📄 ৩.১১: তৃতীয় ক্রুসেড
আল-কুদস হাতছাড়া হয়ে গেছে, এই ঘটনায় ইউরোপজুড়ে বিরাট হাঙ্গামা শুরু হয়ে যায়। আল-কুদসের বিশপ পাদরি দ্বিতীয় উইলিয়াম একদল বিশপ ও শাসককে সাথে করে সামরিক শোকপ্রকাশের পোশাক পরিহিত অবস্থায় রোম পৌঁছে এবং প্রধান পোপের তত্ত্বাবধানে সমস্ত ইউরোপ সফর করে। সে মুসলিম নিপীড়নের কল্পকাহিনি শুনিয়ে বরফশীতল ইউরোপকে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করতে থাকে।
এই সময় সে কবিতা-শোকগাথা এবং ট্রাজিক গল্পকাহিনির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উসকে চলছিল কেবল নয়; বরং চিত্রশিল্পীদেরও সে ব্যবহার করছিল সমাজে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্ধ বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে। চিত্রশিল্পীদের মাধ্যমে সে মুসলমানদের এমন এক রূপ চিত্রিত করে, যে চিত্রে জনৈক আরবকে ঈসা আলাইহিস সালামের সাথে যুদ্ধরত দেখা যায়। আবার কিছু চিত্রে দেখানো হয় যে, ঈসা আলাইহিস সালাম সেই আরব ব্যক্তির হাতে নির্মমভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। তার শরীর থেকে অঝোরধারায় রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে আর তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন। লোকেরা এইসব মর্মান্তিক চিত্র দেখে ব্যথাতুর হয়ে পড়তো যখন, তখন পাদরি তাদের বলতো 'চিত্রের এই লোকটি হলো আরবের নবী। দেখো, কেমন নির্দয়ভাবে সে মাসিহকে প্রহার করছে। তার হাতেই মাসিহর জান চলে গেছে।' পাদরির মুখে এমন কথা শুনে লোকেরা শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠত।
এই ধরনের ড্রামাবাজিতে সুরের শাসক ৪১ কনার্ড মারকুইসের ভূমিকা ছিল সর্বাধিক। সে ইউরোপজুড়ে মুসলিম-বিদ্বেষের আগুনে হাওয়া দেবার জন্য এক নতুন অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। খ্রিষ্টান দুনিয়ার চোখে আল-কুদসের সেন্ট জন চার্চ ছিল তাদের আকিদা-বিশ্বাসের প্রধানকেন্দ্র। এই চার্চেই একটি কাল্পনিক কবর আছে। তাদের ধারণামতে কবরটি হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের। তাদের আকিদা হলো, হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে শূলিতে চড়ানোর পর এখানেই দাফন করে দেওয়া হয়। (নাউযুবিল্লাহ)
মারকুইস ইউরোপের সাধারণ মানুষদের উত্তেজিত করবার জন্য বিরাট এক চিত্র তৈরি করে। যেই চিত্রে দেখা যায়—একজন মুসলিম অশ্বারোহী মাসিহের কবরের উপর উঠছে এবং ঘোরার খুড়ের আঘাতে কবরের মাটি পিষে দিচ্ছে। শেষে ঘোড়া প্রস্রাব করে দিচ্ছে সেই কবরের উপর। দানবের মতন দেখতে এই চিত্রটি ইউরোপের নানা প্রান্তের ছোট-বড় জলসায় প্রদর্শিত হতে থাকে। এই ধরনের কল্পিত চিত্র মূর্তিপ্রেমী খ্রিষ্টানদের ভীষণভাবে উত্তেজিত করে তোলে।
