📄 ২.৬: বনু উমাইয়ার যুগে গৃহযুদ্ধের চেষ্টা
হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর সময়কার জামাল এবং সিফফিনের যুদ্ধদুটি ছিল সেই বিরূপ পরিণামেরই ধারাবাহিকতা। আরও দুঃখজনক হলো—সিফফিনের যুদ্ধের ভয়াবহতা চিন্তা করে হজরত আলী এবং মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুমার মধ্যে যখন সন্ধিচুক্তির একটি পরিবেশ তৈরি হলো, খারেজি নামে এক নতুন ফেতনার আবির্ভাব ঘটিয়ে মুসলমানদের আবারও দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলা হলো। হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্থলবর্তী হজরত হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের বদৌলতে হজরত মুয়াবিয়াকে যখন ইসলামি বিশ্বের খলিফা মনোনীত করা হলো তখন গিয়ে ইসলামি বিশ্বে স্থিরতা ফিরে এলো। মুসলমানেরা প্রবেশ করল বিজয় এবং সফলতার নতুন যুগে।
হজরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর ইনতেকালের পর ইসলামি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার একটি শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সেই অবস্থায় হজরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু কুফা গমন করেন চলমান পরিস্থিতি শান্ত করবার উদ্দেশ্যে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কারবালার প্রান্তরে তাকে শহিদ করে দেওয়া হয়। তার শাহাদাতের ঘটনা বিবদমান পরিস্থিতিকে আরও উসকে দেয় এবং নিরাপত্তা ও শান্তি-শৃঙ্খলা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়বার একটা পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়। ভ্রান্ত দলগুলো জেগে উঠতে থাকে নতুন উদ্যমে। আর মুসলিম-সমাজ ক্রমেই তলিয়ে যেতে থাকে দ্বন্দ্ব-বিরোধ ও গৃহযুদ্ধের অতল অন্ধকারে। এবং গৃহযুদ্ধের অতলান্তে তলিয়ে যাবার এই ধারা অব্যাহত থাকে খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের সময়কাল পর্যন্ত। তারপর পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে আসে।
শাসনামলের মাঝের এবং শেষদিককার কিছু সময় বাদ দিলে উমাইয়া শাসনামলের পুরো সময়টা ছিল মুসলমানদের উত্থানকাল। বিভিন্ন ভ্রান্ত দল ও ফেরকার উদ্ভব সত্ত্বেও মুসলমানদের বিজয় এবং কর্তৃত্ব সমুন্নত ছিল। যেহেতু ফেরকাগুলো তখন মাত্র প্রকাশ্যে আসছে, সদস্যসংখ্যা তখনও সামান্য—যার ফলে ইসলামের বড় কোনো ক্ষতি তাদের দ্বারা সংঘটিত হবার সুযোগ তৈরি হয়নি। এই যুগেই কুরআন কারিম, সিরাত এবং হাদিসের উপর খ্রিষ্টীয় জগতের আপত্তি উত্থাপিত হতে শুরু করে। কিন্তু তাদের অভিযোগ-আপত্তি তৎকালীন মুসলমানদের তেমন প্রভাবিত করতে পারে না।
📄 ২.৭: আব্বাসীয়যুগে দর্শনশাস্ত্রের প্রাদুর্ভাব : ইউরোপের প্রথম বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণ
আব্বাসীযুগে পশ্চিমাজগৎ প্রথম সুযোগ পায় ইসলামি বিশ্বের উপর বুদ্ধিবৃত্তিক হামলা করার। এশিয়ামাইনর এবং ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে মুসলমানদের অনবরত বিজয়াভিযানের সূত্রে মুসলমান ও ইউরোপিয়ান খ্রিষ্টানদের মধ্যকার ভূমির দূরত্ব কমে আসতে থাকে। বৃদ্ধি পেতে থাকে পারস্পরিক প্রমোদভ্রমণ এবং ব্যবসায়িক যাত্রার পরিমাণ। সেই অবসরে ইউরোপের প্রাচীন শাস্ত্র মুসলমানদের হাতে আসে। ইউরোপ থেকে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় লেখাজোখার স্থানান্তর ঘটতে থাকে ইসলামি বিশ্বে। সেই সকল 'বৌদ্ধিক' জ্ঞান-বিদ্যা যেকোনো ধর্মীয় বিশ্বাসে অনাস্থার প্রবেশ করিয়ে দিতে পারে—ততদিনে এ অভিজ্ঞতা গির্জার বেশ ভালোভাবেই অর্জিত হয়ে গিয়েছিল। তাদের বেশ ভালোই জানা ছিল, দর্শন-ফালসাফা চির ধরিয়ে দিতে পারে মানুষের বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে। যে কারণে ধর্মযাজকেরা সে-সব বিদ্যার পঠন-পাঠনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছিল। কিন্তু আব্বাসীযুগে এসে দর্শন ও ফালসাফার সে-সব ভ্রান্তিপূর্ণ গ্রন্থাদি ইসলামি