📄 ৩.৮: ইমাদুদ্দীন জিনকী
বাইতুল মাকদিস হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় সমস্ত ইসলামি বিশ্বে হা-হুতাশ ও মাতম শুরু হয়ে যায়। কিন্তু মুসলিম শাসকগণ তার পুনরুদ্ধারে দীর্ঘদিন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে উঠতে পারেনি। বাইতুল মাকদিস পতনের ২৬ বছর পর ৫১৮ হিজরি মোতাবেক ১১২৪ খ্রিষ্টাব্দে ইমাদুদ্দীন জিনকী নামে একজন অপরিচিত 'কর্মকর্তা' ওয়াসিত এবং বসরার জায়গিরপ্রাপ্ত হন। ৫২৪ হিজরি সনে তিনি ফিরিঙ্গিদের মজবুত দুর্গ 'হিসনে আসারিব' দখল করে নেন। তার অব্যবহিত পরেই তিনি হারিমে হামলা করে বসেন। হারিমের গভর্নর বছরান্তে উসুলকৃত শুল্কের অর্ধেক দেওয়ার শর্তে সন্ধি করে নেন ইমাদুদ্দীন জিনকীর সাথে। এবং এই সন্ধির মধ্য দিয়ে সেখানকার মুসলমানদের খ্রিষ্টান জালিমদের নাগপাশ থেকে বের করে আনতে তিনি সমর্থ হন।
イমাদুদ্দীন জিনকী ৬ জামাদিউস সানি ৫৩৯ হিজরিতে (২৩ ডিসেম্বর ১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) রাহাও জয় করে নেন, ঐতিহাসিকগণ যে বিজয়কে অভিহিত করেছেন ফাতহুল ফুতুহ বা মহাবিজয় বলে। এই বিজয় ছিল দীর্ঘ বিরতির পর ক্রুসেডারদের শক্তিতে এক শক্ত চপেটাঘাত। তারা জিনকীর বিজয়াভিজানে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে বড় কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। কিন্তু তার আগেই ইমাদুদ্দীন জিনকীর ইনতেকাল হয়ে যায়।
📄 ৩.৯: নুরুদ্দীন জিনকী এবং দ্বিতীয় ক্রুসেড
ইমাদুদ্দীন জিনকীর পুত্র সুলতান নুরুদ্দীন জিনকী তার পিতার শুরু করে যাওয়া জিহাদের ধারা অব্যাহত রাখেন। এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লাগাতার বেশ কটি সফল অভিযান পরিচালনা করেন। জীবনাচার ও কর্মের বিবেচনায় নুরুদ্দীন জিনকী ইসলামি ইতিহাসের একজন মহত্তম শাসক। তার কালে ইসলামের পতাকা আরেকবার নতুন করে সমুন্নত হতে শুরু করে। আল-কুদসের পুনরুদ্ধারই ছিল নুরুদ্দীন জিনকীর জীবনের প্রধান স্বপ্ন ও লক্ষ্য।
জিনকী-পরিবারের বিজয়যাত্রার লাগাম টেনে ধরবার জন্য ইউরোপে আরও একবার ক্রুসেডযুদ্ধের নাকারা বেজে ওঠে। ৫৪২ হিজরিতে (১১৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) সেইন্ট বার্নাট ষষ্ঠ লুইয়ের নেতৃত্বে কয়েক লাখ জার্মান ও ফরাসি সৈন্য এশিয়ামাইনর (আনাতোলিয়া) সীমান্ত দিয়ে শামে প্রবেশ করে। আর এর মধ্য দিয়েই দ্বিতীয় ক্রুসেডের সূচনা ঘটে যায়। নুরুদ্দীন জিনকী এবং তার সহোদর সাইফুদ্দীন গাজী দামেশকের শাসক মুঈনুদ্দীন আনজীর সহায়তার জন্য পৌঁছে যান। ফলে মুসলিম শাসকদের ঐক্যের বদৌলতে ৫৪৪ হিজরিতে (১১৪৯ খ্রিষ্টাব্দ) ক্রুসেড বাহিনী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
📄 ৩.১০: সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবী এবং আল-কুদসের পুনরুদ্ধার
নুরুদ্দীন জিনকীর ইনতেকালের পর সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবী মিশর এবং শামকে একত্র করে বৃহত্তর আইয়ুবী সাম্রাজ্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামের এই মহান বীর রবিউস সানি ৫৮৩ হিজরিতে হিত্তিনের যুদ্ধে বিজয় লাভের মধ্য দিয়ে শামের খ্রিষ্টান-শক্তি ধুলোয় মিশিয়ে দেন। এবং ২৭ রজব ৫৮৩ হিজরিতে (সেপ্টেম্বর ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দ) বাইতুল মাকদিস জয় করে তিনি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্মানের আসন পাকাপোক্ত করে নেন।
📄 ৩.১১: তৃতীয় ক্রুসেড
