📄 স্রষ্টার অস্তিত্ব
এক আস্তিক আলেমের সঙ্গে এক নাস্তিক পণ্ডিতের তর্কসভা হওয়ার কথা। সেখানে আস্তিক প্রমাণ করবেন, স্রষ্টা আছেন, আর নাস্তিক প্রমাণ করবে, তা নেই।
সভায় প্রচুর লোকের সমাগম ছিল। আস্তিক আলেম সভায় উপস্থিত হতে দেরি করছেন দেখে অনেকে ধারণা ক'রে বসল যে, তিনি হয়তো স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারবেন না।
তাঁর বাসা ছিল নদীর ওপাড়ে। এদিকে সভায় বড় উৎকণ্ঠার সাথে প্রতীক্ষা চলতে চলতে লোকেদের ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে যেতে লাগল। ইতিমধ্যে তিনি এসে উপস্থিত হলেন। সকলে তাঁকে ভর্ৎসনা করতে লাগল। নাস্তিক বলল, 'আসলে উনি স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারবেন না বিধায় দেরি ক'রে সভায় উপস্থিত হয়েছেন!'
আস্তিক বললেন, 'ভাই সকল! আপনারা হয়তো জানেন। আমার বাড়ি নদীর ওপাড়ে। এ পাড়ে আসার জন্য যথাসময়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম। কিন্তু নদীর ঘাটে এসে দেখি, কোন নৌকা-ওয়ালা নেই। তাই অপেক্ষা করতে করতে দেরি হয়ে গেল। অবশেষে কোন নৌকা-ওয়ালা পেলামও না। বহু অপেক্ষার পর দেখলাম, ঘাটের কাছে একটি বড় গাছ আপনা-আপনি পড়ে গেল। তারপর আপনা-আপনি পাটা তৈরি হল। আপনা-আপনি পাটাগুলি আপোসে জোড়া লেগে নৌকা তৈরি হয়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে পানিতে নেমে গেল। আমি তাতে চড়ে বসলাম। সেই নৌকা মাঝি-মাল্লা ছাড়া এ পাড়ে পার ক'রে দিল। আর তারপরই আমি আপনাদের সম্মুখে উপস্থিত হতে পেরেছি।' সভাস্থ প্রায় সকল জনতাই 'হো-হো' ক'রে হেসে উঠল। নাস্তিক বলে উঠল, 'উপস্থিত ভদ্রমণ্ডলী! আপনাদের কী মনে হয়? উনি কি একজন পাগল নন? কোন নৌকা কি নিজে নিজে তৈরি হয়ে বিনা মাঝি-মাল্লাতে নদী পার ক'রে দিতে পারে? আসলে উনি স্রষ্টাতে বিশ্বাসী হয়ে পাগল হয়ে গেছেন। আপনারা কেউ তাঁর কথায় বিশ্বাস করবেন না।'
আস্তিক আলেম বললেন, 'ভাই সকল! আপনারা ইনসাফের সাথে বিচার ক'রে বলুন, পাগল আমি, না উনি? আমি তো কেবল বলেছি, নদীর ধারে একটি নৌকা আপনা-আপনি তৈরি হয়ে নদীতে চলাচলের কথা। আর উনি যে বলেন, এ সারা বিশ্বজাহান, এ চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, এ আকাশ-বাতাস সব কিছু বিনা পরিচালক ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে। তাহলে উনি কি আমার চাইতে বেশি বড় পাগল নন?' সভায় উপস্থিত জনতা এমন যুক্তিযুক্ত জবাব শুনে আস্তিক আলেমকে সমর্থন করল।
📄 এক ঢিলে তিন শিকার
এক বস্তুবাদী নাস্তিক এক ইমাম সাহেবের নিকট নিজের সন্দেহ পেশ করল। সে বলল,
(ক) যা দেখা যায় না, তা বিশ্বাস করি কীভাবে? সুতরাং আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি না।
(খ) আপনারা বলেন, 'শয়তান জাহান্নামে যাবে।' আবার বলেন, 'শয়তান আগুন থেকে সৃষ্টি।' তাহলে আগুনে আগুন শাস্তি বা কষ্ট পাবে কীভাবে?
(গ) আপনারা বলেন, 'দুনিয়ার যা কিছু ঘটে, তা আল্লাহর লিখিত তকদীর অনুযায়ী ঘটে। সুতরাং পাপ করলে মানুষ দায়ী বা দোষী হবে কেন?
বিচক্ষণ ইমাম সাহেব মুখে কিছু উত্তর না দিয়ে মাটির একটা ঢিল তুলে নিয়ে তার কপালে ছুড়ে মারলেন। লোকটি রাগে উত্তেজিত হয়ে উঠে বলল, 'আমি আপনার কাছে প্রশ্নের জবাব চাইলাম। আর আপনি জবাব না পেয়ে আমাকে ঢিল ছুড়ে মারলেন? আমি আপনার বিরুদ্ধে কাযীর কাছে নালিশ করব!'
ইমাম সাহেব গম্ভীরভাবে বললেন, 'ঢিল মেরেই তো আমি তোমার জবাব দিয়ে দিয়েছি। তুমি রাগলে কেন? তুমি কি ব্যথা পেয়েছ?'
---অবশ্যই।
---আমি বিশ্বাস করি না যে, তুমি ব্যথা পেয়েছ। কারণ যা দেখা যায় না, তা অবিশ্বাস্য।---এ কথা তোমারই। তাই না?