বিশ্বে অবাধে প্রবেশ করতে শুরু করে। যখন ইসলামি বিশ্বে এসব গ্রন্থ পরিচিতি লাভ করে তখন কুরআন-সুন্নাহ এবং ফিকহের পাশাপাশি দর্শন ও ফালসাফাচর্চার নামে একশ্রেণির মুক্তবুদ্ধির চিন্তকের আবির্ভাব ঘটতে থাকে এবং অল্প সময়ের মধ্যে মুতাজিলা ফেরকা নামে তারা এক ভয়াবহ ফেতনার আকৃতিতে দৃশ্যমান হয়। হিজরি প্রথম শতাব্দীতেই বিদআতি ফেরকার আবির্ভাব ঘটে গিয়েছিল এবং তাদের আবির্ভাবের সূচনাকাল থেকেই উম্মাহর বড় বড় আলেম ও বিদ্বান ব্যক্তিবর্গ তাদের ভ্রান্ত চিন্তা ও উদ্ভট যুক্তি-প্রমাণের উপযুক্ত জবাব দিয়ে আসছিলেন। বিদআতি ফেরকার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন যিনি, তিনি ইমাম আজম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ। তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-ফিকহুল আকবার' রচনার মাধ্যমে তিনি সঠিক আকিদা-বিশ্বাসের প্রচারে ভূমিকা রেখেছেন কেবল নয়; বরং উম্মাহকে রক্ষা করেছেন ভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে। এবং সকল ভ্রান্ত চিন্তা ও বিশ্বাসের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণপূর্বক উম্মাহকে বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করে পরিচালিত করেছেন সিরাতুল মুসতাকিমের পথে। অপরদিকে উম্মাহর আরেক রাহবার ইমাম শাফেয়ী রহিমাহুল্লাহ 'আর-রিসালাহ' এবং 'কিতাবুল উম' প্রণয়নের মাধ্যমে কতক ভ্রান্ত দলের চিন্তা-বিশ্বাসের মূলে আঘাত হানেন।
পরবর্তীকালে হানাফী মতাবলম্বী ফকিহ ও মুহাদ্দিস ইমাম তহাবী রহিমাহুল্লাহ 'আল-আকিদাতুত তহাবিয়্যা' নামে ছোট্ট একটি পুস্তিকা রচনা করেন। আকিদা-বিশ্বাস সংক্রান্ত তার রচিত সেই পুস্তিকাটি আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর আকিদা-বিশ্বাস এবং চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করছে। সেই সময়েই ইমাম বুখারী তার বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ 'আল-জামে আস-সাহীহ' সংকলন করেন। তিনি তার গ্রন্থের শিরোনাম এমনভাবে বিন্যস্ত করেন, শিরোনামের বিন্যাসেই ভ্রান্ত মতাবলম্বীদের দলিলের খণ্ডন হয়ে যায়। তার অনুসরণে আরও কতক মুহাদ্দিস তাদের সুনান ও জামের ৩২ শিরোনাম তৈরি করতে গিয়ে বাতিল ফেরকার দলিল খণ্ডন করার বিষয়টি সামনে রাখেন এবং আহলে হকের যথার্থ প্রতিনিধিত্ব করেন।
এই সময়ে আবির্ভাব ঘটে মুতাজিলাদের। খলিফা হারুনুর রশিদের সময়কালে এমন কতক চিন্তাবিদের প্রকাশ ঘটতে থাকে, যারা তাদের চিন্তা ও কর্মধারায় জমহুর (সংখ্যাগরিষ্ঠ) আলেমের বিরোধিতা করে বসে। কিন্তু সুখের খবর হলো— তৎকালে ইসলামি বিশ্বের কাজিউল কুজাত বা প্রধানবিচারপতি ছিলেন ইমাম আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ। তার ব্যক্তিত্বের সামনে ভ্রান্ত চিন্তার মানুষেরা তেমন সুবিধা করতে পারেনি।
মুতাজিলা-সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দেয় হারুনুর রশিদের ইনতেকালের পর। তার তিরোধান হয়ে গেলে খেলাফতের মসনদে বসেন তার পুত্র মামুনুর রশিদ। নতুন খলিফা ছিলেন ‘মুক্তচিন্তা’র সমর্থক। মুক্তচিন্তার চর্চা তিনি পছন্দ করতেন মনেপ্রাণে। পৃথিবীর জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহ ছিল বিপুল। সে-সময়ে এশিয়ামাইনর (আনাতোলিয়ার) অঞ্চলগুলোতে রোমানদের সাথে মুসলমানদের লড়াই চলছিল। চলমান সেই যুদ্ধে মাঝেমধ্যে সন্ধির অবকাশও এসে যেত। মামুনের গোচরে এলো যে, রোমে দর্শন ও ফালসাফার বিরাট সংগ্রহ অর্গলবদ্ধ পড়ে আছে। তিনি রোমের বাদশাহর কাছে দূত পাঠিয়ে সেইসব দর্শন ও ফালসাফার সংগ্রহ চেয়ে বসেন। বাদশাহ তার সভাসদ ও রাজযাজকদের সাথে পরামর্শ করলে প্রায় সকলেই দর্শনের সংগ্রহশালা মামুনের হাতে তুলে দিতে অসম্মতি জ্ঞাপন করে। যাজকদের মধ্যে একজন ছিলেন যুগসচেতন। তিনি জানতেন, নিছক বুদ্ধিমত্তার উপর ভিত্তি করে রচিত এই গ্রন্থমালা যেকোনো ধর্মের বিশ্বাসের মূলে সংশয়ের ঘুণপোকার জন্ম দিতে পারে। ক্রমেই সে ঘুণপোকা ভেতর থেকে খোকলা করে দিতে পারে ক্ষমতার মসনদও। তিনি বাদশাহকে পরামর্শ দেন মুসলমানদের এই অজ্ঞতার সুযোগ লুফে নেওয়ার জন্য। অতঃপর রাজ-যাজকের পরামর্শে দর্শনের গ্রন্থাদি বাগদাদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মামুনুর রশিদ রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে সে-সব দার্শনিক ও ফিলোসফিকাল গ্রন্থের অনুবাদ করিয়ে প্রকাশ ও প্রচারের ব্যবস্থা করেন।