আল-কুদস হাতছাড়া হয়ে গেছে, এই ঘটনায় ইউরোপজুড়ে বিরাট হাঙ্গামা শুরু হয়ে যায়। আল-কুদসের বিশপ পাদরি দ্বিতীয় উইলিয়াম একদল বিশপ ও শাসককে সাথে করে সামরিক শোকপ্রকাশের পোশাক পরিহিত অবস্থায় রোম পৌঁছে এবং প্রধান পোপের তত্ত্বাবধানে সমস্ত ইউরোপ সফর করে। সে মুসলিম নিপীড়নের কল্পকাহিনি শুনিয়ে বরফশীতল ইউরোপকে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করতে থাকে।
এই সময় সে কবিতা-শোকগাথা এবং ট্রাজিক গল্পকাহিনির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে উসকে চলছিল কেবল নয়; বরং চিত্রশিল্পীদেরও সে ব্যবহার করছিল সমাজে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্ধ বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে। চিত্রশিল্পীদের মাধ্যমে সে মুসলমানদের এমন এক রূপ চিত্রিত করে, যে চিত্রে জনৈক আরবকে ঈসা আলাইহিস সালামের সাথে যুদ্ধরত দেখা যায়। আবার কিছু চিত্রে দেখানো হয় যে, ঈসা আলাইহিস সালাম সেই আরব ব্যক্তির হাতে নির্মমভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন। তার শরীর থেকে অঝোরধারায় রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে আর তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন। লোকেরা এইসব মর্মান্তিক চিত্র দেখে ব্যথাতুর হয়ে পড়তো যখন, তখন পাদরি তাদের বলতো 'চিত্রের এই লোকটি হলো আরবের নবী। দেখো, কেমন নির্দয়ভাবে সে মাসিহকে প্রহার করছে। তার হাতেই মাসিহর জান চলে গেছে।' পাদরির মুখে এমন কথা শুনে লোকেরা শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠত।
এই ধরনের ড্রামাবাজিতে সুরের শাসক ৪১ কনার্ড মারকুইসের ভূমিকা ছিল সর্বাধিক। সে ইউরোপজুড়ে মুসলিম-বিদ্বেষের আগুনে হাওয়া দেবার জন্য এক নতুন অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। খ্রিষ্টান দুনিয়ার চোখে আল-কুদসের সেন্ট জন চার্চ ছিল তাদের আকিদা-বিশ্বাসের প্রধানকেন্দ্র। এই চার্চেই একটি কাল্পনিক কবর আছে। তাদের ধারণামতে কবরটি হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের। তাদের আকিদা হলো, হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে শূলিতে চড়ানোর পর এখানেই দাফন করে দেওয়া হয়। (নাউযুবিল্লাহ)
মারকুইস ইউরোপের সাধারণ মানুষদের উত্তেজিত করবার জন্য বিরাট এক চিত্র তৈরি করে। যেই চিত্রে দেখা যায়—একজন মুসলিম অশ্বারোহী মাসিহের কবরের উপর উঠছে এবং ঘোরার খুড়ের আঘাতে কবরের মাটি পিষে দিচ্ছে। শেষে ঘোড়া প্রস্রাব করে দিচ্ছে সেই কবরের উপর। দানবের মতন দেখতে এই চিত্রটি ইউরোপের নানা প্রান্তের ছোট-বড় জলসায় প্রদর্শিত হতে থাকে। এই ধরনের কল্পিত চিত্র মূর্তিপ্রেমী খ্রিষ্টানদের ভীষণভাবে উত্তেজিত করে তোলে।
শেষমেশ ৫৮৫ হিজরিতে (১১৮৯ খ্রিষ্টাব্দ) ইউরোপ থেকে ক্রুসেডার বাহিনী স্রোতের মতন বেরিয়ে শামের সীমান্তে আছড়ে পড়ে। লাগাতার চার বছর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে। সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবী যেই মাত্রার সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার সাথে এই ধ্বংসাত্মক লড়াইয়ের মোকাবেলা করেন, ইতিহাসের পাতায় তা চিরকাল ভাম্বর থাকবে। আক্কা উপকূল থেকে নিয়ে বাইতুল মাকদিসগামী প্রধান সড়ক পর্যন্ত অসংখ্য মুজাহিদ শাহাদাতের অমীয় সুধা মুখে তুলে নেন; কিন্তু খ্রিষ্টান বাহিনীকে পবিত্র ভূমি পর্যন্ত পৌঁছতে দেননি। অবশেষে যুদ্ধের ফল দাঁড়ায়—ক্রুসেড সেনাপতি রিচার্ডকে যথোচিত জবাব দেওয়া হয় এবং ইউরোপিয়ান শক্তি বিপুল ক্ষয়-ক্ষতির শিকার হয়ে শাবান ৫৮৮ হিজরিতে (সেপ্টেম্বর ১১৯২ খ্রিষ্টাব্দ) ব্যর্থ মনোরথে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
টিকাঃ
৪১ সুরের আরেক নাম টায়ার। সুর বা টায়ার বর্তমানে লেবাননের একটি শহর।