তাছাড়া তোমার ব্যথা পাওয়ারও তো কথা নয়। কারণ, তুমি মাটির সৃষ্টি। আর তোমাকে মাটি ছুড়ে মেরেছি। সুতরাং মাটির আঘাতে মাটির তো কষ্ট পাওয়ার কথা নয়। যেমন তুমি বলেছ, 'আগুনের সৃষ্টি শয়তান আগুন দ্বারা কষ্ট পাবে না।'
আর আমি তোমাকে মেরেছি বলে কাযীর কাছে নালিশ করবে কেন? আমার তো কোন দোষ নেই। যেহেতু যেটা ঘটেছে, সেটা তো আল্লাহর লিখিত তকদীর অনুযায়ীই ঘটেছে।
নাস্তিকটি ইমাম সাহেবের নিকট থেকে উচিত জবাব পেয়ে কপালে হাত রেখে বিদায় নিল।
📄 আল্লাহ রক্ষা করবেন
একদা এক মরুভূমিতে মরু-বাবলা গাছের উপর নিজের তরবারি লটকে রেখে তার ছায়ার নিচে বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছলেন আমাদের মহানবী। ইতিমধ্যে এক বেদুঈন দুশমন এসে তাঁর ঐ তলোয়ারটি হাতে নিয়ে তাঁর উপর তুলে ধরে বলল, 'ওহে মুহাম্মাদ! তুমি কি আমাকে ভয় পাও না?'
মহানবী নির্ভয়ে বললেন, 'না।'
বেদুঈন বলল, ' তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?' তিনি বললেন, 'আল্লাহ।'
বেদুঈন আবার বলল, 'তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?'
তিনি পূর্বেকার মতই বললেন, 'আল্লাহ।'
বেদুঈন পুনরায় বলল, 'তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?'
তিনি পুনরায় বললেন, 'আল্লাহ।'
এরপর বেদুঈনের দেহ-মন কেঁপে উঠল। সহসা তার হাত থেকে তলোয়ারটি পড়ে গেল। মহানবী তা তুলে নিয়ে তার প্রতি তুলে ধরে বললেন, 'এবার তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে?' বেদুঈন বলল, 'কেউ নয়।'
কিন্তু মহানবী তাকে ক্ষমা করে দিলেন।
📄 হস্তিবাহিনীর কাহিনী
হাবশার বাদশাহর তরফ থেকে ইয়ামান দেশে আবরাহা গভর্নর ছিল। সে 'সানআ'তে একটি খুব বড় গির্জা নির্মাণ করাল। আর চেষ্টা করল, যাতে লোকেরা মক্কার কাবাগৃহ ত্যাগ ক'রে ইবাদত ও হজ্জ-উমরাহর জন্য এখানে আসে। এ কাজ মক্কাবাসী তথা অন্যান্য আরব গোত্রের জন্য অপছন্দনীয় ছিল। অতএব বানী কিনানার একজন লোক আবরাহার নির্মাণকৃত উপাসনালয়ে পায়খানা ক'রে নোংরা ক'রে দিল। আবরাহার নিকট খবর পৌঁছল যে, গির্জাকে কেউ নোংরা ও অপবিত্র ক'রে দিয়েছে। যার প্রতিক্রিয়ায় সে কাবা ঘরকে ধ্বংস করার দৃঢ়সংকল্প ক'রে নিল। সে বহু সংখ্যক সৈন্যসহ মক্কার উপর হামলা করার উদ্দেশ্যে রওনা হল। কিছু হাতিও তাদের সাথে ছিল। মক্কার নিকট পৌঁছে সৈন্যরা মক্কার সর্দার নবী ﷺ-এর দাদার উটগুলি দখল ক'রে নিল। এ ব্যাপারে আব্দুল মুত্তালিব আবরাহাকে বললেন, 'আমার উটসমূহকে ফিরিয়ে দিন; যা আপনার সৈন্যরা ধরে রেখেছে।' (আবরাহা বলল, 'এখন আমরা তোমাদের কাবা ধ্বংস করতে এসেছি, আর তুমি কেবল উট ছেড়ে দেওয়ার দাবী কর?' তিনি বললেন, 'উটগুলি আমার। তাই আমি সেগুলির হিফাযত চাই।) বাকী থাকল কাবা ঘরের ব্যাপার যাকে আপনি ধ্বংস করতে এসেছেন, তো সেটা হল আপনার ব্যাপার আল্লাহর সাথে। কাবা হল আল্লাহর ঘর। তিনিই হলেন তার হিফাযতকারী। আপনি জানেন আর বায়তুল্লাহর মালিক আল্লাহ জানেন।'
অতঃপর যখন এই সৈন্যদল মিনার কাছে 'মুহাস্সার' উপত্যকার নিকট পৌঁছল, তখন আল্লাহ তাআলা একটি পাখির দলকে প্রেরণ করলেন, যাদের ঠোঁটে এবং পায়ে পোড়া মাটির কাঁকর ছিল, যা ছোলা অথবা মসুরীর দানা সমপরিমাণ ছিল। পাখিরা উপর থেকে সেই কাঁকর বর্ষণ করতে লাগল। যে সৈন্যকে এই কাঁকর লাগল, সে গলে গেল, তার শরীর হতে মাংস খসে পড়ল এবং পরিশেষে সে মারা গেল। 'সানআ' পৌঁছতে পৌঁছতে খোদ আবরাহারও একই পরিণাম হল। এইভাবে আল্লাহ তাআলা নিজ ঘরের হিফাযত করলেন।