আবু সাঈদ আন্দালুসি তার তাবাকাতুল উমাম গ্রন্থে লেখেন : মামুনুর রশিদ রোমের বাদশাহর কাছে গ্রিকদার্শনিকদের গ্রন্থাদি চেয়ে পাঠান। বাদশাহ প্লেটো, অ্যারিস্টটল, হিপোক্রাটিস, গ্যালেন, ইউক্লিড, টলেমি প্রমুখের রচনাবলি মামুনের কাছে উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেন। মামুন অত্যন্ত যত্নের সাথে সে-সবের অনুবাদ করান এবং মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন সেগুলোর অধ্যয়ন ও চর্চার প্রতি। তার সময়ে গ্রিকদর্শনের গ্রন্থাবলি ব্যাপকহারে প্রকাশিত হতে থাকে এবং পৌঁছে যায় মানুষের হাতে হাতে। ইসলামি বিশ্বে গ্রিকদর্শনের উত্থানযুগ বলা চলে মামুনের শাসনকালকে। খলিফা মামুনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে মেধাবী এবং শিক্ষিত তরুণেরা দর্শন ও ফালসাফার চর্চায় আত্মনিয়োগ করে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার দরুন অল্প দিনেই সে-সব তরুণ বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে গ্রিকদর্শনশাস্ত্রে।৩৩
এই দর্শনশাস্ত্র, যার উৎপত্তি প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের হাতে, তা মূলত ছিল ভ্রান্তির আয়োজন। ইউরোপের অদূরদর্শী কিছু চিন্তক সেসবের প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়েছিল। হ্যাঁ, দর্শনশাস্ত্রে মানুষের স্বভাব-চরিত্র, তাদের সামাজিক আচার-আচরণ, এবং রাজনৈতিক নীতিমালা সম্বন্ধীয় ভালো ও উপকারী কিছু আলাপ ছিল; কিন্তু সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্কিত দর্শনের যে দীর্ঘ বয়ান, তা মূলত তৈরি হয়েছিল কিছু উদ্ভট চিন্তা, শয়তানি প্ররোচনা এবং ভ্রান্ত বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে। এটা তো আর বানান করে বোঝানোর প্রয়োজন পড়ে না যে, মহান স্রষ্টা সম্বন্ধে সামান্য সৃষ্টি নিজের অপূর্ণ বুদ্ধিমত্তার আলোকে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হবে তা সমস্যাশূন্য হতে পারে না। তাতে ত্রুটি রয়েই যাবে। এখন সেই ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্তকেই যদি 'মুহাক্কাম উলুম' (চিরন্তন জ্ঞান)-এর মর্যাদা দেওয়া হয়, তবে এটাকে বোকামি ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে! সৃষ্টিকর্তা এবং তার অদৃশ্য কার্যাবলী সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত দেওয়া যেতে পারে কেবল সেই জ্ঞানের আলোকে, যা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে আমাদের কাছে অবতীর্ণ হয়েছে। আর সেই জ্ঞান মুসলমানদের কাছে সংরক্ষিত ছিল কুরআন ও হাদিসের মারফত। সেজন্য সৃষ্টিকর্তা সম্বন্ধীয় রহস্য উদঘাটনের জন্য গ্রিকদর্শনের দ্বারস্থ হবার কোনো প্রয়োজন ছিল না মুসলমানদের। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দর্শনের গ্রন্থগুলো যখন আরবি ও ফারসি ভাষায় অনূদিত হতে শুরু করে, অল্প দিনের মধ্যে মুসলিম জ্ঞানচর্চাকারীদের একটি শ্রেণি দর্শন ও ফালসাফার চর্চায় তুমুল আগ্রহী হয়ে পড়ে।
