📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ২.৮: মুসলিম দার্শনিকদের ফেতনা

📄 ২.৮: মুসলিম দার্শনিকদের ফেতনা


কিন্তু এতকিছুর পরও বাতিল শক্তি নিশ্চুপ বসে থাকে না। তাদের ক্রীড়নকেরা ভেতরে ভেতরে ঠিকই তাদের কাজ করে যেতে থাকে। এই যুগে দ্বিতীয়বারের মতন তাদের হাতিয়ার হয় দর্শন ও ফালসাফা। কিন্তু এবারে তাদের কর্মপদ্ধতি হয় পূর্বের থেকে কিছুটা ভিন্ন। তারা নতুন তরিকায় দর্শন ও ফালসাফার ব্যবহার শুরু করে। বিগত শতাব্দীতে দর্শনকে তারা নিয়েছিল একটি মতবাদ ও মাজহাব হিসেবে। এবং মতাদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকেই তারা দর্শন-ফালসাফার আলোচনা করছিল। আকল ও বিবেকপূজারি মুতাজিলি আলেমরা যদিও বিবেকবুদ্ধির বিচার-আচারের জয়গান গাইছিল, তবু তারা কুরআন-সুন্নাহ এবং ইসলামি ফিকহের আদেশ-নিষেধ মানত। গুনাহ থেকেও যথাসাধ্য বেঁচে থাকত। তাদের প্রচেষ্টা কেবল এতটুকু ছিল যে, তারা কামনা করত দীন ও বুদ্ধি-বিবেক-যুক্তি পরস্পরে এমনভাবে সহাবস্থান করুক যেন গ্রিকদর্শন ইসলামের সহায়ক হয়ে দেখা দেয়। যদিও তাদের এই প্রচেষ্টা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এবং দর্শনকে ইসলামের সহায়তায় ব্যবহারের বদলে নিজেরাই মনস্তাত্ত্বিক দৈন্যের শিকার হয়ে পড়েছে। কিন্তু তারপরও তারা 'ঈমানদার'ই ছিল। আকিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে শক্ত মনোভাব রাখতেন—এমনকি হকপন্থি আলেমরা পর্যন্ত তাদের কেবল 'বিদআতি' সম্প্রদায় হিসেবেই আখ্যা দিয়েছেন। তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে—তাদের ব্যাপারে এমন সিদ্ধান্ত কেউ দেননি।

কিন্তু হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে ফালসাফা ও দর্শনের দরিয়ায় উন্মাতাল এক নয়া ঢেউ উথলে ওঠে। যার তোড়ে দীন ও ইসলামকে দুর্বল করার; বরং বলা ভালো নিশ্চিহ্ন করে দেবার মনোবাসনা এমন উদগ্রভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে জেগে ওঠে যেমন বাসনা ক্রিয়াশীল ছিল গ্রিকদার্শনিকদের চিন্তাচেতনায়। এই নয়া চিন্তা ও দর্শনের লাগাম এমন সব মুসলিম দার্শনিকের হাতে আসে, গ্রিকদর্শনের অনুবাদের মধ্যেই যাদের দর্শনচর্চা সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তারা সে-সবের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতেও উদ্যোগী হয়। এ সকল মুসলিম দার্শনিকের মধ্যে আবু ইয়াকুব কিন্দি (মৃত্যু: ২৫৮ হিজরি) এবং আবু নাসর আল-ফারাবীর (মৃত্যু: ৩৩৯ হিজরি) নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

আল-ফারাবী অ্যারিস্টটলের দর্শনকে নতুন এক মনোহর আকৃতিতে হাজির করেন। ইসলামি দুনিয়ায় অ্যারিস্টটলের সবচাইতে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্যকার হিসেবে তিনি আবির্ভূত হন। তিনি অ্যারিস্টটলের দর্শনে ভয়ঙ্কর রকম প্রভাবিত হয়ে পড়েন। যার ফলে অ্যারিস্টটলীয় দর্শনের সমালোচনার কোনও প্রকার প্রয়াসেই তাকে উদ্যোগী হতে দেখা যায় না। বরং কেবল অনুকরণীয় পদ্ধতিতেই তিনি অ্যারিস্টটলের দর্শন ও চিন্তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও প্রচার-প্রসারের কাজ করে যেতে থাকেন। তিনি মানতেক, ফালসাফা ও দর্শনকে ঢেলে সাজিয়ে তাকে এমন আকর্ষক রূপ দান করেন যে, অজস্র আলেম বিমুগ্ধ হয়ে তার চর্চায় নিবৃত হয়ে পড়ে। এজন্যই ফারাবীকে বলা হয় গ্রিকদর্শনের দ্বিতীয় গুরু।

