📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ৩.৫: ক্লারমন্ট কনফারেন্স

📄 ৩.৫: ক্লারমন্ট কনফারেন্স


খ্রিষ্টান পাদরিরা নিজেদের সম্প্রদায়কে উসকে দেবার উদ্দেশ্যে এই প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে দেয়, মুসলমানেরা আল-কুদসে আমাদের পবিত্র নিদর্শনাবলির অপমান করছে এবং ইউরোপিয়ান দর্শনার্থীদের সাথে যাচ্ছেতাই আচরণ করছে। তাদের বর্ণিত এই 'যাচ্ছেতাই আচরণ'-এর বাস্তবতা কেবল এতটুকু ছিল যে, ইউরোপিয়ান দর্শনার্থীদের একটি সুশৃঙ্খল নিয়মের আওতায় আনবার উদ্দেশ্যে মুসলিম কর্তব্যক্তিরা কিছু আইনের উপর সাময়িক জোর দিচ্ছিলেন।

এমন অবস্থায় ইউরোপের এক পাগল যাজক পিটার আল-কুদস সফর করে। এবং সফর শেষে ইউরোপ ফিরে গিয়ে সে তার অগ্নিগর্ভ উত্তেজক বক্তৃতার মাধ্যমে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিষ উগড়ে দিয়ে সমস্ত ইউরোপকে উসকে দিতে থাকে। স্বয়ং পোপও তার কথায় প্রভাবিত হয়ে পড়ে।

পোপ আরবান দ্বিতীয় জুলকাদা ৫৪৪ হিজরিতে (নভেম্বর ১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) ফ্রান্সের ক্লারমন্ট শহরে বিরাট এক ধর্মীয় কনফারেন্স আহ্বান করে ইউরোপিয়ান শাসকদের আল-কুদস পুনরুদ্ধারের জন্য উত্তেজিত করে তোলে। আর তাদের উদ্দেশ্যে বলে, যে ব্যক্তি ক্রুশ ঊর্ধ্বে তুলে এই লড়াইয়ে অংশ নেবে না, সে খ্রিষ্টের অনুসারী হিসেবে আর গণ্য হবে না। ইউরোপিয়ান শাসকেরা পাদরিদের এমন উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে পড়ে। অবশেষে ১৫ আগস্ট শুক্রবার ১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দে পোপ আরবান দ্বিতীয় ভ্যানিসে (Venice) বসে প্রথম ক্রুসেডের ঘোষণা দিয়ে দেয়।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ৩.৬: মুহাম্মদ আসাদের বিশ্লেষণ

📄 ৩.৬: মুহাম্মদ আসাদের বিশ্লেষণ


নওমুসলিম মুহাম্মদ আসাদ তার বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ The Road to Mecca এর ভূমিকাতে লিখেছেন—ইউরোপের ইসলাম-বিদ্বেষের ম্যানুফেস্টো সেই কনফারেন্সেই লেখা হয়ে গিয়েছিল। আর ইসলাম-বিদ্বেষের সেই রক্তই তখন থেকে আজ পর্যন্ত ইউরোপিয়ানদের শিরা-উপশিরায় চলমান। মুহাম্মদ আসাদ লিখেছেন :

ক্রুসেডযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইউরোপিয়ানদের ধর্মীয় বন্ধন উন্নীত হয় এক নতুন সমতলে, যা সকল ইউরোপীয়রই সাধারণ লক্ষ্য: 'খ্রিষ্টান রাজের' রাষ্ট্রীয়-ধর্মীয় ধারণা। পরিণামে তা-ই জন্ম দেয় ইউরোপভিত্তিক সাংস্কৃতিক চেতনার। ১০৯৫ সালের নভেম্বরে পোপ দ্বিতীয় আরবান তার ক্লারমন্টের বিখ্যাত বক্তৃতায় যখন পবিত্র ভূমি দখল করে রাখা 'পাষণ্ড জাতির' বিরুদ্ধে খ্রিষ্টানদেরকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন তখনই তিনি সম্ভবত তার নিজের অজান্তেই পাশ্চাত্য সভ্যতার চার্টার বা সনদ ঘোষণা করে দেন এবং তার দৃষ্টিভঙ্গিও হাজির করে বসেন।৪০