দেখা যায়—দর্শন ও ফালসাফার প্রতি তারাই আগ্রহী হয়ে উঠছে, মুক্তচিন্তা এবং নতুন বিশ্বাসের প্রতি যারা আজন্ম আসক্তি পোষণ করে আসত। তাদের মধ্যে খারেজিদের চিন্তার প্রতিবিম্ব দেখা যেত। উত্তরসূরি ও সালাফের চিন্তাভাবনা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের বিপরীতে তাদের ঝোঁক ছিল নিজেদের মতামতের উপর। আমার চিন্তাই সঠিক—এই ব্যাধিতে তারা আক্রান্ত ছিল। তাদের জ্ঞান ও ইলমের পরিধি তো ছিল অনেক; কিন্তু গভীরতা বলতে কিছু ছিল না। এমন আলেমরা যখন গ্রিকদর্শন হাতে তুলে নিল তখন তারা তার জালে এমনভাবে বন্দি হয়ে পড়ল যে, দর্শনের আষ্টপৃষ্ঠ থেকে আর বেরোতে পারল না। তারা দর্শন ও ফালসাফার দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে চিরন্তন আকিদা-বিশ্বাসের উপর প্রশ্ন তুলতে আরম্ভ করে। ইসলামের প্রমাণিত বিশ্বাস ও আকিদাকে পরিমাপ করতে থাকে বুদ্ধি-বিবেক ও নিছক চিন্তার নিক্তিতে। আল্লাহ তা'আলার রুইয়াত, আরশে তার সমাসীন হওয়া, আল্লাহর কালাম এবং তাকদিরের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ও তারা তাদের ভ্রান্ত যুক্তিবাদের মুখোমুখি দাঁড় করাতে থাকে। এই বিবেকপূজারি দলটিই 'মুতাজিলা' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।
খলিফা মানুনুর রশিদ ইতোমধ্যে গ্রিকদর্শনে প্রভাবিত হয়ে পড়েছেন। পাশাপাশি দীনের প্রচার-প্রসারের প্রতিও তার ছিল অপরিসীম আগ্রহ। সে কারণে মুতাজিলারা তার থেকে অভূতপূর্ব আনুকূল্য অর্জন করতে সমর্থ হয়। মামুনের ধারণা ছিল দীনের দাওয়াত সবার কাছে পৌঁছে দেবার জন্য এবং প্রতিটি জাতির কাছে দীন গ্রহণযোগ্য করে তুলবার জন্য মুতাজিলাদের চিন্তাভাবনা ও দাওয়াতি রীতিপদ্ধতি অধিক কার্যকর। মামুনের আনুকূল্যে মুতাজিলাসম্প্রদায় অল্পদিনের মধ্যেই খলিফার দরবারে প্রভাবক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং তাদের প্রসিদ্ধ ইমাম আহমাদ বিন আবু দাউদ বাগদাদের প্রধানবিচারপতির পদ বাগিয়ে নেয়। সে 'আকিদায়ে খালকে কুরআন তথা কুরআন আল্লাহ তা'আলার কালাম নয়; বরং তার মাখলুক'—এই ভ্রান্ত বিশ্বাসকে তার দলের মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে হকপন্থি আলেমদের উপর বিচারের নামে প্রহসন চালাতে থাকে। বিবেকপ্রসূত আকিদা-বিশ্বাসের বিপরীতে কুরআন ও সুন্নাহকে আকড়ে থাকা সত্যপন্থি আলেমগণ সে যুগে খলিফার রোষানলে পতিত হন।
মামুন তার মৃত্যুর চার মাস পূর্বে আকিদায়ে খালকে কুরআনের পক্ষে এতটাই শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন যে, তিনি ঘোষণা দিয়ে বসেন—খালকে কুরআনের আকিদা যে লালন করবে না, তার কোনো প্রকার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। এমনকি খালকে কুরআনের ভ্রান্ত আকিদা যারা পোষণ করত না, মামুন তাদেরকে তার রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে রেখে আসার নির্দেশ প্রদান করেন।
সেই সময়ে সভাসদ ও রাষ্ট্রের প্রতি মুতাজিলাসম্প্রদায়ের প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে সাধারণ মানুষেরা মনে করত মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসীরা তীক্ষ্ণ ধীশক্তির অধিকারী, সমাজ ও যুগসচেতন এবং বাস্তববাদী। সাধারণ মানুষ তাদের গবেষণা ও মতামতকে মনে করত নিরপেক্ষ এবং অধিক নির্ভরযোগ্য। বিপরীতে সত্যপন্থি আলেমদের মনে করত—তারা প্রাচীনপন্থি, সেকেলে, গোঁড়া, যুগসম্পর্কে অসচেতন এবং কালের ভাষা উপলব্ধিতে সম্পূর্ণ অক্ষম।
তারপরও এই সময়ে ইমাম আহমাদ বিন হামবল, ইমাম আবুল হাসান আশআরী, ইমাম আবদুর রহমান প্রমুখের মতো ব্যক্তিত্ব বর্তমান ছিলেন, যারা প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও সাহসিকতার সাথে ভ্রষ্ট মুতাজিলাদের ভ্রান্ত চিন্তা-বিশ্বাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।
ইমাম আহমাদ বিন হামবল রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু : ২৪১ হিজরি) ছিলেন বিখ্যাত ফকিহ এবং মুহাদ্দিস। তিনি মুতাজিলাসম্প্রদায়ের ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাস অসার বলে ঘোষণা করেন এবং প্রকাশ্যে তাদের চিন্তা-বিশ্বাসের প্রতি তার ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জনসম্মুখে প্রচার করতে থাকেন যে, কালামুল্লাহ, রুইয়াতুল্লাহ এবং এ ধরনের মাসআলাতে সালাফ যে অভিমত প্রদান করে আসছেন তা-ই সঠিক। এসব মাসআলায় সালাফের মতের পরিবর্তে দার্শনিক কোনো বিচার-বিশ্লেষণ গ্রহণীয় নয়। সালাফ যেমন বলেছেন, এসব বিষয়ে