তারপরে আসেন হিজরি পঞ্চম শতকের বিখ্যাত চিন্তক ও দার্শনিক বু আলী ইবনে সিনা (মৃত্যু: ৪২৮ হিজরি)। এই কালে দর্শনচর্চার দায়িত্ব অর্পিত হয় যেন তার কাঁধে। লেখালেখি এবং গ্রন্থরচনার মাধ্যমে গ্রিকদর্শন-চিন্তাকে তিনি বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দিতে সমর্থ হন। ইবনে সিনা চিকিৎসাশাস্ত্রে যে বিরাট কর্মযজ্ঞ সমাধা করে দেখিয়েছেন তা উপেক্ষা করবার উপায় নেই। এবং তার এই মহান কর্মযজ্ঞ ও তার কল্যাণের স্বীকৃতি দিতেই হবে। কিন্তু সেই সাথে এটাও মনে রাখতে হবে যে, দর্শন ও ফালসাফার মাধ্যমে ইসলামি বিশ্বে তিনি সন্দেহ-সংশয় এবং ইলমে ওহী বিবর্জিত মুক্তচিন্তার যে বীজতলা তৈরি করেছেন, তাতে নৈরাজ্য ও ধর্মহীনতা ছাড়া ভিন্ন কোনো ফসল উৎপন্ন হয়নি।

দার্শনিকদের এই শ্রেণি যদিও প্রকাশ্যে দীন ও ধর্মের অস্বীকারকারী ছিল না; কিন্তু কার্যত দীন-ধর্মকে তারা বেকার জ্ঞান করত। এবং অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর অনুকরণে আকল ও বুদ্ধি-বিবেককেই একমাত্র পরিপূর্ণ ও মহত্তম মনে করত। সবচাইতে বড় কথা হলো, এরা দর্শন ও ফিলোসফিকে দীনের বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং পরিপূর্ণ একটি জীবনপদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিল। আর কেবল স্বভাব-প্রকৃতি ও যাপিত জীবনের কথাই বলছি কেন! বরং রাজনীতি, আখলাক থেকে শুরু করে আকিদা-বিশ্বাস এবং রুহানিয়্যাতের ক্ষেত্রেও দর্শন ও ফালসাফাই ছিল তাদের কাছে একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ রাহনুমা।

লোকেদের মধ্যে ফালসাফা এবং দর্শনচর্চার আগ্রহ যত বৃদ্ধি পাচ্ছিল তাদের মন ও মনন ততই আল্লাহ-রাসুল, দীন-ধর্ম এবং শরিয়তের ভালোবাসা থেকে মুক্ত হয়ে পড়ছিল। এমনকি মানুষের ইবাদত-বন্দেগি ও আমলি জিন্দেগিতেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে পাপ, অন্যায় ও গুনাহের অন্ধকার।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ২.৯: ইখওয়ানুস সাফা মাদ্রাসা

📄 ২.৯: ইখওয়ানুস সাফা মাদ্রাসা


হিজরি পঞ্চম শতকে যেভাবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সবচাইতে বড় দুর্গ হয়ে উঠেছিল বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসা, ঠিক তেমনি নাস্তিক এবং ধর্মবিদ্বেষীদের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল বাগদাদেরই এক গোপন মাদরাসা 'ইখওয়ানুস সাফা'। এই মাদরাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় হিজরি চতুর্থ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। প্রতিষ্ঠানটির ম্যানুফেস্টো বা ঘোষণাপত্রে উল্লেখ ছিল :

ان الشريعة الاسلامية قد تنجست بالجهالات واختلطت بالضلالات ولا سبيل الى غسلها وتطهيرها الا بالفلسفة

কোনো সন্দেহ নেই—ইসলামি শরিয়ত মূর্খতা আর অজ্ঞতায় ছেয়ে গেছে। শরিয়তকে এসব মূর্খতা ও অজ্ঞতা থেকে মুক্ত করবার জন্য ফালসাফা ও দর্শনের আশ্রয়গ্রহণের বিকল্প নেই।