টিকাঃ
৪০ দ্য রোড টু মক্কা, পৃষ্ঠা: ৬

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ৩.৭: প্রথম ক্রুসেড

📄 ৩.৭: প্রথম ক্রুসেড


প্রথম দফার আক্রমণে পাদরি পিটার ১৩ লাখ সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে আনাতোলিয়ার সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। কিন্তু কোনিয়ার শাসক কিলিজ আরসালান এই অসংগঠিত বাহিনীর সামনে রুখে দাঁড়ান এবং তাদের পরাজিত করে আনাতোলিয়া সীমান্ত থেকে তাড়িয়ে দেন।

এরপর ফ্রান্সের রাজা গডফ্রের নেতৃত্বে ১০ লাখ সৈন্যের সুবিন্যস্ত বাহিনী মুসলিম সীমান্ত অভিমুখে রওনা করে। এই বাহিনী ৪৮৯ হিজরিতে (১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দ) ইসলামি বিশ্বের সীমান্তে প্রবেশ করতে সমর্থ হয় এবং রজব ৪৯২ হিজরিতে বাইতুল মাকদিস অবরোধ করে নেয়। ৪২ দিনের অবরোধ শেষে ৪৯২ হিজরির শাবান মাসে (জুলাই ১০৯৯) ক্রুসেডাররা সক্ষম হয় বাইতুল মাকদাসের বুকে তাদের পতাকা উড়িয়ে দিতে। সে বড় নির্মম দৃশ্য ছিল! কেবল মসজিদে আকসার অভ্যন্তরেই ৭০ হাজার মুসলমানকে ক্রুসেডাররা নির্দয়ভাবে শহিদ করে দেয়। শহিদদের রক্তে ক্রুসেডারদের ঘোড়ার খুর পর্যন্ত নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।

শামের এই খ্রিষ্টীয় কর্মযজ্ঞ ধীরে ধীরে প্রসারিত হতে থাকে এবং সমগ্র শাম উপকূলের বড় বড় অঞ্চলজুড়ে খ্রিষ্টীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়; আর তার প্রধান কেন্দ্র হয় জেরুসালেম (আল-কুদস)।৩১

টিকাঃ
৩১ মূল বইয়ে ১০৮৫ খ্রিষ্টাব্দ উল্লেখ রয়েছে। বোধ করি এটা মুদ্রণজনিত ভুল।-অনুবাদক

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ৩.৮: ইমাদুদ্দীন জিনকী

📄 ৩.৮: ইমাদুদ্দীন জিনকী


বাইতুল মাকদিস হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায় সমস্ত ইসলামি বিশ্বে হা-হুতাশ ও মাতম শুরু হয়ে যায়। কিন্তু মুসলিম শাসকগণ তার পুনরুদ্ধারে দীর্ঘদিন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে উঠতে পারেনি। বাইতুল মাকদিস পতনের ২৬ বছর পর ৫১৮ হিজরি মোতাবেক ১১২৪ খ্রিষ্টাব্দে ইমাদুদ্দীন জিনকী নামে একজন অপরিচিত 'কর্মকর্তা' ওয়াসিত এবং বসরার জায়গিরপ্রাপ্ত হন। ৫২৪ হিজরি সনে তিনি ফিরিঙ্গিদের মজবুত দুর্গ 'হিসনে আসারিব' দখল করে নেন। তার অব্যবহিত পরেই তিনি হারিমে হামলা করে বসেন। হারিমের গভর্নর বছরান্তে উসুলকৃত শুল্কের অর্ধেক দেওয়ার শর্তে সন্ধি করে নেন ইমাদুদ্দীন জিনকীর সাথে। এবং এই সন্ধির মধ্য দিয়ে সেখানকার মুসলমানদের খ্রিষ্টান জালিমদের নাগপাশ থেকে বের করে আনতে তিনি সমর্থ হন।

イমাদুদ্দীন জিনকী ৬ জামাদিউস সানি ৫৩৯ হিজরিতে (২৩ ডিসেম্বর ১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) রাহাও জয় করে নেন, ঐতিহাসিকগণ যে বিজয়কে অভিহিত করেছেন ফাতহুল ফুতুহ বা মহাবিজয় বলে। এই বিজয় ছিল দীর্ঘ বিরতির পর ক্রুসেডারদের শক্তিতে এক শক্ত চপেটাঘাত। তারা জিনকীর বিজয়াভিজানে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে বড় কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। কিন্তু তার আগেই ইমাদুদ্দীন জিনকীর ইনতেকাল হয়ে যায়।

ফন্ট সাইজ
15px
17px