সেভাবেই ঈমান ও বিশ্বাস স্থাপন করা জরুরি। তাদের মতাদর্শ থেকে দূরে সরে গিয়ে দার্শনিকদের চিন্তা গ্রহণ করা স্পষ্ট ভ্রান্তি বৈ নয়। এই সত্য উচ্চারণের খেসারতস্বরূপ মামুনের স্থলবর্তী খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ তাকে কারাগারে পাঠায়। খলিফার দরবারে ডেকে নিয়ে মুতাজিলাদের সাথে তাকে বিতর্কও করতে বলা হয়। বিতর্কে মুতাজিলাদের তিনি নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন। কিন্তু সত্য উপলব্ধি করবার পরও তারা তাকে জবরদস্তি করেন মুতাজিলাদের আকিদা গ্রহণ ও তাদের সমর্থন প্রদানের জন্য। কিন্তু মহান ইমাম তাদের প্রস্তাব একবাক্যে নাকচ করে দেন। পরিণামে তার উপর নেমে আসে অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ। কিন্তু সত্যের সিংহাসন থেকে তাকে একবিন্দু অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। তিনি তার হক ও সত্য মতাদর্শ আকড়ে থাকেন বিপুল অপার্থিব শক্তি-বলে।
ইমাম বুখারীর উসতাদ আলী ইবনুল মাদিনী এই মহান ইমামের কথা স্মরণ করতে গিয়ে কী চমৎকার বলেছেন—দীনের মহত্ত্ব, বড়ত্ব ও ঐতিহ্য রক্ষায় আল্লাহ তায়ালা তার দুজন বান্দাকে এমনভাবে কবুল করেছেন যে, তাদের সাথে দ্বিতীয় কাউকে (তাদের সময়ে) শরিক পর্যন্ত করেননি; ইরতিদাদের ফেতনার সময় হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এবং খালকে কুরআনের ফেতনার সময় ইমাম আহমাদ বিন হামবলকে। ৩৪
মুতাসিম বিল্লাহর পর ওয়াসেক বিল্লাহ্ দীর্ঘ সময় মুতাজিলাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং নিজেও খালকে কুরআন আকিদায় বিশ্বাস পোষণ করতে থাকেন। কিন্তু শামের আজদ নগরীর বিখ্যাত আলেম আবু আবদুর রহমান আজদী, যিনি ইমাম আবু দাউদ এবং ইমাম নাসায়ির উসতাজ ছিলেন, ভরা দরবারে প্রধানবিচারপতি মুতাজিলাদের মুখপাত্র কাজী আহমাদ বিন আবু দাউদকে তর্কবিতর্কের মাধ্যমে নাকানিচুবানি খাওয়ালে ওয়াসেক বিল্লাহর কাছে সত্য উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। এবং চিরতরে খালকে কুরআনের আকিদা ত্যাগ করে তিনি মুতাজিলাসম্প্রদায়ের সংসর্গ থেকে ফিরে আসেন।৩৫
ওয়াসেক বিল্লাহর পর খেলাফতের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন মুতাওয়াক্কিল। তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের চিন্তাচেতনা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেন। মুতাজিলা মতবাদ এবং দার্শনিক চিন্তাবিশ্বাসের স্থলে সমাজে পুনঃস্থাপিত করেন কুরআন-সুন্নাহর মতামতের গুরুত্ব ও মর্যাদা। রাষ্ট্রীয় সহায়তায় ফের মুতাজিলা মতবাদ এবং দার্শনিক চিন্তাভাবনার জয়যাত্রা থামিয়ে দেওয়া হয়। অবশ্য এরপরও ইলমি মজলিসে এবং জ্ঞানীদের আলোচনা-সমালোচনায় দর্শনের চর্চা রয়ে গিয়েছিল; সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু সমাজে ভ্রান্ত চিন্তার যে শোরগোল উচ্চকিত হয়েছিল, তা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে।
কাজী ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মদ তাইমীর বক্তব্য হলো : তিনজন খলিফা বিস্ময়কর কাজ করে দেখিয়ে গেছেন: এক আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু, যিনি ইরতিদাদের ফেতনা সমূলে উপড়ে ফেলেছিলেন। আরেক হলেন হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ, যিনি মৃতপ্রায় উম্মাহর মাঝে এনে দিয়েছিলেন প্রাণের সঞ্চার। তৃতীয়জন খলিফা মুতাওয়াক্কিল, যিনি বিদআত মিটিয়ে সুন্নাহর পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছিলেন।৩৬
