📄 গীবতের কাফফারা
অধিকাংশ উলামা বলেন: গীবতকারীর তাওবাহ্'র পন্থা এই যে, সে অভ্যাস পরিত্যাগ করবে এবং আর কখনো ঐ পাপ করবে না। যার গীবত করেছে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া শর্ত কি না এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, এটা শর্ত নয়। কারণ হয়তো সে এর কোন খবরই রাখে না। সুতরাং যখন সে তার কাছে ক্ষমা চাইতে যাবে তখন হয়তো সে দুঃখিত হবে। সুতরাং এর উৎকৃষ্ট পন্থা এই যে, যে মাজলিসে সে তার দোষ বর্ণনা করেছে সেই মাজলিসে তার গুণ বর্ণনা করবে। আর ঐ অন্যায় হতে সে যথাসাধ্য বিরত থাকবে। এটাই বিনিময় হয়ে যাবে। -ইবনু কাসীর ৪র্থ খণ্ড ২৭৬ পৃষ্ঠা
তবে গীবতের কাফ্ফারা সম্পর্কে বাইহাকীর মধ্যে একটি হাদীস পাওয়া যায় তা হচ্ছে-
عن أنس رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إن من كفارة الغيبة أن تستغفر لمن اغتبته تقول اللهم اغفر لنا وله *
আনাস রযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত; তিনি বলেন: রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: গীবতের কাফফারার একটি পদ্ধতি হচ্ছে, তুমি যার গীবত করেছো তার জন্য এভাবে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে: হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে ও তাকে মাফ করে দাও। -বাইহাকী
📄 গীবত পরিত্যাগের উপকারিতা
গীবত করা মুসলমানের গোস্ত খাওয়া সমতুল্য অপরাধ। অতএব যে ব্যক্তি গীবত ত্যাগ করে সে এক জঘন্য পাপ থেকে বেঁচে যায়।
গীবত করা যেনায় লিপ্ত হওয়ার চেয়েও জঘন্য অপরাধ। অতএব যে ব্যক্তি গীবত ত্যাগ করলো সে যেনার চাইতে মারাত্মক একটি অপরাধ থেকে নিজেকে রক্ষা করলো।
গীবতের ফলে রোযার মত একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ ইবাদাত নষ্ট হয়ে যায়। অতএব যে ব্যক্তি গীবত পরিহার করলো সে তার রোযাকে রক্ষা করলো।
গীবত ত্যাগের মাধ্যমে কোন ব্যক্তি হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে অর্থাৎ কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে যেতে পারে। কুরআন মাজীদে গীবতকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
যে ব্যক্তি নিজের বাকশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে না এবং মানুষের গীবত করে বেড়ায় সে পরিশেষে অপমানিত হয়। অতএব গীবত ত্যাগ করে নিজেকে অপমানের হাত থেকে বাঁচানো যায়।
কোন ব্যক্তি গীবত ত্যাগ করে নিজের অন্তরাত্মাকে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন রাখতে পারে। মহানাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
إِنَّ الْمُؤْمِنَ إِذَا أَذْنَبَ كَانَتْ نَقْطَةٌ سَودَاء فِي قَلْبِهِ *
