জন্য এখানে আসে। এ কাজ মক্কাবাসী তথা অন্যান্য আরব গোত্রের জন্য অপছন্দনীয় ছিল। অতএব বানী কিনানার একজন লোক আবরাহার নির্মাণকৃত উপাসনালয়ে পায়খানা ক'রে নোংরা ক'রে দিল। আবরাহার নিকট খবর পৌঁছল যে, গির্জাকে কেউ নোংরা ও অপবিত্র ক'রে দিয়েছে। যার প্রতিক্রিয়ায় সে কাবা ঘরকে ধ্বংস করার দৃঢ়সংকল্প ক'রে নিল। সে বহু সংখ্যক সৈন্যসহ মক্কার উপর হামলা করার উদ্দেশ্যে রওনা হল। কিছু হাতিও তাদের সাথে ছিল। মক্কার নিকট পৌঁছে সৈন্যরা মক্কার সর্দার নবী ﷺ-এর দাদার উটগুলি দখল ক'রে নিল। এ ব্যাপারে আব্দুল মুত্তালিব আবরাহাকে বললেন, 'আমার উটসমূহকে ফিরিয়ে দিন; যা আপনার সৈন্যরা ধরে রেখেছে।' (আবরাহা বলল, 'এখন আমরা তোমাদের কাবা ধ্বংস করতে এসেছি, আর তুমি কেবল উট ছেড়ে দেওয়ার দাবী কর?' তিনি বললেন, 'উটগুলি আমার। তাই আমি সেগুলির হিফাযত চাই।) বাকী থাকল কাবা ঘরের ব্যাপার যাকে আপনি ধ্বংস করতে এসেছেন, তো সেটা হল আপনার ব্যাপার আল্লাহর সাথে। কাবা হল আল্লাহর ঘর। তিনিই হলেন তার হিফাযতকারী। আপনি জানেন আর বায়তুল্লাহর মালিক আল্লাহ জানেন।'
অতঃপর যখন এই সৈন্যদল মিনার কাছে 'মুহাস্সার' উপত্যকার নিকট পৌঁছল, তখন আল্লাহ তাআলা একটি পাখির দলকে প্রেরণ করলেন, যাদের ঠোঁটে এবং পায়ে পোড়া মাটির কাঁকর ছিল, যা ছোলা অথবা মসুরীর দানা সমপরিমাণ ছিল। পাখিরা উপর থেকে সেই কাঁকর বর্ষণ করতে লাগল। যে সৈন্যকে এই কাঁকর লাগল, সে গলে গেল, তার শরীর হতে মাংস খসে পড়ল এবং পরিশেষে সে মারা গেল। 'সানআ' পৌঁছতে পৌঁছতে খোদ আবরাহারও একই পরিণাম হল। এইভাবে আল্লাহ তাআলা নিজ ঘরের হিফাযত করলেন।
📄 কিশোরের পাকা ঈমান
অতীতকালে এক বাদশার একটি যাদুকর ও গণক ছিল। যখন সে গণক বৃদ্ধ অবস্থায় উপনীত হল, তখন সে বাদশাহকে বলল, 'আমাকে একটি বুদ্ধিমান বালক দিন, যাকে আমি এই বিদ্যা শিক্ষা দেব।' সুতরাং বাদশাহ সেই রকম বুদ্ধিমান বালক খোঁজ ক'রে তাকে তার কাছে সমর্পণ করলেন। ঐ বালকের পথে এক পাদরিরও ঘর ছিল। বালকটি পথে আসা-যাওয়ার সময় সেই পাদরির নিকট গিয়ে বসত এবং তার কথা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করত, যা তাকে ভালও লাগত। এ ভাবেই তার আসা যাওয়া অব্যাহত থাকল। একদা এই বালকটির যাওয়ার পথে এক বৃহদাকার জন্তু (বাঘ অথবা সাপ) বসেছিল; যে মানুষের আসা-যাওয়ার রাস্তা বন্ধ ক'রে রেখেছিল। বালকটি চিন্তা করল, আজকে আমি পরীক্ষা করব যে, যাদুকর সত্য, না পাদরি। সে একটি পাথরের টুকরা কুড়িয়ে বলল, 'হে আল্লাহ! যদি পাদরির আমল তোমার নিকট যাদুকরের আমল থেকে উত্তম এবং পছন্দনীয় হয়, তাহলে এই জন্তুকে মেরে ফেল; যাতে মানুষের আসা-যাওয়ার পথ চালু হয়ে যায়।'
