📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ৩.১৩: পঞ্চম ক্রুসেড

📄 ৩.১৩: পঞ্চম ক্রুসেড


৬১৮ হিজরিতে আরও একবার ক্রুসেডের আগুন জ্বলে ওঠে। ইউরোপিয়ান বাহিনী এবারে অভিযানের জন্য নতুন রুট নির্বাচন করে। তারা পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল ধরে মিশরের গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ দিময়াত দখলে নিয়ে নেয়। দিময়াত ক্রুসেডারদের দখলে চলে গেলে সমস্ত মিশর এবং শাম খ্রিষ্টানদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবার শঙ্কা দেখা দেয়। এদিকে আবার যুদ্ধ চলাকালে মুসলিম শাসক আল-মালিকুল আদিলের ইনতেকাল হয়ে গেলে অবস্থা আরও বেগতিক হয়ে পড়ে। কিন্তু তার সন্তান আল-মালিকুল কামিল, আল-মালিকুল মুয়াজ্জম এবং আল-মালিকুল আশরাফ পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন এবং সম্মিলিত হামলার মাধ্যমে তারা ক্রুসেডারদের উচিত শিক্ষা দিতে সমর্থ হন।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ৩.১৪: ষষ্ঠ ক্রুসেড

📄 ৩.১৪: ষষ্ঠ ক্রুসেড


ষষ্ঠ ক্রুসেড সংঘটিত হয় হিজরি ৬২৪ সালে (১২২৮ খ্রিষ্টাব্দ)। এবার জার্মানির শাসক দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের নেতৃত্বে খ্রিষ্টানেরা মোর্চাবন্দি হয়। এই সময়টাতে মিশর এবং ফিলিস্তিনের শাসক আল-মালিকুল কামিল ও তার ভাই, দামেশকের শাসক আল- মালিকুল মুয়াজ্জামের মধ্যে বিবাদ চলছিল। এই কারণে ক্রুসেডারদের রণপ্রস্তুতির সংবাদে মুসলিমশিবিরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আল-মালিকুল কামিল যুদ্ধ থেকে বাঁচতে আল-কুদসকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জার্মানদের আয়ত্তে রাখতে চুক্তিবদ্ধ হন। তার এই সিদ্ধান্ত মুসলিমবিশ্বে শোকের অন্ধকার ছায়া হয়ে নেমে আসে।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ৩.১৫: আল-কুদসে আরও একবার

📄 ৩.১৫: আল-কুদসে আরও একবার


আঠারো বছর পর্যন্ত বাইতুল মাকদিস অযোগ্য মুসলিম শাসকদের রাজনৈতিক খেল- তামাশার ঘুঁটি হয়ে থাকে। তারা মুসলমানের প্রথম কেবলা ব্যবহার করে খ্রিষ্টীয় শক্তিকে খুশি রাখার মধ্য দিয়ে নিজেদের ক্ষমতার মসনদকেই কেবল পোক্ত করতে থাকে। বারবার খ্রিষ্টানশক্তির সাথে এই প্রতিশ্রুতির নবায়ন করাতে থাকে যে, বিপদের দিনে তারা তাদের পাশে থাকবে। ৬৩১ হিজরি নাগাদ অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়ে পড়ে, খ্রিষ্টানেরা তাদের খ্রিষ্টীয় আদব-লেহাজেরও জলাঞ্জলি দিয়ে স্থানীয় মুসলমানের নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে মসজিদুল আকসায় ঘণ্টাধ্বনি বাজাতে এবং কুব্বাতুস সাখরায় বসে মদপান করতেও দ্বিধা করে না; কিন্তু তাদের বাধা দেবার মতন কেউ ছিল না।

এই হৃদয়বিদারক ঘটনা মিশরের বীর শাসক আল-মালিকুস সালিহ নাজমুদ্দীনের আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তোলে। তিনি নিজে একটি বাহিনী প্রস্তুত করে সুলতান জালালুদ্দীন খাওয়ারিজম শাহের বংশধরদের কাছে খাওয়ারিজম বাহিনীর সামরিক সহায়তা চেয়ে পাঠান। খাওয়ারিজমি বাহিনী ৬৪২ হিজরিতে (১২৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) নিজেদের সেনানায়কদের নেতৃত্বে ফুরাত নদী পার হয়ে ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং বাইতুল মাকদিস নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। আর এভাবেই সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর আমানত 'মুক্ত বাইতুল মাকদিস' ফের মুসলমানদের হাতে আসে।