“মু'মিন ব্যক্তি যখন কোন গুনাহের কাজ করে তখন তার অন্তরাত্মায় একটি কালো দাগ পড়ে যায়।” -ইবনু মাজাহ
অতএব কোন ব্যক্তি গীবত পরিহার করলে তার অন্তরে দাগ পড়তে পারে না। ফলে তার অন্তর নির্মল ও স্বচ্ছ থাকে।
যে ব্যক্তি গীবত করে না সে কিয়ামাতের দিন লজ্জিত ও অপমানিত হবে না। কারণ সে মানুষের মান-সম্মানে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থেকেছে।
গীবত ত্যাগ করলে নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য করা হয়। কেননা নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গীবত করতে নিষেধ করেছেন।
কেউ কারো অনুপস্থিতিতে গীবত করলে যার সামনে গীবত করা হয় তার উচিত, অনুপস্থিত ব্যক্তির সাহায্য করা। তাতে সাহায্যকারীই উপকৃত হবে।
عَنْ ابْنِ أُمَّ عَبْدٍ يَقُولُ مَنْ اغْتَيْبَ عِنْدَهُ مُؤْمِنٌ فَنَصَرَهُ جَزَاهُ اللهُ بِهَا خَيْرًا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَنْ اغْتَيْبَ عِنْدَهُ مُؤْمِنٌ فَلَمْ يَنصُرُهُ جَزَاهُ اللهُ بِهَا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ شَرَا وَمَا الْتَقَمَ أَحَدٌ لُقَمَةٍ شَرًّا مِنْ اغْتِيَابِ مُؤْمِنٌ إِنْ قَالَ فِيهِ مَا يُعْلَمُ فَقَدْ اغْيَابَهُ وَإِنْ قَالَ فِيْهِ بِمَا لَا يَعْلَمُ فَقَدْ بَهْتَهُ *
ইবনু উম্মি আবদ রযিআল্লাহু আনহু বলেনঃ কারো উপস্থিতিতে কোন মু'মিন ব্যক্তির গীবত করা হলে এবং সে তার অনুপস্থিত মু'মিনের সাহায্য করলে আল্লাহ তাকে এজন্য দুনিয়া ও আখিরাতে পুরস্কৃত করবেন। কারো উপস্থিতিতে কোন মু'মিন ব্যক্তির গীবত করা হলে এবং সে তার সাহায্য না করলে আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে এর মন্দ ফল (শাস্তি) ভোগ করাবেন। মু'মিন ব্যক্তির গীবতের চেয়ে মন্দ গ্রাস আর কেউ গ্রহণ করে না। সে যদি তার সম্পর্কে তার জ্ঞাত কথাই বলে তবে সে তার গীবতই করলো। আর সে যদি এমন কথা বলে যা সে জ্ঞাত নয়, তবে সে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটালো। -আল-আদাবুল মুফরাদ ৭৩৯ নং হাদীস। সানাদ সহীহ।
📄 যে সমস্ত দোষ বর্ণনা করা বৈধ
শারীআতের যৌক্তিকতায় কারো দোষের কথা আলোচনা করা গীবতের অন্তর্ভূক্ত নয়। যেমন সতর্ককরণ, উপদেশ দান, মঙ্গল কামনা এবং হাদীস যাঁচাই-বাছাই করার ক্ষেত্রে আলোচনা সমালোচনা। দোষ ত্রুটি প্রকাশ করে দেয়া, যেটা দ্বীন রক্ষা করার সহায়ক ও বিবাহ শাদীর ক্ষেত্রে। যেমন রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন পাপাচারী ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছিলেনঃ
انْذِنُوا لَهُ بِئْسَ أَخُرُ الْعَشِيرَةِ !
