📄 ৩.৬: মুহাম্মদ আসাদের বিশ্লেষণ
নওমুসলিম মুহাম্মদ আসাদ তার বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ The Road to Mecca এর ভূমিকাতে লিখেছেন—ইউরোপের ইসলাম-বিদ্বেষের ম্যানুফেস্টো সেই কনফারেন্সেই লেখা হয়ে গিয়েছিল। আর ইসলাম-বিদ্বেষের সেই রক্তই তখন থেকে আজ পর্যন্ত ইউরোপিয়ানদের শিরা-উপশিরায় চলমান। মুহাম্মদ আসাদ লিখেছেন :
ক্রুসেডযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইউরোপিয়ানদের ধর্মীয় বন্ধন উন্নীত হয় এক নতুন সমতলে, যা সকল ইউরোপীয়রই সাধারণ লক্ষ্য: 'খ্রিষ্টান রাজের' রাষ্ট্রীয়-ধর্মীয় ধারণা। পরিণামে তা-ই জন্ম দেয় ইউরোপভিত্তিক সাংস্কৃতিক চেতনার। ১০৯৫ সালের নভেম্বরে পোপ দ্বিতীয় আরবান তার ক্লারমন্টের বিখ্যাত বক্তৃতায় যখন পবিত্র ভূমি দখল করে রাখা 'পাষণ্ড জাতির' বিরুদ্ধে খ্রিষ্টানদেরকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন তখনই তিনি সম্ভবত তার নিজের অজান্তেই পাশ্চাত্য সভ্যতার চার্টার বা সনদ ঘোষণা করে দেন এবং তার দৃষ্টিভঙ্গিও হাজির করে বসেন।৪০
টিকাঃ
৪০ দ্য রোড টু মক্কা, পৃষ্ঠা: ৬
📄 ৩.৭: প্রথম ক্রুসেড
প্রথম দফার আক্রমণে পাদরি পিটার ১৩ লাখ সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে আনাতোলিয়ার সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। কিন্তু কোনিয়ার শাসক কিলিজ আরসালান এই অসংগঠিত বাহিনীর সামনে রুখে দাঁড়ান এবং তাদের পরাজিত করে আনাতোলিয়া সীমান্ত থেকে তাড়িয়ে দেন।
এরপর ফ্রান্সের রাজা গডফ্রের নেতৃত্বে ১০ লাখ সৈন্যের সুবিন্যস্ত বাহিনী মুসলিম সীমান্ত অভিমুখে রওনা করে। এই বাহিনী ৪৮৯ হিজরিতে (১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দ) ইসলামি বিশ্বের সীমান্তে প্রবেশ করতে সমর্থ হয় এবং রজব ৪৯২ হিজরিতে বাইতুল মাকদিস অবরোধ করে নেয়। ৪২ দিনের অবরোধ শেষে ৪৯২ হিজরির শাবান মাসে (জুলাই ১০৯৯) ক্রুসেডাররা সক্ষম হয় বাইতুল মাকদাসের বুকে তাদের পতাকা উড়িয়ে দিতে। সে বড় নির্মম দৃশ্য ছিল! কেবল মসজিদে আকসার অভ্যন্তরেই ৭০ হাজার মুসলমানকে ক্রুসেডাররা নির্দয়ভাবে শহিদ করে দেয়। শহিদদের রক্তে ক্রুসেডারদের ঘোড়ার খুর পর্যন্ত নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।
শামের এই খ্রিষ্টীয় কর্মযজ্ঞ ধীরে ধীরে প্রসারিত হতে থাকে এবং সমগ্র শাম উপকূলের বড় বড় অঞ্চলজুড়ে খ্রিষ্টীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়; আর তার প্রধান কেন্দ্র হয় জেরুসালেম (আল-কুদস)।৩১
টিকাঃ
৩১ মূল বইয়ে ১০৮৫ খ্রিষ্টাব্দ উল্লেখ রয়েছে। বোধ করি এটা মুদ্রণজনিত ভুল।-অনুবাদক
📄 ৩.৮: ইমাদুদ্দীন জিনকী