শামের খ্রিষ্টান রাজনীতিবিদরা যখন এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করল তখন এই ঘটনাকে ধর্মীয় বিজয় আখ্যা না দিয়ে ভূমিদখলের যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করে। এবং দামেশক ও অন্যান্য শহরের মুসলমান শাসকদেরকে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে এক নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এই সময় আল-মালিকুস সালিহ নাজমুদ্দীন তার প্রধান সেনাপতি রুকনুদ্দীন বাইবার্সকে বাহিনী-সমেত খাওয়ারিজমিদের সাহায্যের জন্য পাঠিয়ে দেন। জুমাদাল উলা ৬৪২ হিজরিতে গাজায় তিনি এক সফল অভিযান পরিচালনা করেন। সেই অভিযানে খাওয়ারিজমি এবং মিশরীয়রা সম্মিলিতভাবে খ্রিষ্টান ও তাদের মিত্র মুসলিমদের নিদারুণভাবে পর্যুদস্ত করে। খ্রিষ্টান ও মুসলিম জোট বাহিনী গাজার রণাঙ্গনে ৩০ লাখ সৈন্যের মৃতদেহ রেখে পলায়ন করতে বাধ্য হয়। আর এরই মধ্য দিয়ে বাইতুল মাকদিস-কেন্দ্রিক খ্রিষ্টানদের নাপাক স্বপ্ন ধুলোর সাথে মিশে যায়।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ৩.১৬: সুলতান বাইবার্স এবং সপ্তম ক্রুসেড

📄 ৩.১৬: সুলতান বাইবার্স এবং সপ্তম ক্রুসেড


খ্রিষ্টান দুনিয়ার হৃদয় একদমই চুর হয়ে গিয়েছিল। এমন সময় এক উন্মাদ রাজা তাদের আরও একবার ক্রুসেডযুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করে তোলে। ফ্রান্সের এই উন্মাদ রাজার নাম ছিল নবম লুইস। তবে লোকে তাকে সেন্ট লুই হিসেবেই চিনত। সে রোমান পোপের প্ররোচনায় ১২৪৮ খ্রিষ্টাব্দে সপ্তম ক্রুসেডের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে মিশর উপকূল অভিমুখে রণযাত্রা শুরু করে।

৬৪৭ হিজরিতে (১২৪৯ খ্রিষ্টাব্দ) সে মিশরের বন্দরনগরী দিময়াতে পৌঁছে তা অবরোধ করে ফেলে। সে-সময়ে মিশরের অবস্থা ভালো ছিল না। মিশরের বাদশাহ আল-মালিকুস সালিহ ভয়াবহ রকম অসুস্থ ছিলেন। যুদ্ধের মাঝামাঝি ১৫ শাবান ৬৪৮ হিজরিতে (১৬ এপ্রিল ১২৫০ খ্রিষ্টাব্দ) তার ইনতেকাল হয়ে যায়। তার ইনতেকালের পর তার স্ত্রী শাজারাতুদ দুর অসীম সাহসিকতার সাথে ক্রুসেডারদের মোকাবেলা করে যান। তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল বলতে হবে। কারণ, রুকনুদ্দীন বাইবার্সের মতন একজন সেনাপতি তার বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন। মুসলিমবাহিনী ক্রুসেডারদের চোখে শর্ষে ফুল দেখিয়ে দেয়। অবশেষে ২ মহররম ৬৪৮ হিজরিতে স্বয়ং সেন্ট লুই মানসুরাতে পরাজয় মেনে নিয়ে মুসলিমবাহিনীর হাতে বন্দি হয়। সেই সময় আল-মালিকুস সালিহের পুত্র আল-মালিকুল মুয়াজ্জাম তুরান শাহ পিতার স্থলাভিষিক্ত হয়ে ক্ষমতার মসনদে বসেন। কিন্তু প্রাসাদ-ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি নিহত হন। তার মৃত্যুর পর শাজারাতুদ দুর মিশরের শাসনক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। এবং আগামী ১০ বছর ফ্রান্স থেকে কোনো যুদ্ধাভিযান বের হবে না—এই শর্তে ৬৪৮ হিজরিতে বড় অংকের ফিদিয়া গ্রহণ করে ফ্রান্সের রাজা সেন্ট লুইকে তিনি মুক্ত করে দেন।

১১ মাসের ব্যর্থ অভিযান, বন্দিত্ব বরণ, লাগাতার রোগ-শোক, তারও বেশি পরাজয়ের গ্লানি ফ্রান্সের রাজা সেন্ট লুইকে বাধ্য করে সবকিছু নতুন করে চিন্তা করতে। সে মুক্তিপ্রাপ্তির পর ফ্রান্সে ফিরে না গিয়ে বেশভূষা বদলে চার বছর ফিলিস্তিনে পড়ে থাকে। আর নিজের শোকতপ্ত হৃদয় জুড়ানোর সাথে সাথে মুসলমানদের সফলতার রহস্য ও তাদের দুর্বলতার অনুসন্ধানে নিরত থাকে। সেই সাথে সে শামের দুর্গগুলো, যা তখনও তাদের আয়ত্তে রয়ে গিয়েছিল, আরও মজবুত করতে উদ্যোগী হয়। চার বছরের গোপন মিশন শেষে সে ইউরোপ ফিরে গিয়ে নিজের ক্ষমতা বুঝে নেয়।

এই সময়টাতে মিশরের নতুন শাসক রুকনুদ্দীন বাইবার্স শাম উপকূলীয় অঞ্চলের অবশিষ্ট খ্রিষ্টান শাসকদের অস্তিত্ব নির্মূল-অভিযান অব্যাহত রাখেন। এবং তাদের সবচাইতে মজবুত দুর্গ আনতাকিয়া দখল করে নেন। আনতাকিয়া হাতছাড়া হলে সমগ্র ইউরোপজুড়ে ফের মাতম শুরু হয়ে যায়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px