📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ২.১২: গুরুত্বপূর্ণ ফল

📄 ২.১২: গুরুত্বপূর্ণ ফল


মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের যে ইতিবৃত্ত তুলে ধরা হলো, তা থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয় :

১. এই শতাব্দীগুলোয় মুসলমানদের ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মনস্তাত্ত্বিক হামলার চেয়ে ভেতরকার লোকদের সৃষ্ট ভ্রান্ত চিন্তা ও আকিদা-বিশ্বাসেরই মোকাবেলা করে যেতে হয় অধিক। মুসলমানদের মধ্য থেকেই বিভিন্ন চিন্তার মানুষের আবির্ভাব ঘটে, যারা ইসলামি সমাজে প্রত্যহ নিত্যনতুন চিন্তা হাজির করতে থাকে। এই ভ্রান্ত চিন্তার আমদানিকারকদের গোলমেলে বুদ্ধিজীবিতার তিনটি প্রধান কারণ আমরা চিহ্নিত করতে পারি:
(ক) আত্মম্ভরিতা।
(খ) পূর্বসূরি ও সালাফের প্রতি অনাস্থা।
(গ) গ্রিকদর্শনের প্রতি অযৌক্তিক মুগ্ধতা এবং বিবেকবুদ্ধিকে দীন ও শরিয়তের উপর প্রভাবক জ্ঞান করা।

২. ইতিহাসের এই অধ্যায়গুলো আমাদের সামনে এটাও স্পষ্ট করে তুলে ধরে যে, এই শতাব্দীগুলোয় বিস্তৃত হওয়া বিভ্রান্তির উৎসমুখ যদিও গ্রিকদর্শন, সেখান থেকেই এই বিভ্রান্ত চিন্তাসমস্তের আমদানি; কিন্তু তখনও পর্যন্ত ইউরোপ মুসলমানদের চিন্তাচেতনার উপর সরাসরি কুঠারাঘাত শুরু করেনি। হ্যাঁ, তবে খেলাফতে রাশেদার সময়কালে যেসব ইহুদি ও অগ্নি-উপাসক মুসলমানের বেশ ধরে মুসলমানদের পরস্পরে ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষে জড়িয়ে দিয়েছিল, তারা এইসব মনস্তাত্ত্বিক লড়াই ও বুদ্ধিবৃত্তিক চক্রান্তে শামিল ছিল। এমনকি কিছু ইউরোপিয়ান শাসক বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রদ্রোহী এবং ভ্রান্ত চিন্তার আন্দোলনকারীদের আর্থিক প্রণোদনাও দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তারপরও বলতে হবে—এই কয়েক শতাব্দীজুড়ে কোনো অমুসলিম শক্তি মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পরিকল্পিত ও অনবরত চক্রান্তের মারফত তাদের বিভ্রান্ত করবার অবস্থায় ছিল না।

৩. এই প্রকারের বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ফলে বিভিন্ন স্থানে যদিও মুসলমানদের নানাবিধ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়; তবু ব্যাপকভাবে তখন পর্যন্ত গোমরাহী ও বিভ্রান্তি মুসলিম-সমাজকে আক্রান্ত করেনি। বিস্তৃত পরিমণ্ডলে ব্যাপকভাবে তখনও তারা বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের শিকার হয়নি। শত্রুদের চক্রান্ত কিছু নতুন উপদল সৃষ্টিতে সহায়তা করে, কিছু বিদ্রোহের দাবানল উসকে দেয়; তবে তার বেশি তেমন কিছু করে উঠতে পারেনিই বলা যায়। মুসলমানদের প্রায় সকলেই তখনও 'মা আনা আলাইহি ওয়া আসহাবি'র প্রতিচ্ছবি আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা, জীবনদর্শন এবং চিন্তাধারার উপর অবিচল ছিল। অন্যভাবে বললে—তখন পর্যন্ত কৃত চক্রান্তগুলো রাজনৈতিকভাবে মুসলমানদের কিছুটা বিভ্রান্ত করতে সমর্থ হয় ঠিকই; কিন্তু আকিদা-বিশ্বাস ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে মুসলমানদের তেমন কোনো স্খলনের শিকার করতে পারে না।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ২.১৩: বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণকারীদের ব্যর্থতার কারণ

📄 ২.১৩: বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণকারীদের ব্যর্থতার কারণ


বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণকারীদের ব্যর্থতা এবং মুসলমানদের সাফল্যের প্রধান যে কারণগুলো উল্লেখ করা যেতে পারে:

১. আল্লাহ এবং তার রাসুলের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক মজবুত ছিল। কুরআন- সুন্নাহর সাথে সম্পর্ক এবং নিজেদের দীন-ধর্মের প্রতি ভালোবাসার উত্তাপ অবশিষ্ট ছিল। তারা নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিল এবং তাদের গর্ব ছিল নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি নিয়ে। সাহাবা এবং নেককার পূর্বসূরিদের প্রতি তাদের আস্থা ছিল অটুট। কোনো বিপর্যয়ের কবলে না পড়বার পেছনে এটাই ছিল তৎকালের মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য কারণ।

২. বিদ্যা ও জ্ঞানগত বিবেচনায় বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণকারীরা নিজেরাই ছিল দুর্বল। বিপরীতে মুসলমানদের পোক্ত দখল ছিল ইলমের প্রতিটি শাখায়। মুসলিম- সমাজে এমন ব্যক্তিত্ব বর্তমান ছিলেন, যারা মনস্তাত্ত্বিক যেকোনো হামলাকারীর দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার সামর্থ্য রাখতেন।

৩. রাজনৈতিকভাবে মুসলমানেরা ছিল প্রভাবশালী। ক্ষমতাধর। যে জাতি রাজনৈতিকভাবে প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী হয়ে থাকে, মনস্তাত্ত্বিকভাবে তারা নিজেদের প্রাগ্রসর জ্ঞান করতে থাকে। যার কারণে বৃদ্ধিবৃত্তিকভাবে তাদের পদানত করা সহজ হয় না। ফলে অমুসলিমদের কোনো চক্রান্তই সফলতার মুখ দেখে না।

৪. এইকালে মুসলিম শাসকেরা স্বয়ং দীনের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ভূমিকা পালন করতেন এবং নিজেদের দীন-ধর্ম সম্বন্ধে ছিলেন প্রবল অনুভূতিপ্রবণ। এবং দীন ও ইসলাম বিরোধী সকল অপতৎপরতা রুখে দিতে থাকতেন বদ্ধপরিকর ও সদাৎপর। যেমন সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর কথা স্মরণ করতে পারি, যিনি নাস্তিক্যবাদের প্রচারক সোহরাওয়ার্দীকে হত্যা করেছিলেন।

কখনো কোনো শাসক যদি সত্য পথ থেকে বিচ্যুতও হয়ে যেত তাহলে তার পরবর্তী শাসক দ্রুতই তার বিচ্যুতির ফলে সৃষ্ট ত্রুটিসমস্তের সংশোধন করে নিতেন। উদাহরণত বলা যেতে পারে খলিফা মামুনুর রশিদ ও মু'তাসিম বিল্লাহর কথা। তাদের প্রসারিত মুতাজিলা ফেতনার বিষক্রিয়া খলিফা মুতাওয়াক্কিলের নিখাদ ইসলামি পলিসির তোড়ে সম্পূর্ণরূপে ভেসে যায়।

৫. মুসলমানদের কর্মকাণ্ড ও নেক আমল তাদের অনেক বড় হাতিয়ার ছিল। তাদের আখলাক, তাদের ব্যক্তিক ও সামাজিক আচার-আচরণ অনেক সময় বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণকারীদের পর্যন্ত প্রভাবিত করে ছাড়ত। যার ফলে তারা বাধ্য হতো ইসলামি চিন্তার সামনে আত্মসমর্পণ করতে।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 গ্রন্থপঞ্জি

📄 গ্রন্থপঞ্জি


-সিরাতে ইবনে হিশাম, ১ম ও ২য় খণ্ড
-মুখতাসার সিরাতুর রাসুল, শায়েখ মুহাম্মদ বিন আবদুল ওয়াহহাব নাজদী
-তাফসিরে ইবনে কাসির, হাফেজ ইবনে কাসির
-আল-কামেল ফিত তারিখ, ২য় ও ৩য় খণ্ড, খেলাফতে রাশেদার যুগ, বনু উমাইয়ার যুগ, বনু আব্বাসের যুগ (হারুনুর রশিদ থেকে মুতাওয়াক্কিল পর্যন্ত), আল্লামা ইবনুল আসির জাযারী
-তারিখে ইবনে খালদুন, ৩য় ও ৪র্থ খণ্ড, আল্লামা আবদুর রহমান ইবনে খালদুন
-তারিখে দাওয়াত ওয়া আজিমাত, ১ম খণ্ড (পৃষ্ঠা ৮৪-১১৮), মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদবী
—আল-গাজউল ফিকরি ওয়া ওয়াসায়িলুহু, শায়েখ আবদুল আজিজ বিন বাজ
-তাহসীনু মুজতামাইল মুসলিম জিদ্দাল গাজউয়ীল ফিকরি, ড. হামুদ বিন আহমাদ রহিলী

ফন্ট সাইজ
15px
17px