📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ৩.১৬: সুলতান বাইবার্স এবং সপ্তম ক্রুসেড

📄 ৩.১৬: সুলতান বাইবার্স এবং সপ্তম ক্রুসেড


খ্রিষ্টান দুনিয়ার হৃদয় একদমই চুর হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় এক উন্মাদ রাজা তাদের আরও একবার ক্রুসেডযুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করে তোলে। ফ্রান্সের এই উন্মাদ রাজার নাম ছিল নবম লুইস। তবে লোকে তাকে সেন্ট লুই হিসেবেই চিনত। সে রোমান পোপের প্ররোচনায় ১২৪৮ খ্রিষ্টাব্দে সপ্তম ক্রুসেডের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে মিশর উপকূল অভিমুখে রণযাত্রা শুরু করে।

৬৪৭ হিজরিতে (১২৪৯ খ্রিষ্টাব্দ) সে মিশরের বন্দরনগরী দিময়াতে পৌঁছে তা অবরোধ করে ফেলে। সে-সময়ে মিশরের অবস্থা ভালো ছিল না। মিশরের বাদশাহ আল-মালিকুস সালিহ ভয়াবহ রকম অসুস্থ ছিলেন। যুদ্ধের মাঝামাঝি ১৫ শাবান ৬৪৮ হিজরিতে (১৬ এপ্রিল ১২৫০ খ্রিষ্টাব্দ) তার ইনতেকাল হয়ে যায়। তার ইনতেকালের পর তার স্ত্রী শাজারাতুদ দুর অসীম সাহসিকতার সাথে ক্রুসেডারদের মোকাবেলা করে যান। তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল বলতে হবে। কারণ, রুকনুদ্দীন বাইবার্সের মতন একজন সেনাপতি তার বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন। মুসলিমবাহিনী ক্রুসেডারদের চোখে শর্ষে ফুল দেখিয়ে দেয়। অবশেষে ২ মহররম ৬৪৮ হিজরিতে স্বয়ং সেন্ট লুই মানসুরাতে পরাজয় মেনে নিয়ে মুসলিমবাহিনীর হাতে বন্দি হয়। সেই সময় আল-মালিকুস সালিহের পুত্র আল-মালিকুল মুয়াজ্জাম তুরান শাহ পিতার স্থলাভিষিক্ত হয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেন। কিন্তু প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি নিহত হন। তার মৃত্যুর পর শাজারাতুদ দুর মিশরের শাসনক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এবং আগামী ১০ বছর ফ্রান্স থেকে কোনো যুদ্ধাভিযান বের হবে না—এই শর্তে ৬৪৮ হিজরিতে বড় অংকের ফিদিয়া গ্রহণ করে ফ্রান্সের রাজা সেন্ট লুইকে তিনি মুক্ত করে দেন।

১১ মাসের ব্যর্থ অভিযান, বন্দিত্ব বরণ, লাগাতার রোগ-শোক, তারও বেশি পরাজয়ের গ্লানি ফ্রান্সের রাজা সেন্ট লুইকে বাধ্য করে সবকিছু নতুন করে চিন্তা করতে। সে মুক্তিপ্রাপ্তির পর ফ্রান্সে ফিরে না গিয়ে বেশভূষা বদলে চার বছর ফিলিস্তিনে পড়ে থাকে। আর নিজের শোকতপ্ত হৃদয় জুড়ানোর সাথে সাথে মুসলমানদের সফলতার রহস্য ও তাদের দুর্বলতার অনুসন্ধানে নিরত থাকে। সেই সাথে সে শামের দুর্গগুলো, যা তখনও তাদের আয়ত্তে রয়ে গিয়েছিল, আরও মজবুত করতে উদ্যোগী হয়। চার বছরের গোপন মিশন শেষে সে ইউরোপ ফিরে গিয়ে নিজের ক্ষমতা বুঝে নেয়।

এই সময়টাতে মিশরের নতুন শাসক রুকনুদ্দীন বাইবার্স শাম উপকূলীয় অঞ্চলের অবশিষ্ট খ্রিষ্টান শাসকদের অস্তিত্ব নির্মূল-অভিযান অব্যাহত রাখেন। এবং তাদের সবচাইতে মজবুত দুর্গ আনতাকিয়া দখল করে নেন। আনতাকিয়া হাতছাড়া হলে সমগ্র ইউরোপজুড়ে ফের মাতম শুরু হয়ে যায়।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ৩.১৭: অষ্টম ক্রুসেড

📄 ৩.১৭: অষ্টম ক্রুসেড


প্রতিশোধপ্রবণ সেন্ট লুই ১৮ বছরের ব্যবধানে আরও একবার ক্রুসেডের অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। ৬৬৮ হিজরিতে (জুলাই ১২৭০ খ্রিষ্টাব্দ) সে অভিযান চালায়। কিন্তু ভাগ্য এবারেও তার সহায় হয় না। পরিস্থিতি থাকে তার সম্পূর্ণ প্রতিকূল। তিউনিসের একটি ব্যর্থ অবরোধ ছাড়া তার দ্বারা তেমন কিছুই আর হয়ে ওঠে না। উপরন্তু অবরোধকালে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তার সাহায্যে আগত ইংল্যান্ডের প্রিন্স অ্যাডওয়ার্ড ৬৭০ হিজরিতে (১২৭২ খ্রিষ্টাব্দ) কায়সারিয়ায় মুসলমানদের সাথে সন্ধি করে নেয়। এবং অষ্টম ক্রুসেডের সমাপ্তি ঘোষণা দিয়ে ইংল্যান্ড ফিরে যায়।

সেন্ট লুইয়ের পর ইউরোপের আর কোনো শাসকের হিম্মত হয়নি ক্রুসেডের নামে অস্ত্র হাতে নেওয়ার। ফলে অষ্টম ক্রুসেডে খ্রিষ্টানদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ক্রুসেড তার সমাপ্তিতে পৌঁছে। ৪২

এরও পরে, ৬৯০ হিজরিতে (১২৯১ খ্রিষ্টাব্দ) মিশরের বাদশাহ আল-মালিকুল খালিল সমগ্র শাম থেকে খ্রিষ্টান রাজ্যগুলো নিশ্চিহ্ন করে দিলে পঞ্চম হিজরি শতাব্দী পর্যন্ত চলমান ক্রুসেডের নাম ও নিশানা সম্পূর্ণতই নিঃশেষ হয়ে যায়।

টিকাঃ
৪২ দ্য ক্রুসেডস, হ্যারল্ড ল্যাম্ব, পৃষ্ঠা: ৪৪৬ থেকে ৪৫৬। 'সালিবি জঙ্গ' নামে গ্রন্থটির উরদু সংস্করণ প্রকাশ করেছে এদারায়ে মাআরিফে ইসলামিয়া।

ফন্ট সাইজ
15px
17px