এই বলে বালকটি পাথর ছুড়লে জন্তুটি মারা গেল। এবার বালকটি পাদরির নিকট গিয়ে সব কথা বিস্তারিত বলল। পাদরি বললেন, 'হে বৎস! এবার দেখছি তুমি পূর্ণ দক্ষতায় পৌঁছে গেছ। এবার তোমার পরীক্ষা শুরু হতে চলেছে। কিন্তু এই পরীক্ষা অবস্থায় আমার নাম তুমি প্রকাশ করবে না।'
এই বালকটি জন্মান্ধত্ব, ধবল প্রভৃতি রোগের চিকিৎসাও করত; তবে তা আল্লাহর উপর বিশ্বাসের উপর শর্ত রেখেই করত। এই শর্তানুযায়ী বাদশার এক সহচরের অন্ধ চক্ষুকে আল্লাহর কাছে দুআ ক'রে ভাল ক'রে দিল। বালকটি বলত যে, 'যদি আপনি আল্লাহর উপর ঈমান আনেন, তাহলে আমি তাঁর নিকট দুআ করব; তিনি আরোগ্য দান করবেন।'
সুতরাং সে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা জানালে তিনি রোগীকে আরোগ্য দান করতেন। এই খবর বাদশাহর নিকট পৌঁছলে, তিনি বড় উদ্বিগ্ন হলেন। কিছু সংখ্যক ঈমানদারকে তিনি হত্যা ক'রে ফেললেন। আর এই বালকটির ব্যাপারে তিনি কয়েকটি লোককে ডেকে বললেন যে, 'এই বালকটিকে উঁচু পাহাড়ের উপর নিয়ে গিয়ে নিচে ফেলে দাও।' বালকটি আল্লাহর কাছে দুআ করলে পাহাড় কাঁপতে লাগল; যার কারণে সে ছাড়া সকলেই পড়ে মারা গেল। বাদশাহ তখন বালকটিকে অন্য কিছু লোকের কাছে সমর্পণ করে বললেন, 'একে একটি নৌকায় চড়িয়ে সমুদ্রের মধ্যস্থলে নিয়ে গিয়ে তাতে নিক্ষেপ কর।' সেখানেও বালকটির দুআর কারণে নৌকাটি উল্টে গেল। যার ফলে সকলে পানিতে ডুবে মারা গেল। কিন্তু বালকটি বেঁচে গেল। এবার বালকটি বাদশাকে বলল, 'যদি আপনি আমাকে হত্যাই করতে চান, তাহলে এর সঠিক পদ্ধতি হল এই যে, একটি খোলা ময়দানে লোকদেরকে জমায়েত করুন, আর "বিসমিল্লাহি রাব্বিল গুলাম" (অর্থাৎ, বালকের প্রভুর নামে আরম্ভ করছি) বলে আমার প্রতি তীর নিক্ষেপ করুন; দেখবেন আমি মৃত্যু বরণ করব।'
বাদশাহ তাই করলেন। যার কারণে বালকটি মৃত্যু বরণ করল। সেই ঘটনাস্থলেই লোকেরা সোচ্চার হয়ে বলে উঠল যে, 'আমরা এই বালকটির রবের (প্রভুর) উপর ঈমান আনলাম।'
বাদশাহ আরো অধিক উদ্বিগ্ন হলেন। অতএব তিনি তাদের জন্য একটি গর্ত খনন করিয়ে তাতে আগুন জ্বালাতে আদেশ করলেন। অতঃপর হুকুম দিলেন যে, 'যে ব্যক্তি ঈমান হতে ফিরে না আসবে, তাকে এই অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ কর।' এইভাবে ঈমানদার ব্যক্তিরা আসতে থাকল এবং আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে থাকল। পরিশেষে একটি মহিলার পালা এল, যার সঙ্গে তার বাচ্চাও ছিল। সে একটু পশ্চাৎপদ হল। কিন্তু বাচ্চাটি বলে উঠল, 'আম্মাজান! ধৈর্য ধরুন। আপনি সত্যের উপরে আছেন।' (সুতরাং সেও আগুনে শহীদ হয়ে গেল।)