তোমরা তাকে আমার নিকট আসার অনুমতি দাও তবে সে তার গোত্রের মধ্যে মন্দ লোক।
যখন আবূ জাহাম ও মুয়াবিয়াহ রযিআল্লাহু আনহু তারা উভয়ে ফাতিমাহ বিনতু কাইস রযিআল্লাহু আনহা-এর বিবাহের প্রস্তাব দেন তখন নাবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেনঃ
أَمَّا مُعَاوِيَة فَصَعِلُوكَ وَأَمَّا أَبُو الْجَهْمِ فَلَا يَضَعُ عَصَاهُ مِنْ عَاتِقِهِ
মুয়াবিয়াহ দরিদ্র লোক আর আবুল জাহাম বড়ই প্রহারকারী ব্যক্তি। -ইবনু কাসীর ৪র্থ খণ্ড ২৭৩ পৃষ্ঠা
📄 ছয় কারনে গীবত করা বৈধ
ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ মুসলিম শরীফের ভাষ্যগ্রন্থে ও রিয়াদুস সলেহীন গ্রন্থে বিষয়টি আরো পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন : সৎ ও শারীআত সম্মত উদ্দেশ্য সাধন যদি গীবত ছাড়া সম্ভব না হয় তাহলে এ ধরনের গীবতে কোন দোষ নেই। ছয়টি কারণ এরূপ হতে পারে। এর অধিকাংশের উপর আলিমগণের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তার সমর্থনে মশহুর হাদীসসমূহ থেকে দলীল পেশ করা হয়েছে।
প্রথম কারণ : জুলুমের বিরুদ্ধে আবেদন পেশ করা। নির্যাতিত ব্যক্তি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক বা এমন সব লোকের কাছে যালিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করতে পারে যাদের যালিমকে দমন করার শক্তি বা কর্তৃত্ব এবং মজলুমের প্রতি ন্যায়বিচার করার ক্ষমতা আছে। এ ক্ষেত্রে সে বলতে পারে, অমুক ব্যক্তি আমার উপর জুলুম করেছে।
দ্বিতীয় কারণ : ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ এবং সৎকাজের মাধ্যমে গুনাহের কাজের সুযোগ বন্ধ করার জন্য সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার উদ্দেশ্যে কিছু বলা। এ উদ্দেশ্যে কারো কাছে, যার দ্বারা খোদাদ্রোহী কার্যকলাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে তার বিরুদ্ধে এভাবে বলা যে, অমুক ব্যক্তি এই রকম কাজ করছে। আপনি তাকে শাসিয়ে দিন। তার উদ্দেশ্য হবে শুধু অবৈধ কার্যকলাপ উদঘাটন ও তার প্রতিরোধ। এই রকম উদ্দেশ্য না থাকলে অযথা কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হারাম।
তৃতীয় কারণ : কোন বিষয়ে ফতওয়া চাওয়া। মুফতী সাহেবের কাছে গিয়ে বলা, আমার উপর আমার বাপ, ভাই, স্বামী অথবা অমুক ব্যক্তি এইভাবে জুলুম করছে। তার জন্য এসব করা কি উচিত? তার জুলুম থেকে আমার বাঁচার অধিকার আদায় করার এবং জুলুম প্রতিরোধ করার কি পন্থা আছে। প্রয়োজন বশত এসব কথা এবং এ ধরনের আরো কথা বলা জায়িয। কিন্তু সঠিক ও সর্বোত্তম পন্থা হলো এভাবে বলা যে, কোন ব্যক্তি অথবা কোন স্বামী যদি এরূপ আচরণ করে তবে তার ব্যাপারে আপনার অভিমত কি? কারণ এভাবে বললে কাউকে নির্দিষ্ট না করেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। এসব সত্ত্বেও ব্যক্তির নামোল্লেখ করাও জায়িয। যেমন হিন্দ আবু সুফিয়ান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলেন।
চতুর্থ কারণ : মুসলমানদেরকে খারাপ কাজের পরিণতি সম্পর্কে সাবধান করা এবং উপদেশ দেয়া। এটা কয়েকভাবে হতে পারেঃ
