📄 ২.৪: বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই : খেলাফতে রাশেদা পর্ব
খেলাফতে রাশেদার সময়কার চিন্তাযুদ্ধের সূচনা ঘটে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তিরোধানের সাথে সাথেই। ইসলামকে সমগ্র আরবজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে দেখে যেসব ভ্রান্ত দল আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছিল, তারা নতুন করে সামনে আসে। ইসলামের সকল বিরোধীশক্তি মুসলমানদের এমন শোকতপ্ত ও অস্থির সময়ের পূর্ণ ফায়দা হাসিলের চেষ্টায় নামে। ইসলামি দুনিয়ায় সহসাই এমন কিছু ফেতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য যা যথেষ্ট ছিল। দলে দলে মানুষ দীন ত্যাগ করে মুরতাদ হতে থাকে। কিছু গোত্র জাকাতের বিধান অস্বীকার করে বসে। একই সময়ে নবুওয়াতের তিনজন মিথ্যা দাবিদার একসাথে আত্মপ্রকাশ করে। এটা একদমই স্পষ্ট যে, এমন পরিকল্পিত ও সম্মিলিত বিদ্রোহ কোনো প্রকার ভাবনা-চিন্তা ও কারুর পরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব নয়। চিন্তার দৈন্য এবং বিশ্বাসের সংশয় অকস্মাৎ ঘটে না কখনো। একদমই কারুর প্রয়াস-প্রচেষ্টা ছাড়া ভ্রান্ত চিন্তার আবির্ভাব অতঃপর মানুষের মগজে তার বিস্তার—অসম্ভব প্রায়। একটি বিন্যস্ত পরিকল্পনাই মানুষের মন-মগজে এমন বিবর্তন নিয়ে আসতে পারে কেবল। হ্যাঁ, সুযোগসন্ধানীরা লুফে নিতে পারে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের জন্য—এমন মুহূর্তেরও জন্ম হয় বটে। সে আলাপ ভিন্ন।
নবীজির তিরোধান না হতেই ভ্রান্তচিন্তার লোকেরা সেই সময়টাকে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের সুবর্ণ সুযোগ মনে করে। সে-সময় যদি আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের মাঝে আবু বকর সিদ্দিকের মতো সুস্থির চিন্তা, অদম্য সাহস এবং যোগ্য নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিকে নেতৃত্বের আসনে আসীন না করতেন, ইসলামের দুর্ভাগ্যের দাস্তান হয়তো-বা তখনই রচিত হয়ে যেত। সে আশঙ্কা ছিল বৈ কি!
অবিচলতা, আল্লাহ তায়ালার উপর অনড় বিশ্বাস এবং ঈমানি জজবার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তখন সিদ্দিকে আকবর। মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ফেতনাগুলোর সামনে তিনি এমন দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান যে, নিতান্ত অল্প সময়ের মধ্যে মিথ্যার সকল ক্ষমতা নিস্তেজ হয়ে আসে। ইসলাম তার নিজস্ব শক্তিমত্তা এবং সত্যতার বলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে মুক্তআকাশের নিচে।
হজরত উমরের খেলাফতকাল তো ছিল ইসলামের স্বর্ণযুগ। দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ছিল ইসলামের আহ্বান। প্রতিদিন বিস্তৃত হয়ে চলছিল ইসলামের সীমানা। সেই সময় আড়ালে-আবডালে মুখ লুকিয়ে পড়ে থাকা ছাড়া ফেতনাবাজদের করার তেমন কিছু ছিল না। তারপরও ইসলামের বিপক্ষশক্তি একদমই কোনো চক্রান্ত-ছক আঁকেনি তা নয়; বিশেষ করে অমুসলিমেরা ইসলামের বিজয়গতি রুখে দেবার জন্য সময়ে সময়ে নানা বুদ্ধিবৃত্তিক ছল ও কৌশল নিয়ে হাজির হয়েছে।
হজরত উমরের শঙ্কা ছিল, অমুসলিমেরা মুসলিমদের কৃষ্টি-কালচার ও তাহজিব- তামাদ্দুন বিনষ্ট করার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইবে না। সে কারণে প্রথম থেকেই তিনি ইসলামি রাষ্ট্রের জিম্মিদের জন্য স্বতন্ত্র বিধান প্রণয়ন করেন। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, তাদের বাহনজন্তু এমনকি তাদের বসতির সীমানাও আলাদা করে ফেলেন। অনারব ইসলামি অঞ্চলগুলোতে মুসলিম-অমুসলিম জনপদের মধ্যে এতটুকু দূরত্ব রাখা বাধ্যতামূলক করে দেন যে, মুসলমান এবং জিম্মি তারা যেন একে অপরের ঘরের আলোও দেখতে না পারে। এ সতর্কতা তিনি অবলম্বন করেছিলেন—যেন কাফিরদের কোনো কার্যকলাপ ও সংস্কৃতি মুসলিম-মানসে প্রভাব বিস্তার করবার অবকাশ না পায়।