শেষমেশ ৫৮৫ হিজরিতে (১১৮৯ খ্রিষ্টাব্দ) ইউরোপ থেকে ক্রুসেডার বাহিনী স্রোতের মতন বেরিয়ে শামের সীমান্তে আছড়ে পড়ে। লাগাতার চার বছর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবী যেই মাত্রার সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার সাথে এই ধ্বংসাত্মক লড়াইয়ের মোকাবেলা করেন, ইতিহাসের পাতায় তা চিরকাল ভাম্বর থাকবে। আক্কা উপকূল থেকে নিয়ে বাইতুল মাকদিসগামী প্রধান সড়ক পর্যন্ত অসংখ্য মুজাহিদ শাহাদাতের অমীয় সুধা মুখে তুলে নেন; কিন্তু খ্রিষ্টান বাহিনীকে পবিত্র ভূমি পর্যন্ত পৌঁছতে দেননি। অবশেষে যুদ্ধের ফল দাঁড়ায়—ক্রুসেড সেনাপতি রিচার্ডকে যথোচিত জবাব দেওয়া হয় এবং ইউরোপিয়ান শক্তি বিপুল ক্ষয়-ক্ষতির শিকার হয়ে শাবান ৫৮৮ হিজরিতে (সেপ্টেম্বর ১১৯২ খ্রিষ্টাব্দ) ব্যর্থ মনোরথে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
টিকাঃ
৪১ সুরের আরেক নাম টায়ার। সুর বা টায়ার বর্তমানে লেবাননের একটি শহর।
📄 ৩.১২: চতুর্থ ক্রুসেড
সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর পর আইয়ুবী সাম্রাজ্যের শাসন-ক্ষমতায় আসেন তার ভাই আল-মালিকুল আদিল। তার শাসনকালে রোমান পোপের উসকানিতে জার্মান শাসক হেনরি ষষ্ঠ চতুর্থ ক্রুসেডের পতাকা উড়িয়ে দেয় এবং ৫৯১ হিজরিতে (১১৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) শামে হামলা করতে উদ্যোগী হয়; কিন্তু আক্কা পৌঁছতেই তার মৃত্যু হয়ে যায়। যার ফলে এই অভিযান আর সংঘর্ষ পর্যন্ত গড়ায় না। এবং তাদের এই চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
📄 ৩.১৩: পঞ্চম ক্রুসেড
৬১৮ হিজরিতে আরও একবার ক্রুসেডের আগুন জ্বলে ওঠে। ইউরোপিয়ান বাহিনী এবারে অভিযানের জন্য নতুন রুট নির্বাচন করে। তারা পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল ধরে মিশরের গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ দিময়াত দখলে নিয়ে নেয়। দিময়াত ক্রুসেডারদের দখলে চলে গেলে সমস্ত মিশর এবং শাম খ্রিষ্টানদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবার শঙ্কা দেখা দেয়। এদিকে আবার যুদ্ধ চলাকালে মুসলিম শাসক আল-মালিকুল আদিলের ইনতেকাল হয়ে গেলে অবস্থা আরও বেগতিক হয়ে পড়ে। কিন্তু তার সন্তান আল-মালিকুল কামিল, আল-মালিকুল মুয়াজ্জম এবং আল-মালিকুল আশরাফ পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন এবং সম্মিলিত হামলার মাধ্যমে তারা ক্রুসেডারদের উচিত শিক্ষা দিতে সমর্থ হন।
📄 ৩.১৪: ষষ্ঠ ক্রুসেড
ষষ্ঠ ক্রুসেড সংঘটিত হয় হিজরি ৬২৪ সালে (১২২৮ খ্রিষ্টাব্দ)। এবার জার্মানির শাসক দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের নেতৃত্বে খ্রিষ্টানেরা মোর্চাবন্দি হয়। এই সময়টাতে মিশর এবং ফিলিস্তিনের শাসক আল-মালিকুল কামিল ও তার ভাই, দামেশকের শাসক আল- মালিকুল মুয়াজ্জামের মধ্যে বিবাদ চলছিল। এই কারণে ক্রুসেডারদের রণপ্রস্তুতির সংবাদে মুসলিমশিবিরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আল-মালিকুল কামিল যুদ্ধ থেকে বাঁচতে আল-কুদসকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জার্মানদের আয়ত্তে রাখতে চুক্তিবদ্ধ হন। তার এই সিদ্ধান্ত মুসলিমবিশ্বে শোকের অন্ধকার ছায়া হয়ে নেমে আসে।