এই মাদরাসার 'চিন্তাবিদেরা' তাদের কার্যক্রম চালাতো খুবই গোপনে। আর দল ভারী করবার জন্য তারা কেবল তরুণ ও সমচিন্তার লোকদেরই খুঁজে বের করত। কেননা পোক্ত চিন্তার মুসলমান কিংবা বয়সের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ মানুষদের তাদের এইসব ভ্রান্ত ও নাস্তিক্যবাদী চিন্তা গেলানো সহজ ছিল না।

প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে নানা বিষয়ে ছোট ছোট পুস্তিকা রচনা করে, সব মিলিয়ে যার সংখ্যা বায়ান্নটি। এই ছোট পুস্তিকাগুলো খোরাসান থেকে আন্দালুস পর্যন্ত আধুনিক-মনস্কতা, নাস্তিক্যবাদ এবং সংশয়বাদের বীজ বুনে চলছিল।

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ২.১০: বাতিনিয়্যাত (নিগূঢ়তত্ত্ব) তত্ত্বের হামলা

📄 ২.১০: বাতিনিয়্যাত (নিগূঢ়তত্ত্ব) তত্ত্বের হামলা


হিজরি পঞ্চম শতকে আরেক নতুন চিন্তা ইসলামের ভিত্তিমূলে ফাটল সৃষ্টি করবার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। এই নতুন চিন্তার নাম দেওয়া হয় বাতিনিয়্যাত। ইসলামের বিপক্ষশক্তির কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ইসলামের তাবৎ বিধিবিধান এবং কায়দাকানুন কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহে ইসলামিতে অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং দালিলিকভাবে বর্তমান। এবং সেগুলোকে ভুল প্রমাণ করবার জন্য তাদের শত বছরের চলমান সকল প্রয়াস বারবার ব্যর্থ হয়ে আসছে। তখন তারা বেশ ভালোভাবেই বুঝে নেয়, দীন ও শরিয়তের উৎসমূল কুরআন-সুন্নাহ অক্ষত থাকতে তাদের কোনো প্রচেষ্টাই সফল হবার নয়। এখন কুরআন-সুন্নাহর 'আলফাজ' ও টেক্সট বিনষ্ট করবার কোনো ধরনের এখতিয়ার বা অথরিটি তো তাদের ছিল না। সে সুযোগ কারুরই নেই। সে কারণে তারা এমন এক চিন্তা ও দর্শনের আবির্ভাব ঘটায়, যা কুরআন-সুন্নাহর আলফাজ থেকে মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা দূর করে দিতে পারে। এই নতুন চিন্তা ও দর্শনই হলো বাতিনিয়্যাত। এই দর্শনের সার ছিল—প্রতিটি শব্দেরই দুটি অর্থ থাকে। একটি জাহের আরেকটি বাতেন: আক্ষরিক এবং নিগূঢ়। আলেমরা কেবল শব্দের জাহেরি বা আক্ষরিক অর্থটিই জানেন। আর শব্দের বাতেনি ও নিগূঢ় অর্থের জ্ঞান কেবল প্রতি কালের ইমামদেরই থাকে। বাতেনি অর্থটাই হলো একটি শব্দের প্রকৃত অর্থ। সেজন্য কুরআন-সুন্নাহর কোনো শব্দ থেকে যে বিধানই সাব্যস্ত হোক না কেন, কালের ইমাম যদি তার বিপরীত বিধান বর্ণনা করেন, তবে সে অনুযায়ী আমল করাই আবশ্যক হয়ে পড়বে। কেননা একজন 'イমাম' শব্দের বাতেনি অর্থের দিকে লক্ষ রেখে বিধান বর্ণনা করেন, বাহ্যিক দুনিয়া যে বাতেনি অর্থ সম্বন্ধে বেখবর।