হিজরি তৃতীয় শতাব্দীর শেষ এবং চতুর্থ শতাব্দীর শুরুর দিকের কথা। ইমাম আবুল হাসান আশআরী (মৃত্যু: ৩৩৪ হিজরি), যিনি একজন মুতাজিলি আলেম ছিলেন, নিজের পূর্বেকার ভ্রান্ত চিন্তা ও মতবাদ পরিত্যাগ করে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মুখপাত্রে পরিণত হন। আর কেবল ইলম এবং জ্ঞানের ময়দানেই নয়; বরং সাধারণ পরিমণ্ডলেও ইসলামের বিরুদ্ধে এই বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের পোক্ত জবাব দিতে থাকেন। তিনি মুতাজিলাদের প্রতিহত করবার জন্য তাদের সাথে তাদেরই ভাষায় কথা বলেন এবং মুহাদ্দিস ও মুতাজিলাদের মধ্যে সংলাপের জন্য এক অভিনব ও মধ্যপন্থি বাকপদ্ধতি অবলম্বন করেন, যাতে মুতাজিলাদের মতো চিন্তা ও বিবেকবুদ্ধিকে লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়নি আবার মুহাদ্দিসদের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক ও যৌক্তিক আলাপ একদমই এড়িয়ে যাওয়া হয়নি। তিনি দার্শনিক আলাপ-সংলাপের বিরোধী ছিলেন না। বরং তার কথা ছিল—দর্শন ও ফালসাফা বাছবিচার করে গ্রহণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে তাকে সমালোচনার কাঠগড়ায় হাজির করা হবে। তিনি মনে করতেন—বিরোধীদের সাথে তাদেরই ভাষা ও পরিভাষায় কথা বলতে পারা অধিক কার্যকরী। আবু মুসা আশআরী তার বিভিন্ন বিতর্ক এবং রচনার মাধ্যমে বুদ্ধি ও বিবেকপূজারিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে তৎকালীন মনস্তাত্ত্বিক লড়াই প্রতিহত করতে এবং মুসলিম-মানসকে সেই ভ্রান্ত চিন্তার সয়লাবে ভেসে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে সমর্থ হন।
তারই অন্যতম শাগরেদ ইমাম আবু মানসুর মাতুরিদী (মৃত্যু: ৩৩২ হিজরি); ইসলামি বিশ্বে যিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন কালামশাস্ত্রের সবচেয়ে বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ আলেম হিসেবে। অনেক দিন মুতাজিলাদের সান্নিধ্যে কাটানোর পরিণামে আবু মুসা আশআরীর গৃহীত কার্যপদ্ধতির মধ্যে কিছু কঠোরতার প্রকাশ ঘটে যেত, যা অনেক সময় আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিভিন্ন মাসআলা ও আকিদাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলত। মাতুরিদী সে সমস্যাগুলো দূর করে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের পথ ও পন্থা আরও পাকাপোক্ত ও সুসংহত করে তোলেন। ইমাম মাতুরিদীর পর কাজী আবু বকর বাকিল্লানী (মৃত্যু: ৪০৩ হিজরি) এবং শায়েখ আবু ইসহাক ইসফারায়িনীর (মৃত্যু: ৪১৮ হিজরি) মতো বিদগ্ধ ইসলামি দার্শনিকবৃন্দ মুসলমানদের আকিদা-বিশ্বাস সংরক্ষণের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। হারামাইন শরিফাইনের ইমাম জুয়ানী (মৃত্যু: ৪৬৮ হিজরি) রহিমাহুল্লাহুও কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন তার কালের মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক হামলার মোকাবেলার জন্য। তিনি একজন দার্শনিক ও বিতার্কিক হবার পাশাপাশি একজন বিদগ্ধ মুহাদ্দিস, ফকিহ এবং মুফাসসিরও ছিলেন। হিজরি পঞ্চম শতাব্দীতে বাগদাদের মাদরাসায়ে নিজামিয়া আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের চিন্তাধারার লোকদের সবচাইতে বড় মোর্চা এবং দুর্গে পরিণত হয়। সেলজুক সাম্রাজ্যের মালিক শাহের উজির নিজামুল মুলক তুসী এটাকে প্রতিষ্ঠা করেন। আর মাদরাসাটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন আবু ইসহাক সিরাজী (মৃত্যু : ৪৭৬ হিজরি)। বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের প্রতিরোধ ও মোকাবেলায় মাদরাসায়ে নিজামিয়ার ভূমিকা ছিল অনন্য সাধারণ।৩৭
হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত উদ্ভূত ভ্রান্ত মতবাদ ও ফেতনার 'কানমলা' দেওয়ার জন্য ইলম ও জ্ঞানজগতে গবেষণাধর্মী ও বিশ্লেষণাত্মক বেশ কিছু কাজ হয়, যা পরিণামে কল্যাণকর হয়েও দেখা দিয়েছিল। এই কালের আলেমদের প্রয়াস-প্রচেষ্টার ফলে হিজরি প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে সৃষ্ট আরও কিছু ভ্রান্ত আকিদা ও মতবাদ যেমন, খারেজি, মুরজিয়া, কাদরিয়্যা, জাহমিয়্যি ইত্যাদি তৃতীয় শতকের পর একদমই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মুতাজিলা ফেতনার প্রকোপও কমে আসে এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতই ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র—প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাবকশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। ভ্রান্ত মতাদর্শী বলতে রয়ে যায় কেবল শিয়াসম্প্রদায়, যারা একের পর এক নিত্যনতুন অভিনব সব ফেতনার জন্ম দিয়ে যাচ্ছিল।