এমনতর সব সতর্কতার কারণে হজরত উমরের সময়কালে ইসলামের শত্রুপক্ষ কোনোদিক থেকে ইসলামের ক্ষতি সাধনে বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। ইসলামের বিরুদ্ধে কোনোদিক থেকেই কায়দা করে উঠতে না পেরে ইসলামের বিপক্ষশক্তি তাদের চলার পথের প্রাচীরই সরিয়ে দেয়। জনৈক ইহুদির হাতে শহিদ হতে হয় ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে।
📄 ২.৫: অনৈক্য সৃষ্টির প্রয়াস
খ্রিষ্টীয় হঠকারিতা এবং ইহুদিচক্রান্ত হজরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে এসে একাত্ম হয়ে যায়। এবং সাবায়ী গোষ্ঠীর ছদ্মাবরণে তারা নবরূপে ইসলামের বিনাশ সাধনের লক্ষ্যে মাঠে নামে, যার পরিণতিতে উসমান ইবনে আফফানের নামে কুৎসা রটানো হয়। আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসার নামে মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির কাজ শুরু হয়ে যায়। এবং পরিশেষে ইসলামের তৃতীয় খলিফা এমনই এক ভ্রান্ত দলের হাতে নির্মমভাবে শহিদ হন। এর ফলে ইসলামের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যে ক্ষতি হয়ে যায়, তার ক্ষতিপূরণ আর কখনো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে পরবর্তী এক দশক পর্যন্ত ইসলামি খেলাফত এবং মুসলিম-সমাজ তার বিরূপ ফল ভোগ করতে থাকে।
📄 ২.৬: বনু উমাইয়ার যুগে গৃহযুদ্ধের চেষ্টা
হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর সময়কার জামাল এবং সিফফিনের যুদ্ধদুটি ছিল সেই বিরূপ পরিণামেরই ধারাবাহিকতা। আরও দুঃখজনক হলো—সিফফিনের যুদ্ধের ভয়াবহতা চিন্তা করে হজরত আলী এবং মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুমার মধ্যে যখন সন্ধিচুক্তির একটি পরিবেশ তৈরি হলো, খারেজি নামে এক নতুন ফেতনার আবির্ভাব ঘটিয়ে মুসলমানদের আবারও দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলা হলো। হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্থলবর্তী হজরত হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের বদৌলতে হজরত মুয়াবিয়াকে যখন ইসলামি বিশ্বের খলিফা মনোনীত করা হলো তখন গিয়ে ইসলামি বিশ্বে স্থিরতা ফিরে এলো। মুসলমানেরা প্রবেশ করল বিজয় এবং সফলতার নতুন যুগে।
হজরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর ইনতেকালের পর ইসলামি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার একটি শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সেই অবস্থায় হজরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু কুফা গমন করেন চলমান পরিস্থিতি শান্ত করবার উদ্দেশ্যে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কারবালার প্রান্তরে তাকে শহিদ করে দেওয়া হয়। তার শাহাদাতের ঘটনা বিবদমান পরিস্থিতিকে আরও উসকে দেয় এবং নিরাপত্তা ও শান্তি-শৃঙ্খলা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়বার একটা পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়। ভ্রান্ত দলগুলো জেগে উঠতে থাকে নতুন উদ্যমে। আর মুসলিম-সমাজ ক্রমেই তলিয়ে যেতে থাকে দ্বন্দ্ব-বিরোধ ও গৃহযুদ্ধের অতল অন্ধকারে। এবং গৃহযুদ্ধের অতলান্তে তলিয়ে যাবার এই ধারা অব্যাহত থাকে খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের সময়কাল পর্যন্ত। তারপর পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে আসে।
