📄 ৩.১: সংজ্ঞা
ক্রুসেড-একটি বিশেষ পরিভাষা। অজস্র লড়াই সংঘটিত হয়েছে মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে; কিন্তু তার সবটাকেই ক্রুসেড বলা হয় না। ক্রুসেডের পারিভাষিক পরিচিতি হলো : الحروب الصليبية التي دعا اليها رجال دين النصارى والقساوسة ضد المسلمين باسم الصليب وتحت رأيته ক্রুসেড সেই যুদ্ধ, খ্রিষ্টান পাদরি ও ধর্মযাজকরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যার আহ্বান করে থাকে। এবং ক্রুশের নামে জীবন-মরণ পণ করে যেই যুদ্ধ লড়ে যাওয়া হয়।
📄 ৩.২: ক্রুসেডের সময়কাল
হিজরি ৪৮৯ সালে শুরু হয়ে ৬৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই শতাব্দীকালজুড়ে চলমান থাকে এই যুদ্ধ। তবে এর পরিকল্পনার শুরু মূল ক্রুসেড শুরু হবার প্রায় দেড় শতাব্দীকাল পূর্বে। আব্বাসী খেলাফতের দুর্বলতার রূপ ধরেই মূলত ক্রুসেডের প্রথম অনুঘটক তৈরি হয়ে যায়। এটা হিজরি চতুর্থ শতকের কথা। আব্বাসী খলিফারা ক্ষমতা হারিয়ে দাইলামী শিয়া আমিরদের খেলার পুতুলে পরিণত হয়ে পড়েন। আর ইসলামি বিশ্ব বহুধাবিভক্ত হয়ে ক্রমেই দুর্বল হতে থাকে।
মুসলমানদের এই দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগায় তৎকালীন রোম সম্রাটের প্রধানসেনাপতি নেকোফোর্স (তিগফুর)। ইসলামি বিশ্বের সীমান্তে সে অভিযান শুরু করে। এমনকি শাম-তীরবর্তী অঞ্চল সে নিজের দখলে নিয়ে নেয়। কেবল একজন মুসলিম শাসক, সাইফুদ্দৌলা তার মোকাবেলায় টিকে থাকেন এবং প্রাণপণ জিহাদ চালিয়ে যান। ৩৫৬ হিজরিতে সাইফুদ্দৌলার ইনতেকাল হলে খ্রিষ্টীয় শক্তির দুঃসাহস আরও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ৩৬১ হিজরি নাগাদ দিয়ারে বকর পর্যন্ত অঞ্চল তাদের দখলে চলে যায়।
এই যুদ্ধগুলোকে ক্রুসেড বলা হয় না যদিও; কিন্তু ক্রুসেডের ভূমিকা বা সূচনাপর্ব হিসেবে তাকে অভিহিত করা যেতেই পারে। খ্রিষ্টীয় শক্তি যদিও-বা এইসব বিজয় থেকে তেমন কোনো লাভ তাদের ঘরে তুলতে পারে না, মুসলমানেরা অল্পদিনের বিরতিতেই তাদের হারানো ভূমি পুনরুদ্ধার করে নেয়; তবু এই যুদ্ধগুলোতে মুসলমানদের ক্ষতি যা হয়, খ্রিষ্টানশক্তির প্রবল বিশ্বাস জন্মে যায় যে, মুসলমান কোনো অপরাজেয় শক্তি নয়। তাদেরও পতন সম্ভব এবং তা শুরু হয়ে গেছে। আর এর পরপরই হিজরি পঞ্চম শতকের শেষদিকে মূল ক্রুসেড শুরু হয়। সুতরাং বোঝাই যায়, এই আত্মবিশ্বাসটুকু অর্জন সাফল্য হিসেবে খ্রিষ্টানশক্তির জন্য কম কিছু ছিল না।
📄 ৩.৩: ক্রুসেডের কারণসমূহ
খেলাফতে রাশেদার সময়ে মুসলমানেরা রোমান সাম্রাজ্যে আঘাত হেনে খ্রিষ্টানদের ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত উমরের সময় থেকে ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিও মুসলমানদের আয়ত্তে থাকে। খ্রিষ্টীয় ধারণা অনুসারে আল-কুদস হলো হজরত ঈসা মাসিহের পবিত্র মাজার। যার ফলে তাদের কাছে পবিত্রতম স্থান হিসেবে তা পরিগণিত হয়ে আসছিল। খ্রিষ্টানরা তাদের এই পবিত্র ও ধর্মীয় কেন্দ্রভূমির পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখে আসছিল শত বছর ধরে। কিন্তু মুসলমানদের উপর তাদের কোনো কৌশলই কাজে আসছিল না। তা ছাড়া হিজরি প্রথম শতকের আঘাত রোমান ও বাইজান্টাইনদের অনুভূতিতে তখনও জাগরূক ছিল। আবার মুসলমানদের উন্নতি, অগ্রগতি ও সাফল্যও তাদের মধ্যে হিংসার বারুদ তপ্ত করে তুলছিল। তারা মনেপ্রাণে কামনা করছিল—কোনো উপায়ে যদি সে-সব নেয়ামত তাদের দখলে চলে আসত! শত বছরের প্রতিশোধপরায়ণ মানসিকতা এবং সম্পদ ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষাই ছিল ক্রুসেডযুদ্ধের প্রধান অনুঘটক। এই প্রধান অনুঘটকের সাথে যখন আরও কিছু কার্যকারণ যুক্ত হয়ে পড়ল তখন ক্রুসেডের আগুন টগবগিয়ে উঠল। আর যুদ্ধের সেই আগুনে হাওয়া দেবার পেছনে তাৎক্ষণিক যেই কার্যকারণগুলো উপস্থিত ছিল :
১. দুই শতাব্দীকাল ধরে মিশর ও উত্তর আফ্রিকাতে শিয়াগোত্রীয় বনু উবাইদের শাসন চলে আসছিল, যারা খেলাফতের দাবি করে নিজেদের শাসনব্যবস্থার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছিল ফাতেমি খেলাফত নামে। তখন শাম থেকে খোরাসান পর্যন্ত যে-সকল সেলজুক সুলতান ও আব্বাসী খলিফা (যারা সকলেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের চিন্তা-বিশ্বাসের লালনকারী ছিলেন) শাসন করছিলেন, বনু উবাইদ তাদের কট্টর বিরোধী হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই বিরোধিতার সূত্র ধরেই ৪৬২ হিজরিতে উবাইদি শাসকেরা ক্রুসেডারদের ফুসলাতে থাকে শামে আক্রমণ করবার জন্য, যাতে তাদের বিরোধীশক্তি সেলজুক শাসকগোষ্ঠী দুর্বল হয়ে পড়ে।
২. ৪৬৩ হিজরি সনে সেলজুক সাম্রাজ্যের বাহাদুর সুলতান আলপ আরসালান রোমান শাসক রোমানোস ডায়োজিনিসকে এমন বেকায়দায় ফেলেন যে, কনস্টান্টিনোপলের সম্মান-মর্যাদা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি মাটির সাথে মিশে যায়। তারপর থেকে রোমানরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে—কখন মুসলমানদের থেকে এই লাঞ্ছনার বদলা নেওয়া যায়।
৩. ইসলামপূর্বকাল থেকেই খ্রিষ্টানেরা দুটি ধর্মীয় কেন্দ্রে বিভক্ত ছিল; এশিয়ার খ্রিষ্টানেরা কনস্টান্টিনোপল-চার্চের অনুসরণ করত, যাকে বলা হতো পূর্বাঞ্চলীয় চার্চ, আর ইউরোপের খ্রিষ্টানরা রোমান-চার্চের অনুসরণ করে চলত, যাকে বলা হতো পশ্চিমাঞ্চলীয় চার্চ। রোমানোসের পরিণতি দেখে কনস্টান্টিনোপলের আরেক শাসক অ্যালেক্সিয়াজ প্রথমবারের মতো দুই গির্জার মাঝে ঐক্যের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি রোমান যাজকের কাছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাহায্য চেয়ে আবেদন করলে তা গৃহীত হয়। এবং এভাবেই একটি দীর্ঘ সময়কালের ব্যবধানের পর কেবল মুসলমানদের বিরোধিতার লক্ষ্যে খ্রিষ্টানদের দুই পক্ষ নিজেদের অভ্যন্তরীণ মতভেদ ভুলে সংঘবদ্ধ হয়।
