📄 ৩.১২: চতুর্থ ক্রুসেড
সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর পর আইয়ুবী সাম্রাজ্যের শাসন-ক্ষমতায় আসেন তার ভাই আল-মালিকুল আদিল। তার শাসনকালে রোমান পোপের উসকানিতে জার্মান শাসক হেনরি ষষ্ঠ চতুর্থ ক্রুসেডের পতাকা উড়িয়ে দেয় এবং ৫৯১ হিজরিতে (১১৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) শামে হামলা করতে উদ্যোগী হয়; কিন্তু আক্কা পৌঁছতেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। যার ফলে এই অভিযান আর সংঘর্ষ পর্যন্ত গড়ায় না। এবং তাদের এই চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
📄 ৩.১৩: পঞ্চম ক্রুসেড
৬১৮ হিজরিতে আরও একবার ক্রুসেডের আগুন জ্বলে ওঠে। ইউরোপিয়ান বাহিনী এবারে অভিযানের জন্য নতুন রুট নির্বাচন করে। তারা পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল ধরে মিশরের গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ দিময়াত দখলে নিয়ে নেয়। দিময়াত ক্রুসেডারদের দখলে চলে গেলে সমস্ত মিশর এবং শাম খ্রিষ্টানদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবার শঙ্কা দেখা দেয়। এদিকে আবার যুদ্ধ চলাকালে মুসলিম শাসক আল-মালিকুল আদিলের ইনতেকাল হয়ে গেলে অবস্থা আরও বেগতিক হয়ে পড়ে। কিন্তু তার সন্তান আল-মালিকুল কামিল, আল-মালিকুল মুয়াজ্জম এবং আল-মালিকুল আশরাফ পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন এবং সম্মিলিত হামলার মাধ্যমে তারা ক্রুসেডারদের উচিত শিক্ষা দিতে সমর্থ হন।
📄 ৩.১৪: ষষ্ঠ ক্রুসেড
ষষ্ঠ ক্রুসেড সংঘটিত হয় হিজরি ৬২৪ সালে (১২২৮ খ্রিষ্টাব্দ)। এবার জার্মানির শাসক দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের নেতৃত্বে খ্রিষ্টানেরা মোর্চাবন্দি হয়। এই সময়টাতে মিশর এবং ফিলিস্তিনের শাসক আল-মালিকুল কামিল ও তার ভাই, দামেশকের শাসক আল- মালিকুল মুয়াজ্জামের মধ্যে বিবাদ চলছিল। এই কারণে ক্রুসেডারদের রণপ্রস্তুতির সংবাদে মুসলিমশিবিরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আল-মালিকুল কামিল যুদ্ধ থেকে বাঁচতে আল-কুদসকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জার্মানদের আয়ত্তে রাখতে চুক্তিবদ্ধ হন। তার এই সিদ্ধান্ত মুসলিমবিশ্বে শোকের অন্ধকার ছায়া হয়ে নেমে আসে।
📄 ৩.১৫: আল-কুদসে আরও একবার
আঠারো বছর পর্যন্ত বাইতুল মাকদিস অযোগ্য মুসলিম শাসকদের রাজনৈতিক খেল- তামাশার ঘুঁটি হয়ে থাকে। তারা মুসলমানের প্রথম কেবলা ব্যবহার করে খ্রিষ্টীয় শক্তিকে খুশি রাখার মধ্য দিয়ে নিজেদের ক্ষমতার মসনদকেই কেবল পোক্ত করতে থাকে। বারবার খ্রিষ্টানশক্তির সাথে এই প্রতিশ্রুতির নবায়ন করাতে থাকে যে, বিপদের দিনে তারা তাদের পাশে থাকবে। ৬৩১ হিজরি নাগাদ অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়ে পড়ে, খ্রিষ্টানেরা তাদের খ্রিষ্টীয় আদব-লেহাজেরও জলাঞ্জলি দিয়ে স্থানীয় মুসলমানের নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে মসজিদুল আকসায় ঘণ্টাধ্বনি বাজাতে এবং কুব্বাতুস সাখরায় বসে মদপান করতেও দ্বিধা করে না; কিন্তু তাদের বাধা দেবার মতন কেউ ছিল না।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনা মিশরের বীর শাসক আল-মালিকুস সালিহ নাজমুদ্দীনের আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তোলে। তিনি নিজে একটি বাহিনী প্রস্তুত করে সুলতান জালালুদ্দীন খাওয়ারিজম শাহের বংশধরদের কাছে খাওয়ারিজম বাহিনীর সামরিক সহায়তা চেয়ে পাঠান। খাওয়ারিজমি বাহিনী ৬৪২ হিজরিতে (১২৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) নিজেদের সেনানায়কদের নেতৃত্বে ফুরাত নদী পার হয়ে ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং বাইতুল মাকদিস নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। আর এভাবেই সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর আমানত 'মুক্ত বাইতুল মাকদিস' ফের মুসলমানদের হাতে আসে।
শামের খ্রিষ্টান রাজনীতিবিদরা যখন এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করল তখন এই ঘটনাকে ধর্মীয় বিজয় আখ্যা না দিয়ে ভূমিদখলের যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করে। এবং দামেশক ও অন্যান্য শহরের মুসলমান শাসকদেরকে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে এক নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এই সময় আল-মালিকুস সালিহ নাজমুদ্দীন তার প্রধান সেনাপতি রুকনুদ্দীন বাইবার্সকে বাহিনী-সমেত খাওয়ারিজমিদের সাহায্যের জন্য পাঠিয়ে দেন। জুমাদাল উলা ৬৪২ হিজরিতে গাজায় তিনি এক সফল অভিযান পরিচালনা করেন। সেই অভিযানে খাওয়ারিজমি এবং মিশরীয়রা সম্মিলিতভাবে খ্রিষ্টান ও তাদের মিত্র মুসলিমদের নিদারুণভাবে পর্যুদস্ত করে। খ্রিষ্টান ও মুসলিম জোট বাহিনী গাজার রণাঙ্গনে ৩০ লাখ সৈন্যের মৃতদেহ রেখে পলায়ন করতে বাধ্য হয়। আর এরই মধ্য দিয়ে বাইতুল মাকদিস-কেন্দ্রিক খ্রিষ্টানদের নাপাক স্বপ্ন ধুলোর সাথে মিশে যায়।