শাসনামলের মাঝের এবং শেষদিককার কিছু সময় বাদ দিলে উমাইয়া শাসনামলের পুরো সময়টা ছিল মুসলমানদের উত্থানকাল। বিভিন্ন ভ্রান্ত দল ও ফেরকার উদ্ভব সত্ত্বেও মুসলমানদের বিজয় এবং কর্তৃত্ব সমুন্নত ছিল। যেহেতু ফেরকাগুলো তখন মাত্র প্রকাশ্যে আসছে, সদস্যসংখ্যা তখনও সামান্য—যার ফলে ইসলামের বড় কোনো ক্ষতি তাদের দ্বারা সংঘটিত হবার সুযোগ তৈরি হয়নি। এই যুগেই কুরআন কারিম, সিরাত এবং হাদিসের উপর খ্রিষ্টীয় জগতের আপত্তি উত্থাপিত হতে শুরু করে। কিন্তু তাদের অভিযোগ-আপত্তি তৎকালীন মুসলমানদের তেমন প্রভাবিত করতে পারে না।
📄 ২.৭: আব্বাসীয়যুগে দর্শনশাস্ত্রের প্রাদুর্ভাব : ইউরোপের প্রথম বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণ
আব্বাসীযুগে পশ্চিমাজগৎ প্রথম সুযোগ পায় ইসলামি বিশ্বের উপর বুদ্ধিবৃত্তিক হামলা করার। এশিয়ামাইনর এবং ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে মুসলমানদের অনবরত বিজয়াভিযানের সূত্রে মুসলমান ও ইউরোপিয়ান খ্রিষ্টানদের মধ্যকার ভূমির দূরত্ব কমে আসতে থাকে। বৃদ্ধি পেতে থাকে পারস্পরিক প্রমোদভ্রমণ এবং ব্যবসায়িক যাত্রার পরিমাণ। সেই অবসরে ইউরোপের প্রাচীন শাস্ত্র মুসলমানদের হাতে আসে। ইউরোপ থেকে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় লেখাজোখার স্থানান্তর ঘটতে থাকে ইসলামি বিশ্বে। সেই সকল 'বৌদ্ধিক' জ্ঞান-বিদ্যা যেকোনো ধর্মীয় বিশ্বাসে অনাস্থার প্রবেশ করিয়ে দিতে পারে—ততদিনে এ অভিজ্ঞতা গির্জার বেশ ভালোভাবেই অর্জিত হয়ে গিয়েছিল। তাদের বেশ ভালোই জানা ছিল, দর্শন-ফালসাফা চির ধরিয়ে দিতে পারে মানুষের বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে। যে কারণে ধর্মযাজকেরা সে-সব বিদ্যার পঠন-পাঠনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছিল। কিন্তু আব্বাসীযুগে এসে দর্শন ও ফালসাফার সে-সব ভ্রান্তিপূর্ণ গ্রন্থাদি ইসলামি বিশ্বে অবাধে প্রবেশ করতে শুরু করে। যখন ইসলামি বিশ্বে এসব গ্রন্থ পরিচিতি লাভ করে তখন কুরআন-সুন্নাহ এবং ফিকহের পাশাপাশি দর্শন ও ফালসাফাচর্চার নামে একশ্রেণির মুক্তবুদ্ধির চিন্তকের আবির্ভাব ঘটতে থাকে এবং অল্প সময়ের মধ্যে মুতাজিলা ফেরকা নামে তারা এক ভয়াবহ ফেতনার আকৃতিতে দৃশ্যমান হয়। হিজরি প্রথম শতাব্দীতেই বিদআতি ফেরকার আবির্ভাব ঘটে গিয়েছিল এবং তাদের আবির্ভাবের সূচনাকাল থেকেই উম্মাহর বড় বড় আলেম ও বিদ্বান ব্যক্তিবর্গ তাদের ভ্রান্ত চিন্তা ও উদ্ভট যুক্তি-প্রমাণের উপযুক্ত জবাব দিয়ে আসছিলেন। বিদআতি ফেরকার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন যিনি, তিনি ইমাম আজম আবু হানিফা রহিমাহুল্লাহ। তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-ফিকহুল আকবার' রচনার মাধ্যমে তিনি সঠিক আকিদা-বিশ্বাসের প্রচারে ভূমিকা রেখেছেন কেবল নয়; বরং উম্মাহকে রক্ষা করেছেন ভ্রান্তির বেড়াজাল থেকে। এবং সকল ভ্রান্ত চিন্তা ও বিশ্বাসের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণপূর্বক উম্মাহকে বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করে পরিচালিত করেছেন সিরাতুল মুসতাকিমের পথে। অপরদিকে উম্মাহর আরেক রাহবার ইমাম শাফেয়ী রহিমাহুল্লাহ 'আর-রিসালাহ' এবং 'কিতাবুল উম' প্রণয়নের মাধ্যমে কতক ভ্রান্ত দলের চিন্তা-বিশ্বাসের মূলে আঘাত হানেন।
পরবর্তীকালে হানাফী মতাবলম্বী ফকিহ ও মুহাদ্দিস ইমাম তহাবী রহিমাহুল্লাহ 'আল-আকিদাতুত তহাবিয়্যা' নামে ছোট্ট একটি পুস্তিকা রচনা করেন। আকিদা-বিশ্বাস সংক্রান্ত তার রচিত সেই পুস্তিকাটি আজ পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর আকিদা-বিশ্বাস এবং চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করছে। সেই সময়েই ইমাম বুখারী তার বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ 'আল-জামে আস-সাহীহ' সংকলন করেন। তিনি তার গ্রন্থের শিরোনাম এমনভাবে বিন্যস্ত করেন, শিরোনামের বিন্যাসেই ভ্রান্ত মতাবলম্বীদের দলিলের খণ্ডন হয়ে যায়। তার অনুসরণে আরও কতক মুহাদ্দিস তাদের সুনান ও জামের ৩২ শিরোনাম তৈরি করতে গিয়ে বাতিল ফেরকার দলিল খণ্ডন করার বিষয়টি সামনে রাখেন এবং আহলে হকের যথার্থ প্রতিনিধিত্ব করেন।