১) হাদীসের বর্ণনা এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ব্যাপারে যেসব ব্যক্তির দোষ-ত্রুটি আছে তা যাচাই বাছাই করে বলে দেয়া। মুসলমানদের ঐক্যমতের ভিত্তিতে এটা শুধু জায়িয নয়, বরং বিশেষ প্রয়োজন ও অবস্থায় ওয়াজিবও। যেমন কোন লোককে বিবাহের ব্যাপারে, কারো সাথে কোন বিষয়ে অংশীদার হওয়ার ব্যাপারে, আমানত ও লেনদেনের ব্যাপারে কিংবা কাউকে প্রতিবেশী বানানোর ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে পরামর্শদাতার কর্তব্য হলো তথ্য গোপন না করে বরং একান্তে তার সামনেই অভিমান প্রকাশ করা। যখন কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে দেখা যায় যে, সে শারীআত বিরোধী কাজে লিপ্ত ব্যক্তির ব্যাপারে সন্দেহ ও উৎকণ্ঠায় পতিত হয়েছে অথবা কোন ফাসিক ব্যক্তিকে তার কাছে জ্ঞানার্জন করতে দেখা যাচ্ছে এবং এই সুযোগে তার ঐ ব্যক্তির ক্ষতি করার আশঙ্কা থাকলে তখন তার কাছে উপদেশের মাধ্যমে ফাসিক ব্যক্তির স্বরূপ প্রকাশ করে দেয়া কর্তব্য। এসব ক্ষেত্রে ভুল বুঝাবুঝিরও যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে উপদেশ প্রদানকারীকে হিংসা-বিদ্বেষের শিকার হতে হয়। কখনও শাইতন তাকে ধোঁকা দিয়ে এই ধারণা সৃষ্টি করে যে, এটা নিছক উপদেশ বৈ কিছু নয়। সুতরাং ব্যাপারটাকে গভীর ও সূক্ষ্মভাবে অনুধাবন করে অগ্রসর হতে হবে।
২) কোন লোককে কোন বিষয়ে জিম্মাদার বা দায়িত্বশীল বানানো হলো কিন্তু সে তা পালনে অক্ষম অথবা সে ঐ পদের অনুপযুক্ত অথবা সে ফাসিক বা অলস ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে যার এসব বিষয়ে কর্তৃত্ব রয়েছে এবং যে ইচ্ছা করলে সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে কিংবা অন্য কোন যোগ্য লোককে দায়িত্ব দিতে পারে অথবা সে তাকে ডেকে নিয়ে তার যাবতীয় দুর্বলতা দেখিয়ে দিবে এবং সে সংশোধন হয়ে উপযুক্তভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে, এইরূপ লোকের নিকট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দোষ বলা বৈধ। এতে উর্ধতন কর্মকর্তা তার সম্পর্কে অমূলক ধারণা বা ধোঁকায় নিমজ্জিত হওয়া থেকে বাঁচতে পারবে। সে তাকে ডেকে নিয়ে এ কথাও বলতে পারে যে, হয় সে যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করবে নতুবা তাকে অব্যাহতি দেয়া হবে।
পঞ্চম কারণ : কোন ব্যক্তি প্রকাশ্যে ফাসেকী ও বিদ'আতী কাজ করে। যেমন প্রকাশ্যে মদ পান করে, মানুষের উপর যুলুম করে, কারো ধন-সম্পদ জোরপূর্বক হরণ করে, জনসাধারনের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে কর আদায় করে, অবৈধ কার্যকলাপে লিপ্ত হয় ইত্যাদি। এই ব্যক্তির কার্যকলাপের আলোচনা করা যাবে। কিন্তু তার কৃত কুকর্ম ছাড়া অন্য কিছু বলা জায়িয নয়। তবে উল্লেখিত কারণ ছাড়া অন্য কোন কারণ থাকলে ভিন্ন কথা।
ষষ্ঠ কারণ: পরিচয় দেয়া- কোন ব্যক্তিকে তার বিশেষ উপাধি বা তার কোন দৈহিক ত্রুটির উল্লেখ করে পরিচয় করিয়ে দেয়া জায়িয। যেমন রাতকানা, পঙ্গু, বধির, অন্ধ, টেরা ইত্যাদি। এভাবে কারো পরিচয় দেয়া জায়িয। তবে খাট করা বা অসম্মান করার উদ্দেশ্যে এসব শব্দ ব্যবহার করা হারাম। এসব ত্রুটির উল্লেখ ছাড়া অন্য কোনভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে পারলে সেটাই উত্তম।
উলামায়ি কিরাম এই ছয়টি কারণ বর্ণনা করেছেন। এর অধিকাংশই ঐক্যমত দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। প্রসিদ্ধ হাদীসসমূহে এসবের দলীল প্রমাণ রয়েছে।
এ ধরনের ব্যাপার দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা ব্যতীত সর্বক্ষেত্রেই গীবত হারাম ও কাবীরা গুনাহ। আল্লাহ আমাদের সকল মু'মিন মুসলিম ভাইদেরকে এসব গুনাহের কাজ থেকে মুক্ত রাখুন- আমীন ॥