এই দর্শনচিন্তার জনক ছিল ইসমাইলি শিয়াসম্প্রদায়, যারা মিশরে 'ফাতেমি খেলাফত' নামে আলাদা সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিল। তারা তাদের দর্শনচিন্তার প্রচারে ইসলামের প্রতিটি পরিভাষা ও তার অর্থ নিজেদের মতো করে রং চড়িয়ে বিকৃত করে যেতে থাকে। যেমন, তাদের ইমামদের ব্যাখ্যা অনুসারে পবিত্রতা হলো বাতিনিয়্যাত ছাড়া অন্যসকল ধর্মবিশ্বাস এবং চিন্তা-দর্শন থেকে মুক্ত হওয়া। জাকাতের অর্থ হলো, নিজেদের দর্শনচিন্তা অর্থাৎ বাতিনিয়্যাত তত্ত্বের প্রচার ও প্রসার। হজ হলো, বাতেনি ইলমের তালাশ। জান্নাত দ্বারা উদ্দেশ্য—সকল বাতেনি জ্ঞান ও নিগূঢ় তত্ত্ব। জাহান্নাম দ্বারা উদ্দেশ্য—জাহেরি ও আক্ষরিক ইলম, যা মুহাদ্দিস ও ফকিহরা ধারণ করে। কা'বা দ্বারা মসজিদুল হারাম কেন্দ্রিক কাবা উদ্দেশ্য নয়। বরং কা'বা দ্বারা উদ্দেশ্য তো স্বয়ং নবী। আর বাবে কাবা বা কাবার দুয়ার দ্বারা হজরত আলী উদ্দেশ্য। জিবরিল দ্বারা কোনো সত্তার অস্তিত্ব উদ্দেশ্য নয়; বরং জিবরিল হলো কুওয়্যাতে কুদসিয়্যা বা পবিত্রতম শক্তিমত্তার সয়লাব। বাতিনিয়‍্যাত এভাবেই ইসলামের প্রতিটি পরিভাষা বিকৃত করবার মধ্য দিয়ে দীন ও ইসলামেরই আমূল উৎপাটনের ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। তাদের এই ঘৃণিত কাজের জন্যই মুসলমানেরা তাদের 'মুলহিদিন' বা 'মালাহিদা' সম্বোধনে স্মরণ করে থাকে।৩৮

হাসান বিন সাব্বাহ ছিল এই দর্শন ও চিন্তার সবচেয়ে বড় প্রচারক। সে শরিয়তের প্রসিদ্ধ সব পরিভাষা ও অর্থ অস্বীকার করে হালাল-হারামের সীমারেখা মিটিয়ে দেয়; জায়েজ করে দেয় সবধরনের কামনা ও প্রবৃত্তির পূজা। সে ইসলামেরই নামে ইসলামের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক এক 'ধর্ম' হাজির করে সমাজের সামনে। এর চেয়েও ভয়াবহ যে কাজটি সে করে—একদল খুনি তৈরি করে গোপনে তাদের হাতে ইসলামের বড় বড় আলেমদের শহিদ করে দিতে থাকে। এই জঘন্য কাজের উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি বিশ্বকে চরম মাত্রার ব্যক্তিত্ব ও আলেম-খরায় ফেলে দেওয়া। এবং এই কাজে তাকে মোটামুটি 'সফল'ই বলা যায়।

হিজরি প্রথম শতক থেকে শুরু করে হিজরি ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত সময়কালব্যাপী মা'বাদ আল-জুহানি, জাহাম বিন সাফওয়ান, জাহেজ, ইয়াকুব কিন্দি, আবু বকর রাজী, ইবনে রাওয়ান্দী, ইবনুল মুকাফফা, আবু ঈসা ওয়াররাক, আবুল আলা মাআররী, উমর খৈয়াম, ফারাবী, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ এবং শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী এমন কিছু নাম, যারা ফালসাফা, দর্শন এবং আধুনিক-মনস্কতার শিরোনামে ইসলামি বিশ্বে ভ্রান্ত চিন্তার অনুপ্রবেশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর সময়কালের মানুষ। তিনি ছিলেন শামের বিখ্যাত ফিলোসফার বা দার্শনিক। সেই সাথে তিনি একজন ভালো কবি ও সাহিত্যিকও ছিলেন। যুবসমাজ তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ছিল। শেষমেশ নিজের নাস্তিক্যবাদী চিন্তা ও দর্শনের কারণে সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর হাতে তাকে নিহত হতে হয়।