এই সময়ে আবির্ভাব ঘটে মুতাজিলাদের। খলিফা হারুনুর রশিদের সময়কালে এমন কতক চিন্তাবিদের প্রকাশ ঘটতে থাকে, যারা তাদের চিন্তা ও কর্মধারায় জমহুর (সংখ্যাগরিষ্ঠ) আলেমের বিরোধিতা করে বসে। কিন্তু সুখের খবর হলো— তৎকালে ইসলামি বিশ্বের কাজিউল কুজাত বা প্রধানবিচারপতি ছিলেন ইমাম আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ। তার ব্যক্তিত্বের সামনে ভ্রান্ত চিন্তার মানুষেরা তেমন সুবিধা করতে পারেনি।
মুতাজিলা-সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দেয় হারুনুর রশিদের ইনতেকালের পর। তার তিরোধান হয়ে গেলে খেলাফতের মসনদে বসেন তার পুত্র মামুনুর রশিদ। নতুন খলিফা ছিলেন ‘মুক্তচিন্তা’র সমর্থক। মুক্তচিন্তার চর্চা তিনি পছন্দ করতেন মনেপ্রাণে। পৃথিবীর জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি তার আগ্রহ ছিল বিপুল। সে-সময়ে এশিয়ামাইনর (আনাতোলিয়ার) অঞ্চলগুলোতে রোমানদের সাথে মুসলমানদের লড়াই চলছিল। চলমান সেই যুদ্ধে মাঝেমধ্যে সন্ধির অবকাশও এসে যেত। মামুনের গোচরে এলো যে, রোমে দর্শন ও ফালসাফার বিরাট সংগ্রহ অর্গলবদ্ধ পড়ে আছে। তিনি রোমের বাদশাহর কাছে দূত পাঠিয়ে সেইসব দর্শন ও ফালসাফার সংগ্রহ চেয়ে বসেন। বাদশাহ তার সভাসদ ও রাজযাজকদের সাথে পরামর্শ করলে প্রায় সকলেই দর্শনের সংগ্রহশালা মামুনের হাতে তুলে দিতে অসম্মতি জ্ঞাপন করে। যাজকদের মধ্যে একজন ছিলেন যুগসচেতন। তিনি জানতেন, নিছক বুদ্ধিমত্তার উপর ভিত্তি করে রচিত এই গ্রন্থমালা যেকোনো ধর্মের বিশ্বাসের মূলে সংশয়ের ঘুণপোকার জন্ম দিতে পারে। ক্রমেই সে ঘুণপোকা ভেতর থেকে খোকলা করে দিতে পারে ক্ষমতার মসনদও। তিনি বাদশাহকে পরামর্শ দেন মুসলমানদের এই অজ্ঞতার সুযোগ লুফে নেওয়ার জন্য। অতঃপর রাজ-যাজকের পরামর্শে দর্শনের গ্রন্থাদি বাগদাদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মামুনুর রশিদ রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে সে-সব দার্শনিক ও ফিলোসফিকাল গ্রন্থের অনুবাদ করিয়ে প্রকাশ ও প্রচারের ব্যবস্থা করেন।
আবু সাঈদ আন্দালুসি তার তাবাকাতুল উমাম গ্রন্থে লেখেন : মামুনুর রশিদ রোমের বাদশাহর কাছে গ্রিকদার্শনিকদের গ্রন্থাদি চেয়ে পাঠান। বাদশাহ প্লেটো, অ্যারিস্টটল, হিপোক্রাটিস, গ্যালেন, ইউক্লিড, টলেমি প্রমুখের রচনাবলি মামুনের কাছে উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেন। মামুন অত্যন্ত যত্নের সাথে সে-সবের অনুবাদ করান এবং মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন সেগুলোর অধ্যয়ন ও চর্চার প্রতি। তার সময়ে গ্রিকদর্শনের গ্রন্থাবলি ব্যাপকহারে প্রকাশিত হতে থাকে এবং পৌঁছে যায় মানুষের হাতে হাতে। ইসলামি বিশ্বে গ্রিকদর্শনের উত্থানযুগ বলা চলে মামুনের শাসনকালকে। খলিফা মামুনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে মেধাবী এবং শিক্ষিত তরুণেরা দর্শন ও ফালসাফার চর্চায় আত্মনিয়োগ করে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার দরুন অল্প দিনেই সে-সব তরুণ বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে গ্রিকদর্শনশাস্ত্রে।৩৩