টিকাঃ
৩২ সুনান ও জামে মুহাদ্দিসদের দুটো বিশেষ পরিভাষা। সুনান দ্বারা উদ্দেশ্য হাদিসের ওই সমস্ত গ্রন্থ, যেগুলো ফিকহের অধ্যায়ের বিন্যাস অনুসারে বিন্যস্ত করা হয়েছে। যেমন: ইমাম নাসায়ী রহ. এর সংকলিত হাদিসগ্রন্থ সুনানে নাসায়ী। পক্ষান্তরে জামে বলা হয় সেই সমস্ত হাদিসগ্রন্থকে, যেগুলোতে দীনের মৌলিক ৮টি বিষয় : আকায়েদ, সিয়ার, তাফসির, আহকাম, আদব, ফিতান, রিকাক ও মানাকিব অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেমন: ইমাম তিরমিজী রহ. এর সংকলিত হাদিসগ্রন্থ জামে তিরমিজী।
৩৩ তাবাকাতুল উমাম, পৃষ্ঠা: ৪৭
৩৪ তারিখে বাগদাদ, খতিব বাগদাদী-৪/৪২১
৩৫ আল-ইতিসাম, শাতেবী, পৃষ্ঠা: ৩২৪
৩৬ তারিখে বাগদাদ, খতিব বাগদাদী।
৩৭ তারিখে দাওয়াত ওয়া আজিমাত গ্রন্থ থেকে সংক্ষেপিত: ১/৯৪-১১৮
📄 ২.৮: মুসলিম দার্শনিকদের ফেতনা
কিন্তু এতকিছুর পরও বাতিল শক্তি নিশ্চুপ বসে থাকে না। তাদের ক্রীড়নকেরা ভেতরে ভেতরে ঠিকই তাদের কাজ করে যেতে থাকে। এই যুগে দ্বিতীয়বারের মতন তাদের হাতিয়ার হয় দর্শন ও ফালসাফা। কিন্তু এবারে তাদের কর্মপদ্ধতি হয় পূর্বের থেকে কিছুটা ভিন্ন। তারা নতুন তরিকায় দর্শন ও ফালসাফার ব্যবহার শুরু করে। বিগত শতাব্দীতে দর্শনকে তারা নিয়েছিল একটি মতবাদ ও মাজহাব হিসেবে। এবং মতাদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকেই তারা দর্শন-ফালসাফার আলোচনা করছিল। আকল ও বিবেকপূজারি মুতাজিলি আলেমরা যদিও বিবেকবুদ্ধির বিচার-আচারের জয়গান গাইছিল, তবু তারা কুরআন-সুন্নাহ এবং ইসলামি ফিকহের আদেশ-নিষেধ মানত। গুনাহ থেকেও যথাসাধ্য বেঁচে থাকত। তাদের প্রচেষ্টা কেবল এতটুকু ছিল যে, তারা কামনা করত দীন ও বুদ্ধি-বিবেক-যুক্তি পরস্পরে এমনভাবে সহাবস্থান করুক যেন গ্রিকদর্শন ইসলামের সহায়ক হয়ে দেখা দেয়। যদিও তাদের এই প্রচেষ্টা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। এবং দর্শনকে ইসলামের সহায়তায় ব্যবহারের বদলে নিজেরাই মনস্তাত্ত্বিক দৈন্যের শিকার হয়ে পড়েছে। কিন্তু তারপরও তারা 'ঈমানদার'ই ছিল। আকিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে শক্ত মনোভাব রাখতেন—এমনকি হকপন্থি আলেমরা পর্যন্ত তাদের কেবল 'বিদআতি' সম্প্রদায় হিসেবেই আখ্যা দিয়েছেন। তারা ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে—তাদের ব্যাপারে এমন সিদ্ধান্ত কেউ দেননি।
কিন্তু হিজরি চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে ফালসাফা ও দর্শনের দরিয়ায় উন্মাতাল এক নয়া ঢেউ উথলে ওঠে। যার তোড়ে দীন ও ইসলামকে দুর্বল করার; বরং বলা ভালো নিশ্চিহ্ন করে দেবার মনোবাসনা এমন উদগ্রভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে জেগে ওঠে যেমন বাসনা ক্রিয়াশীল ছিল গ্রিকদার্শনিকদের চিন্তাচেতনায়। এই নয়া চিন্তা ও দর্শনের লাগাম এমন সব মুসলিম দার্শনিকের হাতে আসে, গ্রিকদর্শনের অনুবাদের মধ্যেই যাদের দর্শনচর্চা সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তারা সে-সবের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতেও উদ্যোগী হয়। এ সকল মুসলিম দার্শনিকের মধ্যে আবু ইয়াকুব কিন্দি (মৃত্যু: ২৫৮ হিজরি) এবং আবু নাসর আল-ফারাবীর (মৃত্যু: ৩৩৯ হিজরি) নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