বাইতুল মাকদিস হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় সমস্ত ইসলামি বিশ্বে হা-হুতাশ ও মাতম শুরু হয়ে যায়। কিন্তু মুসলিম শাসকগণ তার পুনরুদ্ধারে দীর্ঘদিন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে উঠতে পারেনি। বাইতুল মাকদিস পতনের ২৬ বছর পর ৫১৮ হিজরি মোতাবেক ১১২৪ খ্রিষ্টাব্দে ইমাদুদ্দীন জিনকী নামে একজন অপরিচিত 'কর্মকর্তা' ওয়াসিত এবং বসরার জায়গিরপ্রাপ্ত হন। ৫২৪ হিজরি সনে তিনি ফিরিঙ্গিদের মজবুত দুর্গ 'হিসনে আসারিব' দখল করে নেন। তার অব্যবহিত পরেই তিনি হারিমে হামলা করে বসেন। হারিমের গভর্নর বছরান্তে উসুলকৃত শুল্কের অর্ধেক দেওয়ার শর্তে সন্ধি করে নেন ইমাদুদ্দীন জিনকীর সাথে। এবং এই সন্ধির মধ্য দিয়ে সেখানকার মুসলমানদের খ্রিষ্টান জালিমদের নাগপাশ থেকে বের করে আনতে তিনি সমর্থ হন।
イমাদুদ্দীন জিনকী ৬ জামাদিউস সানি ৫৩৯ হিজরিতে (২৩ ডিসেম্বর ১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) রাহাও জয় করে নেন, ঐতিহাসিকগণ যে বিজয়কে অভিহিত করেছেন ফাতহুল ফুতুহ বা মহাবিজয় বলে। এই বিজয় ছিল দীর্ঘ বিরতির পর ক্রুসেডারদের শক্তিতে এক শক্ত চপেটাঘাত। তারা জিনকীর বিজয়াভিজানে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে বড় কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। কিন্তু তার আগেই ইমাদুদ্দীন জিনকীর ইনতেকাল হয়ে যায়।
📄 ৩.৯: নুরুদ্দীন জিনকী এবং দ্বিতীয় ক্রুসেড
ইমাদুদ্দীন জিনকীর পুত্র সুলতান নুরুদ্দীন জিনকী তার পিতার শুরু করে যাওয়া জিহাদের ধারা অব্যাহত রাখেন। এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লাগাতার বেশ কটি সফল অভিযান পরিচালনা করেন। জীবনাচার ও কর্মের বিবেচনায় নুরুদ্দীন জিনকী ইসলামি ইতিহাসের একজন মহত্তম শাসক। তার কালে ইসলামের পতাকা আরেকবার নতুন করে সমুন্নত হতে শুরু করে। আল-কুদসের পুনরুদ্ধারই ছিল নুরুদ্দীন জিনকীর জীবনের প্রধান স্বপ্ন ও লক্ষ্য।
জিনকী-পরিবারের বিজয়যাত্রার লাগাম টেনে ধরবার জন্য ইউরোপে আরও একবার ক্রুসেডযুদ্ধের নাকারা বেজে ওঠে। ৫৪২ হিজরিতে (১১৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) সেইন্ট বার্নাট ষষ্ঠ লুইয়ের নেতৃত্বে কয়েক লাখ জার্মান ও ফরাসি সৈন্য এশিয়ামাইনর (আনাতোলিয়া) সীমান্ত দিয়ে শামে প্রবেশ করে। আর এর মধ্য দিয়েই দ্বিতীয় ক্রুসেডের সূচনা ঘটে যায়। নুরুদ্দীন জিনকী এবং তার সহোদর সাইফুদ্দীন গাজী দামেশকের শাসক মুঈনুদ্দীন আনজীর সহায়তার জন্য পৌঁছে যান। ফলে মুসলিম শাসকদের ঐক্যের বদৌলতে ৫৪৪ হিজরিতে (১১৪৯ খ্রিষ্টাব্দ) ক্রুসেড বাহিনী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।