এই দর্শনশাস্ত্র, যার উৎপত্তি প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের হাতে, তা মূলত ছিল ভ্রান্তির আয়োজন। ইউরোপের অদূরদর্শী কিছু চিন্তক সেসবের প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়েছিল। হ্যাঁ, দর্শনশাস্ত্রে মানুষের স্বভাব-চরিত্র, তাদের সামাজিক আচার-আচরণ, এবং রাজনৈতিক নীতিমালা সম্বন্ধীয় ভালো ও উপকারী কিছু আলাপ ছিল; কিন্তু সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্কিত দর্শনের যে দীর্ঘ বয়ান, তা মূলত তৈরি হয়েছিল কিছু উদ্ভট চিন্তা, শয়তানি প্ররোচনা এবং ভ্রান্ত বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে। এটা তো আর বানান করে বোঝানোর প্রয়োজন পড়ে না যে, মহান স্রষ্টা সম্বন্ধে সামান্য সৃষ্টি নিজের অপূর্ণ বুদ্ধিমত্তার আলোকে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হবে তা সমস্যাশূন্য হতে পারে না। তাতে ত্রুটি রয়েই যাবে। এখন সেই ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্তকেই যদি 'মুহাক্কাম উলুম' (চিরন্তন জ্ঞান)-এর মর্যাদা দেওয়া হয়, তবে এটাকে বোকামি ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে! সৃষ্টিকর্তা এবং তার অদৃশ্য কার্যাবলী সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত দেওয়া যেতে পারে কেবল সেই জ্ঞানের আলোকে, যা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে আমাদের কাছে অবতীর্ণ হয়েছে। আর সেই জ্ঞান মুসলমানদের কাছে সংরক্ষিত ছিল কুরআন ও হাদিসের মারফত। সেজন্য সৃষ্টিকর্তা সম্বন্ধীয় রহস্য উদঘাটনের জন্য গ্রিকদর্শনের দ্বারস্থ হবার কোনো প্রয়োজন ছিল না মুসলমানদের। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দর্শনের গ্রন্থগুলো যখন আরবি ও ফারসি ভাষায় অনূদিত হতে শুরু করে, অল্প দিনের মধ্যে মুসলিম জ্ঞানচর্চাকারীদের একটি শ্রেণি দর্শন ও ফালসাফার চর্চায় তুমুল আগ্রহী হয়ে পড়ে।
দেখা যায়—দর্শন ও ফালসাফার প্রতি তারাই আগ্রহী হয়ে উঠছে, মুক্তচিন্তা এবং নতুন বিশ্বাসের প্রতি যারা আজন্ম আসক্তি পোষণ করে আসত। তাদের মধ্যে খারেজিদের চিন্তার প্রতিবিম্ব দেখা যেত। উত্তরসূরি ও সালাফের চিন্তাভাবনা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের বিপরীতে তাদের ঝোঁক ছিল নিজেদের মতামতের উপর। আমার চিন্তাই সঠিক—এই ব্যাধিতে তারা আক্রান্ত ছিল। তাদের জ্ঞান ও ইলমের পরিধি তো ছিল অনেক; কিন্তু গভীরতা বলতে কিছু ছিল না। এমন আলেমরা যখন গ্রিকদর্শন হাতে তুলে নিল তখন তারা তার জালে এমনভাবে বন্দি হয়ে পড়ল যে, দর্শনের আষ্টপৃষ্ঠ থেকে আর বেরোতে পারল না। তারা দর্শন ও ফালসাফার দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে চিরন্তন আকিদা-বিশ্বাসের উপর প্রশ্ন তুলতে আরম্ভ করে। ইসলামের প্রমাণিত বিশ্বাস ও আকিদাকে পরিমাপ করতে থাকে বুদ্ধি-বিবেক ও নিছক চিন্তার নিক্তিতে। আল্লাহ তা'আলার রুইয়াত, আরশে তার সমাসীন হওয়া, আল্লাহর কালাম এবং তাকদিরের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ও তারা তাদের ভ্রান্ত যুক্তিবাদের মুখোমুখি দাঁড় করাতে থাকে। এই বিবেকপূজারি দলটিই 'মুতাজিলা' নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।
খলিফা মানুনুর রশিদ ইতোমধ্যে গ্রিকদর্শনে প্রভাবিত হয়ে পড়েছেন। পাশাপাশি দীনের প্রচার-প্রসারের প্রতিও তার ছিল অপরিসীম আগ্রহ। সে কারণে মুতাজিলারা তার থেকে অভূতপূর্ব আনুকূল্য অর্জন করতে সমর্থ হয়। মামুনের ধারণা ছিল দীনের দাওয়াত সবার কাছে পৌঁছে দেবার জন্য এবং প্রতিটি জাতির কাছে দীন গ্রহণযোগ্য করে তুলবার জন্য মুতাজিলাদের চিন্তাভাবনা ও দাওয়াতি রীতিপদ্ধতি অধিক কার্যকর। মামুনের আনুকূল্যে মুতাজিলাসম্প্রদায় অল্পদিনের মধ্যেই খলিফার দরবারে প্রভাবক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং তাদের প্রসিদ্ধ ইমাম আহমাদ বিন আবু দাউদ বাগদাদের প্রধানবিচারপতির পদ বাগিয়ে নেয়। সে 'আকিদায়ে খালকে কুরআন তথা কুরআন আল্লাহ তা'আলার কালাম নয়; বরং তার মাখলুক'—এই ভ্রান্ত বিশ্বাসকে তার দলের মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে হকপন্থি আলেমদের উপর বিচারের নামে প্রহসন চালাতে থাকে। বিবেকপ্রসূত আকিদা-বিশ্বাসের বিপরীতে কুরআন ও সুন্নাহকে আকড়ে থাকা সত্যপন্থি আলেমগণ সে যুগে খলিফার রোষানলে পতিত হন।