৪. ৪৮৯ হিজরি মোতাবেক ১০৮৬ খ্রিষ্টাব্দে মরক্কোর শাসক ইউসুফ বিন তাশফিন আন্দালুসের ঝাল্লাকা রণাঙ্গনে এক ঐতিহাসিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ইউরোপের খ্রিষ্টানদের জবরদস্ত শিক্ষা দেন। এবং আন্দালুস খ্রিষ্টানদের দখলে প্রায় চলে গেছে—এমন পরিস্থিতিতে তাকে রক্ষা করেন। এরপরে ইউরোপের খ্রিষ্টানদের মনে প্রবল আকাঙ্ক্ষা জন্মে, সেই পরাজয়ের বদলা তারা এশিয়ার মাটিতেই নেবে।
৫. অকর্মণ্য এবং উদ্দেশ্যহীন জীবনযাপনকারী খ্রিষ্টান শাহজাদাদের ব্যয়ভার বহনের জন্য নয়া জায়গির দরকার ছিল। ইউরোপের ব্যবসায়ীরাও দীর্ঘদিন ধরে তাদের ব্যবসার জন্য নতুন বাজারের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছিল। মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তাদের সেইসব প্রত্যাশা পূরণের পথ উন্মুক্ত করবার একটি 'ভালো' বাহানা হিসেবে কাজ করে।
৬. ৪৮৪ হিজরিতে ভূমধ্যসাগরের মধ্যস্থিত মুসলিম অধ্যুষিত সিসিলি দ্বীপ খ্রিষ্টানরা দখল করে নেয়। এই বিজয়ের ফলে মুসলমানদের পরাজিত করবার স্বপ্ন খ্রিষ্টান দুনিয়ায় নতুন করে জেগে ওঠে।
৭. সেলজুক সাম্রাজ্যের অধিপতি মালিক শাহ—যার দাপটে সারা দুনিয়া ছিল কম্পমান—অকস্মাৎ তার ক্ষমতা খর্ব হয়ে পড়লে শামের সেলজুক সাম্রাজ্য টুকরো টুকরো হয়ে খ্রিষ্টানদের গ্রাসে পরিণত হয়। এবং এর অবধারিত ফল যা হয়—খ্রিষ্টীয় শক্তি শামে হামলা করবার মতো সাহসী হয়ে ওঠে এবং ক্রুসেডের সকল পথ হয়ে ওঠে সুগম ও মসৃণ।
৮. খ্রিষ্টানদের একটি মৌলিক আকিদা হলো তাদের 'অরিজিনাল সিন' বা জন্মগত পাপের ধারণা। এই বিশ্বাস তাদের প্রতিজনের মধ্যে সারাক্ষণ অপরাধ ও পাপের এক ধরনের অনুশোচনাবোধ জাগিয়ে রাখে। এবং বাস্তবেও তৎকালে তাদের মধ্যে চারিত্রিক অপরাধের কোনো কমতি ছিল না। গির্জার পাদরি ও যাজকেরা যুদ্ধের বারুদ উসকে দেবার উদ্দেশ্যে ঘোষণা দেয় যে, এই যুদ্ধে অংশ নেওয়ার 'বরকতে' তাদের সকলের সমস্ত পাপ একদমই ঝরে পড়বে। পাপের আর কোনো কালিমাই থাকবে না তাদের গায়ে। এভাবেই নেতারা নিজেদের বাস্তবিক উদ্দেশ্য আড়াল করে ধর্মের মিথ্যা বয়ান সামনে এনে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে তোলে।
📄 ৩.৪: ক্রুসেডের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
এই যুদ্ধের পেছনে ইউরোপিয়ান নেতাদের সামনে নিম্নযুক্ত উদ্দেশ্যগুলো হাজির ছিল:
১. এশীয় অঞ্চলের মুসলিম অধ্যুষিত ভূমিগুলো দখলে নেওয়া।
২. আল-কুদসের পুনরুদ্ধার।
৩. মুসলমানদের থেকে অতীত দিনের পরাজয়ের বদলাগ্রহণ।
৪. স্পেন দখল।
৫. ইসলামি বিশ্বের ব্যবসায়িক রুট, উৎপাদিত পণ্য, খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ এবং অর্থনৈতিক উপকরণাদির উপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।
৬. ইহুদিজাতির আল-কুদস ফিরে পাবার যে আকাঙ্ক্ষা, তা বাস্তায়িত করা।
(ইহুদিরা এই যুদ্ধে প্রকাশ্যে শরিক ছিল না। কিন্তু তাদের আশা ছিল—এই যুদ্ধের মারফতেই সলোমান মন্দির পর্যন্ত তাদের পৌঁছানোর রাস্তা খুলে যাবে। সেই স্বপ্নেরই বাস্তবায়নে প্রথম থেকেই টেম্পলারের বেশে খ্রিষ্টানদের সহায়তায় তাদের গোপন মিশন চলমান ছিল।)