এখানে একটি কথা বলে রাখার প্রয়োজন বোধ করছি। শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়াদী রহিমাহুল্লাহ, যিনি তাসাওউফের বিখ্যাত সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা, তিনিও কিন্তু সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর সময়কালেরই। তবে তিনি এবং দার্শনিক শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়াদী, সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবী যাকে হত্যা করেন, দুজন ভিন্ন।

টিকাঃ
৩৮ মুলহিদিন বা মালাহিদা শব্দটি মুলহিদ শব্দের বহুবচন, যার অর্থ অবিশ্বাসী, নাস্তিক। -অনুবাদক

📘 বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের ইতিবৃত্ত 📄 ২.১১: প্রতিরোধ-চেষ্টা

📄 ২.১১: প্রতিরোধ-চেষ্টা


দার্শনিক এবং নাস্তিকদের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে আলেমগণ বিপুল অধ্যবসায় এবং দারুণ সচেতনতার স্বাক্ষর রাখেন। এই শ্রেণির আলেমদের মধ্যে সর্বাধিক সুখ্যাতি লাভ করেন ইমাম গাজালী রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ৫০৫ হিজরি)। তিনি একদিকে 'ফাজায়িহুল বাতিনিয়্যাহ' এবং 'মাওয়াহিবুল ইবাহিয়্যাহ' গ্রন্থ রচনা করে বাতেনি আকিদা ও চিন্তা-বিশ্বাসের পোক্ত সমালোচনা করেন এবং অন্যদিকে 'তাহাফাতুল ফালাসিফা' প্রণয়ন করে ফালসাফার ভিত্তিমূলে কুঠারাঘাত হানেন। ইমাম গাজালী রহিমাহুল্লাহ এই আবশ্যিক কর্মটি সমাধা দেওয়ার লক্ষ্যে ফালসাফা-দর্শনকে তার গভীর থেকে অধ্যয়ন করেন। এতে করে দর্শন-ফালসাফার দুর্বলতা ও গোঁমর সম্বন্ধে অবগতি লাভ তার জন্য অনায়াস হয়ে যায়। যার ফলে সব ধরনের প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে ফালসাফা- দর্শনের সেইসব কায়দাকানুন ও মূলনীতির সংশোধনের চ্যালেঞ্জ করে উঠতে তিনি সমর্থ হন, তখন পর্যন্ত ইসলামি বিশ্বে যা অক্ষরে অক্ষরে অনুসৃত হয়ে আসছিল। তিনি প্রমাণ করে দেখান যে, ফালসাফা ও দর্শন আল্লাহ, রাসুল, দীন-ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা এবং নবুওয়াত সম্বন্ধে যেখানেই মুখ খুলেছে সেখানেই স্খলনের শিকার হয়েছে। ফালসাফা-দর্শনের এইসব আলোচনা-পর্যালোচনা তার কায়দাকানুন ও মূলনীতি-সমেতই স্পষ্ট ভুল ও ভ্রান্ত।

ইমাম গাজালী রহিমাহুল্লাহর এই জবরদস্ত রচনাসমস্তের একেকটি আধুনিক-মনস্ক মুক্তচিন্তকদের হতভম্ব ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে রাখে এবং গ্রিকদর্শনের বাহ্যিক চাকচিক্যকে একদমই নিশ্চিহ্ন করে ছাড়ে।

এর এক শতক পরের ঘটনা। ইবনে রুশদ (মৃত্যু: ৫৯৫ হিজরি) নামে আন্দালুসে ফালসাফার এক নতুন ভাষ্যকারের জন্ম হয়, যিনি 'তাহাফাতুত তাহাফা' নামে ইমাম গাজালীর চিন্তার খণ্ডন করার প্রয়াস চালান এবং অ্যারিস্টটলের প্রতিনিধিত্বপূর্বক প্রাণান্তকর পরিশ্রম শেষে দর্শনশাস্ত্রে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটাতে সমর্থ হন। কিন্তু তার চেষ্টা-পরিশ্রমের 'প্রাসাদ' বেশি কাল স্থায়িত্ব পায় না। অল্পদিনের মধ্যেই আবুল বারাকাত বাগদাদি 'আল-মু'তাবার' প্রণয়ন করে অ্যারিস্টটলের অধিকাংশ চিন্তাই যে ভ্রান্ত—আরও একবার তা প্রমাণ করে দেখান। আর তারপরে আবির্ভাব ঘটে হকপন্থিদের মুখপাত্র মহান ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী রহিমাহুল্লাহর। তিনি তার নানামুখী রচনা, বিশেষ করে তার বিখ্যাত তাফসিরগ্রন্থ 'মাফাতিহুল গাইব' রচনার মধ্য দিয়ে ফালসাফা ও দর্শনের উপর পোক্ত ও মজবুত আপত্তি উত্থাপন করে হকপন্থি দার্শনিকদের তরফ থেকে হক আদায় করে দেন।