মামুন তার মৃত্যুর চার মাস পূর্বে আকিদায়ে খালকে কুরআনের পক্ষে এতটাই শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন যে, তিনি ঘোষণা দিয়ে বসেন—খালকে কুরআনের আকিদা যে লালন করবে না, তার কোনো প্রকার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। এমনকি খালকে কুরআনের ভ্রান্ত আকিদা যারা পোষণ করত না, মামুন তাদেরকে তার রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে রেখে আসার নির্দেশ প্রদান করেন।
সেই সময়ে সভাসদ ও রাষ্ট্রের প্রতি মুতাজিলাসম্প্রদায়ের প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে সাধারণ মানুষেরা মনে করত মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসীরা তীক্ষ্ণ ধীশক্তির অধিকারী, সমাজ ও যুগসচেতন এবং বাস্তববাদী। সাধারণ মানুষ তাদের গবেষণা ও মতামতকে মনে করত নিরপেক্ষ এবং অধিক নির্ভরযোগ্য। বিপরীতে সত্যপন্থি আলেমদের মনে করত—তারা প্রাচীনপন্থি, সেকেলে, গোঁড়া, যুগসম্পর্কে অসচেতন এবং কালের ভাষা উপলব্ধিতে সম্পূর্ণ অক্ষম।
তারপরও এই সময়ে ইমাম আহমাদ বিন হামবল, ইমাম আবুল হাসান আশআরী, ইমাম আবদুর রহমান প্রমুখের মতো ব্যক্তিত্ব বর্তমান ছিলেন, যারা প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও সাহসিকতার সাথে ভ্রষ্ট মুতাজিলাদের ভ্রান্ত চিন্তা-বিশ্বাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।
ইমাম আহমাদ বিন হামবল রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু : ২৪১ হিজরি) ছিলেন বিখ্যাত ফকিহ এবং মুহাদ্দিস। তিনি মুতাজিলাসম্প্রদায়ের ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাস অসার বলে ঘোষণা করেন এবং প্রকাশ্যে তাদের চিন্তা-বিশ্বাসের প্রতি তার ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জনসম্মুখে প্রচার করতে থাকেন যে, কালামুল্লাহ, রুইয়াতুল্লাহ এবং এ ধরনের মাসআলাতে সালাফ যে অভিমত প্রদান করে আসছেন তা-ই সঠিক। এসব মাসআলায় সালাফের মতের পরিবর্তে দার্শনিক কোনো বিচার-বিশ্লেষণ গ্রহণীয় নয়। সালাফ যেমন বলেছেন, এসব বিষয়ে সেভাবেই ঈমান ও বিশ্বাস স্থাপন করা জরুরি। তাদের মতাদর্শ থেকে দূরে সরে গিয়ে দার্শনিকদের চিন্তা গ্রহণ করা স্পষ্ট ভ্রান্তি বৈ নয়। এই সত্য উচ্চারণের খেসারতস্বরূপ মামুনের স্থলবর্তী খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ তাকে কারাগারে পাঠায়। খলিফার দরবারে ডেকে নিয়ে মুতাজিলাদের সাথে তাকে বিতর্কও করতে বলা হয়। বিতর্কে মুতাজিলাদের তিনি নাস্তানাবুদ করে ছাড়েন। কিন্তু সত্য উপলব্ধি করবার পরও তারা তাকে জবরদস্তি করেন মুতাজিলাদের আকিদা গ্রহণ ও তাদের সমর্থন প্রদানের জন্য। কিন্তু মহান ইমাম তাদের প্রস্তাব একবাক্যে নাকচ করে দেন। পরিণামে তার উপর নেমে আসে অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ। কিন্তু সত্যের সিংহাসন থেকে তাকে একবিন্দু অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। তিনি তার হক ও সত্য মতাদর্শ আকড়ে থাকেন বিপুল অপার্থিব শক্তি-বলে।
ইমাম বুখারীর উসতাদ আলী ইবনুল মাদিনী এই মহান ইমামের কথা স্মরণ করতে গিয়ে কী চমৎকার বলেছেন—দীনের মহত্ত্ব, বড়ত্ব ও ঐতিহ্য রক্ষায় আল্লাহ তায়ালা তার দুজন বান্দাকে এমনভাবে কবুল করেছেন যে, তাদের সাথে দ্বিতীয় কাউকে (তাদের সময়ে) শরিক পর্যন্ত করেননি; ইরতিদাদের ফেতনার সময় হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে এবং খালকে কুরআনের ফেতনার সময় ইমাম আহমাদ বিন হামবলকে। ৩৪