আল-ফারাবী অ্যারিস্টটলের দর্শনকে নতুন এক মনোহর আকৃতিতে হাজির করেন। ইসলামি দুনিয়ায় অ্যারিস্টটলের সবচাইতে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্যকার হিসেবে তিনি আবির্ভূত হন। তিনি অ্যারিস্টটলের দর্শনে ভয়ঙ্কর রকম প্রভাবিত হয়ে পড়েন। যার ফলে অ্যারিস্টটলীয় দর্শনের সমালোচনার কোনও প্রকার প্রয়াসেই তাকে উদ্যোগী হতে দেখা যায় না। বরং কেবল অনুকরণীয় পদ্ধতিতেই তিনি অ্যারিস্টটলের দর্শন ও চিন্তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও প্রচার-প্রসারের কাজ করে যেতে থাকেন। তিনি মানতেক, ফালসাফা ও দর্শনকে ঢেলে সাজিয়ে তাকে এমন আকর্ষক রূপ দান করেন যে, অজস্র আলেম বিমুগ্ধ হয়ে তার চর্চায় নিবৃত হয়ে পড়ে। এজন্যই ফারাবীকে বলা হয় গ্রিকদর্শনের দ্বিতীয় গুরু।
তারপরে আসেন হিজরি পঞ্চম শতকের বিখ্যাত চিন্তক ও দার্শনিক বু আলী ইবনে সিনা (মৃত্যু: ৪২৮ হিজরি)। এই কালে দর্শনচর্চার দায়িত্ব অর্পিত হয় যেন তার কাঁধে। লেখালেখি এবং গ্রন্থরচনার মাধ্যমে গ্রিকদর্শন-চিন্তাকে তিনি বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দিতে সমর্থ হন। ইবনে সিনা চিকিৎসাশাস্ত্রে যে বিরাট কর্মযজ্ঞ সমাধা করে দেখিয়েছেন তা উপেক্ষা করবার উপায় নেই। এবং তার এই মহান কর্মযজ্ঞ ও তার কল্যাণের স্বীকৃতি দিতেই হবে। কিন্তু সেই সাথে এটাও মনে রাখতে হবে যে, দর্শন ও ফালসাফার মাধ্যমে ইসলামি বিশ্বে তিনি সন্দেহ-সংশয় এবং ইলমে ওহী বিবর্জিত মুক্তচিন্তার যে বীজতলা তৈরি করেছেন, তাতে নৈরাজ্য ও ধর্মহীনতা ছাড়া ভিন্ন কোনো ফসল উৎপন্ন হয়নি।
দার্শনিকদের এই শ্রেণি যদিও প্রকাশ্যে দীন ও ধর্মের অস্বীকারকারী ছিল না; কিন্তু কার্যত দীন-ধর্মকে তারা বেকার জ্ঞান করত। এবং অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর অনুকরণে আকল ও বুদ্ধি-বিবেককেই একমাত্র পরিপূর্ণ ও মহত্তম মনে করত। সবচাইতে বড় কথা হলো, এরা দর্শন ও ফিলোসফিকে দীনের বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং পরিপূর্ণ একটি জীবনপদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিল। আর কেবল স্বভাব-প্রকৃতি ও যাপিত জীবনের কথাই বলছি কেন! বরং রাজনীতি, আখলাক থেকে শুরু করে আকিদা-বিশ্বাস এবং রুহানিয়্যাতের ক্ষেত্রেও দর্শন ও ফালসাফাই ছিল তাদের কাছে একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ রাহনুমা।
লোকেদের মধ্যে ফালসাফা এবং দর্শনচর্চার আগ্রহ যত বৃদ্ধি পাচ্ছিল তাদের মন ও মনন ততই আল্লাহ-রাসুল, দীন-ধর্ম এবং শরিয়তের ভালোবাসা থেকে মুক্ত হয়ে পড়ছিল। এমনকি মানুষের ইবাদত-বন্দেগি ও আমলি জিন্দেগিতেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে পাপ, অন্যায় ও গুনাহের অন্ধকার।
📄 ২.৯: ইখওয়ানুস সাফা মাদ্রাসা
হিজরি পঞ্চম শতকে যেভাবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সবচাইতে বড় দুর্গ হয়ে উঠেছিল বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসা, ঠিক তেমনি নাস্তিক এবং ধর্মবিদ্বেষীদের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল বাগদাদেরই এক গোপন মাদরাসা 'ইখওয়ানুস সাফা'। এই মাদরাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় হিজরি চতুর্থ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। প্রতিষ্ঠানটির ম্যানুফেস্টো বা ঘোষণাপত্রে উল্লেখ ছিল :
ان الشريعة الاسلامية قد تنجست بالجهالات واختلطت بالضلالات ولا سبيل الى غسلها وتطهيرها الا بالفلسفة
কোনো সন্দেহ নেই—ইসলামি শরিয়ত মূর্খতা আর অজ্ঞতায় ছেয়ে গেছে। শরিয়তকে এসব মূর্খতা ও অজ্ঞতা থেকে মুক্ত করবার জন্য ফালসাফা ও দর্শনের আশ্রয়গ্রহণের বিকল্প নেই।
এই মাদরাসার 'চিন্তাবিদেরা' তাদের কার্যক্রম চালাতো খুবই গোপনে। আর দল ভারী করবার জন্য তারা কেবল তরুণ ও সমচিন্তার লোকদেরই খুঁজে বের করত। কেননা পোক্ত চিন্তার মুসলমান কিংবা বয়সের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ মানুষদের তাদের এইসব ভ্রান্ত ও নাস্তিক্যবাদী চিন্তা গেলানো সহজ ছিল না।
প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে নানা বিষয়ে ছোট ছোট পুস্তিকা রচনা করে, সব মিলিয়ে যার সংখ্যা বায়ান্নটি। এই ছোট পুস্তিকাগুলো খোরাসান থেকে আন্দালুস পর্যন্ত আধুনিক-মনস্কতা, নাস্তিক্যবাদ এবং সংশয়বাদের বীজ বুনে চলছিল।