৫০ বছর পর। প্রসিদ্ধ শিয়া দার্শনিক এবং জ্যোতির্বিদ খাজা নাসিরুদ্দীন তুসি ফের কোমর বেঁধে নামে অ্যারিস্টটলের প্রতিনিধিত্ব করবার মানসে। সে তার সর্বশক্তি ব্যয় করতে থাকে ফালসাফা, মানতেক এবং গ্রিকদর্শনের হারানো 'ঐতিহ্যে'র পুনরুদ্ধারে। আজকাল দেখি খাজা নাসিরুদ্দীন তুসিকে ইসলামি ইতিহাসের একজন সফল বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্মরণ করা হয়, যেখানে সে ছিল মূলত ইসলামি বিশ্বের সবচাইতে ভয়ঙ্কর দুশমন ও ধ্বংসাত্মক শাসক হালাকু খানের উপদেষ্টা এবং মুসলিম নামধারী এক বিশ্বাসঘাতক। বাগদাদে খেলাফতে আব্বাসিয়ার পতনের পেছনে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। সেই সাথে খাজা নাসিরুদ্দীন তুসি ইলমের জগতে মুসলমানদের এই পরিমাণ বিভ্রান্ত করতে সমর্থ হয় যে, ইরাক এবং খোরাসানে নিখাদ ইসলামি ইলম ও জ্ঞানচর্চা দুর্লভ হয়ে পড়ে। এবং সর্বত্র মানতেক-ফালসাফার পঠন-পাঠন চালু হয়ে যায়। তার দুই শিষ্য কুতুব উদ্দীন সিরাজী এবং কুতুব উদ্দীন রাজী মানতেক ও ফালসাফায় নতুন গতির সঞ্চার করে। আর সেই প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে ইসলামি দুনিয়ার আলেমগণ আরও একবার নতুন করে নিজেদের বন্দি করে ফেলেন দর্শন ও ফালসাফার ভয়ঙ্কর ফাঁদে।

অবস্থা যখন এমনই শোচনীয়, পরম করুণাময় তখন এই উম্মতকে উদ্ধারের জন্য ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহকে (মৃত্যু: ৭২৮ হিজরি) নির্বাচন করেন। তিনি তার দুটি কালজয়ী গ্রন্থ 'আর-রদ্দু আলাল মানতিকিয়্যীন' এবং 'মিনহাজুস সুন্নাহ' রচনা করে মানতেক ও ফালসাফার তুলোধুনো করে ছাড়েন। আর এর মাধ্যমে আকল ও বুদ্ধি-বিবেকের উপর দীন ও শরিয়তের কর্তৃত্ব আরও একবার প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। এবং ইসলামি বিশ্বে পূর্বেকার মতন দীনি ইলম ও শরয়ি জ্ঞানকেই সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়।

ইমাম গাজালী, ইমাম রাজী এবং ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুমুল্লাহর পোক্ত তাহকিক ও গবেষণার বদৌলতে গ্রিকদর্শনের জ্ঞানজগৎ মৃতবৎ হয়ে পড়ে। তারপর হিজরি একাদশ শতক পর্যন্ত ইসলামি বিশ্বে ভ্রান্ত গ্রিকদর্শন আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। উলটো তার জায়গায় গড়ে ওঠে ফিকহ, হাদিস এবং তাসাউফশাস্ত্রের দৃষ্টিনন্দন সব প্রাসাদ। এবং একের পর এক আবির্ভাব ঘটতে থাকে ইবনে কাইয়ুম, আল্লামা আইনী, ইবনে হুমাম, জালালুদ্দীন সুয়ূতী, ইবনে খালদুন, মুজাদ্দিদে আলফেসানী এবং शाह ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবীর মতন বিরলপ্রতীম আলেমদের, ইসলামের ইতিহাস যাদের নিয়ে আজও গর্ব করে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px