মুতাসিম বিল্লাহর পর ওয়াসেক বিল্লাহ্ দীর্ঘ সময় মুতাজিলাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং নিজেও খালকে কুরআন আকিদায় বিশ্বাস পোষণ করতে থাকেন। কিন্তু শামের আজদ নগরীর বিখ্যাত আলেম আবু আবদুর রহমান আজদী, যিনি ইমাম আবু দাউদ এবং ইমাম নাসায়ির উসতাজ ছিলেন, ভরা দরবারে প্রধানবিচারপতি মুতাজিলাদের মুখপাত্র কাজী আহমাদ বিন আবু দাউদকে তর্কবিতর্কের মাধ্যমে নাকানিচুবানি খাওয়ালে ওয়াসেক বিল্লাহর কাছে সত্য উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। এবং চিরতরে খালকে কুরআনের আকিদা ত্যাগ করে তিনি মুতাজিলাসম্প্রদায়ের সংসর্গ থেকে ফিরে আসেন।৩৫
ওয়াসেক বিল্লাহর পর খেলাফতের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন মুতাওয়াক্কিল। তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের চিন্তাচেতনা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেন। মুতাজিলা মতবাদ এবং দার্শনিক চিন্তাবিশ্বাসের স্থলে সমাজে পুনঃস্থাপিত করেন কুরআন-সুন্নাহর মতামতের গুরুত্ব ও মর্যাদা। রাষ্ট্রীয় সহায়তায় ফের মুতাজিলা মতবাদ এবং দার্শনিক চিন্তাভাবনার জয়যাত্রা থামিয়ে দেওয়া হয়। অবশ্য এরপরও ইলমি মজলিসে এবং জ্ঞানীদের আলোচনা-সমালোচনায় দর্শনের চর্চা রয়ে গিয়েছিল; সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু সমাজে ভ্রান্ত চিন্তার যে শোরগোল উচ্চকিত হয়েছিল, তা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে।
কাজী ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মদ তাইমীর বক্তব্য হলো : তিনজন খলিফা বিস্ময়কর কাজ করে দেখিয়ে গেছেন: এক আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু, যিনি ইরতিদাদের ফেতনা সমূলে উপড়ে ফেলেছিলেন। আরেক হলেন হজরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ, যিনি মৃতপ্রায় উম্মাহর মাঝে এনে দিয়েছিলেন প্রাণের সঞ্চার। তৃতীয়জন খলিফা মুতাওয়াক্কিল, যিনি বিদআত মিটিয়ে সুন্নাহর পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছিলেন।৩৬
হিজরি তৃতীয় শতাব্দীর শেষ এবং চতুর্থ শতাব্দীর শুরুর দিকের কথা। ইমাম আবুল হাসান আশআরী (মৃত্যু: ৩৩৪ হিজরি), যিনি একজন মুতাজিলি আলেম ছিলেন, নিজের পূর্বেকার ভ্রান্ত চিন্তা ও মতবাদ পরিত্যাগ করে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মুখপাত্রে পরিণত হন। আর কেবল ইলম এবং জ্ঞানের ময়দানেই নয়; বরং সাধারণ পরিমণ্ডলেও ইসলামের বিরুদ্ধে এই বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের পোক্ত জবাব দিতে থাকেন। তিনি মুতাজিলাদের প্রতিহত করবার জন্য তাদের সাথে তাদেরই ভাষায় কথা বলেন এবং মুহাদ্দিস ও মুতাজিলাদের মধ্যে সংলাপের জন্য এক অভিনব ও মধ্যপন্থি বাকপদ্ধতি অবলম্বন করেন, যাতে মুতাজিলাদের মতো চিন্তা ও বিবেকবুদ্ধিকে লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়নি আবার মুহাদ্দিসদের মতো বুদ্ধিবৃত্তিক ও যৌক্তিক আলাপ একদমই এড়িয়ে যাওয়া হয়নি। তিনি দার্শনিক আলাপ-সংলাপের বিরোধী ছিলেন না। বরং তার কথা ছিল—দর্শন ও ফালসাফা বাছবিচার করে গ্রহণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে তাকে সমালোচনার কাঠগড়ায় হাজির করা হবে। তিনি মনে করতেন—বিরোধীদের সাথে তাদেরই ভাষা ও পরিভাষায় কথা বলতে পারা অধিক কার্যকরী। আবু মুসা আশআরী তার বিভিন্ন বিতর্ক এবং রচনার মাধ্যমে বুদ্ধি ও বিবেকপূজারিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়ে তৎকালীন মনস্তাত্ত্বিক লড়াই প্রতিহত করতে এবং মুসলিম-মানসকে সেই ভ্রান্ত চিন্তার সয়লাবে ভেসে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে সমর্থ হন।
তারই অন্যতম শাগরেদ ইমাম আবু মানসুর মাতুরিদী (মৃত্যু: ৩৩২ হিজরি); ইসলামি বিশ্বে যিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন কালামশাস্ত্রের সবচেয়ে বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ আলেম হিসেবে। অনেক দিন মুতাজিলাদের সান্নিধ্যে কাটানোর পরিণামে আবু মুসা আশআরীর গৃহীত কার্যপদ্ধতির মধ্যে কিছু কঠোরতার প্রকাশ ঘটে যেত, যা অনেক সময় আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিভিন্ন মাসআলা ও আকিদাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলত। মাতুরিদী সে সমস্যাগুলো দূর করে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের পথ ও পন্থা আরও পাকাপোক্ত ও সুসংহত করে তোলেন। ইমাম মাতুরিদীর পর কাজী আবু বকর বাকিল্লানী (মৃত্যু: ৪০৩ হিজরি) এবং শায়েখ আবু ইসহাক ইসফারায়িনীর (মৃত্যু: ৪১৮ হিজরি) মতো বিদগ্ধ ইসলামি দার্শনিকবৃন্দ মুসলমানদের আকিদা-বিশ্বাস সংরক্ষণের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। হারামাইন শরিফাইনের ইমাম জুয়ানী (মৃত্যু: ৪৬৮ হিজরি) রহিমাহুল্লাহুও কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন তার কালের মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক হামলার মোকাবেলার জন্য। তিনি একজন দার্শনিক ও বিতার্কিক হবার পাশাপাশি একজন বিদগ্ধ মুহাদ্দিস, ফকিহ এবং মুফাসসিরও ছিলেন। হিজরি পঞ্চম শতাব্দীতে বাগদাদের মাদরাসায়ে নিজামিয়া আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের চিন্তাধারার লোকদের সবচাইতে বড় মোর্চা এবং দুর্গে পরিণত হয়। সেলজুক সাম্রাজ্যের মালিক শাহের উজির নিজামুল মুলক তুসী এটাকে প্রতিষ্ঠা করেন। আর মাদরাসাটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন আবু ইসহাক সিরাজী (মৃত্যু : ৪৭৬ হিজরি)। বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের প্রতিরোধ ও মোকাবেলায় মাদরাসায়ে নিজামিয়ার ভূমিকা ছিল অনন্য সাধারণ।৩৭
হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত উদ্ভূত ভ্রান্ত মতবাদ ও ফেতনার 'কানমলা' দেওয়ার জন্য ইলম ও জ্ঞানজগতে গবেষণাধর্মী ও বিশ্লেষণাত্মক বেশ কিছু কাজ হয়, যা পরিণামে কল্যাণকর হয়েও দেখা দিয়েছিল। এই কালের আলেমদের প্রয়াস-প্রচেষ্টার ফলে হিজরি প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে সৃষ্ট আরও কিছু ভ্রান্ত আকিদা ও মতবাদ যেমন, খারেজি, মুরজিয়া, কাদরিয়্যা, জাহমিয়্যি ইত্যাদি তৃতীয় শতকের পর একদমই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। মুতাজিলা ফেতনার প্রকোপও কমে আসে এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতই ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র—প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাবকশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। ভ্রান্ত মতাদর্শী বলতে রয়ে যায় কেবল শিয়াসম্প্রদায়, যারা একের পর এক নিত্যনতুন অভিনব সব ফেতনার জন্ম দিয়ে যাচ্ছিল।
টিকাঃ
৩২ সুনান ও জামে মুহাদ্দিসদের দুটো বিশেষ পরিভাষা। সুনান দ্বারা উদ্দেশ্য হাদিসের ওই সমস্ত গ্রন্থ, যেগুলো ফিকহের অধ্যায়ের বিন্যাস অনুসারে বিন্যস্ত করা হয়েছে। যেমন: ইমাম নাসায়ী রহ. এর সংকলিত হাদিসগ্রন্থ সুনানে নাসায়ী। পক্ষান্তরে জামে বলা হয় সেই সমস্ত হাদিসগ্রন্থকে, যেগুলোতে দীনের মৌলিক ৮টি বিষয় : আকায়েদ, সিয়ার, তাফসির, আহকাম, আদব, ফিতান, রিকাক ও মানাকিব অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেমন: ইমাম তিরমিজী রহ. এর সংকলিত হাদিসগ্রন্থ জামে তিরমিজী।
৩৩ তাবাকাতুল উমাম, পৃষ্ঠা: ৪৭
৩৪ তারিখে বাগদাদ, খতিব বাগদাদী-৪/৪২১
৩৫ আল-ইতিসাম, শাতেবী, পৃষ্ঠা: ৩২৪
৩৬ তারিখে বাগদাদ, খতিব বাগদাদী।
৩৭ তারিখে দাওয়াত ওয়া আজিমাত গ্রন্থ থেকে সংক্ষেপিত: ১/৯৪-১১৮